ইসলামের ইতিহাসে বহু বীরের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা। তাদের অন্যতম সালাউদ্দিন আইয়ুবি। কোথাও তিনি সালাউদ্দিন, কোথাও সালাদিন। ক্রুসেডের তিনি কেন্দ্রীয় চরিত্র। ১১৮৭ সালে হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে তিনি পুনরুদ্ধার করেন জেরুজালেম কিন্তু বিজয়ের পর তিনি প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমাশীলতা দেখিয়েছিলেন। বন্দিদের মুক্তি, নারীদের নিরাপত্তা ও খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের প্রতি শ্রদ্ধা—এসব আচরণ তাকে ইতিহাসে এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করেছে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আলোচিত। কেবল আলোচিতই নন, বহুল আলোচিত। তিনি যেমন বীর, তেমনই ইতিহাসের বাঁকবদলে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। লোককথা, উপকথায় তিনি অমর হয়ে আছেন। পরবর্তী সময়ে তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে গল্প, উপন্যাস। তৈরি হয়েছে সিনেমা এবং আরো পরে এসে তৈরি হয়েছে টেলিভিশন সিরিজ।

সাহিত্যে সালাউদ্দিনের প্রতিচ্ছবি নিয়ে আলাপ তুললে প্রথমেই আসবে স্যার ওয়াল্টার স্কটের উপন্যাসের নাম। স্কটের আইভানহো নিয়ে নানা সমালোচনা আছে। ‘দ্য তালিসমান’ও মুক্ত নয়। তবে এর মধ্যেই আছে সালাদিনের কথা। ১৮২৫ সালে প্রকাশ হয় দ্য তালিসমান। এটি স্কটের ‘ওয়েভারলি নভেলস’ সিরিজের ‘টেলস অব ক্রুসেড’-এর অংশ। উপন্যাসটি তৃতীয় ক্রুসেডের পটভূমিতে রচিত। এতে ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড ও সালাদিনের কথা সমান্তরালে এসেছে।

ব্রিটিশ লেখক হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের রচনায় ১৯০৪ সালে প্রকাশ হয় ‘দ্য ব্রেদরেন’। এ উপন্যাসও তৃতীয় ক্রুসেডের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এ উপন্যাসে সালাদিনকে এক উদার ও মর্যাদাবান রাজা হিসেবে চিত্রিত করেছেন হ্যাগার্ড। উপন্যাসে দেখা যায় তিনি ইউরোপীয় যোদ্ধাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েও তাদের সম্মান করতেন।

সুইডিশ লেখক-সাংবাদিক জ্যান গিলো তিনটি উপন্যাস লিখেছেন ক্রুসেড নিয়ে। ক্রুসেড ট্রিলজি নামে ‘দ্য রোড টু জেরুজালেম’, ‘দ্য নাইট টেম্পলার’ ও ‘দ্য কিংডম অ্যাট দি এন্ড অব দ্য রোড’-এ উঠে এসেছে ক্রুসেডের নানা বিষয়। স্বাভাবিকভাবেই এ উপন্যাসগুলোয় এসেছে সালাউদ্দিন আইয়ুবির কথাও। আর্ন নামের এক চরিত্রকে নিয়ে এ উপন্যাসের সিরিজ এগোয়। জ্যানের দ্বিতীয় উপন্যাসে দেখা যায় আর্ন ফিলিস্তিনে গেছে। সেখানে নাইট টেম্পলার হিসেবে সে গাজা ও জেরুজালেমে সালাউদ্দিনের সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করে।

