দুর্ধর্ষ সব যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সমর ইতিহাসে তিনি হাজার বছর ধরে কিংবদন্তি নাম। আরবে জ্ঞানচর্চার ইতিহাস ঘাঁটলে সেখানেও তিনি দীপ্তিমান—তিনি সালাউদ্দিন আইয়ুবি। তার শৈশব-কৈশোর কেটেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের তীর্থভূমি দামেস্কে। তাই ছোটবেলায়ই ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি গণিত জ্যামিতিতে আগ্রহী ছিলেন। আরবি ভাষা, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে আইন শিক্ষায়ও জ্ঞানার্জন করেছিলেন।
সেকালে তিনি ছিলেন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক। তার শাসনামলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সাহিত্যচর্চা উজ্জীবিত হয়। তিনি প্রমাণ করেছেন সত্যিকারের মহান শাসক হলেন তিনিই, যিনি জ্ঞান ও ন্যায়ের সমন্বয় ঘটাতে পারেন।
ইসলামের ইতিহাসে সালাউদ্দিন আইয়ুবি ১১৮৭ সালে জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তবে তার কৃতিত্ব শুধু যুদ্ধের ময়দানে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানবিক কল্যাণের দৃঢ় সমর্থক একজন শাসকও। মধ্যযুগে যখন ইউরোপ ক্রুসেড যুদ্ধে নিমগ্ন, তখন সালাউদ্দিন মুসলিম সমাজে জ্ঞান, চিকিৎসা ও শিক্ষার পুনর্জাগরণ ঘটান। তার শাসনামলে চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে, যা ইসলামী স্বর্ণযুগের ঐতিহ্যকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
তিনি মিসর ও সিরিয়াজুড়ে বহু সুন্নি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যেগুলোকে পর্যাপ্ত সম্পদ ও ওয়াকফ দান করেন, খ্যাতনামা আলেমদের নিয়োগ দেন, পাঠ্যক্রম মানসম্মত করেন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা পরিবেশ সৃষ্টি করেন।
তার এ বৈজ্ঞানিক ও শিক্ষা আন্দোলন ছিল প্রকৃতপক্ষে নূরউদ্দিন মাহমুদ জঙ্গির উদ্যোগের ধারাবাহিকতা। সালাউদ্দিন আইয়ুবির প্রতিষ্ঠিত প্রধান মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিসরের মাদ্রাসা আস সালিহিয়্যাহ। এটি তার যুগের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত ছিল। সালাউদ্দিন এ মাদ্রাসার ওয়াকফ পরিচালনার দায়িত্ব দেন শায়খ নাজমুদ্দিন আল-খুবুশানীকে, যিনি একই সঙ্গে শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। আল-হাফিজ আস-সুয়ুতী উল্লেখ করেছেন যে ওই সময় মিসরে এটি ছিল সবচেয়ে বিশিষ্ট মাদ্রাসা এবং এর শিক্ষকরা ছিলেন যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের অন্তর্ভুক্ত। সালাউদ্দিন মন্ত্রী আল-আব্বাসের বাড়ি রূপান্তর করেন হানাফি মাজহাবের মাদ্রাসা হিসেবে, যা আস-সুইফিয়্যাহ নামে পরিচিত ছিল। এটি কায়রোর আল-হুসাইনি মসজিদের নিকটে অবস্থিত ছিল। এছাড়া শাফেয়ি মাজহাবের জন্য সালাউদ্দিন আশ-শারিফিয়্যাহ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা সুন্নি ফিকহ ও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তিনি আল-কামহিয়্যাহ নামের মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন মালিকি মাজহাবের শিক্ষার জন্য। এর মাধ্যমে তিনি তার সাম্রাজ্যে চারটি সুন্নি মাজহাবের (হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) মধ্যে অন্তত তিনটির শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন নিশ্চিত করেন।
এখনো মিসরের ঐতিহাসিক সব মসজিদসংলগ্ন মাদ্রাসায় চার মাজহাবের ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীকক্ষ দেখা যায়। মাজহাবের ভিন্নতা জ্ঞানচর্চারই একটা বিশেষ অংশ ছিল তখন।
ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকানের মতে, যখন সুলতান (সালাউদ্দিন আইয়ুবি) মিসরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন, তখন মিসর ছিল ইমামিয়া (শিয়া) মতবাদের অধীনে, যেখানে এ বিষয়ে (সুন্নি শিক্ষা ব্যবস্থা) কোনো পাঠদান হতো না। তাই তিনি ইমাম শাফেয়ীর (রহ.) কবরের পাশে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
