তারিক আলির সঙ্গে ডেভিড এডগারের কথোপকথন। অনুবাদ: শওকত হোসেন
[তারিক আলি (জন্ম ১৯৪৩) ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক, সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ, চলচ্চিত্র নির্মাতা। এতসব পরিচয়ের মধ্যে ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ হিসেবেই দুনিয়াজোড়া তার পরিচিতি। সত্তররের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে ইউরোপে যে বিক্ষোভ আলোড়ন তুলেছিল, তার অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। গত শতকের ষাট ও সত্তরের দশকে দুনিয়ার রাজনৈতিক নানা উত্তাল পর্বে তারিক আলি উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে তিনি নিউ লেফট রিভিউয়ের সম্পাদকীয় কমিটির সদস্য।]
গত সংখ্যার পর
‘কী সেটা?’ তিনি বললেন, “একবার ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরায় একটা ক্লিফের কিনারায় দাঁড়িয়েছিলাম— খুবই বিমর্ষ অবস্থায়, কারণ জানতে চেয়ো না— তখন চামড়ার জ্যাকেট গায়ে এক লোক মোটরবাইক চালিয়ে হাজির হলো, থেমে কঠোর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নিশ্চয়ই আত্মহত্যার কথা ভাবছ না?’ আমি হতবাক হয়ে বললাম, ‘বেশ, ঠিক তা-ই করতে যাচ্ছি আমি।’ লোকটা তখন বলল, ‘বোকামি করো না! এসো, আমার মোটরবাইকের পেছনে উঠে বসো। আমার কাছে বাড়তি হেলমেট নেই, তোমাকে সবচেয়ে কাছের শহরে নিয়ে যাব, ওখানে বসে তোমার মাথা থেকে ফালতু চিন্তা বিদায় করব।’ ওই লোকটা ছিল ক্রিস্টোফার লোগ। ‘তো’ বললেন মহিলা, ‘আমি আমার জীবনের জন্য ক্রিস্টোফার লোগের কাছে ঋণী, যখন দেখলাম তোমাদের পত্রিকার একজন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সে...’ ক্রিস্টোফারকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলল, ‘কাজটা করেছি বলে খোদাকে ধন্যবাদ’।”
এবার আমরা সর্বোচ্চ বিন্দু হিসেবে ১৯৬৮ সালে ফিরে যাব কিন্তু কী ঘটতে যাচ্ছে, আপনি যেমন ধারণা করেছিলেন সেই বিচারে কেমন লাগছিল এবং আপনি কী করছেন বলে জড়িয়ে গেছেন ভাবছিলেন? আমি বিশেষ করে ভিয়েতনাম যুদ্ধের ব্যাপারে আগ্রহী—
ভিয়েতনাম বিক্ষোভ যে বিপ্লবের মতো কিছু হয়ে যাবে, সেটা ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি। এটা ঘটবে এমন কোনো চিন্তাই ছিল না আমার। হয়তো গোটা ইউরোপের পক্ষে বৃহত্তম ভিয়েতনাম বিক্ষোভের পুরোধা ছিলাম আমরা— জার্মানরা আমাদের এবং ফরাসিদের কাছ থেকেই সবক নিয়েছিল— কিন্তু ১৯৬৮-৬৯ সালে বার্লিনে ফ্রান্সের পুঁজিবাদ বা মানবিক চেহারার সমাজতন্ত্রের ইতিহাসে বৃহত্তম সাধারণ ধর্মঘটের মতো কিছুই ঘটেনি। চেকোস্লোভাকিয়ায় সংস্কারবাদী কমিউনিস্ট কিংবা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণের দাবিদার ইতালির শ্রমিকদের হাতে শুরু হয়েছিল আন্দোলন। ১৯৬৮-৬৯ সালে বার্লিনে প্রচুর রাজনীতি ছিল; রাজনীতি ও সংস্কৃতির যথেষ্ট মিথস্ক্রিয়া ছিল— প্রধানত দ্য স্টোনস, তবে পরে বিটলস এবং আরো অনেক গায়ক আর ব্যান্ড এ মিথস্ক্রিয়াতে ভূমিকা রাখছিল। রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভেতর এ সম্পর্ক ছিল আমাদের সাফল্যের সর্বোচ্চ বিন্দু এবং অবশ্যই ভিয়েতনামীদের সাহায্য করার প্রয়াস। ১৯৭০-এর দশকের আগে খনি শ্রমিকদের ব্যাপক ধর্মঘট দেখা দেয়নি।
তখনই একটা কিছু ঘটতে পারে বলে চিন্তা জেগেছিল। খোদ খনি শ্রমিকদের ধর্মঘট নয়, বরং শাসকদের বেসামাল করে দেয়া অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে ছিল এদের সংহতি— টিঅ্যান্ডজি রাস্তাঘাট এবং পাহাড়ে গণপিকেটের আয়োজন করছিল। আমার এক বন্ধু রবিন ব্ল্যাকবার্ন বিয়ে করতে যাচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষে ছোটখাটো একটা ভোজের আয়োজন করা হয়। খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটই ছিল মূল আলোচনার বিষয়। এমন সময় মেরি ফার্নেস নামে উচ্চবিত্ত পরিবারের এক তরুণী হাঁপাতে হাঁপাতে হাজির হলেন। ‘দেরির জন্য দুঃখিত,’ এক এক করে আমাদের জরিপ করে বললেন তিনি। পেরি অ্যান্ডাসন আর ব্ল্যাক ডোয়ার্ফের লোকদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বিয়ে করে বিক্রি হয়ে যাওয়ায় রবিনকে ভর্ত্সনা করলেন।
‘গতকাল আমি কোথায় ছিলাম জানলে আমাকে খানিকটা হতবিহ্বল মনে হওয়ার কারণ বুঝতে পারবেন,’ বললেন তিনি।
‘আমাদের বলুন, মেরি।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি কলিন টেনান্টের বিশাল বাড়িতে আয়োজিত একটি ডিনার পার্টিতে ছিলাম। অনুষ্ঠানের জাঁকজমক আমাকে অবাক করেনি। তবে একটু বেশিই জাঁকালো ছিল, এক বাটলার কে আসছে ঘোষণা দিচ্ছিল। কামরায় টেন্যান্ট, আরো কয়েকজন অতিথি আর হ্যারল্ড ম্যাকমিলান ছিলেন। মেজবানের উদ্দেশে ফিসফিস করে বললাম, ‘কার জন্য অপেক্ষা করছি আমরা?’
