মুসলিম বীর সালাউদ্দিন আইয়ুবি পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিত ‘সালাদিন’ নামে। মধ্যযুগের ইউরোপীয় ক্রুসেডাররা প্রায়ই তাকে সম্মানের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন। মুসলিম নেতা হিসেবে তিনি ইসলামী বিশ্বের মধ্যে সুপরিচিত এবং একজন দক্ষ শাসক ও যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। তবে ইউরোপীয় চিত্রকল্পে তিনি ছিলেন ‘মহান শত্রু’। আবার তাকে একজন শক্তিশালী, চতুর কিন্তু ন্যায়পরায়ণ ও মানবিক নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। শত্রুপক্ষের প্রতি মানবিক ও উদার আচরণের কারণে ক্রুসেডাররা যুদ্ধক্ষেত্রের পরও সালাউদ্দিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করতেন।

১১৮৭ সালের হাত্তিনের যুদ্ধে খ্রিস্টানদের সম্মিলিত ক্রুসেড বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন সালাউদ্দিন। এ মহাসাফল্য এবং জেরুজালেম বিজয়কে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ক্রনিক সংরক্ষিত হয়েছে। হাত্তিনের যুদ্ধের ফলে সালাউদ্দিন জেরুজালেম দখল করেন এবং শহরের খ্রিস্টান নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করেন। এ মানবিক আচরণই তাকে ইউরোপীয় বর্ণনায় ‘সম্মানজনক শত্রু’ হিসেবে পরিচিতি দেয়। ইউরোপীয় বর্ণনায় একদিকে শত্রু, অন্যদিকে নায়ক—সালাউদ্দিনকে নিয়ে পশ্চিমাদের এমন দ্বৈত দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

ক্যারল হিলেন ব্রান্ড একজন খ্যাতনামা ব্রিটিশ মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ইতিহাসবিদ। মধ্যযুগীয় ইসলামের ইতিহাস নিয়ে তার বিস্তর গবেষণা আছে। তিনি ‘দি ইভ্যালুয়েশন অব দ্য সালাদিন লিজেন্ড ইন দ্য ওয়েস্ট’ শীর্ষক গবেষণা করেছেন। সেখানে মধ্যযুগীয় মুসলিম যোদ্ধা সালাউদ্দিনকে ইউরোপীয়রা নায়করূপে গ্রহণ করার ঘটনাকে একটি বিরল এবং অসাধারণ উদাহরণ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। কারণ ক্রুসেডের সময় পশ্চিমা খ্রিস্টান বিশ্বের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সালাউদ্দিন।

ক্রুসেডারদের চোখে সালাউদ্দিন

ক্যারল হিলেনের গবেষণায় দেখা যায়, আর্চবিশপ উইলিয়াম অব টায়ার (১১৭০-৮৪) সাল পর্যন্ত লাতিন কিংডম অব জেরুজালেমের চ্যান্সেলর ছিলেন। সালাউদ্দিনের কৃতিত্ব এবং চরিত্রের সত্য মূল্যায়নে উইলিয়ামের সাক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লাতিন, গ্রিক, ফরাসি ও আরবি ভাষায় অভিজ্ঞ ছিলেন। তিনি সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনায়ও সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, বিশেষ করে সালাউদ্দিনের কর্মজীবনের সময়ে। তার লাতিন ভাষায় লেখা গ্রন্থ ‘হিস্টোরিয়া রেরাম ইন পার্টিবাস গেস্টারাম’। এটি বারো শতকে ক্রুসেড নিয়ে বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ, যা সমকালের ইতিহাস আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে বিবেচিত।

