উইলিয়াম কেনেডি। অনুবাদ লুনা রুশদী
[‘দি আটলান্টিক’ পত্রিকায় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল]
‘আপনি ইংরেজি বলতে পারেন?’ আমি জানতে চাইলাম।
‘না’, তিনি টেলিফোনে জানালেন— ‘না, না একদম পারি না।’
কথাটা সত্যি না হলেও এ রকম বলতেই পছন্দ করেন তিনি। আমিও ভাঙা ভাঙা স্প্যানিসে জানতে চাইলাম তিনি কোথায় থাকেন আর কখন আমাদের দেখা হতে পারে। জানালেন, ‘আমি একটা বাড়িতে থাকি’; বললেন, বিকাল ৫টার দিকে লা-রাম্বলাসের উপরে হোটেল থেকে তুলে নেবেন আমাকে। বার্সেলোনার পুরনো শহরে এ রাস্তা দিয়েই আসা-যাওয়া করা হয়। তাকে জানালাম আমার স্ত্রী ডানা পোর্তারিকোর মেয়ে, তাই আমরা নিজেরাও পথ চিনে তার বাড়িতে পৌঁছতে পারব। উত্তরে তিনি শুধু বললেন, ‘বুয়েনো’ (ভালো)।
১০ মিনিট পর আবার ফোনে বললেন, বিকালের বদলে দুপুর ১২টায় আসবেন। সেদিন ছিল বইমেলার উৎসব। ঠিক ১২টায় রাম্বলাসের ভিড় আর হট্টগোলের ভেতর দিয়ে হেঁটে এলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। পরনে গাঢ় নীল রঙের ডাবল ব্রেস্টেড স্পোর্টস জ্যাকেটের নিচে কলার-খোলা নীল শার্ট, তাতে খয়েরি আর সাদায় নকশা কাটা, ধূসর রঙের প্যান্ট। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো কালো চুল। গালে হালকা দাড়ি, এক মাস বিদেশ বাসের সময় রেজর নিতে ভুলে যাওয়ার পরিণাম।
‘হাল্লো, হ্যালো,’ শুভেচ্ছা বিনিময়, কেমন আছেন, কোমো এস্তা, দেখা হয়ে ভালো লাগছে, করমর্দন ইত্যাদি লৌকিকতার পর তিনি জানতে চাইলেন, ‘বই কিনেছেন?’
‘অবশ্যই! আপনার।’
তার বই অর্থাৎ তার বিশাল বই চিয়েন আনোস দে সোলেদাদ (আ হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড/একশ বছরের নির্জনতা)। দক্ষিণ আমেরিকার এক কাল্পনিক শহর মাকোন্দোর কাল্পনিক পরিবার বুয়েন্দিয়াদের অলীক অর্জন আর অদ্ভুত কর্মকাণ্ডে ভরা জীবনের একশ বছর নিয়ে আধা পরাবাস্তব কাহিনী। একাধিক সমালোচক মাস্টারপিস বলে আখ্যায়িত করেছেন গার্সিয়ার এ নাটকীয় উপন্যাসটিকে, জেনেসিসের যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত সব রকম মানবিক অনুভূতির কথাই বোধহয় আছে এ বইয়ে। টাইমস লিটারারি সাপ্লিমেন্টে বইটির বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে— ‘মজার মাস্টারপিস, এ-যাবৎকাল পর্যন্ত লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে নিটোল উপন্যাস।’ বইটি ১৯৬৯ সালে ফ্রান্সের প্রি-দু-মিল্যুঁ-লিভ্রে-ত্রাজে জিতেছে এবং একই বছর জিতেছে ইতালির প্রেমিও-কিয়ামচিয়ানো। ১৯৬৭ সালে বইটা বুয়েন্স আয়ার্সের ‘এডিটরিয়াল সুদামারিকানা’ থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর ২১ বার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে এবং ১০ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। এছাড়া পৃথিবীর ২৩টি দেশে প্রকাশিত হয়েছে। ১৮টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, ব্রাজিলে বিক্রি হয়েছে ৬০ হাজার কপি, ইতালিতে ৫০ হাজার, হাঙ্গেরিতে ৩০ হাজার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হার্ড কভারে ১৮ হাজার ৬৫০ কপি আর পেপার ব্যাকে ৪৬ হাজার ৬৫০ কপি বিক্রি হয়ে বেস্ট সেলার হয়েছে। এ সবকিছুই তাকে অর্থনৈতিক ও সাহিত্যিক স্বাধীনতা দিয়েছে, যার জন্য বহুদিন প্রতীক্ষায় ছিলেন তিনি। গার্সিয়া বলেন, সেই সঙ্গে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের ‘নির্যাতনের’ চাপও বেড়েছে।
এক বন্ধুর কাছে আক্ষেপ করে একবার বলেছিলেন, ২ ঘণ্টা সময় নষ্ট করে নিজেকে পত্রিকার প্রতিবেদকের কাছে ব্যক্ত করার পর তারা তা দেড় পাতার প্রতিবেদন বানিয়ে ফেলে। এক সম্পাদক একবার গার্সিয়ার স্ত্রী মারসিডিসের কাছ থেকে তার লেখা ব্যক্তিগত চিঠি চেয়েছিলেন ছাপার জন্য। আরেকবার এক মেয়ে একটা বইয়ের প্রস্তাব নিয়ে তার কাছে এসেছিল, বইয়ের নাম গার্সিয়া মার্কেসকে ২৫০টি প্রশ্ন। এ সম্পর্কে গার্সিয়া তার বন্ধুকে লিখেছিলেন, ‘মেয়েটাকে কফি খাওয়াতে নিয়ে গিয়ে বুঝিয়ে বললাম, আমি যদি ২৫০টি প্রশ্নের উত্তর দিই, তাহলে বইটা আমার বই হবে, তোমার বই না।’ আরেক সম্পাদক একবার অনুরোধ করেছিলেন চে-গুয়েভারার সিয়েরা-মায়েস্ত্রার ডায়েরির আগে একটা মুখবন্ধ লিখে দিতে, উত্তরে গার্সিয়া বলেছিলেন, তিনি খুশিমনে কাজটা করতে রাজি আছেন কিন্তু এজন্য অন্তত আট বছর সময় লাগবে। কারণ কাজটা তিনি ঠিকমতো করতে চান।
তাই বাইরের কেউ যোগাযোগ করলে এখন আর তাদের বাড়িতে ডাকেন না, অন্য কোথাও দেখা করেন, যেমন লা-রাম্বলাসের সামনের কোনো হোটেলে, ভদ্রতা রক্ষার জন্য যতক্ষণ থাকতে হয় থাকেন, তারপর বিদায় নেন। তবে সাক্ষাৎকারটা মনমতো হলে বেশি সময় থাকেন। তিনি জানান, যতটা সম্ভব কম লোকের সঙ্গে দেখা করতে চান বলেই সমস্যাটা হয়। এমনকি মাঝে মাঝে বন্ধুরাও ঝামেলায় ফেলেন। হয়তো কোনো বন্ধুর বাড়িতে দুপুরের খাওয়ার দাওয়াতে গেলেন, দেখা গেল আরো ২০ জন অপরিচিত মানুষ দাওয়াতে এসেছে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য।
‘তখন তো আর সহজ হাসি-ঠাট্টা করতে পারি না।’ জানান তিনি, ‘ওদের সামনে বুদ্ধিমানের ভাব ধরতে হয়। বীভৎস ব্যাপার।’
এত রকম চাপ সত্ত্বেও তার বার্সেলোনার জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি, ‘অন্তত একটা কাজ তো পেরেছি, দেখার জিনিসে রূপান্তরিত হইনি।। এসব কীভাবে এড়াতে হয় জানি আমি।’
আমরা ভিড়ের রাম্বলাস ধরে আবছা হাঁটছিলাম, চারপাশে ফুলের ছড়াছড়ি, আরেকটা প্রশ্ন করলেন গার্সিয়া, ‘যখন বই কিনলেন তখন একটা ফুল কিনেছিলেন?’