‘রানী আর প্রিন্স ফিলিপ।’
“আমি ঢোক গিললাম। তারপর ওরা এসে ডিনারে বসলেন। আপনারা বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু খুবই পুলকিত হবেন— খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটের আলোচনায় গোটা সন্ধ্যাটা কেটে গেল। ফিলিপ মুখ খিস্তি করছিলেন, স্কারগিলের মুণ্ডু ফেলে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু রানীই অবাক করেছেন আমাকে: ‘আমার মনে হয় পরিস্থিতি সত্যি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং এটাই শেষ,’ বললেন তিনি। ‘শ্রমিকরা বেশি ক্ষমতা পেয়ে যাচ্ছে, ওরাই দেশ চালাচ্ছে— দেশকে জিম্মি করে রেখেছে ওরা।’ রাজ্যের ট্যাবলয়েড বুলি নতুন করে উচ্চারিত হলো। আতঙ্কের একটা আবহ ছিল সেখানে। ব্ল্যাকবার্নের বিয়ের অতিথিরা বেশ আমোদিত হয়েছিলেন। আমরা জানতাম বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন রকম কিন্তু বাদ দিন সে কথা। আর হ্যাঁ, বেশ প্রীতিকর ছিল সেটা। কেউ একজন বাদ সাধে (মনে হয় পেরি ছিল), ঠিক ভিক্টোরিয়ার মতো। ১৮৪৮ সাল নাগাদ ফসিল হয়ে গেছে।”
খেই ধরেছেন মেরি: “এটা থামাতে— যদিও তাতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছে তার— ম্যাকমিলান সরাসরি রানীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘ম্যাম, আমরা ইংল্যান্ড নিয়ে কথা বলছি, এখানে পেন্ডুলাম দোল খায়, কিন্তু কখনই পুরোপুরি দোল খায় না— আপনি যখন পেন্ডুলামকে বামে দোল খেতে দেখছেন, আমি কিন্তু এরই মধ্যে ডানে কিঞ্চিৎ নড়তে দেখেছি— তো আতঙ্কিত হবেন না, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে’।”
পেন্ডুলাম ঠিকই ১৬৪৯ সালে ব্যাঙ্কোয়েট হলের বাইরে পুরোপুরি দোল খেয়েছিল। কিন্তু ছয় বছর পরে আমরা থ্যাচারকে পাওয়ার পর আর কখনই নয়।
১৯৬৫-৭৫-এর আশা বরবাদ হয়ে গেল কেন?
আমি সবসময়ই ভেবেছি ব্রিটেনে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনে শ্রমিকদলের আধিপত্য এবং সংসদে শ্রমিকশ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এর সামগ্রিক একচেটিয়া অধিকারই আসলে খনি শ্রমিকদের ধর্মঘটের আগে এর বিস্তার ঠেকিয়ে রেখেছে এবং এমনকি এখানেও রক্ষণশীল সরকার ক্ষমতায় থাকলে বিশাল ধর্মঘট হয়ে থাকে। এডওয়ার্ড হিথ খনি শ্রমিকদের সঙ্গে নিয়ে সভায় আসছেন আর ইউনিয়নের ন্যাশনাল সেক্রেটারি লরেন্স ডেলি কনফারেন্স টেবিলে পা তুলে তার চেয়ারে বসে আছেন। হিথ ভেতরে ঢুকলে অন্য খনি শ্রমিক নেতারা উঠে দাঁড়ালেন। ডেলি বসে থেকেই হিথের দিকে তাকিয়ে স্বাগত জানালেন তাকে: ‘হ্যালো, সেইলর!’
রাজনৈতিক দিক থেকে ডেলি ব্যতিক্রম ছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত, নিউ লেফটের অংশ, এডোয়ার্ড টম্পসন, ডয়েশ্চার ইত্যাদি পড়েছেন। উত্তর ভিয়েতনামে আমার সঙ্গে ছিলেন। হো চি মিনের জন্য সেরা মল্টের একটা বোতল ছিল তার কাছে কিন্তু কোনোভাবে নমপেনে ওটা শেষ করে ফেলি আমরা। স্কারগিলের একই চেহারা ছিল। শ্রমিকশ্রেণী খুবই আত্মবিশ্বাসী প্রতিনিধি ছিল এরা, এবং তখন থেকে নব্য উদারপন্থী ব্রিটেনে প্রাধান্য বিস্তারকারী থ্যাচার আরোপিত ওদের ভাষায় সংস্কারে— আমি যাকে বলি অবনমন— অরগ্রিভে এবং অন্যান্য বিভিন্ন সংঘাতে বিচলিত হয়নি।
কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে...
