স্যার ওয়াল্টার স্কটের উপন্যাস ‘দ্য তালিসমান’-এর পাতা ওল্টালেই বাতাসে ভেসে আসে তৃতীয় ক্রুসেডের ধুলোমাখা যুদ্ধক্ষেত্রের গন্ধ। একদিকে অগ্নিগর্ভ, সাহসী আর ক্ষমতায় অটুট ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট, অন্যদিকে তার সমান ক্ষমতাধর, কিন্তু প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা আর উদারতায় অতুলনীয় সুলতান। স্কট তার উপন্যাসে সুলতানকে এমন এক মহৎ চরিত্র হিসেবে এঁকেছেন, যিনি শত্রুকেও সম্মান জানান। ন্যায়বিচারে অবিচল থাকেন। মানবতার মাপকাঠির শিখরে থাকেন।
স্কটের কলমের সেই সুলতান, যার প্রজ্ঞা আর দানশীলতা পাঠককে মুগ্ধ করে, কোনো কল্পনাপ্রসূত চরিত্র ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক জীবন্ত ব্যক্তিত্বের প্রতিধ্বনি। যার গল্প শুরু হয়েছিল কোনো উপন্যাসের পাতায় নয়, বরং ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দের এক বৃষ্টিসিক্ত রাতে, তিকরিতের দুর্গে।
এ কথাই ফুটে উঠেছে, সালাউদ্দিনের জীবনী নিয়ে লেখা বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘দ্য লাইফ অব সালাহ এড-দিন’ বা ‘সুলতান ইউসুফের জীবনকথা’য়, এ এক অসাধারণ দলিল। সুলতানের একান্ত সচিব ও সেনাবাহিনীর প্রধান কাজী হিসেবে বাহাউদ্দিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে দরবারের অন্দরমহল পর্যন্ত সবকিছুর সঙ্গে ছিলেন নিবিড়ভাবে পরিচিত। তার এ লেখায় উঠে এসেছে এমন সব ঘটনা ও চরিত্রের খুঁটিনাটি, যা ইতিহাসকে করেছে আরো প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য।
তিকরিতের দুর্গের ওপর সেদিন মেঘ নেমে এসেছিল টাইগ্রিসের বাতাসে ভিজে। ১১৩৭ খ্রিস্টাব্দ, ৫৩২ হিজরি। রাত গভীর হলে এক নবজাতকের কান্না ভাঙল নীরবতা। নাম হলো ইউসুফ ইবনে আইয়ুব। পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব, তিকরিতের দায়িত্বশীল গভর্নর, উদার আর ন্যায়প্রিয় মানুষ। চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহ, দুঃসাহসী সেনাপতি। শৈশব থেকেই ইউসুফ এ দুই ধারার পাঠ পেলেন। একদিকে সংযম ও ন্যায়। অন্যদিকে শৌর্য ও কৌশল।
কিছুদিনের ভেতর রাজনৈতিক টানাপড়েনে পরিবার তিকরিত ছাড়ল। মসুল হয়ে সিরিয়া এল। বালবেকের দায়িত্ব পেল পরিবার, আর সেখানেই তরুণ ইউসুফ প্রথম প্রশাসনের পাঠ নিলেন।
কৈশোরে দামেস্কের আঙিনায় ইউসুফ পাঠ নিলেন পবিত্র কোরআন, হাদিস, ফিকাহ, কূটনীতির। নূরউদ্দিন জঙ্গির দরবারে নিয়ম-শৃঙ্খলা দেখে শিখলেন শাসনের প্রধান নীতি; ন্যায় যদি সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, রাজকার্য ব্যর্থ। জ্ঞানচর্চা আর ইসলামের অনুশাসন—এ দুটি স্রোত তার ভিত নির্মাণ করল। বন্ধুমহলে তিনি সংযত, স্বল্পভাষী, অতিথিপরায়ণ। ক্রীড়া-শিকারে মেতেছেন। তবু অহংকার তার মন ছোঁয়নি। তারুণ্যের দীপ্ত দিনে তিনি স্থির বিশ্বাসে পৌঁছলেন, মানুষের ওপর শাসন করতে হলে আগে নিজের ওপর শাসন স্থাপন করতে হয়। পরবর্তীকালে এ আত্মশাসনই তাকে সমসাময়িক বহু রাজপুরুষের থেকে আলাদা করেছে।