সালাউদ্দিন আইয়ুবির শিক্ষানীতি ছিল তার ঐক্যবদ্ধ ইসলামী সমাজের স্বপ্ন দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজ, যা নৈতিক মূল্যবোধ ও জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি মাদ্রাসা, গ্রন্থাগার ও ওয়াকফ (দাতব্য তহবিল) প্রতিষ্ঠায় সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেন শিক্ষা প্রসারে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্রই ছিল না, বরং যুক্তি, ভাষা, চিকিৎসাশাস্ত্র, গণিত এবং আইনেরও পাঠদান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তার শিক্ষামডেল চরিত্র গঠন (তাজকিয়াহ), সমাজসেবা এবং জ্ঞান ও নীতির মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতার প্রতিরক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল।
বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সালাউদ্দিনের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ইসলামী পরিচয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধকে সুসংহত করার প্রয়োজনে উদ্ভূত হয়েছিল, বিশেষ করে ক্রুসেড চলাকালীন পশ্চিমা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। শিক্ষা ছিল তার বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যার মাধ্যমে তিনি এমন এক প্রজন্মের পণ্ডিত, বিচারক ও প্রশাসক তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যারা ইসলামী মূল্যবোধ পুনর্জাগরণ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিবেদিত থাকবে।
আজ সালাউদ্দিনের শিক্ষামডেল অধ্যয়নের প্রাসঙ্গিকতা নিহিত রয়েছে আধুনিক ইসলামী শিক্ষার পুনর্জাগরণে। বিশ্বায়ন ও ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাবের যুগে মুসলিম সমাজগুলোর জন্য এমন শিক্ষা কাঠামো ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আধুনিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।
সালাউদ্দিনের শাসনামলকে ইসলামী চিন্তা ও সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের যুগ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অসাধারণ সাফল্য অর্জন এবং বিজ্ঞান ও জ্ঞানচর্চাকে সংরক্ষণের মাধ্যমে সালাউদ্দিন মিসর, দামেস্ক ও আল-জাজিরাহ অঞ্চলকে জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। তার আমলে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের প্রাণশক্তি আরো উজ্জীবিত হয় এবং মানসিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসংখ্য পণ্ডিত ও চিন্তাবিদদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
সালাউদ্দিন ও পরবর্তী আইয়ুবি যুগ ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল সময় হিসেবে বিবেচিত হয়, বিশেষত খ্যাতনামা পণ্ডিতদের উত্থানের কারণে। তার সময়ে ধর্ম, রাজনীতি ও দর্শনের বহু বিশিষ্ট আলেম এবং চিন্তাবিদ সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের মধ্যে আল-শাতিবি, ইবনে আসাকির, ইবনে কুদামা, ইবনে মুনকিজ, আল-সুহরাওয়ার্দি, মাইমোনিডিস, সাইফ আদ-দীন আল-আমিদি এবং আবদুল লতিফ আল-বাগদাদি ছিলেন সে যুগের উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত ও চিন্তাবিদ।
সালাউদ্দিন মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসিয়া থেকে বহু পণ্ডিতকে মিসর, দামেস্ক ও আল-জাজিরাহ অঞ্চলে আসার সুযোগ করে দেন, ফলে এসব অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত হয়। ইহুদি পণ্ডিতরাও পশ্চিম অঞ্চল থেকে এসে সালাউদ্দিনের ন্যায়বিচারের আশ্রয় নেন। আন্দালুসিয়া ও ইউরোপে নিপীড়নের শিকার হওয়া বহু ইহুদি মিসরে এসে আশ্রয় নেন সালাউদ্দিনের শাসনাধীন অঞ্চলে। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক ও দার্শনিক মাইমোনিডিস, যিনি পরে সালাউদ্দিনের রাজচিকিৎসক হন এবং তার সুরক্ষা লাভ করেন।