আমরা ষাটের দশককে— ১৯৬৫ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে শেষ হওয়া সময়কে দশক হিসেবে দেখলে একমাত্র বিজয় ছিল পাকিস্তান। ছাত্রদের নেতৃত্বে শ্রমিক এবং কোথাও কোথাও কৃষক এবং কার্যত সব শ্রেণীর পেশাজীবী, সরকারি কর্মচারী আর আইনবিদ এবং আমি বলব পতিতাদের অংশগ্রহণে তিন মাসব্যাপী এক অভ্যুত্থান ঘটেছিল। রাস্তায় নেমে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও স্বৈরাচারের অবসানের লক্ষ্যে মিছিল করেছে। জনপ্রিয় স্লোগান ছিল— ‘পুঁজিপতি আর জমিদাররা হট যাও। পাকিস্তান আমাদের।’ ১৯৬৮ সালের ৭ নভেম্বর শুরু হয়ে ১৯৬৯ সালের মার্চে শেষ হয়েছিল সেটা। স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং প্রথমবারের মতো অবাধ নির্বাচনের অনুমতি দেয়া হয়।
সেটা ছিল একটা বিজয়। আরেকটা কাছাকাছি বিজয় ছিল পর্তুগাল— সম্ভবত সবচেয়ে অগ্রসর ইউরোপীয় বিদ্রোহ। পর্তুগাল ক্ষুদ্রতম উপনিবেশিক শক্তি ছিল, তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং উপনিবেশগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিল। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে পর্তুগিজ সৈনিক ও কর্মকর্তাদের পাশাপাশি গেরিলারা উৎসাহের সঙ্গে রেডিও শুনছিল এবং ভিয়েতনাম থেকে আসা খবরে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের খে সানহে বিজয় এবং ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে ভিয়েত-কঙদের মার্কিন দূতাবাস দখল দেখছিল। এ ঘটনা সৈনিকদের বিপ্লবী করে তোলায় দারুণ প্রভাব রাখে। এখন স্রেফ শত্রুপক্ষ কীভাবে চিন্তা করছে বোঝার জন্য ওরা মাও, চে গুয়েভারা ও হো চি মিনের রচনা পড়ছিল এবং নিজেরাই সংক্রমিত হয়ে পড়ছিল এবং অবশ্যই গেরিলারা বৈশ্বিক বামপন্থীদের সমর্থন পাচ্ছিল, চীনা ও রাশানদের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছিল।
আফ্রিকায় পরাজয় পর্তুগিজ সমাজের মধ্যস্তর এবং সেই সঙ্গে দেশে তলব করা নিয়মিত সৈনিকদের বিপ্লবী করে তুলেছিল— উপনিবেশে রেখে দেয়া হয়নি তাদের। ধর্মঘট শুরু হয়ে গিয়েছিল। দেশের জরাগ্রস্ত ও বোনাপার্টপন্থী স্বৈরাচারের পতনের দাবিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিনা সহিংসতায় সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ে এবং আমাদের মনে হয়েছিল পরিস্থিতি বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। জার্মান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সমর্থিত মারিও সোরেস সবচেয়ে জ্বলাময়ী ভাষণ দিচ্ছিলেন— আপনি জানেন, অনেকটা দেসমৌলিনস বা ডান্টনের মতো। এ বর্ণহীন আমলা, যাকে আমরা কখনো যোগ্য ভাবিনি, লিসবনে ১ লাখ ৫০ হাজার লোকের এক সভায় ভাষণ দেবেন, প্রধানত পর্তুগিজ বিপ্লবের পক্ষের কৃষক, শ্রমিক ও ছাত্র— ওরা সবাই একে ‘বিপ্লব’ বলছিল। সোরেস শ্রমিকদের প্রশ্ন করলেন: ‘আমরা কি সমাজতন্ত্র চাই?’ ‘হ্যাঁ!’ ‘আমরা কি ভূমি সংস্কার চাই?’ ‘হ্যাঁ!’ ‘আমরা কি কলকারখানা আর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রীয় মালিকানা চাই?’ ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ!’ ‘আর আমরা কি গণতন্ত্র চাই?’ ‘হ্যাঁ!’
কিন্তু চরম বাম প্রলেতারিয়েতের গণতন্ত্রের আহ্বান জানানোর সময় গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন উপেক্ষা করে গেল। অন্য কথায়, তিনি যেন দেশকে বলছিলেন একটা স্বৈরাচার আরেক স্বৈরাচারের জায়গা দখল করতে যাচ্ছে। মানুষ নির্বোধ ছিল না; বহু পর্তুগিজ শ্রমিক ফ্রান্স সফর করেছেন, তারা দুনিয়ায় কী ঘটছে জানতেন এবং জানতেন পূর্ব ইউরোপ কেমন ছিল। তারা এমন একটা অবস্থা চাননি, যেখানে গণমাধ্যম একই সুরে কথা বলে। সেই অভিজ্ঞতা তাদের ছিল এবং তারা ভিন্ন কিছু আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন। সোরেস এটা বুঝতে পেরেছিলেন এবং অত্যন্ত সুললিত ও সুসংগঠিত ভাষণের কল্যাণে জিতে যান। অত্যন্ত শক্তিশালী বিপ্লবী ঝোঁক এক ধরনের রাজনৈতিক দুর্বলতার সুবাদে পরাস্ত হলো। অবশ্যই প্রচুর মানুষ তখন কী ঘটেছে বুঝতে পারলেও কিছুই করার ছিল না।
আমেরিকায় দক্ষিণে একটি বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পতন ঘটানো সিভিল রাইটস আন্দোলন ঘটেছিল, ভিয়েতনাম যুদ্ধ বাধানো অসম্ভব করে তুলেছিলেন আপনারা; লিন্ডন জনসনকে আবার নির্বাচনে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিলেন—
অন্য কোনো সাম্রাজ্যবাদী দেশে ষাট ও সত্তরের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে ওঠা যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের জুড়ি নেই। মার্কিন ইতিহাসে মতবিরোধের সর্বোচ্চ বিন্দু ছিল সেটা, যুদ্ধাবসানে সাহায্য করেছিল। ডান-বাম, উদার ও প্রতিক্রিয়াশীল নির্বিশেষে গোটা দেশ ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় মেতেছিল। ১৯৬৮ সালের জানুুয়ারিতে সায়গন এবং বেশির ভাগ প্রাদেশিক শহরসহ ১০০ শহরে ভিয়েতনামিজ লিবারেশন আর্মির সমন্বিত আক্রমণ নাটকীয় ও ফলপ্রসূ ছিল। আমেরিকানদের উচিত ছিল অবিলম্বে শান্তির প্রয়াস নেয়া। কিন্তু উল্টো আরো সাত বছর যুদ্ধ চালিয়ে গেছে ওরা। মানুষ হত্যা আর বিকৃত করার কাজে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে, পরিবেশ ধ্বংসে এজেন্ট অরেঞ্জ প্রয়োগ করেছে। টেলিভিশনের পর্দায় রোজই এ বর্বরতা দেখা যাচ্ছিল। হররোজ মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল, গোটা যুক্তরাষ্টে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, জয় লাভ করছিল ভিয়েতনামীরা— চরম বাস্তবতা ছিল, ওদের পরাস্ত করতে পারছিল না ওরা। প্রত্যেক বছর জেনারেল ওয়েস্টমোরল্যান্ড বড়দিন উপলক্ষে ভাষণ দিতেন: ‘আগামী বছরই ছেলেরা ঘরে ফিরে আসবে।’ বেশ, ছেলেরা ঘরে ফিরে আসছিল বলে মনে হয়নি, কিন্তু পঙ্গু ও বিকারগ্রস্ত লোকদেরই ফিরে আসতে দেখেছে ওরা এবং এক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে নজিরবিহীন যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে সেটা। সম্ভবত ১৯৭১ সালে পেন্টাগনের বাইরে মিছিলের ঘটনাটাই সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল, মূলত জিআই ও যুদ্ধবিরোধী প্রবীণ সৈনিকরা এর আয়োজন করেছিলেন। ওই মিছিলে ক্রাচে ভর দিয়ে, হুইল চেয়ারে করে উর্দি পরা ৭০ হাজার থেকে এক লাখ সাবেক জিআই পেন্টাগনের বাইরে মিছিল করে স্লোগান দিচ্ছিলেন— ‘হো, হো, হো চি মিন, এলএলএফ জিতে যাবে!’ এ ঘটনা পেন্টাগনকে ৯/১১-এর আল কায়েদার বোমা বর্ষণের চেয়েও বেশি আহত করেছিল।
ওই ঘটনা কেন অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশ দুটিকে একটি কার্যকর বাম বিকল্পের দিকে নিয়ে গেল না?
অন্ততপক্ষে বার্লিনে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক কাঠামো এবং ফলপ্রসূভাবে সংসদীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে ট্রেড ইউনিয়ন কর্তৃক গঠিত একটা রাজনৈতিক দল এর কারণ। এটা ভাঙার জন্য খুবই বিরাট কিছু প্রয়োজন হবে আপনার। যেমন ধরুন, একজন শ্রমিকদলীয় প্রধানমন্ত্রীর ধর্মঘটীদের ওপর গুলি বর্ষণের নির্দেশ দেয়ার মতো বিরাট ঘটনা, এ ধরনের ভীতিকর কিছু। বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু ব্রিটিশ শ্রমিক আন্দোলন কিংবা যেভাবেই হোক এর সিংহভাগ বরাবরই সাম্রাজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, কখনই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশের বিরোধিতা করেনি। ফলে ইনডিপেনডেন্ট লেবার পার্টির মতো বিভিন্ন গ্রুপ বা কমিউনিস্ট পার্টি অথবা খোদ খুদে কমিউনিস্ট পার্টির মতো খুদে ট্রেড ইউনিয়ন বাদে কখনই সাম্রাজবাদবিরোধী ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি। কমিউনিস্ট পার্টি কখনই ব্রিটিশ রাজনীতিতে বিরাট শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি, যেমনটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রেনেসাঁর কল্যাণে ফ্রান্স ও ইতালিতে পেরেছিল ।
আপনি কি মনে করেন বাম, চরম বাম, যাদের সঙ্গে আপনি জড়িত ছিলেন, ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারত?
আমি মনে করি গোটা চরম বামরা মিলে যদি একটা দল গঠন করত...কিন্তু কী করত তারা? প্রথমত. পরস্পরের সঙ্গে ঠোকাঠুকি করে খুনখারাবি করত কিংবা রাজনৈতিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। দ্বিতীয়ত. ব্রিটেনের নির্বাচন কাঠামো— দ্য ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট ব্যবস্থা— তৃতীয় একটি দল গঠন কার্যত অসম্ভব করে তুলেছে। লিবারেলদের উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে আমরা যেমন লক্ষ করেছি কিংবা গ্রিনরা যেখানে এক মিলিয়ন ভোট পেয়ে মাত্র একজন এমপি পেয়েছিল কিংবা আরো নাটকীয় উদাহরণ, এখন সানন্দে মরতে বসা ইউকিপ কয়েক মিলিয়ন ভোট পেয়ে মাত্র একজন এমপি পেয়েছিল। এতে নির্বাচনী প্রতিনিধিত্ব পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে গেছে। শ্রমিকশ্রেণীর ওপর শ্রমিকদলের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ টোরিজদের হাতে এবং পরে অন্য ছোট ছোট কারণে কিছু মাত্রায় কমেছিল। কিন্তু কখনই পুরোপুরি ভাঙেনি এবং অবশ্যই এখন বদলা নেয়ার ইচ্ছা নিয়ে ফিরে এসেছে। আমি অবশ্য করবিনের কারণে তাতে কিছু মনে করি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তৃতীয় কোনো দল অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছে। ভূগোলের অনেকখানি গুরুত্ব রয়েছে এবং বামদের প্রথমেই শহর আর রাজ্যগুলোকে টার্গেট করার জন্য পরামর্শ দিয়েছি আমি। দ্য ডেমোক্রেটিক সোস্যালিস্টস অব আমেরিকার এখন ৩০ হাজার সদস্য রয়েছে। ছোটখাটো সূচনা?
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে বামরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিষ্কার পিছু হটেছিল— থ্যাচারবাদের কারণে জাতীয়ভাবে এবং কমিউনিজমের পতনের কারণে আন্তর্জাতিকভাবে— আপনি বলতে পারেন এসব সত্ত্বেও বামরা বিভিন্ন বিজয় অর্জন করছিল, কিন্তু সেসব ছিল সাংস্কৃতিক বিষয়আশয়: সমকামী অধিকার, নারীদের অধিকার আদায়, কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়, সমাজের সাধারণ অর্থনৈতিক উদারীকরণ। আপনি কি মনে করেন যে বামরা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিল?
নব্বইয়ের দশকে এখানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপের অন্যান্য জায়গায় কমিউনিজমের ভাগ্যে যেটা ঘটেছে সেটা হলো, চরম বামরা বৈশ্বিক ক্ষেত্রে লাখ লাখ মানুষের ওপর কমিউনিজমের পতনের প্রভাবকে গুরুতরভাবে খাটো করে দেখেছে, যারা বিশেষভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পছন্দ না করলেও এর অস্তিত্বের কারণে খুশি ছিল। এর উপস্থিতিই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটা প্রাচীর ছিল। দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়ার বিরাট একটা অংশ, আফ্রিকা, এমনকি ইউরোপেও অতিমেধাবী মানুষগুলো বুঝতে পেরেছিল যে এ ব্যবস্থার সামগ্রিক পতন বামদের পক্ষে এক বিরাট মাত্রার পরাজয়। আপনি সোভিয়েত ইউনিয়ন পছন্দ করুন বা না করুন। চরম বামদের কেউ কেউ ভেবেছেন, ‘আহ...এবার আমাদের পালা!’ তারা ভুলে গেছেন, জীবনভর তারা বিরাট কমিউনিস্ট আন্দোলনের স্রেফ পাদটীকা ছিলেন, যা ছাড়া তাদের অস্তিত্বই সম্ভব ছিল না। এতে কেউ কেউ রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ খুইয়ে আচরণের দিক থেকে, কাজের দিক থেকে আরো বেশি করে রক্ষণশীল হয়ে গেছেন। কারণ কী ঘটেছে আদৌ হূদয়ঙ্গম করতে পারেননি তারা।
বৃহত্তর বামপক্ষের লোকজন বলেছে, ‘এটা একটা পরাজয়, আমরা হেরে গেছি,’ কিন্তু তারা পরিচয়ের রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছে। মনে রাখতে হবে এটাও কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকেরই পরিণতি। আমি বলতে চাইছি, সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্পষ্টই তৃতীয় বিশ্বে সংগ্রামের সঙ্গে সম্পর্কিত নারী আন্দোলনকে কেন নারী অধিকার আন্দোলন বলা হলো? সমকামী মুক্তি আন্দোলন, কৃষ্ণাঙ্গ মুক্তি আন্দোলন, দ্য ব্ল্যাক প্যান্থারস— এসবই ষাটের দশকের শেষে এবং সত্তরের দশকের প্রধান অংশে গড়ে উঠেছিল এবং জোরালো প্রভাব রেখে গেছে। আমরা যেমন জানি, সমস্যাগুলো মিটে যায়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দ্য ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলন হচ্ছে, আফ্রিকান-আমেরিকানদের কারারুদ্ধ করার ক্রমবর্ধমান হার— ভয়াবহ। সুতরাং এমনকি নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নেও বিশেষ করে বর্ণবাদের ক্ষেত্রে আমরা সবকিছু জয় করিনি।
শ্রমিক আন্দোলনে প্রচলিত অর্থে যেটা করার কথা সেটা হলো, দরিদ্র ও শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করা কিন্তু সেটা থেমে গেছে এবং যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই?