আমার স্ত্রী ডানা ফুল কেনার প্রমাণ হিসেবে তার হাতে ধরা গোলাপটা দেখাল তাকে। মেলার প্রথা অনুযায়ী সব প্রকাশক আর বইয়ের দোকান বড় রাস্তার উপরে অস্থায়ী কাঠের স্টল থেকে বই বিক্রি করে। ঐতিহ্য অনুসারে পুরুষরা তাদের স্ত্রী, প্রেমিকা, বান্ধবী অথবা মহিলা আত্মীয়কে ফুল কিনে দেন আর বিনিময়ে নারীরা তাদের একটা বই উপহার দেন।
ভিড়ের হট্টগোলের ভেতর গার্সিয়ার কথা প্রায় শুনতেই পাচ্ছিলাম না। বললাম, ‘আমাদের নিরিবিলি কোথাও যাওয়া দরকার।’
‘নিরিবিলি এক বস্তু, যা সারা স্পেনের কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল’, তিনি বললেন। তারপর একদিকে আঙুল তুলে দেখালেন, ‘চলেন, ওই বারে গিয়ে বসি। মার্কিন দোকান তো, কেউ যায় না।’
আমরা সেই ফরমিকার টেবিলওয়ালা বার কাম রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম। এত সাধারণ আর প্রায় খালি হওয়ার কারণেই তাকে মনে রাখা যায়। গার্সিয়া নিজের জন্য কফি বললেন আর আমাদের জন্য রেড ওয়াইন, ওয়েটারকে বলে দিলেন যাতে ১৯৫৬ সালের ইম্পেরিয়াল পরিবেশন করা হয় আমাদের, তিনি নিজে যেহেতু টিন্টো পান করেন না, তাই চান না সাধারণ টিন্টো পান করে আমাদের বিতৃষ্ণা জন্মাক। মদ নিলেন না বলে মাফ চেয়ে নিলেন আমাদের কাছে। বললেন, তিনি সাধারণত অন্ধকার না হলে পান করেন না। ২ ঘণ্টার আলাপে মাত্র এক কাপ কফি নিলেন। ওজন ও ভারসাম্য ঠিক রাখতে চাইছেন।
‘এখন কফি খাচ্ছি’, বললেন তিনি— ‘রাতে হুইস্কি একটু কম খাব।’
তাকে জানালাম ইউরোপ বেড়াতে বেরিয়ে পড়ার আগে আমার শেষ লেখাটা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত তার ছোট উপন্যাস লিফ স্টর্মের (পাতার ঝড়/ লা-হোজারাস্কা) একটা রিভিউ। এটাই আসলে তার প্রথম উপন্যাস, কলাম্বিয়াতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৫ সালে। তাকে সবিস্তারে বললাম, যদিও তার লেখা আরো একটা ছোট উপন্যাস এবং বেশকিছু ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তার নিজের সম্পর্কে খুব কম তথ্যই পাওয়া যায়। তিনিও একমত হলেন।
১৯৬০-এর দশকে বোর্হেসকে নিয়ে সাহিত্য মহলে তুমুল উচ্ছ্বাসের পর এই প্রথম কোনো লাতিন লেখক এত সমাদর পাচ্ছেন সমালোচকদের কাছ থেকে। অথচ সাহিত্য পত্রিকাগুলো এ লেখাগুলোর পেছনের মানুষটা সম্পর্কে বেশ উদাসীন। বিষয়টা যত অদ্ভুত মনে হচ্ছে ততটা নয়। কয়েক বছর আগে নিউইয়র্কের আলবেনিতে আইরিশদের এক বারে বসে একটা আলাপ মনে পড়ছে। সে সময় লাতিন আমেরিকার দুই দেশে বিপ্লব বিস্ফোরণ হচ্ছিল। এক নিস্পৃহ বারটেন্ডার এ প্রসঙ্গে আলাপচারিতার ইতি টানল এই বলে, ‘এ দুই দেশের কোনোটার দামই একটা বিড়ালের গুয়ের সমানও হবে না।’ তার পর থেকেই এ বাক্যটা আমার মনে থেকে গেছে উপমহাদেশের মানুষের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাবের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে। তা সে যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক কিংবা সামরিক।