মধ্যযুগীয় ইসলামী বিশ্বে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া হতো এবং প্রায় সব শাসক চিকিৎসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করতেন ও বিভিন্ন স্থানে হাসপাতাল নির্মাণ করতেন। সালাউদ্দিন তার পূর্বসূরি নূরউদ্দিনের মতোই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মিসর, দামেস্ক ও আল-জাজিরাহর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে হাসপাতাল নির্মাণ করেন, যা পরবর্তী সময়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক চিকিৎসা শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এ হাসপাতালগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল সালাউদ্দিন কর্তৃক কায়রোয় প্রতিষ্ঠিত বিমারিস্তান আন-নাসিরি (সালাহিয়্যা হাসপাতাল) এবং নূরউদ্দিন কর্তৃক দামেস্কে প্রতিষ্ঠিত বিমারিস্তান আন-নূরী,যেগুলো ওই সময়ের দুটি প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি চিকিৎসকেরা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ দুই প্রতিষ্ঠানে এসে যুক্ত হন, ফলে তত্ত্ব ও অনুশীলনের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী চিকিৎসা বিদ্যালয় গড়ে ওঠে। সালাউদ্দিন কায়রো, দামেস্ক ও আলেপ্পোতে একাধিক বিমারিস্তান (হাসপাতাল) প্রতিষ্ঠা করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত ‘আল-নাসরি বিমারিস্তান’ ছিল তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের অন্যতম উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্র। এখানে রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা ছিল। সালাউদ্দিনের চিকিৎসা ও শিক্ষানীতি প্রমাণ করে তিনি যুদ্ধের মধ্যেও জ্ঞানকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে ইসলামী চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশে ভূমিকা রাখে।
তার আমলে চিকিৎসকদের জন্য আলাদা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু হয়। তিনি চিকিৎসা গবেষণায় পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং ইবনে সিনা, আল-রাজি ও আল-জাহরাবির গ্রন্থগুলো পাঠ্য হিসেবে নির্ধারণ করেন। সালাউদ্দিন চিকিৎসকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করেন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বাজেট নির্ধারণ করেন, যা মধ্যযুগে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
সালাউদ্দিনের চিকিৎসা নীতিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল। খ্রিস্টান ও ইহুদি চিকিৎসকরাও তার হাসপাতালগুলোয় কাজ করতেন। এমনকি ক্রুসেড যুদ্ধের সময় আহত শত্রু সৈনিকদের জন্যও চিকিৎসা ব্যবস্থা তিনি নিজে নিশ্চিত করতেন।
সালাউদ্দিন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সালাহিয়্যা হাসপাতাল (কায়রো) বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ সেখানে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক চিকিৎসা একত্রে পরিচালিত হতো। ফাতিমি রাজবংশ পতনের পর সালাউদ্দিন তাদের এক সুন্দর প্রাসাদকে এ হাসপাতালে রূপান্তর করেন। তার কাদি আল-ফাদিলের মতে, সালাউদ্দিন হাসপাতালটিকে ধনী ওয়াকফ সম্পদ দ্বারা সমর্থন করেছিলেন, যা অসুস্থ ও মানসিকভাবে বিষণ্ন ব্যক্তিদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে বহু দক্ষ চিকিৎসক ও সার্জন কর্মরত ছিলেন।
এ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ছিল রাইসুল আতিব্বা মুহাযযাব উদ-দীন আদ-দাখওয়ারের প্রতিষ্ঠিত একটি মাদ্রাসা, যেখানে শুধু চিকিৎসা শিক্ষা দেয়া হতো, যা ইসলামী ইতিহাসে অনন্য উদাহরণ।
সালাউদ্দিনের আমলে চিকিৎসা শিক্ষা হাসপাতাল, মাদ্রাসা ও ব্যক্তিগত গৃহে পরিচালিত হতো। দামেস্কের নূরিয়্যা হাসপাতালে তাত্ত্বিক চিকিৎসা শিক্ষার জন্য একটি বড় শ্রেণীকক্ষ ছিল। সেখানে হাসপাতালের প্রথম সার্জন জেনারেল আবু আল-মাজদ ইবনে আবি আল-হাকাম পাঠদান করতেন। একই রকম ব্যবস্থা ছিল মিসরের নাসিরিয়্যা হাসপাতালে, যেখানে রাদিউদ্দীন আর-রাহবি চিকিৎসা পাঠদান করতেন।
এছাড়া চিকিৎসকদের নিজ নিজ বাসায় চিকিৎসা শিক্ষা দেয়াও প্রচলিত ছিল। দামেস্কে আদ-দাখওয়ার এবং কায়রোয় আবদুল লতিফ আল-বাগদাদি তাদের নিজ বাড়িতে চিকিৎসা পাঠদান করতেন।
সালাউদ্দিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক সংখ্যা ছিল অন্তত ১৮ জন, তাদের মধ্যে ছিলেন আটজন মুসলিম, পাঁচজন ইহুদি, চারজন খ্রিস্টান এবং একজন সামারিটান। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কোরদোভায় জন্মগ্রহণকারী এবং সেখানে শিক্ষালাভকারী ইবনে মাইমুন (মাইমোনিডিস), যিনি পরবর্তী সময়ে সালাউদ্দিনের রাজচিকিৎসক হন।