প্রায়ই যে জিনিসটা এড়িয়ে যাওয়া হয় সেটা হলো, ১৯৯১ সালে কেবল রাষ্ট্রীয় কমিউনিজমেরই পতন ঘটেনি। এর সঙ্গে প্রচলিত সামাজিক গণতন্ত্রেরও পতন ঘটেছে। বিশ শতকের বেশির ভাগ অংশ জুড়ে সামাজিক গণতন্ত্রের সামগ্রিক তত্পরতা ছিল পুঁজিবাদের অভ্যন্তরে একটা বিকল্পের ব্যবস্থা করা, যা কিছু সংস্কারের পক্ষে লড়াই করে বিপ্লব, কমিউনিজম, আপনি একে যা-ই বলেন, তার বিরুদ্ধে প্রাচীরের কাজ করবে। পুরনো শত্রু বিদায় নেয়ায় পুঁজি এবং এর নেতারা আর ওই পথ অনুসরণ করার কোনো দরকার মনে করেননি। বরং টার্বো-চার্জড পুঁজিবাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছেন, পায়ের নিচে কে পিষ্ট হয়েছে, তাতে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাননি। এবং সামাজিক গণতন্ত্র এখানে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। ফ্রান্সে বেসরকারীকরণের সিংহভাগই সমাজবাদী সরকারের হাতে ঘটেছে: মিতেরাঁ ও জোসপিন। ব্লেয়ার, ম্যান্ডেলসন, ব্রাউন নব্য উদারবাদের গোঁড়া সমর্থক ছিলেন, লোকজনের টাকা বানানো দেখে বেশ স্বস্তিতেই ছিলেন। সমাজতন্ত্রের পতন-পরবর্তী সামাজিক গণতান্ত্রিক দলগুলো সেন্টার রাইট পার্টিগুলো থেকে ভিন্ন ছিল না এবং ইউরোপের বিরাট অংশে ও বিশ্বের অন্যান্য এলাকায়ও যা ঘটেছে— ভারত এর একটি উদাহরণ— একে আমি এক্সট্রিম সেন্টার বলে বর্ণনা করেছি। সেন্টার লেফট বা সেন্টার রাইট, আপনি কোন দলের তাতে কিছু এসে যায় না। মূলত আপনি কিছু পরিমাণ নব্য উদার অর্থনৈতিক নীতিরই পক্ষে। আপনি মোটামুটিভাবে বিশ্বব্যাপী আমেরিকানদের যুদ্ধকে সমর্থন করেছেন। আপনি ন্যটোর গোড়া সমর্থক। ফলে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, দুটো ব্যাপার ঘটেছে তাতে: একটি হলো বর্জনের সংখ্যা বৃদ্ধি— সামাজিক গণতন্ত্রের ঐতিহ্যবাহী সমর্থক বহু মানুষ ভোটদান থেকে পুরোপুরি বিরত থেকেছেন। ব্রিটেনের সাম্প্রতিককালের নির্বাচন ভোট বর্জনের পরিমাণ রীতিমতো বিস্ময়কর। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের একটা বিরাট অংশ আদৌ ভোট দেননি; ফ্রান্স এবং অন্যান্য দেশেও একই হাল। ওয়াল স্ট্রিট ক্রাশের সঙ্গে মিলে শূন্যতার সৃষ্টি বিভিন্ন বৈষম্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে, যেগুলো বেশির ভাগ সময়ে বিরাট ডানপন্থী বিভিন্ন গ্রুপের উত্থানের ভেতর দিয়ে ফ্রান্সে এবং এখন জার্মানিতে পূরণ করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের সামনে দুটো পরিষ্কার বিকল্প ছিল। জনমতগুলো দেখাচ্ছিল, বার্নি স্যান্ডার্স ট্রাম্পকে পরাস্ত করবেন। কিন্তু ক্লিনটন প্রচলিত চরম মধ্যপন্থী ধরনের রাজনীতির হাত ধরে প্রেসিডেন্সিকে এক বিচিত্র, মেভেরিক, শ্বেতাঙ্গ সুপারম্যাসিস্ট বিলিয়নেয়ারের হাতে তুলে দিলেন, যিনি মোটামুটিভাবে রিপাবলিকান পার্টিকে নিজস্ব উদ্দেশ্যে দখল করে নিয়েছেন এবং এমন একটা প্লাটফর্মে চেপে ক্ষমতায় এসেছেন, যা বেশকিছু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যেগুলোর কোনোটাই এখনো ঘটেনি। আমরা এখনো এ পরিস্থিতির ভেতরই আছি।
বামরা ক্রাশের সুযোগ গ্রহণ করছেন না কেন?