উইলিয়াম সালাউদ্দিনকে ‘বুদ্ধির অধিকারী, যুদ্ধকুশলী ও অত্যধিক উদার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অবশ্য উইলিয়ামের বর্ণনায় সালাউদ্দিনের সমালোচনা এবং কিছু ভুল তথ্যও আছে। তিনি লিখেছেন, সালাউদ্দিন নিজ হাতে খলিফা ও তার সন্তানদের হত্যা করেছিলেন, তারপর রাজকোষের ধন-সম্পদ দখল করেন। এমনকি সৈন্যদের স্বর্ণ দিয়ে প্রলুব্ধ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এসব তথ্য ছিল ভিত্তিহীন।

বারো শতকের নিকটপূর্বের যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়া ক্রুসেডারদের লেখায় সালাউদ্দিনের ব্যক্তিত্ব ও সহমর্মিতা এবং উদারতার প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, এ ধরনের প্রশংসা হয়তো ক্রুসেডারদের পরাজয়ের ব্যথা নরম করার জন্য করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সালাউদ্দিনের বাস্তব চরিত্রের সঙ্গে এ প্রশংসার যৌক্তিকতা পাওয়া যায়। পশ্চিমাদের প্রশংসা সালাউদ্দিনের আরবি জীবনীকারদের (যেমন ইমাদুদ্দিন আল-ইসফাহানি ও ইবনে শাদ্দাদ) বর্ণনার সঙ্গেও মিল পাওয়া যায়।

পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সাহিত্যে সালাউদ্দিনের উল্লেখযোগ্য মূল্যায়ন দেখা যায়। জার্মান আলোকযুগের অন্যতম নাট্যকার, প্রাবন্ধিক ও দার্শনিক গোটহল্ড এফ লেসিং তার নাটক ‘নাথান দ্য ওয়াইজ’-এ ইসলামকে উপস্থাপন করার জন্য সালাউদ্দিনকে বেছে নেন। নাটকটি ১৭৭৯ সালে সম্পন্ন হয়। জেরুজালেম নাটকের কেন্দ্রীয় স্থান। এখানে সালাউদ্দিনের অবস্থান দেখানো হয় আপেক্ষিক হিসেবে। কোথাও তাকে স্বৈরাচারী ও নিষ্ঠুর, আবার কোথাও তাকে সহানুভূতিশীলভাবে দেখানোরও চেষ্টা করা হয়।

ইতিহাসবিদ ক্যারল হিলেন একটি বড় প্রশ্ন তোলেন যে ক্রুসেডকালে অন্যান্য মুসলিম কমান্ডার—যেমন ইমাদ আদ-দীন জঙ্গি, নূর আল-দীন জঙ্গি ও অন্যরাও ছিলেন। তারা পশ্চিমা ইতিহাসে এমন খ্যাতি পাননি। তাহলে কেন সালাউদ্দিনই পশ্চিমাদের চোখে সবচেয়ে সম্মানিত মুসলিম নেতা হলেন? ব্যাখ্যাটি এ ইতিহাসবিদ দিয়েছেন এভাবে যে ইমাদ আদ-দীন জঙ্গির কর্মকাণ্ড মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং মুসলিম সূত্রগুলোতেও তার ব্যক্তিত্ব আকর্ষণীয় নয়। কিন্তু সালাউদ্দিন সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলেন। মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয়ের কাছেই তিনি সম্মানিত ও প্রশংসিত ছিলেন। এর বিভিন্ন কারণের অন্যতম হলো হাত্তিনের যুদ্ধ এবং জেরুজালেম জয় করার পর তার উদারতা ও ন্যায়পরায়ণ আচরণের কথা ক্রুসেডার সূত্রগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তার চরম মানবিক ও সভ্য আচরণের গল্পগুলোও সত্যের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে কিংবদন্তিতে রূপ নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জেমস মেডিসন ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের গবেষক ব্রায়ান ক্রিস্টোফার ডেভিড তার ‘ইনভেন্টিং সালাদিন: রোল অব দ্য সালাদিন লিজেন্ড ইন ইউরোপিয়ান কালচার অ্যান্ড আইডেনটিটি’ শীর্ষক মাস্টার্সের থিসিস গবেষণায় সালাউদ্দিন আইয়ুবিকে নিয়ে পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির আরো গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। সালাউদ্দিন আইয়ুবিকে নিয়ে বিভিন্ন কিংবদন্তি চলমান আছে। ইতিহাসবিদ ব্রায়ান ক্রিস্টোফার ডেভিডের মতে, কিংবদন্তি ও স্মৃতিকথা ইতিহাসের লিখিত ও মৌখিক উভয় ধারায়ই গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কিংবদন্তি সাংস্কৃতিক পরিচয় গড়ে তুলতে পারলেও তা ইতিহাসবিদদের জন্য হয়ে ওঠে বিভ্রান্তির কারণ। তখন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, বিকল্প উৎস ও তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ইতিহাসবিদরা এসব কিংবদন্তির আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে উন্মোচনের চেষ্টা করেন। তার পরও কিংবদন্তিকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা যায় না, কারণ এগুলো একেকটি সভ্যতার মানসিকতা ও আত্মপরিচয়ের প্রতিফলন। যেমন সালমান রুশদি একবার বলেছিলেন, ‘কখনো কখনো কিংবদন্তিই বাস্তবতা তৈরি করে, আর বাস্তবতার চেয়েও কার্যকর হয়ে ওঠে।’ এ কথা ক্রুসেড যুগের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব সালাউদ্দিন আইয়ুবির ক্ষেত্রে নিখুঁতভাবে প্রযোজ্য।