রাজনীতি তার দিকে এগিয়ে এল মিসরে অভিযানের পথে। ফাতিমীয় দরবার তখন অস্থিরতায় টলমল। শিরকুহের সঙ্গে মিসরে গিয়েই ইউসুফ কাছ থেকে দেখলেন ক্ষমতার নাটক—কারসাজি, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রলোভন আর লোভের ক্ষয়ক্ষতি। শিরকুহ ১১৬৯ সালে কায়রোয় মৃত্যুবরণ করলে ভেঙে পড়া দরবারে তরুণ ইউসুফকে ওয়াজির করা হলো। বাহাউদ্দিন লিখেছেন, ‘কায়রোয় ১১৬৯-এ শিরকুহ মৃত্যুবরণ করেন এবং তার স্থলাভিষিক্ত হন সালাউদ্দিন।’
ওয়াজির হয়েই ইউসুফ তিনটি কাজ শুরু করলেন, রাজকোষ গরিবের জন্য খুলে দিলেন, সেনাদের নিয়মিত বেতন নিশ্চিত করলেন আর দুর্নীতিকে কঠোর হাতে দমন করলেন। মিসর পেল স্থিতি, প্রশাসন হলো স্বচ্ছ, করের বোঝা হালকা হলো, ধর্মীয় সম্প্রীতি ফিরল। কিছুদিনের মধ্যেই ৫৬৭ হিজরির মহররম ১০ (১৩ সেপ্টেম্বর ১১৭১) ফাতিমি খলিফা আল-আদিদের মৃত্যুতে ফাতিমীয় খেলাফতের শেষ অধ্যায় রচিত হলো। তার আগে থেকেই খুতবায় আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাদির নাম উচ্চারণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সালাউদ্দিন। এভাবেই ওয়াজির ইউসুফ ধীরে ধীরে ‘সুলতান’-এর দায়দায়িত্ব কাঁধে নিলেন—প্রথমে মিসরে, এরপর নূরউদ্দিনের মৃত্যু (১১৭৪)-পরবর্তী শূন্যতা পেরিয়ে দামেস্কে প্রবেশ ও সিরিয়া-মিসরের ঐক্য গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি পরিচিত হলেন আল-মালিক আন-নাসির সালাউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব নামে—‘ধর্মের ন্যায়ের সালাউদ্দিন, আল্লাহর সাহায্যে জয়ী রাজা ইউসুফ’।

মিসরের কায়রোর সামরিক জাদুঘরে সালাউদ্দিনের আধুনিক ভাস্কর্য
দামেস্কে সিংহাসনে বসেও তিনি নিজেকে প্রজার সমতুল্যই ভাবতেন। তার আদালত বসত খোলা আকাশের নিচে, সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে যে কেউ এসে অভিযোগ জানাতে পারত। পারস্যবাসী, আরব, কুর্দ, সিরীয়, খ্রিস্টান, ইহুদি—সবাই একই সারিতে দাঁড়িয়ে কথা বলত। সমকালীন বর্ণনা থেকে জানা যায়, দামেস্কে ঢোকার পর তিনি জনসমক্ষে দরবার করতেন, নিপীড়িতদের অভিযোগ শুনতেন। এ সময়ে নিজ সন্তানরাও থাকত পাশে। ন্যায়ের পথচলা যেন পারিবারিক উত্তরাধিকার হয়ে ওঠে সে লক্ষ্যে সন্তানদের পাশে রাখতেন তিনি।
সালাউদ্দিনের এ ন্যায়পরায়ণতার মূলে ছিল স্রষ্টার প্রতি তার অগাধ আস্থা। খোদাভীরুতা। তার নিয়মিত ইবাদত বন্দেগিতে এর প্রকাশ ঘটত। তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত ভালো নামাজি। বাহাউদ্দিন লিখেছেন, সুলতান বছরের পর বছর ধরে কোনো জুমার নামাজেই গরহাজির হননি। অসুস্থ থাকলেও তিনি জোর করে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। ভ্রমণের সময় নির্দিষ্ট ওয়াক্ত এলেই তিনি ঘোড়া থেকে নেমে আদায় করতেন নামাজ। কোরআন তিলাওয়াত শুনলে তার চোখ ছলছল করে উঠত। অশ্রু গড়িয়ে পড়ত তার দাড়ি বেয়ে। তার কাছে ধর্মীয় অনুশাসন ছিল জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। এ অনুশাসনই তাকে ন্যায়ের পথে অবিচল রাখত।