অনেকেই মনে করেন, সাহিত্যিক হিসেবে গার্সিয়াকে বরণ করে নেয়ার ব্যাপারে এ তুলনামূলক নিরুৎসাহের মূলে রয়েছে রাজনীতি। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত গার্সিয়া ফিদেল কাস্ত্রোর প্রেসনা লাতিনা পত্রিকায় সাংবাদিকের কাজ করেছেন বোগোতা, হাভানা আর নিউইয়র্কে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ছেড়েছিলেন ১৯৬১ সালে, তারপর ১৯৭১ সালে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডিগ্রি দেয়ার আগে পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার অনুমতি পাননি। তবে যদি তার বামপন্থী অতীতের গল্প চুইয়ে নামতে নামতে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকের কানে পৌঁছেও থাকে, তাহলেও এ অনাগ্রহের মূলে রয়েছে সেই ‘বিড়ালের পুরিষ’ লক্ষণ, বামবিরোধ নয়। ভাবটা এ রকম— হেহ! আসছে আরেকটা বামপন্থী লাতিন সাহিত্যিক।
গার্সিয়ার প্রতি স্প্যানিশ ভাষাভাষী সাহিত্যজগতের আচরণ একদম অন্য রকম। গত বছর (১৯৭২) এপ্রিলে কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে বক্তব্য দেয়ার সময় পাবলো নেরুদা একশ বছরের নির্জনতা বইটি প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘কারভান্তেসের ডন-কিহোতের পরে এটাই বোধহয় স্প্যানিশ ভাষায় সবচেয়ে বড় উন্মোচন।’ মারিও ভারগাস লোসা এরই মধ্যে গার্সিয়ার একটা চমৎকার সমালোচনামূলক জীবনী লিখেছেন, যার নাম হিস্তোরিয়া দে-উন দেইসিদো (এক দেবহন্তারকের ইতিহাস), বইটা বার্সেলোনার বারাল-এডিটরস প্রকাশ করেছে ১৯৭১ সালে। ভারগাস একজন শিক্ষক ও ঔপন্যাসিক। তার লেখা দুটি উপন্যাসের নাম দ্য টাইম অব দ্য হিরো, দ্য গ্রিনহাউজ। তিনি গার্সিয়ার পূর্ণ সহযোগিতায় বইটা লিখেছেন এবং গার্সিয়ার মতে, তাকে নিয়ে যে কয়েকটা বই লেখা হয়েছে, ভারগাসের বইটিই তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো। তবে তিনি কেবল বইটির প্রথম ৮৪ পৃষ্ঠার সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিতে রাজি আছেন, বাকিটা নাকি তার পড়ার সাহস হয়নি— ভারগাসের প্রশংসা করতে গিয়ে জানান গার্সিয়া।
‘মারিয়োর বইটায় হয়তো আমাকে পড়ে ফেলা যাবে’, তিনি বলেছিলেন।
অন্য কারো বিশ্লেষণ নিয়ে আপনার ভয়ের কী আছে?
‘এটা একটা জুয়া’, জানান তিনি— ‘একটা খেলা। খুবই সম্ভব যে বইটা পড়ার পরেও আমি বদলে যাব না। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে কাজ কী?’
গার্সিয়ার একই সঙ্গে জনপ্রিয় ও সমালোচকদের নিক্তিতে মানসম্পন্ন সাহিত্যিক হয়ে ওঠা বিষয়ে বেশ নির্দেশপূর্ণ বিদ্রূপ রয়েছে (কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, আমি নিজে যদি একশ বছরের নির্জনতা না লিখতাম, তাহলে বইটা পড়তাম না। আমি জনপ্রিয় লেখা পড়ি না)। একবার লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এক অক্ষরও লেখেননি। কয়েক রকম হতাশা মিলেমিশে ঘটেছিল ব্যাপারটা, নিজের লেখা প্রথমদিকের উপন্যাসগুলো সম্পর্কে একটা নেতিবাচক অনুভূতি ছিল, সে কারণেই লেখনশৈলীর এমন আমূল পরিবর্তন করেছিলেন যে নিজের লেখাই অচেনা মনে হচ্ছিল, এছাড়া ছিল চলচ্চিত্রের প্রভাবশালী কিন্তু হতাশামূলক সম্পৃক্ততা।
তিনি বলেন, যতদিন পর্যন্ত মনে করতে পারেন, সবসময়ই লেখক ছিলেন। তার জন্ম ১৯২৮ সালের মার্চের ৬ তারিখে, কলাম্বিয়ার উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত আরাকাতাকা নামের ছোট এক শহরে। অলীক শহর মাকোন্দো, যেখানে জীবন তর্জন-গর্জন করেছে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে একশ বছর ধরে, তা আসলে আরাকাতাকা শহরেরই কাল্পনিক রূপ। তার প্রথম গল্প ১৯৪৭-এর আগে প্রকাশিত হয়নি, সে সময় তিনি ইউনিভার্সিটি অব বোগোতায় আইন পড়ছিলেন দারুণ অনিচ্ছায়। রাজনৈতিক সন্ত্রাসের কারণে ইউনিভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি কার্তাজেনায় চলে যান পড়তে, সেখান থেকেই লেখালেখি চালিয়ে গেছেন। তারপর বারানকিলায় বেড়াতে এসে এক লেখক-সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে পরিচিত হন, যারা আগে থেকেই তার লেখার সঙ্গে পরিচিত। আইন পড়া ছেড়ে বারানকিলায় চলে গেলেন সাংবাদিকের চাকরি নিয়ে। ১৯৫৪ সালে এল-এসপেকতাদর পত্রিকায় সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচকের চাকরি পেয়ে বোগোতা ফিরলেন। ‘সাংবাদিক হিসেবে আমার অবস্থান ছিল একদম নিচের দিকে, আমারও এ রকমই ভালো লাগত। অন্য লেখকরা সবসময় চাইতেন কী করে সম্পাদকীয়র পাতায় পৌঁছানো যায়, আর আমি চাইতাম অপরাধ বা কোথাও আগুন লাগার খবরগুলো নিয়ে লিখতে।’
গার্সিয়ার সাংবাদিক থেকে ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠা কর্মজীবনকে তার জীবনীকার তুলনা করেছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে। মিল অবশ্যই আছে কিন্তু ব্যাপক পার্থক্যও রয়েছে। হেমিংওয়ে ছিলেন বাস্তববাদী, আবেগী, নিষ্ঠাবান সাংবাদিক। গার্সিয়া তার কাজের ক্ষেত্রে অনেক কম রাশভারী, সাংবাদিকতাকে তিনি নিজের মতামত তুলে ধরার একটা মাধ্যমের চেয়ে বেশি দেখেন অভিজ্ঞতা হিসেবে, বোধহয় হেমিংওয়ের সঙ্গে সঙ্গে বেন হেকটও আছেন গার্সিয়ার ভেতর। অন্তত তার বন্ধুকে লেখা একটা চিঠি পড়ে সে রকমই মনে হয়। কলাম্বিয়ার কিবিদো শহরে একটা খবরের কথা লিখেছেন বন্ধুকে। একবার কিবিদো থেকে এল-এসপেকতাদরের সংবাদদাতা টেলিগ্রাম পাঠালেন তুমুল সংঘর্ষের খবর দিয়ে, গার্সিয়া ও একজন আলোকচিত্রী বেশ কষ্টকর দূরের রাস্তা পার হয়ে যত জলদি সম্ভব সেখানে পৌঁছলেন, গিয়ে দেখেন এক আধা ঘুমন্ত ধূলিধুসর গ্রাম, মারামারির চিহ্নমাত্রও নেই সেখানে। সংবাদদাতাকে খুঁজে পেলেন, তিনি তখন হ্যামকে শুয়ে দুলতে দুলতে গরম ভাগাচ্ছেন। সংবাদদাতা বুঝিয়ে বললেন, কিবিদোতে কখনই কিছু ঘটে না, তাই প্রতিবাদস্বরূপ তিনি ওই টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন। এত দুঃসাধ্য সফরের পরে কিছুতেই খালি হাতে ফিরতে চাইছিলেন না গার্সিয়া আর তার সঙ্গী। তিনজন মিলে সাইরেন আর ড্রাম বাজিয়ে ভিড় জড়ো করে পরিকল্পিত মারামারির ছবি তুললেন। দুদিন ধরে মারামারির খবর পাঠাতে লাগলেন সংবাদপত্রে আর সাংবাদিকদের দল এসে পৌঁছল সম্পূর্ণ ঘটনা তুলে ধরার জন্য। গার্সিয়া তাদেরকেও কিবিদোর ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললেন এবং আরো বড় মারামারির ব্যবস্থা করলেন, যাতে সবাই মিলে প্রতিবেদন লিখতে পারেন।
১৯৬৬ সালে গার্সিয়ার সাংবাদিক জীবনের বড় একটা সাফল্যের মুহূর্ত এল, যখন লুই-আলেজান্দ্রো-ভেলাস্কো নামের এক নাবিক এল-এসপেকতাদরের অফিসে এলেন সমুদ্র থেকে তার বেঁচে ফেরার বিখ্যাত গল্পটা সবিস্তারে বয়ানের প্রস্তাব নিয়ে।
কলাম্বিয়ার এক যুদ্ধজাহাজ নিউ অরলিন্স থেকে ফেরার পথে ঝড়ের মুখে পড়েছিল। আটজন নাবিক হারিয়ে গেছেন, শুধু ভেলাস্কো বেঁচে ফিরেছেন। তিনি ১০ দিন কাটিয়েছেন লাইফবোটে। এ খবরের মাধ্যমে ততদিনে তিনি জাতীয় বীর হয়ে উঠেছিলেন এবং বেশ ধনবানও। তবে শুধু কলাম্বিয়ার স্বৈরশাসক গুস্তাভো-রজাস-পিনিলার অনুমোদিত সংবাদপত্রগুলোই ভেলাস্কোর সাক্ষাৎকার নিতে পেরেছিল। গার্সিয়া জানালেন, যতদিনে ভেলাস্কো তাদের অফিসে এসে নিজের কাহিনী বয়ানের প্রস্তাব করলেন, ততদিনে এ সম্পর্কে অনেক খবর প্রচারিত হয়েছে, জনসাধারণের আগ্রহও কমতে শুরু করেছে, অনেকেই মনে করলেন, গল্পটা পুরনো হয়ে গেছে। তবে একজন সম্পাদক আরো একটু চিন্তাভাবনা করে ভেলাস্কোকে গার্সিয়ার কাছে পাঠালেন।
এতে পাওয়া গেল চৌদ্দ অধ্যায়ের প্রথম পুরুষে বর্ণিত এক আখ্যান, সেই কুড়ি বছর বয়সী নাবিকের স্বাক্ষরসমেত। প্রমাণসহ জানা গেল, যুদ্ধজাহাজটা আদৌ ঝড়ের মুখে পড়েনি, বরং তার ডেকের উপরে খুব অসাবধানে বেঁধে রাখা একটা বেআইনি কার্গো ছিল। খুব জোর বাতাসে জাহাজটা প্রায় কাত হয়ে যাওয়ায় কার্গো খুলে পড়েছে আর তার ধাক্কায় আটজন নাবিক জাহাজ থেকে পড়ে যান। এ কাহিনী পাঠকের ভেতর আলোড়ন তুলল এবং এল-এসপেকতাদরের বিক্রি বেড়ে গেল। লজ্জিত স্বৈরতান্ত্রিক সরকার এসবই অস্বীকার করতে চাইছিল কিন্তু পত্রিকায় অনেক তথ্যপ্রমাণ ছাপা হলো ডেকে দাঁড়ানো নাবিকদের ছবিসহ। ছবিতে পরিষ্কার লেবেলে দেখা যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা টেলিভিশন, ফ্রিজ, ওয়াশিংমেশিন ইত্যাদি। রোজাস পিনিলার সরকার পত্রিকার ওপর প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করতে লাগল, আর বেশ কয়েক মাস পরে যখন গার্সিয়া এল-এসপেকতাদরের ভ্রাম্যমাণ ইউরোপীয় প্রতিবেদক হিসেবে প্যারিসে ছিলেন, তখন পত্রিকাটা বন্ধ করে দেয়া হলো।
পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে বার্সেলোনায় এ নিবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়েছিল গার্সিয়ার নামে, সেই প্রথম তার নাম প্রকাশ্যে এ ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হলো। বইটার নাম তিনি দিয়েছিলেন এক জাহাজ ভাঙা নাবিকের গল্প, যে ১০ দিন কোনো খাবার অথবা পানীয় ছাড়া লাইফবোটে ভেসেছে, যাকে জাতীয় নায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, সুন্দরীরা যাকে চুমু খেয়েছে, প্রচার যাকে ধনী করেছে, তারপর সরকার যার ওপর নারাজ হয়েছে, আর যে চিরতরে বিস্মৃত হয়েছে। পুনর্মুদ্রণের প্রস্তাবনায় গার্সিয়া প্রশংসা করেছেন ভেলাস্কোর স্বাভাবিক সুন্দর বলার ভঙ্গি আর তার বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির। সেই সঙ্গে আরো যোগ করেছেন, ‘ভাবতে খারাপ লাগে যে সম্পাদকরা প্রায়ই একটা লেখার যোগ্যতা নিয়ে তেমন মাথা ঘামান না, তাদের কাছে লেখকের নামটাই বড়। তাদের এ অভ্যাসই আমাকে কেতাদুরস্ত লেখক বানিয়ে তুলছে, এ নিয়ে আমার খেদ রয়েছে। সৌভাগ্যবশত কিছু বই আছে, তা যারা লেখেন তাদের না, বরং যারা সহ্য করেন তাদের, এটা সে রকম একটা বই।’ তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন, বইটার স্বত্বাধিকারী ভেলাস্কো, গার্সিয়া নন।