ক্রিস্টোফার ডেভিডের গবেষণায় দেখা যায়, মৃত্যুর পর সালাউদ্দিন আরব বিশ্বে একসময় প্রায় বিস্মৃত হয়ে পড়েন। সেখানে তাকে কেবল এক সাধারণ সুলতান হিসেবেই দেখা হতো। তার জীবনী বারবার লেখা ও মুদ্রিত হলেও তাতে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়নি। কিন্তু আধুনিক যুগে, বিশেষত ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে, এ ধারণা বদলে যায়। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ ও মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘকাল ধরে তাদের হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপটে সালাউদ্দিনকে পুনরায় আবিষ্কার করা হয়। তাকে দেখানো হয় এক স্থানীয় বীর ও বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে। এভাবে তিনি ইউরোপীয় সংস্কৃতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

পশ্চিমা ইতিহাসবিদদের লেখায় সালাউদ্দিন

পশ্চিমা বিশ্বে সালাউদ্দিনকে নিয়ে ‘হিস্ট্রি দে সালাদিন’ নামে প্রথম ঐতিহাসিক জীবনী প্রকাশ করেন ফরাসি ইতিহাসবিদ এলএফসি মারিন। গ্রন্থটি ১৭৫২ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ছিল সালাউদ্দিনের ওপর প্রথম রচনা, যেখানে লাতিন ও আরবি উভয় উৎসের সংমিশ্রণ দেখা যায়। মারিন সালাউদ্দিনকে একজন বীরত্বপূর্ণ ও রোমান্টিক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করলেও তার খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তর বা ইউরোপ সফরের মতো অবাস্তব কিংবদন্তিগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। একই ধারা দেখা যায় আরেক ফরাসি ইতিহাসবিদ জেএফ মিশোর রচনা বিখ্যাত ‘হিস্ট্রি দেজ ক্রুসেডস’ গ্রন্থে। তিনিও সালাউদ্দিনকে নিয়ে যুগে যুগে গড়ে ওঠা অদ্ভুত সব কিংবদন্তিকে বর্জন করেন।