১৯৯৮ সালে প্রকাশ হয় তরিক আলির ‘দ্য বুক অব সালাদিন’। সুলতান সালাউদ্দিনকে নিয়ে রচিত এ উপন্যাসকেই সবচেয়ে আধুনিক উপন্যাস ধরা হয়। দ্য বুক অব সালাদিন মূলত তারিক আলীর ইসলাম কুইনটেট সিরিজের দ্বিতীয় বই। লেখক এ বইয়ে সালাউদ্দিনের জীবনকে এক ইহুদি লেখকের চোখে বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসটি শুধু এক বীর যোদ্ধার কাহিনী নয়, বরং মুসলিম সভ্যতার উদারতা ও বহুত্ববাদকেও তুলে ধরে। আর উপন্যাসে সালাউদ্দিনকে দেখা যায় এক যোদ্ধা হিসেবে, যে ক্রুসেডে বীরত্বের কারণে পরবর্তী সময়ে মিসর ও সিরিয়ার শাসনভার পান।

1b

সালাউদ্দিনের চরিত্রে ঘাসান মাসউদ ছবি: আইএমডিবি

1a

ভারসো প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ছবি: অ্যামাজন

আরো সাম্প্রতিক সময়ে জ্যাক হাইটের সালাদিন ট্রিলজিতে (ঈগল, ক্রুসেড ও হোলি ওয়ার) সিরিজ সালাদিনের সামরিক কৌশল ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক বিশ্লেষণ করেছে। এ উপন্যাসগুলো জনপ্রিয়তার দিক থেকে সালাউদ্দিনকে নতুন প্রজন্মের পাঠকদের কাছেও পরিচিত করেছে।

উপন্যাসের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও এসেছে সুলতান সালাউদ্দিনের কথা। ঐতিহাসিক চরিত্র ও বিষয়াদি নিয়ে সিনেমা নির্মাণ হয়েই থাকে। সেক্ষেত্রে সালাউদ্দিনের মতো বর্ণময় চরিত্র বাদ পড়ার কথা না। পড়েওনি। একাধিক সিনেমা নির্মিত হয়েছে এ যোদ্ধাকে কেন্দ্র করে। পাশাপাশি অন্য নানা সিনেমায় সালাউদ্দিনের প্রসঙ্গ এসেছে। সেখানে হয়তো তিনি গৌণ, তবে সালাউদ্দিনকে মুখ্য চরিত্রে রেখে সিনেমা ও সিরিজের সংখ্যাও কম না এবং তা নির্মিত হয়েছে বিশ্বজুড়ে।

চলচ্চিত্রে সালাদিনের উপস্থিতি বর্ণময়। শুরুটা প্রায় ৯০ বছর আগে। ১৯৩৫ সালে মার্কিন চলচ্চিত্র নির্মাতা সিসিল বি ডিমিলে নির্মাণ করেন মহাকাব্যিক সিনেমা ‘দ্য ক্রুসেডস’। এ সিনেমায় সালাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেন ইয়ার কিথ।

১৯৩৯ সালে ভারতীয় নির্মাতা আই এ হাফিজজির পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘গাজী সালাউদ্দিন’। এতে সালাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেন গোলাম মোহাম্মদ। রিচার্ডের চরিত্রে ছিলেন মাজহার খান।

সালাউদ্দিন ও রিচার্ড বিষয়ক সবচেয়ে জনপ্রিয় বই দ্য তালিসমান। আর এ বই থেকে সিনেমা নির্মাণ হবে না তা তো সম্ভব না। সে দায়িত্ব নিয়েছিল ওয়ার্নার ব্রোস। ১৯৫৪ সালে তাদের প্রযোজনায় স্কটের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ হয় কিং রিচার্ড অ্যান্ড দ্য ক্রুসেডারস। সিনেমাটি পরিচালনা করেন মার্কিন নির্মাতা ডেভিড বাটলার। এতে ব্রিটিশ অভিনেতা রেক্স হ্যারিসন অভিনয় করেন সালাউদ্দিনের চরিত্রে। রিচার্ডের চরিত্রে অভিনয় করেন জর্জ স্যান্ডার্স।

১৯৬৩ সালে মিসরের কিংবদন্তি পরিচালক ইউসুফ শাহিন নির্মাণ করেন আস নাসের সালাউদ্দিন। ইংরেজিতে সিনেমাটির নাম সালাদিন দ্য ভিক্টোরিয়াস। এটি আরব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র। সিনেমায় সালাদিনকে দেখানো হয়েছে এক আরব ঐক্যের প্রতীক হিসেবে, যিনি ধর্ম নয়, ন্যায় ও স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেন। এতে সালাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন আহমেদ হাফেজ মাজহার আর হামদি গিয়াসকে দেখা গেছে রিচার্ডের চরিত্রে।

বিবিসির ডক্টর হু সিরিজে ১৯৬৫ সালের একটি পর্ব ছিল ‘দ্য ক্রুসেড’। এতে সালাদিনের চরিত্রে অভিনয় করেন বার্নার্ড বে। ১৯৯৫ সালের তথ্যচিত্র ক্রুসেডস নির্মাণ করেন টেরি জোনস। এতে সালাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেন ক্যামি দারবিশ।

২০০১ সালে প্রচার হয় সিরিয়ান নির্মাতা হাতেম আলী পরিচালিত টেলিভিশন সিরিজ ‘সালাহ আল-দ্বীন আল-আইযুবি’। আরবি ভাষার এ টেলিভিশন সিরিজে সালাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যায় সিরিয়ার অভিনেতা জামাল সোলেমানকে। সিরিজে সালাউদ্দিন একাধারে একজন বীর যোদ্ধা, অন্যদিকে জ্ঞানী সেনাপতি ও শাসক।

সালাউদ্দিনকে নিয়ে নির্মিত বা ক্রুসেডকেন্দ্রিক আধুনিক সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো রিডলি স্কটের কিংডম অব হ্যাভেন। ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে সালাউদ্দিনের ভূমিকায় অভিনয় করেন সিরিয়ান অভিনেতা ঘাসান মাসউদ। এখানে সালাউদ্দিনকে দেখানো হয়েছে এক জ্ঞানী, সংযত ও মানবিক নেতা হিসেবে, যিনি যুদ্ধের মাঝেও মানবতার আলো ধরে রাখেন। রিডলি স্কট ঐতিহাসিক সিনেমা নির্মাণে স্বনামধন্য। তার এ সিনেমায় সালাউদ্দিন ও ক্রুসেডের বিষয়গুলো যেমন দারুণভাবে এসেছে, তেমনি সিনেমাটোগ্রাফি ও চিত্রগ্রহণের জন্যও দর্শনীয় হয়ে উঠেছে।

এদিকে সম্প্রতি তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় তৈরি হয়েছে টিভি সিরিজ ‘কুদুস ফাতিহি সালাউদ্দিন আইয়ুবি’। ২০২৩ সালে স্ট্রিম হওয়ার পর এখন পর্যন্ত দুই সিজন প্রচার হয়েছে। এটি সালাদিনের জীবনের বিস্তারিত উঠে এসেছে। তার শৈশব থেকে শুরু করে ক্রুসেড পর্যন্ত দীর্ঘ সংগ্রাম ফুটে উঠেছে। সিরিজটি ইসলামী ইতিহাসে আগ্রহী তরুণদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

এদিকে জ্যান গিলোর উপন্যাস থেকে নির্মিত হয়েছে আর্ন: দ্য নাইট টেম্পলার। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন ড্যানিশ নির্মাতা পিটার ফ্লিন্থ। এতে সালাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ভারতীয় অভিনেতা মিলিন্দ সোমান।

এ সিনেমাগুলো ছাড়াও মালয়েশিয়ায় নির্মাণ হয়েছিল একটি অ্যানিমেশন সিরিজ। ২০০৯ সালে এর প্রথম এপিসোড প্রচার হয়। এছাড়া ভিডিও গেমেও দেখা গেছে সালাউদ্দিনের উপস্থাপনা। এজ অব এম্পায়ারস টু: দি এজ অব দ্য কিংস, ক্রুসেডার কিংস, সিভিলাইজেশন সিরিজের গেমে তার চরিত্র রাখা হয়েছে।

মাহমুদুর রহমান: লেখক ও সাংবাদিক