একদিন জেরুজালেমের আদালতে এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ী হাজির হলেন, যার নাম ওমর খেলাতি। তিনি অভিযোগ করলেন, তার এক দাস সোঙ্কোর খেলাতি মারা গেছে। দাসের কাছে তার বহু অর্থ জমা ছিল, যা আসলে তারই। কিন্তু সুলতানের লোকেরা সেই অর্থ বাজেয়াপ্ত করে নিয়েছে। বাহাউদ্দিন যখন দলিলপত্র দেখলেন, তখন দেখলেন সবকিছুই আইনসিদ্ধ। তিনি বিস্মিত হলেও বিষয়টি সুলতানের কাছে উপস্থাপন করলেন। সুলতান শুনে বললেন, যদি দাবিটি সত্য হয়, তবে অর্থ ফেরত দেয়া হবে। তদন্তে সত্যতা মিলল। সুলতান নির্দেশ দিলেন, রাজকোষ থেকে ওই ব্যবসায়ীর সমস্ত অর্থ ফেরত দেয়া হোক। রাষ্ট্রের প্রধান হয়েও তিনি নিজের বিরুদ্ধেও ন্যায়বিচার করতে পিছপা হননি।
তার দয়াশীলতার দৃশ্য চোখে দেখা বিবরণ থেকেই জানা যায়। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকা এক বন্দিকে তিনি মুক্ত করে দেন; আবার এক ফ্র্যাঙ্ক নারীর হারিয়ে যাওয়া শিশুকে বাজার থেকে দাম দিয়ে কিনে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন। এসব বয়ান বাহাউদ্দিনের লেখায় তুলে ধরা হয়েছে।
সেই খোলা দরবারেই জন্ম নেয় আরেক কাহিনী। একদিন এক বৃদ্ধা এলেন। তার হাত কাঁপছে, চোখে অশ্রু। অভিযোগ, তার ছোট্ট খেত বেআইনিভাবে ঘিরে নিয়েছে এক প্রভাবশালী রাজকর্মকর্তা। প্রহরীরা তাকে সরিয়ে দিতে চাইলে সুলতান সালাউদ্দিন থামালেন, বৃদ্ধাকে পাশে বসালেন, অভিযোগ শুনলেন, আর তলব করলেন অভিযুক্তকে। বললেন, রাজ্যের ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের লোভ চরিতার্থ করেছ, তুমি রাজ্যের শত্রু। পরদিন ভোরেই জমি ফেরত গেল; নথিপত্র নতুন করে লেখা হলো; বৃদ্ধা দোয়া করতে করতে দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। এমন উন্মুক্ত জবাবদিহির আরো কাহিনী বইজুড়েই ছড়িয়ে আছে। এসব কাহিনীতে একটা বিষয় ফুটে উঠেছে, সালাউদ্দিন ‘শারীরিক দণ্ড দিতে অনিচ্ছুক, কিন্তু দায়িত্ব পালনে কঠোর।’ রাজকোষের সোনা-রুপা তছরুপের কেলেঙ্কারির মামলায়ও তিনি অভিযুক্তকে বরখাস্ত করেন। প্রহারের নির্দেশ দেননি।
তার শাসনের নীতি ছিল, ধন রাজকোষে থাকুক, শাসকের অন্তরে নয়। তাই অকারণ বিলাস, অপচয়, অলংকার—সবই অপছন্দ। খাদ্য-পানি সৈন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন; তার শয্যা ছিল সাদামাটা চৌকি বা তক্তপোষ। যুদ্ধশেষে নিহতের পরিবারের জন্য খোরপোশ নির্ধারণ করতেন; বন্দিদের মুক্তিপণ জোগাড় না হলে রাজকোষ থেকে দিতেন। যেখানে তার নিশান উড়েছে, সেখানেই তৈরি হয়েছে হাসপাতাল, মাদ্রাসা, সড়ক, কূপ। দিনের রাজকার্য শেষে রাতভর ইবাদত; রাষ্ট্রচিন্তা আর ইবাদত—একই স্রোতে চলত তার জীবনে। তার কাছে আল্লাহর পথে লড়াই মানে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, মানুষের সম্মান রক্ষা। আর নিজের কামনার ওপর সংযম।