সামাজিক-গণতান্ত্রিক দলগুলো— এদের দিয়েই শুরু করা যাক, বিশেষ করে নিউ লেবার— বড় বেশি ডানে সরে গিয়েছিল, কারণ তারা ভেবেছিল অবস্থা সেদিকেই গড়াবে। ফলে যখন ক্রাশ দেখা দিল, পুঁজিবাদকে বাঁচাতে তারা কেবল ব্যাংকগুলোকে অব্যাহতভাবে টাকার জোগান দিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করতে পারেনি। ডান ও বামের ভেতর কোনো তফাত ছিল না। ব্লেয়ার বা ব্রাউন প্রথম যে কাজটা করেছিলেন, সেটা ছিল ধারাবাহিকতা দেখাতে থ্যাচারকে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে দাওয়াত করে এনে তার সঙ্গে ছবি তোলা। অবার ক্যামেরন নিজেকে ব্লেয়ারের বিরাট ভক্ত হিসেবে তুলে ধরা গোপন করেননি। এক চরম মধ্যপন্থী সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের এ ধারাবাহিকতা ছিল। জার্মানিই প্রথম সত্যিকার অর্থে ডাই লিঙ্কেত, দ্য লেফট নামে বামদের একটা দলের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করে। এ দলটি সাবেক পূর্ব জার্মানির শাসকদলকে পশ্চিম জার্মানির সামাজিক গণতন্ত্রের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করে। আপনি চাইলে বলতে পারেন, জার্মানিতেই সবচেয়ে বড় স্বস্তি এসেছিল। এখানে অস্কার লাফোন্টাইনের একটি বামপন্থী কিনেসীয় কর্মসূচি ছিল, তিনি জার্মান রাষ্ট্রের এখনো যুগোস্লাভিয়ার সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতির দায় স্বীকার করা বাকি রয়ে গেছে বলে যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ বাধানোর বিরোধিতা করেছেন। তার প্রকাশ্যে এবং খোলাখুলি সরে আসার বাস্তবতাকে বাম পন্থার বহু লোক ইতিবাচক হিসেবে দেখেছে। এটা পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানির বামকে ঐক্যবদ্ধ করেছে, খুব একটা খারাপ করছে না এটা। ইতালি ও ফ্রান্সে এক্সট্রিম লেফট বিরাট আঘাত পেয়েছে। শেষের দেশটিতে অভিজাতরা মাখোঁকে ক্ষমতায় আনতে সফল হয়েছে এবং এখন তিনি থ্যাচারীয় অপারেশনে নেমেছেন। আমরা কথা বলার সময় ইতালিতে কোনো সরকারের অস্তিত্ব নেই।
গত বছরের ৮ জুনের বিস্ময়ের কী অর্থ করবেন আপনি?
দুটো কারণ। প্রথমটি হলো, হাতছাড়া হয়ে গেলেও স্কটিশ স্বাধীনতার লড়াই— উভয়পক্ষের তরফে যেভাবে লড়াই করা হয়েছে; স্বাধীনতার পক্ষেই বেশির ভাগ তরুণরা ছিল— টনিকের মতো ছিল সেটা। ওই সময় স্কটল্যান্ডে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেছি, বিভিন্ন সভায় কথা বলেছি, আনন্দময় ব্যাপার ছিল সেটা— এর আগে এ দ্বীপগুলোয় এমন কিছু প্রত্যক্ষ করিনি। স্কটল্যান্ডের প্রত্যেকে হয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলছিল বা ভাবছিল— দুই পক্ষেরই সবাই। সেই বিস্ময়কর দৃশ্যের কথা ভুলে যাওয়া কীভাবে সম্ভব, শ্রমিকদলীয় এমপিদের জোর করে গ্লাসগোতে স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অভিযানে নামিয়ে দেয়া হলে একজন মাত্র ব্যাগপাইপার কীভাবে পুরো দৃশ্যের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়েছিল। ‘ওই যে লন্ডন থেকে বিশ্বাসঘাতক এসেছে, ইউনিয়নের সমর্থক হাউজ অব কমন্সের সদস্য!’ ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পরে তাদের বেশির ভাগই আসন হারান।
দ্বিতীয় কারণটি ছিল, ভোটদানের বয়স ১৬ বছরে কমিয়ে আনা। ফলে সব স্কুল জড়িয়ে পড়ে। তরুণরা প্রায় সাফল্য কেড়ে নিচ্ছিল। ইংল্যান্ডের বহু তরুণ সামাজিক নেটওয়ার্কে এটা দেখেছে। ওরা ভাবতে শুরু করে, কেবল স্কটল্যান্ডেই কেন এটা সীমিত থাকবে। ওদের অনুভূতি ছিল: ‘ভাগ্যবান স্কটদের দেখো— ওরা অন্তত ওদের সিস্টেম পাল্টানোর চেষ্টা করছে, অথচ আমরা এখানে একেবারে নিঃসাড় হয়ে আছি।’ এবং তারপর লেবার পার্টি নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পরপরই এড মিলিব্যান্ড ইস্তফা দিলে উত্তরাধিকারের লড়াই হয়, বেশির ভাগ প্রার্থীই মোটামুটি একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিউ লেবারের অধীনে লেবার লেফটকে প্রায়ই একজন প্রতীকী প্রার্থী দেয়ার সুযোগ দেয়া হতো। এবার প্রতীকই জয়লাভ করল।
বেশ, করবিনের পালা ছিল সেটা, তাই না?