এ দুই ইতিহাসবিদ একত্রে সালাউদ্দিন এবং রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট সম্পর্কে এমন এক ধারাবাহিক রূপক-ছবি গড়ে তোলেন, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী পশ্চিমা সাহিত্য ও ইতিহাসে পুনরাবৃত্তি হয় সাহসী ও নির্ভীক রিচার্ড বনাম ধার্মিক ও বিনম্র সালাউদ্দিন হিসেবে। উল্লেখ্য, রিচার্ড তৃতীয় ক্রুসেডে (১১৮৯-১১৯২) মুসলিম সেনাপতি সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। যদিও তিনি জেরুজালেম পুনর্দখল করতে ব্যর্থ হন, সালাউদ্দিনের সঙ্গে তার পারস্পরিক সম্মান ও কূটনৈতিক দক্ষতার গল্পই ইউরোপীয় সাহিত্যে বীরত্বের কাহিনীর জন্ম দেয়।

স্যার ওয়াল্টার স্কট ইতিহাসবিদ ছিলেন না, কিন্তু তার বিখ্যাত ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস ‘দ্য তালিসমান’ (১৮২৫)-এর মাধ্যমে সালাউদ্দিনকে এক রোমান্টিক বীর রূপে জনপ্রিয় করে তোলেন। স্কটের এ সাহিত্যকর্ম ইতিহাসবিদদের মধ্যেও প্রভাব বিস্তার করে। মারিন ও মিশোর ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং স্কটের সাহিত্যিক কল্পনার মিশ্রণে পশ্চিমা বিশ্বে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সালাউদ্দিন এক কুশলী বীর ও মানবিক চরিত্র হিসেবে প্রাধান্য পায়।

বিশ শতকের শুরুতে এ রোমান্টিক চিত্রটি আরো গভীরভাবে প্রোথিত হয়। ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি লেন-পুল (১৯০৬), রেনে গ্রুসেট (১৯৩৯) ও এইচএআর গিব (১৯৪৯)—এ ধারা বজায় রেখে সালাউদ্দিনের চরিত্র বিশ্লেষণ করেন। তবে তারা এক নতুন দৃষ্টিকোণও যোগ করেন—‘সালাউদ্দিনের কুর্দি বংশোদ্ভূত পরিচয়’। তাদের মতে, সালাউদ্দিনের কুর্দি রক্তই আরব সমাজে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছিল, যা তাকে অন্যান্য মুসলিম নেতা থেকে আলাদা করেছিল।

এ ধারণা পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও সমর্থন করে—যেখানে বলা হয়, কুর্দিরা আসলে ‘ইন্দো-ইউরোপীয়’ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, তারা আরব বা তুর্কি নয়। সালাউদ্দিন এক অর্থে ইউরোপীয়দেরই প্রতিনিধি। তাই ইউরোপীয়রা ক্রুসেডে পরাজিত হলেও তারা নিজেদের মতো এক বীরের কাছে হেরেছিল—এ ব্যাখ্যা তাদের কাছে মানসিক সান্ত্বনা এনে দেয়। এ যুক্তি থেকেই সালাউদ্দিনের কিংবদন্তির রোমান্স যুগ শুরু হয়।

এ রোমান্টিক ইতিহাসচর্চা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে স্থায়ী হয়, যার চূড়ান্ত উদাহরণ স্টিভেন রুনসিম্যানের ‘আ হিস্ট্রি অব দ্য ক্রুসেডস’ (১৯৫১-৫৪) শীর্ষক গ্রন্থ। যদিও এটি জনপ্রিয় বই, আধুনিক গবেষকরা একে বৈজ্ঞানিক ইতিহাসের চেয়ে সাহিত্যিক রচনা হিসেবে দেখেন। ইতিহাসবিদ থমাস ম্যাডেন এ নিয়ে বলেছেন, ‘রুনসিম্যান একাই আধুনিক যুগে ক্রুসেড নিয়ে প্রচলিত ধারণা গড়ে তুলেছেন।’

