জামদানি এক অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম। বাংলাদেশের এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। প্রাচীন বাংলার আদি হস্তচালিত তাঁতশিল্প পরম্পরার সঙ্গে এর রয়েছে বিশেষ যোগসূত্র। অসাধারণ নকশায় সমৃদ্ধ জামদানি বস্তুত মসলিনেরই একটি প্রকার। ঔপনিবেশিক যুগের বিলাতি বস্ত্রের অনুপ্রবেশসহ সময়ের নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এ বয়নশিল্প। একসময় দেশী-বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের জন্য মিহিন সুতোয় যে ২৮ ধরনের সূক্ষ্ম মসলিন বোনা হতো, এর মধ্যে কেবল এই একটিই টিকে আছে। জটিল প্যাটার্নে শৈল্পিকভাবে বিন্যস্ত বস্ত্রের অন্যতম জামদানি সৃজনসৌকর্যের শিখরে পৌঁছে মোগল শাসনামলেই; কারণ সে সময়ে নতুন প্যাটার্নের সঙ্গে পারসিক মোটিফের সংযোজনে জামদানি হয়ে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দর। উল্লেখ্য, জামদানি শব্দটির উৎস ফার্সি। জাম অর্থ ফুল আর দানি অর্থ আধার। অর্থাৎ পুষ্পাধার বা ফুলদানি।
হাতে বোনা এ বিস্ময় বস্ত্রের রয়েছে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস, যা আমাদের কল্পনার সীমাকেও অতিক্রম করে। বাংলা আর পুণ্ড্রে এ বস্ত্র তৈরির উল্লেখ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মেলে কৌটিল্যের বিবরণীতে। সেই সুতিবস্ত্র— যা আজো আমাদের কাছে বিস্ময়— তৈরি হয়েছে বিশেষ টানা আর ভরনার বয়নকৌশলে; আর নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য সমান্তরালে ভরনা বরাবর ব্যবহার করা হয় আলাদা সুচ।
স্পর্শকাতর এ শিল্পের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে পারাটাই হলো আজকের মূল চ্যালেঞ্জ। পূর্বসূরিদের কাছ থেকে বয়ননৈপুণ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীরা কতটা আয়ত্ত করতে পারছেন, তার ওপরই নির্ভর করছে এ শিল্পপরম্পরার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা। বিশ শতকের সূচনায় বিভিন্ন ধরনের মিলের শাড়ির সহজলভ্যতায় জামদানি শিল্পের ক্রমপতন পরিলক্ষিত হয়। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বয়নশিল্পীরা তাদের পেশা পরিবর্তন করছেন। বিভিন্ন ধরনের উপকরণের ব্যবহার আর সহজ নকশার প্রতি আকর্ষণের ফলে অবস্থার আরো অবনতির আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ইউনেস্কো ২০১৩ সালে বাংলাদেশের জামদানিকে ইনট্যাজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটির প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। কুটির শিল্পের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ফলে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এগিয়ে এসেছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি নিয়ে, যা জামদানি শাড়ির ক্রমবিলুপ্তি ঠেকাতে সহায়ক হবে।
জামদানির ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য নানাভাবে অবদান রাখা যেতেই পারে। তবে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে দুটো নির্দিষ্ট বিষয়ে জরুরি দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে। একটি হলো জামদানি উৎপাদনের অর্থনীতি এবং অন্যটি হলো ঐতিহ্যগতভাবে পরম্পরার শিক্ষা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার নিশ্চয়তা।
জামদানি বয়ন কেবল শিল্প দক্ষতায় নয়, ক্লেশসাধ্য আর সময়সাপেক্ষ উৎপাদন প্রক্রিয়াও। একে টেকসই করতে অতএব প্রয়োজন যথাযথ বিপণন এবং বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। পক্ষান্তরে পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক বয়নশিল্পীদের এ পেশায় থাকতে উৎসাহিত করবে বটে, তবে তা ক্রমসংকুচিত বাজারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজার বিস্তারে এর পরই আসে আন্তঃপ্রজন্ম দক্ষতা বিনিময়ের বিষয়। এ প্রসঙ্গে উপেক্ষার জো নেই যে, জামদানিকে তার হূতগৌরব কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন উন্নতি সাধনের আর সেটা বিশেষত নকশার ক্ষেত্রে। নতুন এবং সহজ বয়নযোগ্য মোটিফ এ শিল্পের পুনরুজ্জীবনে অনুঘটক হতে পারে।