এ যাত্রা অনিচ্ছার সঙ্গেই পতাকা বহনে রাজি হয়েছিলেন তিনি। তার পরের ঘটনা অবিশ্বাস্য। টেলিভিশন ও রেডিওতে সব প্রার্থীকে সমান সময় দেয়া হয়। এবং করবিন তার বিশ্বাসের কথাই বলেছেন, যা কিনা প্রথাগত বাম বা অনেক সময় পুরোপুরি বাম নয়, এমন সামাজিক-সমাজতান্ত্রিক মূল্যবোধ। এক বিরাট সমাবেশের পর তিনি আমাকে বলেছিলেন, লোকজন বিশেষ করে তরুণরা বেশি করে তার কাছে আসছে, কারণ ওরা তাকে টেলিভিশনে এমন কথা বলতে দেখেছে, যেটা আর কেউ বলেনি। তাই তার কথা শোনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ ছিল সেটা, এক ধরনের রাজনৈতিক পুনর্জাগরণ। তরুণদের উপস্থিতিতে সভা ভরে উঠছিল। করবিন বলতেন, ‘আমরা আবার উচ্চশিক্ষা ফ্রি করে দিতে যাচ্ছি।’ তাকে যে জিনিসটা বিস্মিত করেছিল সেটা হলো, তার কাছে আসা বেশ উল্লেখযোগ্য তরুণ জানতে চেয়েছেন, ‘উচ্চশিক্ষা কি একসময় ফ্রি ছিল?’ নব্য উদারবাদী আমলে ওই স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে বলে তার মনে হয়েছে। সেজন্যই ‘ব্যাপারটা ছিল এ রকম এবং আমরা আবার সেটা নিশ্চিত করতে যাচ্ছি’ বলার পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করেছেন। রেলওয়ে এককালে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় ছিল, তখন ঢের ভালো ছিল...।’ তিনি রেলওয়ে, পাবলিক ইউটিলিটি ও শিক্ষাকে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে প্রচারণা চালিয়ে গেছেন— ষাটের দশকে এসব ধারণা আমাদের কাছে খুবই তুচ্ছ ছিল। মানে আমরা স্রেফ এ সবকিছু নিশ্চিত বলে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এসব হারিয়ে গিয়েছিল।
একজন ভদ্রচেহারার নেতা ছিলেন, আদৌ গণমাধ্যমে তুলে ধরা বুনো কেউ নন; লেবার পার্টির প্রথম নেতা, যিনি গুরুত্বপূর্ণভাবে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, যুদ্ধ সর্মথন করেন না, স্টপ দ্য ওয়ারের সদস্যপদ রক্ষা করেন। মানুষ তাদের ভাগ্যকে বিশ্বাস করতে পারেনি এবং এটা বেড়ে উঠছিল, সহসা গণমাধ্যম ও লন্ডনের মিডিয়া বাবলের ভেতরে যারা অবস্থান করছে, তারা ভীত হয়ে উঠল— করবিন জিতে যেতে পারেন ভেবে তাদের চেহারায় নির্ভেজাল আতঙ্ক ফুটে উঠেছিল। এটা লক্ষ করা আনন্দদায়ক ছিল।
পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির বড় অংশ তার বিরোধী ছিল। দ্বিতীয় দফা তার নেতৃত্বের জন্য দাঁড়ানো ঠেকানোর প্রয়াসে তাকে এমন ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে, যেমনটা অতীতে কোনো লেবার নেতা মোকাবেলা করেননি। যখন ডাক এল, ওই ছেলেরা করবিনকে ভোট দিতে লেবার পার্টিতে যোগ দিল। আধা মিলিয়ন লোক যোগদান করে একে ইউরাপের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত করল এবং এখনো দলের ভেতরে ব্রাউন ও ব্লেয়ার অংশ তরুণদের এসব পরিবর্তন চাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেনি। তাকে পার্লামেন্টারি লেবার পার্টির এক সভায় তলব করা হয়, ওখানে অনাস্থা ভোট গ্রহণ করা হয়, আমরা প্রবলভাবে আশা করছিলাম, তিনি যেন এটা মেনে না নেন। তিনি মেনে নেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমার প্রতি আপনাদের আস্থা না থাকতে পারে, আমরা যে লেবার পার্টি গড়ে তুলছি তাদের আস্থা আছে এবং আমি ফের এর জন্য লড়তে যাচ্ছি।’ সুতরাং তার রাজনীতি ও দৃঢ়তা দুটোই মানুষকে বিস্মিত করেছিল। ওই মুহূর্তে তার স্বাভাবিকতা ছিল লক্ষণীয়। মনোবল ভেঙে দিয়ে তাকে ইস্তফাদানে বাধ্য করাই ছিল লক্ষ্য। কিন্তু তিনি সাহস ধরে রেখেছেন।
আপনি তরুণদের এক আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। এর স্লোগান ছিল: ‘তিরিশের ওপর বয়সী কাউকে বিশ্বাস নেই।’ ষাটের দশকের অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা লাভ করতে পারেন? আপনি কি এখন সামনে এগোনোর একটা উপায় বাতলাতে পারেন, যেটা আরো নিরাপদ হতে পারে?
বেশ, ষাটের দশকের আন্দোলনগুলো প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার প্রতি এক ধরনের সংসদবহির্ভূত চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। মানে, আমরা ছোট ছোট গ্রুপে ছিলাম, কিন্তু মূলত এটা ছিল গণআন্দোলন। এবং আমাদের মনে হয়েছে কোনো পরিবর্তন এলে সেটা রাস্তায়ই আসবে, ধর্মঘটের তরঙ্গের ভেতর দিয়ে আসবে, কিন্তু সেটা ঘটেনি। যেসব দেশে ব্যাপারটা ঘটেছে— ফ্রান্স ও ইতালিতে— সেসব দেশে চূড়ান্ত মুহূর্তে ‘এবার আমরা চেষ্টা চালাব, আমরা হয়তো হেরে যেতে পারি, হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারি, কিন্তু আমরা চেষ্টা করবই’ বলার মতো বড় আকারের কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না— প্যারিস কমিউন মুহূর্ত, ১৯১৭ সালের মতো কোনো একটি মুহূর্ত। পর্তুগালে ওই মুহূর্ত এসেছিল এবং হাতছাড়া হয়ে গেছে। ব্রিটেনে বামে লক্ষণীয় কিছুর অনুপস্থিতিতে এসব তরুণ প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলে গেছে এবং সেটাই হয়তো পার্থক্য গড়ে দিতে পারত।