হেমিংওয়ে সাংবাদিকতার বিপক্ষে তর্ক তুলেছিলেন। বলেছিলেন, ঠিক সময়ে এ পেশা থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে ভালো একটা ভিত তৈরি হতে পারে কিন্তু বেশি সময় থাকলে লেখকের ক্ষতি হয়। গার্সিয়া এ উপদেশ মানতে পারেননি, জীবিকার জন্য সাংবাদিকতা করতেন তিনি এবং ১৯৪৮ থেকে ১৯৬১ পর্যন্ত এ পেশায় ছিলেন। বরং মানসিকভাবে উইলিয়াম ফকনারের সঙ্গে তার বেশি মিল ছিল এক্ষেত্রে। ফকনার মনে করতেন, একজন ভালো লেখককে কোনো কিছুই ধ্বংস করতে পারে না। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের যেকোনো ঐকান্তিক লেখকের মতনই গার্সিয়ার উপরেও ফকনারের গভীর প্রভাব রয়েছে। আর এ নিয়ে এত কিছু বলা হয়েছে যে তিনি এখন এ সম্পর্ক নিয়ে যেকোনো বিস্তারিত আলাপের ওপর পর্দা টেনে দেন। হয়তো এ কারণেই আর ফকনার পড়তে পারেন না, যদিও তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে আবার ফকনার পড়ার সময় ফকনারীয় ভাষাশৈলীর উদগিরণের চোটেই বিতৃষ্ণ হয়েছেন। তবে ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে যখন গার্সিয়া পাতার ঝড় লিখছিলেন, তখন ফকনারের বিশেষ কদর ছিল তার কাছে।
প্রায় সাত বছর ধরে পাতার ঝড়ের জন্য প্রকাশক খোঁজার পর শেষ পর্যন্ত ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল বইটা। একই বছরে নাবিকের বইটাও প্রকাশিত হয়। আর্জেন্টিনার এক প্রকাশনী বইটা প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং গার্সিয়াকে উপদেশ দিয়েছিল অন্য কোনো পেশা খুঁজে নিতে, যেহেতু লেখক হিসেবে তিনি প্রতিভাহীন। পাতার ঝড়ের গল্পটা বলা হয়েছে পর্যায়ক্রমে এক বাবা, তার মেয়ে ও নাতির জবানিতে। একসময় তাদের সঙ্গেই থাকতেন এক ডাক্তার, তার অন্তিম সৎকারের সময় শুধু এ তিনজন মানুষ ছাড়া কেউ উপস্থিত ছিল না। পরবর্তীতে ডাক্তার নিভৃতবাসী হয়েছিলেন এবং তার একটা কাজের কারণে সারা শহরের বিরাগভাজন হওয়ায় মৃত্যুর পর শহরবাসীরা শবদেহের অপমান করতে চেয়েছিল। এ বইয়ে ফকনারের ভাষাভঙ্গির ব্যবহার স্পষ্ট আর ডাক্তার চরিত্রের সঙ্গে ‘লাইট ইন অগাস্ট’ বইয়ের রেভারেন্ড গেইল হাইটাওয়ারের মিল রয়েছে।
তবে ফকনারের প্রভাব থাকলেও পাতার ঝড় কোনো অমৌলিক কাজ নয়। এ বইয়ের ভাষা সমৃদ্ধ, গভীর অথচ ফকনারের ভাষার মতন জটিল নয়। বইটায় পরাবাস্তবতা এমনভাবে উপস্থিত, যেভাবে ফকনারের কাজে থাকে না। যদিও ফকনারের ইয়কনাপাতাওফা প্রদেশের অনুকরণেই পাতার ঝড় বইয়ের কাল্পনিক গ্রাম মাকোন্দো স্থাপিত হয়েছে কিন্তু এতটাই মৌলিকভাবে এবং লাতিন আমেরিকার জীবনযাপনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিকভাবে এর সৃষ্টি হয়েছে যে একশ বছরের নির্জনতা বইয়ে যখন মাকোন্দো একটা পূর্ণবিকশিত গ্রাম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল, ততদিনে অধিকাংশ লাতিন পাঠক জায়গাটাকে তাদের সামাজিক মানসের বিচরণক্ষেত্র বলে চিনে নিয়েছে।
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]