এরপর এল হাত্তিনের সেই গ্রীষ্ম। ভূগোলের ভাষায়, গ্যালিলির উপত্যকা—টিবেরিয়াস হ্রদের পশ্চিমে আগ্নেয় পাহাড়ের যুগলশিখর, যাকে বলে হাত্তিনের শৃঙ্গ। ৫৮৩ হিজরি, ৪ জুলাই ১১৮৭—তপ্ত বাতাস, শত্রু বাহিনীর তৃষ্ণা, আর ঘিরে ফেলা জলপথ। সালাউদ্দিন সৈন্যদের বললেন—ধৈর্য ধরো, তৃষ্ণাকে পরাস্ত করো, আল্লাহর ওপর ভরসা করো। কয়েকদিনের আঘাতে ক্রুসেডারদের পতাকা মাটিতে লুটাল; বন্দি হলেন রাজা গাই দ্য লুসিনান; ধরা পড়লেন কুখ্যাত রেনো দে শাতিলোঁ—ক্রুসেডারদের অন্যতম শক্তিশালী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দুর্গ, কেরাক দুর্গের অধিপতি বা কেরাকের প্রভু। রেনো বহুবার মুসলমান বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করেছেন, পবিত্রতার অবমাননা করেছিলেন। তাঁবুতে ডেকে সালাউদ্দিন রেনোকে শাস্তি দিলেন। নিজ হাতে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করলেন। রাজা গাইকে প্রাণদণ্ড দিলেন না, বরং ক্ষমা করলেন তিনি। যুদ্ধোত্তর শৃঙ্খলা ফিরে এলে তিনি সৈন্যদের কাছ থেকে লুটের মাল জড়ো করে মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিলেন। এ যেন বাজার বসেছে, কিন্তু পণ্য শুধুই ন্যায়; পালিয়ে যাওয়া লোকদেরও ডেকে এনে জিনিস বুঝিয়ে দেয়া হলো।
হাত্তিন জয় কেন জেরুজালেমের দরজায় এনে দাঁড় করাল—তার ব্যাখ্যা সরল। হাত্তিনে ক্রুসেডারদের মূল সেনাশক্তি কার্যত গুঁড়িয়ে যায়; ‘হলি ক্রস’ হেরে যায়; দুর্গপ্রাচীর রক্ষার লোকবল টিকিয়ে রাখার মতো রসদ-মনোবল থাকে না। হাত্তিন-পরবর্তী কয়েক মাসে সালাউদ্দিন একের পর এক দুর্গ-বন্দর দখল করে রসদ-পথ কেটে দেন; এতে অক্টোবরের ভেতর জেরুজালেমে আত্মসমর্পণের আলোচনার পরিস্থিতি পাকাপাকি হয়। ৫৮৩ হিজরির রজব-শাবানজুড়ে অবরোধ-আলোচনার পর—শহর শান্তি চুক্তি হয়। জেরুজালেম আত্মসমর্পণের পর বন্দি-মুক্তির অর্থ বা মুক্তিপণ না থাকলে রাজকোষ থেকে প্রদানের ব্যবস্থা, গির্জা এবং পুরোহিতের নিরাপত্তা, বাজার খোলা রাখার মতো পদক্ষেপ নেন সালাউদ্দিন। ইউরোপ চমকে উঠল। এ কেমন আচরণ? দুশমনের সঙ্গেও মানুষের মতো, বিশেষ করে বন্ধুর মতো ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে তারা দেখা তো দূরের কথা শোনেওনি এমন কথা।
এরপর শুরু হলো রিচার্ড দ্য লায়নহার্টের সঙ্গে টানাপড়েন। ইংল্যান্ডের এ সম্রাট ছিলেন যোদ্ধা আর কূটনীতিবিদের অদ্ভুত মিশেল। তাদের লড়াই ছিল শুধু তলোয়ারের নয়, মনেরও। একবার সম্মুখযুদ্ধে রিচার্ডের ঘোড়া নিহত হলে তিনি পদাতিক সেনা হয়ে পড়েন। সালাউদ্দিন দূর থেকে এ দৃশ্য দেখলেন। তার ভ্রাতুষ্পুত্রকে ডেকে বললেন, একটি শ্রেষ্ঠ আরবীয় ঘোড়া পাঠিয়ে দাও, একজন রাজা পদাতিক সেনার মতো যুদ্ধ করতে পারেন না। এ মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে রিচার্ড পরে বলেছিলেন, শত্রু হলেও সালাউদ্দিন একজন মহান নেতা। আরেকবার যুদ্ধবিরতিকালে রিচার্ড গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে সালাউদ্দিন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসককে পাঠানোর পাশাপাশি হেরমন পর্বত থেকে বরফ এনে তার জ্বর ঠাণ্ডা করার ব্যবস্থা করেন আর পাঠান তাজা ফল। শত্রুতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার যে পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসে বিরল। অবশেষে দীর্ঘ লড়াই আর কূটনীতির পর তিন বছরের জন্য শান্তি চুক্তি হলো, যেখানে তীর্থযাত্রীদের নিরাপদে জেরুজালেমে যাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হলো।
রাজনীতির বাইরে তার দিনযাপন ছিল মানুষকেন্দ্রিক। দামেস্কে ফিরে তিনি কেল্লা মেরামত করলেন; সৈন্যদের বেতন-রসদ নিয়মিত করলেন; নগর প্রাচীরের দরজা রাতে বন্ধ-দিনে খোলা রাখার বিধান করা হলো। ফলে রাতে চোরাচালান-জুলুম কমল, দালালের উৎপাতও থিতিয়ে গেল। বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পরিমাপ-কর-দপ্তর কড়া নজরদারি চালাল। বড় বড় সভায় কবি-বিদ্বান-দরবেশ—সবার কথা বলার সুযোগ ছিল।
কখনো কখনো সন্তানদের নিয়ে শিকারে বেরোতেন। তবে রাজকার্যের ডাক পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ফিরতেন। শেষবার দামেস্কে ফিরে তিনি জনসম্মুখে বৃহৎ দরবার বসালেন। লোকজন ভিড় করল; কবিরা পড়লেন প্রশংসাগাথা। ‘ন্যায়ের ডানা প্রসারিত হয়েছে’—কবিতার পঙ্ক্তিতে বর্ণনা করা হলো। সালাউদ্দিন নির্দিষ্ট সময় ধরে, নির্দিষ্ট নিয়মে নিপীড়িতদের কথা শুনলেন। বাহাউদ্দিন স্বচক্ষে এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছেন।
তার অনুদানের তালিকা দীর্ঘ। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে শহীদ পরিবারের জন্য দপ্তর, অসহায়দের খোরপোশ, মাদ্রাসা-হাসপাতাল-খানকাহ, কোরআনের অনুলিপি তৈরির উদ্যোগ, ওয়াকফ ব্যবস্থা কার্যকর করা, কৃষিজমিতে সেচের উন্নতি, সড়ক-কূপ নির্মাণ, ছোট ছোট বাজারের খাজনা কমিয়ে বেচাকেনা সচল রাখা। তিনি বলতেন, আল্লাহর ঘরে যাওয়ার টিকিট সোনায় নয়, সেবায়। রাজকোষকে তিনি আমানত ভাবতেন, ব্যক্তিসম্পত্তি নয়; তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দরজা খোলা রেখে দান করেছেন।
জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হলো দামেস্কেই। অসুখ বাড়তে থাকলেও তিনি নিপীড়িতদের কথা শোনা বন্ধ করলেন না। শেষ রাতে যখন মৃত্যুর ছায়া গ্রাস করছিল, বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করছিলেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি তার কাতিবকে ডেকে বললেন, রাজকোষে যা আছে তা খুলে দাও। সৈন্যদের বেতন বাকি আছে কিনা দেখো, দিয়ে দাও। বন্দিদের মুক্তিপণ বাকি থাকলে তা-ও পরিশোধ করো। যেকোনো গরিব মানুষের যদি আমার কাছে পাওনা থাকে, তাও মিটিয়ে দাও। আমার দরবারের সাজসরঞ্জাম, আমার পোশাক, সবকিছু বিক্রি করে দাও, যাতে কেউ অভাবে না থাকে। আর যদি আমার জানাজার খরচ পর্যন্ত না জোটে, তবে আমার এ চাদরটাই বিক্রি করে দিয়ো। তার কণ্ঠ কম্পিত হলেও আদেশ ছিল দৃঢ়। তিনি চেয়েছিলেন নিঃস্ব হয়েই মহাপ্রভুর দরবারে হাজির হতে। ৪ মার্চ ১১৯৩ সালে তিনি ইন্তেকাল করলেন।