পরের দিকে ম্যালকম লায়ন্স ও ডেভিড জ্যাকসন তাদের ‘সালাদিন অ্যান্ড দ্য পলিটিকস অব হলি ওয়ার’ (১৯৮৩)-তে সালাউদ্দিনকে ধর্মপ্রাণ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী নেতা হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। এ দৃষ্টিভঙ্গিই আজকের দিনে সালাউদ্দিনকে নিয়ে একাডেমিক পরিসরে আলোচনায় গ্রহণযোগ্যতা পায়।

সালাউদ্দিনকে নিয়ে পশ্চিমারা বেশকিছু চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সিরিজ নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো রিডলি স্কট পরিচালিত ২০০৫ সালের হলিউড চলচ্চিত্র ‘কিংডম অব হেভেন’।

ইউরোপে সালাউদ্দিনের প্রতি আকর্ষণ গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি। এটি তার মৃত্যুর পর ১১৯৩ সাল থেকে শুরু হয় এবং তা আজও অব্যাহত আছে। প্রকৃতপক্ষে সালাউদ্দিনের ‘কিংবদন্তি’ চরিত্র পশ্চিমা বিশ্বে বিকশিত হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নয়; এ মত ইতিহাসবিদ ক্যারল হিলেনের। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো মুসলিম মধ্যপ্রাচ্য সালাউদ্দিনকে খুব দেরিতে, উনিশ শতকে আবিষ্কার বা পুনরাবিষ্কার করে। এ সময় ঔপনিবেশিক যুগের সূচনায় খ্রিস্টান আরবরা ইউরোপীয় ক্রুসেডের গ্রন্থ অনুবাদ করে মুসলিম সহ-আরবদের সালাউদ্দিনের কীর্তি সম্পর্কে জানায়। এ ইতিহাস সালাউদ্দিনকে মধ্যপ্রাচ্যে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে আধুনিক আরব রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে অনেকেই দ্বিতীয় সালাউদ্দিন হওয়ার স্বপ্ন লালন করেন।

ইতিহাসবিদ ক্রিস্টোফার ডেভিডের দাবি, আধুনিক জীবনীকার সবাই সালাউদ্দিনকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তিগুলোকে স্বীকার করেন, কিন্তু কোনো বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাসবিদই আর তার কুর্দি পরিচয়কে আগের মতো সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন না। তার মতে, আধুনিক ইতিহাসচর্চায় সালাউদ্দিনকে কিংবদন্তি থেকে আলাদা করে প্রকৃত সালাউদ্দিনকে তুলে ধরা দরকার। তাকে অধ্যয়ন করার অনেক কারণ আছে; কিন্তু অতিরঞ্জিত করার প্রয়োজন নেই। সালাউদ্দিনের মাঝে যে মহানুভবতা ও বীরত্ব ছিল, সেটি তার সময়ের ইসলামী সংস্কৃতির মূল্যবোধেরই অংশ। তিনি ছিলেন ইউরোপীয় নাইটদের মতোই বীর, কিন্তু ইউরোপকে পরাজিত করেছিলেন। এ কারণেই ইউরোপীয় কিংবদন্তিতে তাকে প্রায়ই খ্রিস্টানসুলভ বা ইউরোপীয় রূপ দেয়া হয়। পরবর্তীকালে সাম্রাজ্যবাদী যুগে তার নাম ব্যবহার করা হয় ঔপনিবেশিক ও বর্ণবাদী মতাদর্শের ন্যায্যতা প্রমাণে।

সালাউদ্দিনের সমকালীন ইতিহাস লেখক আর্চবিশপ উইলিয়াম অব টায়ার থেকে শুরু করে বর্তমানের জেমস মেডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ব্রায়ান ক্রিস্টোফার ডেভিড পর্যন্ত পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও রচনায় সালাউদ্দিনের উদারতা, বুদ্ধিমত্তা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এমনভাবে স্থান পেয়েছে যে ক্রুসেডে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাসও সেখানে একপ্রকার নৈতিক জয়ে রূপ নিয়েছে।

বাশার খান: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা