বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্যের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বয়নশিল্পীরাই টিকিয়ে রেখেছেন এই শিল্প। তবে এই ভূখণ্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখানকার বয়নশিল্পের সুখ্যাতি দূর বিদেশে ছড়িয়েছে বণিক সম্প্রদায়, যাদের অনেকেই ভিনদেশী।
ঘরোয়া বাজার থেকে দেশীয় তাঁতবস্ত্র রফতানি এবং বাজার সম্প্রসারণের নেপথ্যে ছিল রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা। পরবর্তী সময়ে সওদাগরি সহায়তায় এই ধারা বজায় থাকে। আজকের বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশকে নিয়েই ছিল সুবা বাংলা। বলতে গেলে সেই মধ্যযুগ থেকে উনিশ শতকের সূচনা সময় পর্যন্ত এ অঞ্চলই ছিল বৈশ্বিক বস্ত্র বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। অমসৃণ, মোটা বাফতা থেকে নিয়ে মিহিন মলমল তৈরি হয়েছে এই বাংলার গ্রামে গ্রামে, স্থানীয় বয়নশিল্পীদের নৈপুণ্যে। তারপর সেসব কাপড় নিয়ে কাফেলা চলেছে মালদা হয়ে বোখারা, ইস্পাহান আর সমরখন্দের পথে। প্রাচ্যে এই কাপড় গেছে সমুদ্রপথে; উপকূল বরাবর জাহাজে করে পাড়ি জমিয়েছে সেই ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ইউরোপ, আমেরিকা আর আফ্রিকা— এই তিন মহাদেশে বাংলার হাতে বোনা কাপড়কে সমুদ্রপথে পৌঁছে দিয়েছে ইউরোপীয় বণিকরা। ঢাকা সেসময় সুপরিচিত ছিল ৪৭ ধরনের মলমল বস্ত্রের জন্য; এর মধ্যে দুররিয়াঁ, চাহারখান, তারান্দুুম, তানজিব আর সামাদলাহার চাহিদা ছিল সবচেয়ে বেশি। আরো ছিল জামদানির থান বা নকশাদার বা অলঙ্কৃত মলমল, আজো যা সোনারগাঁর বয়নশিল্পীদের গর্বিত ঐতিহ্য হিসেবেই রয়ে গেছে। এই বস্ত্রই খ্যাত মালবুস খাস হিসাবে; যা বস্তুত মোগল সম্রাটদের জন্য উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হতো। জামদানিই আবার ইউরোপ আর ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের রমণীদের বিশেষ প্রিয় হয়ে ওঠে। আমাদের সময়ে এই জামদানিই বিয়ের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেসময় বৈচিত্র্যময় নকশায় জামদানি বোনা হয়েছে। এই নকশাবৈচিত্র্যে কাপড় বোনার ক্ষেত্রে বণিকদের ছিল বিশেষ ভূমিকা। কারণ তারা বিভিন্ন উৎপাদন কেন্দ্র বা আড়ংয়ে এসে বিভিন্ন ধরনের ডিজাইন দেখিয়ে কাপড়ের অর্ডার দিত। এসব ডিজাইনের ছিল আলাদা আলাদা নাম, যা ক্রেতা এবং বয়নশিল্পী উভয়ের কাছেই পরিচিত ছিল। এজন্যই এসব নকশা বা মোটিফের নাম বাংলা এবং ফার্সি দুই ভাষাতেই ছিল; যা পরে বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানির রেকর্ডেও পাওয়া গেছে। বণিকদের আরো একটা অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সোনারগাঁ এবং এর আশপাশের জামদানি বয়নশিল্পীদের তারা কাজের সুবিধার জন্য আগাম টাকা বা দাদন দিত। বাজার বদলের সাথে সাথে অবশ্য বাণিজ্যের ধারাও বদলে যায়। মোগলরা কাপড় বুনিয়েছে তাদের বিশেষ কারখানা থেকে; অন্যদিকে ইউরোপীয়রা সেদিকে না গিয়ে নির্ভর করেছে মধ্যস্থতাকারীদের ওপর। এরাই সাহেবদের অর্ডার অনুযায়ী বয়নশিল্পীদের কাজ দেয়া এবং সেই কাজ ওঠানোসহ পুরোটাই দেখভাল করেছে। বিশ্ববাজারে এই বস্ত্র বাণিজ্যে তাদের সুবিধার জন্য বণিকরা এক জটিল বৃত্ত রচনা করেছে। এভাবে সংরক্ষিত হয়েছে জামদানি নকশা। আর বয়নশিল্পীদের বোনা জামদানি নানা হাত ঘুরে তবেই পৌঁছেছে ভোক্তার কাছে। মোগল এবং কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা এসব কিনেছেন, অথবা ক্রেতারা পেয়েছেন গোমস্তা আর দাদন ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে। এ বইতে এসব জামদানি নকশাই সংগৃহীত হয়েছে।
জামদানি থানে মোটামুটিভাবে তিন ধরনের প্যাটার্ন আমরা পাই, যা এখনকার শাড়িতেও বিদ্যমান। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত হলো বুটি; ফার্সিতে একেই বলে বুটেহ। এটি ফ্লোরাল মোটিফ বা ফুলের নকশা, থানের জমিনজুড়ে ছড়ানো। দ্বিতীয়টি হলো তেরচা; এটা লতানো নকশা; তাঁতের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে এই নকশার চলন কোনাকুনি। আর তৃতীয়টি হলো জাল; এটা মূলত পাড় বা বর্ডার হিসেবে ব্যবহূত হয়। থানে একসঙ্গে বা আলাদাভাবে ব্যবহার করা হয় এই প্যাটার্ন। শাড়িতে বিশেষ করে পাড়ের নকশা, বুটি বা তেরচার সঙ্গে সমন্বয় করেই বোনা হয়। বেশির ভাগ মোটিফই বলা হয়ে থাকে বয়নশিল্পীদেরই সৃষ্টি। চারপাশের ফুল, লতাপাতা, পশুপাখিই তাদের প্রেরণা। তবে নামগুলো এসেছে আমদানিকারক অঞ্চল থেকে। এক্ষেত্রে পশ্চিম পারস্যের নামই বেশি। তবে সমান্তরালে বাংলা নামও ব্যবহার করা হয়েছে। খুবই পরিচিত একটি মোটিফ হলো কল্কা। ঢাকাতে এই নামেই পরিচিত; এটাই আবার কাশ্মীরে আম্বি আর স্কটল্যান্ডে পেইজলি। এই নকশা আমের আকৃতির অনুরূপ, তবে কেবল আকৃতি নয়, নকশার দিক থেকেও এটি যথেষ্ট জটিল। বিশেষত পাড়েই এর ব্যবহার। মোগল রাজদরবারের রমণীদের পোশাক কিংবা ইউরোপীয় নারীদের গাউনে এই ধরনের অনেক নকশাই বোনা হয়েছে। সংরক্ষিত এসব বয়ন-নকশার পুনরাবৃত্তির জন্য সে সময় ইউরোপে প্রদর্শনীও হয়েছে। ১৮৫১ সালে বাংলার বস্ত্র রফতানি যখন বেশ কমে এসেছে, সেই সময়েই ঢাকায় তৈরি উত্কৃষ্ট মানের সুতি পণ্য প্রদর্শিত হয় লন্ডনের ক্রিস্টাল প্যালেস এগজিবিশনে।
বাণিজ্য প্রক্রিয়ার বদৌলতেই জামদানি নকশা আর বয়নকৌশল নানা পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। সেই সময়কার পর্যটকদের বিবরণ থেকে জানা যায় কীভাবে নানা পথে আরব, আর্মেনীয় আর তুরানি বণিকরা ভারতে এসেছে। কীভাবে তারা দাদন ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভর করে ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে আর বিভিন্ন আড়ংয়ের গোমস্তা ও পাইকারদের মাধ্যমে বয়নশিল্পীদের সন্ধান পেয়েছে। অর্থ সহায়তায় তাদের নির্ভর করতে হয়েছে গুজরাটি সারাফদের ওপর; এরা মূলত জৈন ও মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ী। এই চেইন আরো সম্প্রসারিত ছিল ইউরোপীয়দের। গ্রামে বয়নশিল্পীরা প্রথমে নমুনা বুনতেন। গোমস্তাদের মাধ্যমে তা চলে যেত ঢাকার কারখানায়। সেখান থেকে অনুমোদন এবং অর্ডারের জন্য পাঠানো হতো লন্ডনে। তারপর সেখানকার অনুমোদন পাওয়া থেকে ফরমায়েশ অনুযায়ী কাপড় বুনিয়ে তা ইউরোপে পাঠানো পর্যন্ত এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় ব্যয় হতো টানা দু’বছর। এক সময় তাদের সমস্ত প্রতিপক্ষকে হটিয়ে এখানকার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। জামদানি নকশা আর এর বাণিজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেই বয়নশিল্পীদের ওপর কঠোর আর্থিক ও আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করে কোম্পানি।
অন্যদিকে মোগলদের উৎপাদন ছিল কারখানাকেন্দ্রিক; আর এই উৎপাদনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নজরদারির জন্য নিযুক্ত ছিল দারোগা। সুতা কাটা থেকে জামদানি বুনে শেষ করা পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার কোনো স্তরে কোনো ধরনের বিচ্যুতি থাকলে, তা সংশোধন করিয়ে নেয়ার দায়িত্ব ছিল এই দারোগাদের। এভাবেই মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে গ্রামীণ বয়নশিল্পীরা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক যোগাযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রফতানি কমে আসে। ততদিনে ভারতের মসনদে আসীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তবুও বাংলা এবং ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের হাতে বোনা কাপড়ের নকশা সংরক্ষণ অব্যাহত ছিল; এর উদ্দেশ্য আর কিছুই নয়, বরং ল্যাঙ্কাশায়ারে নতুন প্রতিষ্ঠিত যন্ত্রচালিত কারখানায় এসব নকশার পুনর্বয়ন। এজন্যই প্রিন্স আলবার্টের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৫১ সালে আয়োজি ক্রিস্টাল প্যালেসে প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল জামদানি এবং এমব্রয়ডারি করা মলমলের গাউন; যা সে সময়ে ইউরোপীয় ও ইংরেজ রমণীদের ফ্যাশন ছিল।
পোর্টেবল ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিউজিয়াম— জন ফোর্বস ওয়াটসনের এই ভাবনা থেকেই ১৮৬৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘দ্য কারেকশন অব দ্য টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারারস অব ইন্ডিয়া’। আঠারো খণ্ডের অনবদ্য এই সংগ্রহে ছিল চমৎকারভাবে মাউন্ট ও শ্রেণীবদ্ধ করা ভারতীয় বস্ত্রশিল্পের ৭০০ নমুনা। এসব নকশার বেশির ভাগই নেয়া হয়েছিল ১৮৫৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্যারিস ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শিত বস্ত্র থেকে।
অস্থায়ী প্রদর্শনী আর জাদুঘরের সংগ্রহই নকশা সংরক্ষণে ধারাবাহিকভাবে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এমনকি তা নির্দেশনা হয়েছে বণিক আর উৎপাদকদের। একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে ১৯৮৬ সালে হাতে বোনা জামদানি আর হাতে সেলাই করা কাঁথার প্রদর্শনীর আয়োজন করে হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারি। এই গ্যালারিটি পূর্ব লন্ডনে অবস্থিত হওয়ায় অনেক বাংলাদেশী এবং বাংলাদেশী বশোদ্ভূত ব্রিটিশদের পক্ষে একসময়ে বাংলাদেশে বোনা বস্ত্রশিল্পের সব অনন্য নিদর্শন দেখার সুযোগ হয়েছে।
বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত হয়েছে নানা রাজনৈতিক টানাপড়েনে। জলবায়ু পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছে তুলা চাষের মন্দা। সমান্তরালে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। তা সত্ত্বেও আমাদের বয়নশিল্পীরা তাদের বয়ননৈপুণ্য হারাননি।
উনিশ শতকের গোড়ায় এসে বাংলা থেকে বস্ত্র রফতানি কমে আসে। তার পরও নারীদের কাছে, বিশেষত বঙ্গললনাদের কাছে জামদানি শাড়ি সমান জনপ্রিয়তায় থেকে যায়। মহাত্মা গান্ধীর বিদেশী পণ্য বর্জনের আন্দোলন কেবল হাতে বোনা খাদিই নয়, বরং উৎসাহিত করেছে অন্যান্য সুতি কাপড়, এমনকি জামদানিকেও। বাণিজ্য আবার বাধার সম্মুখীন হয় ১৯৪৭-এর ভারত ভাগে। ভাগ হয়ে যায় বাংলা। ফলে বয়নশিল্পী আর বণিকদের জন্য কঠিন হয়ে যায় কলকাতার নারীদের এই অঞ্চলের তাঁতবস্ত্রের চাহিদা মেটানো। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও এই বাংলার বস্ত্রবয়নশিল্প ক্ষতির মুখে পড়েছে। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তাঁত; জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে গ্রাম। বয়নশিল্পীদের সুতা সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা। যেমন, ১৯৭১ পরবর্তী সুতার ঘাটতি মেটাতে বয়নশিল্পীদের ন্যায্যমূল্যে সুতা বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তাও দেয় হ্যান্ডলুম বোর্ড। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) ১৯৯৬ সালে জামদানি বয়নশিল্পীদের জন্য নোয়াপাড়ায় আলাদা গ্রাম প্রতিষ্ঠা করে ৪০০ বয়নশিল্পী পরিবারকে পুনর্বাসন করে; যেখানে ওস্তাদ-কারিগররা তাদের কারখানা তৈরি করেন। সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ এবং সিদ্ধিরগঞ্জের আশপাশে জামদানি বয়নশিল্পীদের আধিক্য রয়েছে। সোনারগাঁর লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে রয়েছে জামদানি শাড়ির স্থায়ী প্রদর্শনী। এছাড়া কিছু নমুনা আছে ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে।
বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন বিভিন্ন সময়ে তাঁতবস্ত্র ও কারুপণ্যের প্রসারের জন্য ঢাকা, দিল্লি ও লন্ডনে প্রদর্শনী করেছে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে এই ধরনের প্রথম উদ্যোগটি নেয়া হয় ১৯৭৪ সালে; এর নেপথ্যে ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে কয়েকজন। বাংলাদেশের লোক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভোক্তা এবং ডিজাইনারদের কাছে তুলে ধরাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। এরই পথ ধরে সে সময়ে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠিত হয় বিভিন্ন কারুপণ্য প্রতিষ্ঠান ও বুটিক। বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম বোর্ড আর বিসিক নিয়মিত বস্ত্রমেলা আয়োজন করে থাকে; যেখানে জামদানিও প্রদর্শিত হয়। ১৯৮১ এবং ২০১০ সালে আড়ং আয়োজিত প্রদর্শনীতে দেখা গেছে সরল গর্ত-তাঁতে বোনা বৈচিত্র্যময় নকশার বিপুল সমাহার।
এক্ষেত্রে বয়নশিল্পীদের সাধুবাদ দিতেই হবে; কারণ ভোক্তা চাহিদার প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই তারা তাদের সৃজন মুনশিয়ানা বজায় রেখেছেন। এক সময়ের ক্ষয়িষ্ণু জামদানির চাহিদা পুনরায় বৃদ্ধি পায় ডেমরার সাপ্তাহিক হাটে জামদানি বিক্রি এবং নগরীর কিছু বাড়িতে নিয়মিত সরবরাহের কারণে।
সময় ধারায় নগরীতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বুটিক আর বস্ত্রবিতান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান কিংবা কারুপণ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এখন বয়নশিল্পীদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। ওস্তাদ-কারিগরদের অনেকেই এদের কাছ থেকে অর্ডারের বিপরীতে অগ্রিম নিয়েই কাজ শুরু করে থাকেন। আর এভাবেই টিকে থাকছে পুরনো সেই দাদন পদ্ধতি।
বহুমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়ন অথবা বর্তমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বয়নশিল্পীরা নিজেদের উদ্ভাবনী দক্ষতার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। সময়ের পটবদলে পরিবর্তন এসেছে শ্রম বিভাজনে; প্রথমত. এখন আর মেয়েরা সুতা কাটে না। অবশ্য হাতে সুতা কাটার প্রয়োজনও আর হয় না। বরং নারায়ণগঞ্জে পাইকারি বাজার কিংবা স্থানীয় বাজার থেকে সুতা কিনে আনা হয়। দ্বিতীয়ত. মেয়েরা এখন ছেলেদের মতোই তাঁতে বসে। তৃতীয়ত. লেখাপড়া শিখে অন্য পেশা বেছে নেয়ার অভিপ্রায়ে বয়ন পরিবারের কিশোররা শিক্ষানবিশ হিসাবে তাঁতে না বসে বরং স্কুলে যাচ্ছে। ফলে আশপাশের জেলার তুলনায় কম সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের খুঁজে পেতে নিয়ে আসা হচ্ছে শিক্ষানবিশ হিসেবে। ওস্তাদ-কারিগররাই তাদের কারখানায় এখন কারিগর নিয়োগ দিয়ে থাকেন; এজন্য স্বাধীন বয়নশিল্পীর সংখ্যা অনেক কমে এসেছে।
ভোক্তা চাহিদা মেটাতে বয়নশিল্পীরা পণ্য বহুমুখীকরণে সফল হয়েছে। শীর্ষ বুটিকগুলোর কয়েকটিতে শাড়ির পাশাপাশি তাই মিলছে কামিজ, ফতুয়া আর ওড়না। মোটা আর অমসৃণ সুতা ব্যবহার কর জামদানি নকশায় বোনা হচ্ছে পর্দার কাপড় এবং হোম ফার্নিশিং। এসব আবার রফতানিও হচ্ছে। তা সত্ত্বেও বলতেই হবে এখনো চাহিদার শীর্ষে রয়েছে শাড়ি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তন বস্ত্রবয়নশিল্পকে প্রভাবিত করেছে। হস্তচালিত তাঁত ক্রমেই প্রতিস্থাপিত হচ্ছে যন্ত্রচালিত তাঁতে। পরোক্ষে, জামদানি শাড়ির দাম মধ্যবিত্তের নাগাল ছাড়িয়েছে। ফলে কম দামে জামদানির চাহিদা মেটাতে বয়নশিল্পীরা কম কাউন্টের সুতা বা মোটা সুতা ব্যবহার করছে। এসব সুতায় বোনা জামদানিতে সঙ্গত কারণেই বদলে যাচ্ছে মূল মোটিফের আকার। জামদানি শাড়িকে আরো নষ্ট করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ডিজাইনারদের মধ্যে। তারা জামদানির প্রকৃত ঐতিহ্যের ধার না ধেরে এর পাড়ে লেস লাগাচ্ছে, জমিনে করছে মিরর এমব্রয়ডারি। এদিকে আবার টাঙ্গাইলে বয়নশিল্পীরা জামদানি মোটিফকে চ্যাকার্ড তাঁতে কিংবা যন্ত্রচালিত তাঁতে ব্যবহার করে মূল মোটিফের আকারই বদলে ফেলছেন।
এসব সত্ত্বেও যথার্থতাবাদীদের কাছে পিট লুম বা গর্ত-তাঁতে বোনা জামদানির কদর অবিকল রয়েছে গেছে। এখনো এটাই তাদের ওয়ার্ডরোবের অপরিহার্য অংশ।
এই বয়নশিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করেই ইউনেস্কোর জামদানিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বয়ন ঐতিহ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতীয় সংসদ ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য (নিবন্ধন এবং সুরক্ষা) আইন ২০১৩ (জিআইঅ্যাক্ট) অনুমোদন করেছে। এই আইনে জামদানি সোনারগাঁ ও এর আশপাশের নির্দিষ্ট অঞ্চলের আদি পণ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার পাশাপাশি অন্য কোথাও এর প্রতিলিপি করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। খসড়া আইন এখনো অনুমোদিত হয়নি। তবে ডব্লিউআইপিওর কাছ থেকে জামদানির ভৌগোলিক নিদের্শক দাবির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করা জরুরি। জামদানি মূলত ঢাকা থেকে ভারতে রফতানি হয়। এই ঐতিহ্যবাহী পণ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি একান্ত জরুরি; নচেৎ কম দামি এবং নকল জামদানি পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হতে থাকবে।
বাজার এবং বাণিজ্য পদ্ধতি পটপরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই ঢাকার অদূরের ছোট গ্রামগুলোতে আজো টিকে রয়েছে জামদানির বয়ন ঐতিহ্য। শহুরে মধ্যবিত্ত আর সীমাবদ্ধ পরিসরে আন্তর্জাতিক চাহিদা মেটানোর প্রত্যাশা এখন করা যেতে পারে; এক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী নকশা, মানসম্মত কাপড় আর সাশ্রয়ী মূল্যের নিশ্চয়তা দিতেই হবে। বস্তুত এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে বয়নশিল্পীদের প্রয়োজন হবে সহায়ক স্কিম, তাহলেই তারা জামদানির আধুনিক ব্যবহারের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে এবং একই সঙ্গে এই ঐতিহাসিক বয়নশিল্পের প্রসার ঘটবে। আর তা করতে হলে কোনো মতেই আদি ডিজাইন মোটিফকে বিকৃত করা যাবে না এবং তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যবসায়ী এবং উৎপাদক উভয়েরই।