সালাউদ্দিনের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদ্রাসাগুলো শুধু ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে এক সমন্বিত পাঠ্যক্রমসমৃদ্ধ পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো দামেস্কের মাদ্রাসাত আল-কামিলিয়্যা এবং জেরুজালেমের মাদ্রাসাত আল-সালাহিয়্যা।
প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শুধু ইসলামী আইন (ফিকহ), কোরআনের তাফসির এবং হাদিস শিক্ষার জন্য নয়, বরং এর সঙ্গে জ্যোতির্বিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের মতো বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ আন্তঃবিষয়ক (interdisciplinary) শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন আলেম তৈরি করা, যারা আত্মিক ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রেই জ্ঞানচর্চা ও নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
সালাউদ্দিনের শাসনামলে মাদ্রাসাগুলোয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি নেয়া হতো না। বরং শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের প্রয়োজন মেটাতে তাদের ওয়াকফ (ধর্মীয় দান বা সম্পত্তি) থেকে ভাতা প্রদান করা হতো। সালাউদ্দিন আস-সালাহিয়্যা মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য মাসিক ৪০ দিনার বেতন, ১০ দিনার নজির (পর্যবেক্ষক) এবং প্রতিদিন ৬০ মিসরীয় রুটি বরাদ্দ করেছিলেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে তিনি হাম্মাম (গোসলখানা), বেকারি ও নাইল নদীর মাঝখানে অবস্থিত ফিল উপদ্বীপের জমি দান করেন।
জনাথন বার্কি তার গ্রন্থ The Transmission of Knowledge in Medieval Cairo-এ উল্লেখ করেন মাদ্রাসাগুলো ওয়াকফ দান দ্বারা পরিচালিত হতো, বিশেষ করে আইয়ুবি ও মামলুক আমলে, যাতে এগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও স্থিতিশীলভাবে চলতে পারে। সালাউদ্দিন ও তার উত্তরসূরিরা ওয়াকফ ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন, যা সুন্নি মতবাদ ও শিক্ষা ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছিল।
বিভিন্ন বিষয় যেমন যুক্তি (Logic) ও দর্শনের (Philosophy) অন্তর্ভুক্তি ধর্মীয় মূল পাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি মাদ্রাসাগুলোর এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, যা এগুলোকে বহুমাত্রিক বা আন্তঃবিষয়ক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
মুসলিম ভূমির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন রূপে ও আকারে বিদ্যমান ছিল, যেমন মাদ্রাসা, খানকাহ, মসজিদ এবং নানা ধরনের একাডেমি। ওয়াল্টার স্কটের মতে, এসব প্রতিষ্ঠান সার্জারি ও চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে বিশদ গ্রন্থ রচনা করেছিল। তারা নক্ষত্রগুলোকে এমন আরবি নাম দিয়েছিল, যা আজও আকাশমণ্ডলের মানচিত্রে বিদ্যমান। মুয়াজ্জিন যখন মানুষকে নামাজের আহ্বান জানাতেন, তখন তার মাথার ওপরে স্থাপিত থাকত বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতি, যেমন সূর্যঘড়ি, অ্যাস্ট্রোল্যাব, দোলঘড়ি, আর্মিলারি গোল। এসব বৈজ্ঞানিক উপকরণ মুসলমানরা গ্রহণে আপত্তি করেনি কখনো।
তিনি বহু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়কে সংস্কার করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় প্রাচীন গ্রিক ও ফারসি গ্রন্থগুলো অনুবাদ করে সংরক্ষণ করা হয়, যা পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় রেনেসাঁয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সালাউদ্দিনের শাসন মানবিকতা, ন্যায় ও সহমর্মিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। জেরুজালেম বিজয়ের পর তিনি খ্রিস্টানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং দাসপ্রথা সীমিত করেন। সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান, যেমন খানা-খাদ্য বিতরণ কেন্দ্র ও এতিমখানা তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়।
দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় ফাতেমীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তখন সিরিয়ার শাসক নূরউদ্দিন জঙ্গি সালাউদ্দিনকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন। সালাউদ্দিন ১১৬৯ সালে মিসরে প্রেরিত হন এবং পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ফাতেমীয়দের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্যে তিনি মিসরে নিজের অবস্থান মজবুত করেন। অবশেষে ১১৭১ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ফাতেমীয় খিলাফতের অবসান ঘটান এবং সুন্নি আব্বাসীয় খলিফার নামে খুতবা পাঠ শুরু করেন। এর মাধ্যমে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলা ফাতেমীয় শাসনের অবসান ঘটে এবং মিসরে সুন্নি আইয়ুবি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
সাধারণত ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠী ক্ষমতা হারালে তাদের স্থাপিত প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস বা দমন করা হয়। কিন্তু সালাউদ্দিন এ পথ অনুসরণ করেননি। তিনি জানতেন, ফাতেমীয়দের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে মতভেদ থাকলেও তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ইসলামী সভ্যতার এক মূল্যবান সম্পদ। ফাতেমীয়দের প্রতিষ্ঠিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মূলত শিয়া শিক্ষাকেন্দ্র। সালাউদ্দিন এটি ধ্বংস করেননি; বরং এটিকে পুনর্গঠিত করে সুন্নি ইসলামী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তর করেন। তিনি সেখানে মালিকি, শাফেয়ি ও হানাফি মাজহাবের পণ্ডিতদের নিয়োগ দেন এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনেন। ফলে আল-আজহার একটি সর্বজনীন ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়, যা আজ পর্যন্ত ইসলামী জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে টিকে আছে। ফাতেমীয়দের সময় কায়রোয় বিশাল গ্রন্থাগার (দারুল-হিকমা) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এতে হাজার হাজার দুষ্প্রাপ্য পাণ্ডুলিপি ছিল। সালাউদ্দিন অনেক মূল্যবান বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং সেগুলোকে রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারে স্থানান্তর করেন।
তিনি আরো কয়েকটি নতুন সুন্নি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যেমন মাদ্রাসাতুল ফাদিলিয়া ও মাদ্রাসাতুন নাসিরিয়া, কিন্তু পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস না করে সংস্কার করে জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবেই রাখেন।
সালাউদ্দিন আইয়ুবি শুধু রাজনৈতিক ঐক্য নয়, বরং ধর্মীয় সহাবস্থানের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি মিসরে শিয়া, খ্রিস্টান ও ইহুদি জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করেন।
ফাতেমীয় প্রশাসনের কর্মচারীদেরও সম্পূর্ণরূপে বরখাস্ত না করে যোগ্যতা অনুযায়ী অনেককে দায়িত্বে রাখেন। এতে প্রশাসনিক স্থিতি বজায় থাকে এবং জনগণের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সালাউদ্দিনের এ উদারনীতি ইসলামী সভ্যতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি তিনি ফাতেমীয় প্রতিষ্ঠানের সবকিছু ধ্বংস করে দিতেন, তাহলে ইসলামী জ্ঞানচর্চা মিসরে এক বিশাল ধাক্কা খেত। কিন্তু তার দূরদর্শিতা আল-আজহার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জ্ঞানের প্রবাহ অক্ষুণ্ন রাখে। ফলে আইয়ুবি যুগে ও পরবর্তী মামলুক আমলে কায়রো ইসলামী জ্ঞান, দর্শন ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আল-আজহার থেকে অসংখ্য আলেম, দার্শনিক ও বিজ্ঞানী বেরিয়ে আসেন, যারা ইসলামী সভ্যতার বিকাশে অবদান রাখেন।
সালাউদ্দিন কেবল বিজ্ঞান ও ধর্ম নয়, বরং সাহিত্য এবং ইতিহাসেও উৎসাহী ছিলেন। তিনি ইতিহাসবিদ, কবি ও দার্শনিকদের সংস্পর্শে রাখতেন এবং তাদের কাজের প্রতি সম্মান দেখাতেন। তার ন্যায়পরায়ণ ও উদার শাসননীতি বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে প্রশংসিত হয়েছে। ইতিহাস ও জ্ঞানচর্চাকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তাসনীম আলম: লেখক ও অনুবাদক