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই মানুষ ভিড় করল, মসজিদ, গির্জা, ইহুদি পাড়া—সবখানেই কান্নার রোল পড়ল। সমাহিত হলেন এক সাধারণ গম্বুজের নিচে। তার পাশে রাখা হলো কাঠের তলোয়ার, একটি কলস আর একখানা কাপড়—লোভহীন ক্ষমতা, পবিত্রতা আর সাদামাটা জীবনযাপনের প্রতীক। তার মৃত্যুর পর রাজকোষে মাত্র ৪৭টি দিরহাম আর একটি টাইরিয়ান স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেল। কোনো সম্পত্তি, বাড়ি, বাগান—কিছুই ছিল না।
তার পূর্ণ উপাধি—আল-মালিক আন-নাসির সালাউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব। সমসাময়িকরা তাকে ‘সুলতানুল ইসলাম, মুসলমানদের সুলতান, দুই পবিত্র নগরের খাদেম’ বলেও উল্লেখ করেছেন।
আজও তার শিক্ষা প্রাসঙ্গিক—শাসন মানে জবরদস্তি নয়, দায়িত্ব। ন্যায় প্রতিষ্ঠা মানে প্রতিশোধ নয়, সংযম। যুদ্ধ মানে ধ্বংস নয়, মানুষের মান রক্ষা। যেখানে দুর্নীতি স্বাভাবিক সেখানে তিনি শেখান—রাজা আগে নিজেকে শাসন করো। যেখানে রাজনীতি বিভাজনকে নিয়ম বানায় সেখানে তিনি শেখান—ঐক্য না থাকলে বিজয়ও পরাজয়ে রূপান্তর হয়। যেখানে অসুস্থ শত্রুর জন্য ফল-বরফ-চিকিৎসক পাঠানো হয়, সেখানে মানবতা এসে ধর্মের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়। যেখানে আদালতে এক বৃদ্ধা কাঁদে, সেখানে তিনি বলেন, প্রজার অশ্রুপাতের জন্য আমার জবাবদিহি করতে হবে। যেখানে বাজার বসে, কিন্তু পণ্য শুধুই ন্যায়—সেখানে তিনি ন্যায়কেই রাষ্ট্রের একমাত্র মুদ্রা বানিয়ে দেন।
ইউসুফ কী করে সালাউদ্দিন হলেন, তার গল্পটি এক কথায় আত্মশাসন। তিকরিতের এক গভর্নরের সন্তান থেকে দামেস্কের শাসক, মিসরের ওয়াজির থেকে সুলতান, হাত্তিনের বিজয়ী থেকে জেরুজালেমের মুক্তিদাতা, প্রতিটি পদক্ষেপেই তিনি প্রমাণ করেছেন, ন্যায়ই তার তলোয়ারের ধার ছিল, মানবতাই ছিল তার ঢাল। ১১৮৭ সালের হাত্তিন যদি তার তলোয়ারের দীপ্তি হয়, তবে জেরুজালেম জয়ের পর করুণাময় প্রশাসন ছিল তার হৃদয়ের আলো।
শেষ রাতে কাঠের তলোয়ারের পাশে নিঃস্ব শায়িত রাজাই সেই আলোকে অক্ষয় করে রেখে গেলেন, যাতে করে শতাব্দীকাল পরেও মানুষ জানতে পারে, সিংহাসনে বসে কেউ প্রকৃত শাসক হন না, মানুষের অশ্রু মোছানোর হাতের গুণেই হয়ে ওঠেন প্রকৃত শাসক। এ ন্যায় আর মানবতার উত্তরাধিকারই ধরে রেখেছিলেন স্যার ওয়াল্টার স্কট তার ‘তালিসমান’ উপন্যাসে। উপন্যাসের কাল্পনিক তালিসমান, মাদুলি বা তাবিজ নাকি কোনো ধন্বন্তরি দাওয়াই উপন্যাসে তা পরিষ্কার করা হয়নি, যতই জাদুকরী হোক না কেন, প্রকৃত সালাউদ্দিন ছিলেন সেই জাদুর জীবন্ত প্রতীক। যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মানের প্রতীক। শান্তিতে সুশাসনের প্রতীক।
সৈয়দ মূসা রেজা: লেখক ও সাংবাদিক