লেবার পার্টিকে সংসদে বৃহত্তম দলে পরিণত হওয়ার খুব কাছে নিয়ে যাওয়া নির্বাচনী ফল মানুষকে প্রচুর আশাবাদী করে তুলেছিল। ফল প্রকাশের পর আরো বহু লোক যোগ দিয়েছিল। ফলে প্লাবনের জোয়ার ক্রমেই বেড়ে উঠছিল। এক ধরনের প্রবল বেগ তৈরি করেছিল তারা, লেবার পার্টির ভেতরে-বাইরে স্বাধীনভাবে প্রচার চালিয়েছে সেটা। কাঠামো একেবারেই ভিন্ন, সময়ও অন্য রকম। এখন আপনি যদি জানতে চান, করবিনের নেতৃত্বে এ নতুন লেবার পার্টি আগামী নির্বাচনে জিততে পারবে কিনা? আমি বলব: ‘হ্যাঁ, যদি খুব বেশি দূরে না গিয়ে থাকে। আমার মনে হয়, জিততে পারবে।’ শুনতে ভালো লাগলেও আমি না বলে পারছি না যে, গ্রেনফিল অগ্নিকাণ্ড নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে ঘটলে সম্ভবত তা লেবার পার্টির বিজয়ে পরিণত হতো, কারণ ওই ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ড নব্য লিবারেল ব্রিটেনের সব ত্রুটিকে প্রতীকায়িত করেছিল। তবে এ তরুণরা কি করবিনকে ক্ষমতায় নিয়ে যেতে পারবেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। সমস্যা হলো, করবিন এমন এক লেবার পার্টিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার বড় অংশ সামাজিক গণতন্ত্রে ফিরে যেতে চায়, কিন্তু যার সংসদীয় প্রতিনিধিরা এখনো নব্য উদারবাদী অগ্রাধিকার এবং ব্লেয়ার/ব্রাউন যুগের সংরক্ষণবাদের ছাঁচে গড়া। কেউ কেউ তাদের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকে আড়াল করতে পরিচয়ের রাজনীতির প্রয়াস পেয়েছেন, কিন্তু সেটাও খুব একটা কাজ দিচ্ছে না। সাদিক খান, চুকা উমুন্না এবং মুষ্টিমেয় কিছু নারীর চেয়ে বেশি কিছু ক্যামেরন স্টাইল টোরি দল নিয়ে স্রেফ খুশি। আসলে তারা এবং তাদের সহকর্মীরা টোরি বাজেট এবং অভিবাসী আইনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। নিউ লেবার দলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে আঞ্চলিক প্রধানদের হাতে আরো বেশি ক্ষমতা দিয়েছেন তারা, কনস্টিটিউয়েন্সি লেবার পার্টিগুলোর ক্ষমতা হ্রাস করেছেন, উদার গণমাধ্যমের তরফে অসন্তোষের কোনো গুঞ্জন ছাড়াই ব্লেয়ার ও ব্রাউনের বিষয়আশয়কে নিরাপদ শ্রমিকশ্রেণী নির্বাচকমণ্ডলীতে পরিণত করেছেন। মূলত সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং সেটা বদলানো সহজ প্রমাণিত হচ্ছে না।
আমার চিন্তা হচ্ছে... ধরুন করবিন জিতে গেলেন। এ বিজয় টনিক হয়ে দাঁড়াবে এবং কিছু সময়ের জন্য তার বিরোধিতা করা দুরূহ আবিষ্কার করবে ওরা; কিন্তু বড় বড় ইস্যুতে— যুদ্ধ, মূলধনের পুনর্জাতীয়করণ বা নিয়ন্ত্রণ— আমার ধারণা বিপদে পড়তে যাচ্ছেন তিনি; এবং আমার নিজস্ব অনুভূতি হচ্ছে যে লেবার রাইট তাকে অষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে সম্পূর্ণ নিরীহ রোমানপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে, যাতে প্রধানত গণভোটকে অগ্রাহ্য করা হবে। ওরা এ পরিকল্পনাই করছে: সরাতে না পারলে ওর হাত-পা বেঁধে ফেলো। এভাবেই হামলা চালাবে ওরা। আর একমাত্র আশার কথা হলো, অন্তত আগামী বছরে আরো বেশি করে স্থানীয় লেবার দলীয় আমলাতন্ত্র নয়, বরং সদস্য সংখ্যা তুলে ধরবে।
আপনার কি মনে হয় যে ব্রিটেনে এবং কে জানে আমেরিকায়ও আপনি যাকে লেফট কিনিসিয়ান পার্টি বলে উল্লেখ করেছেন, ক্ষমতায় আসার একটা সম্ভাবনা থাকতে পারে, যা আসলে বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা যেসব প্রত্যাশা করছি তার অনেক কিছু বাস্তবায়ন করতে পারবে?
লেবার ইশতেহার ইউটিলিটিজ ফের সরকারি মালিকানায় ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ইইউ বিধিবিধানে মোটামুটি এটা নিষিদ্ধ। ‘আনক্রিটিক্যাল রিমেইনার’রা এটা মানতে অস্বীকার করেছে: তাদের চোখে ব্যক্তি পুঁজির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠিত বা রাষ্ট্র কর্তৃক অধিকারে নেয়া যেকোনো কিছুকে বড়জোর আধা আইনি বলে মনে করা হয়। অবশ্যই এসব নিয়ে বিতর্ক আছে। কারণ অন্যান্য দেশও এসব আলোচনার কোনো কোনোটায় জড়িত। কিন্তু সেটা হবে প্রথম বাধা, লেবার ইইউতে না থাকলে কোনো বাধা হবে না। সুতরাং কৌতূহলোদ্দীপকভাবে বামপন্থী সরকারের অধীনে ইইউর বাইরে থাকাটা সুবিধাজনক হতে পারে। আমার মনে হয়, এসবের কিছু বিষয় এগিয়ে নেয়া হবে। ভেতর থেকে বিরোধিতা আসবে। তবে আমি মোটামুটিভাবে আশাবাদী— করবিন এরই মধ্যে যে কাজে দক্ষ সেটার সুবাদেই— আসলে প্রচারণা সংগঠিত করা এবং লেবার যতদূর সম্পর্কিত রাজনীতিকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করে— এর মোকাবেলা সম্ভব হবে। সুতরাং ইউটিলিটিজ ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিরক্ষা— যদি সেগুলো ঘিরে সামাজিক আন্দোলন থাকে— কাজ দিতে পারে এবং সেটা লেবারের ডানপন্থী সংসদ সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, যারা হয়তো এর বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন বা অনুপস্থিত থাকতে বা অন্য কিছু করতে পারেন। এছাড়া ষাট ও সত্তরের দশকে আমরা যাকে আংশিক বিজয়ের দ্বান্দ্বিকতা বলতাম, সেই বিষয়টিও রয়েছে। অর্থাৎ এরই মধ্যে যে বিজয় আমরা অর্জন করেছি, সেটাই আঁকড়ে থাকব নাকি আরো বেশি কিছু পাওয়ার চেষ্টায় সেটাকে ঝুঁকির মুখে ফেলব? যুদ্ধ-পরবর্তী কাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত সামাজিক-গণতন্ত্রী এবং কমিউনিস্টরা এ প্রশ্নের মোকাবেলা করেছে। আজও করবিনিস্ট লেবার পার্টিসহ বহু দলকে এর মোকাবেলা করতে হচ্ছে: কতদূর যাওয়া সম্ভব? এগুলো রাজনৈতিক কলাকৌশল এবং রণনীতির অংশ, কিন্তু সমস্যা রয়েই যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত করবিন এক্ষেত্রে ভালোই করছেন, লেবার পার্টির ভেতরে-বাইরে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে যুদ্ধ করছেন, তবে শেষতক দলের বাইরের অংশই সফল হয়েছে।
আপনি কি মনে করেন, যা ঘটেছে সেটা আগেই ঘটতে পারত?
মোটেই তা বিশ্বাস করি না। এক দশকেরও বেশি সময় আগে ট্রেনে করে বেলজিয়ামে যাওয়ার কথা মনে আছে। আমার উল্টোদিকে বসা এক ভদ্রলোক একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি যখন তার দিকে তাকালাম, চেহারা আড়াল করে ফেললেন তিনি। ট্রেন থেকে নামার সময় তিনি বললেন, ‘তুমি আমাকে চিনতে পারোনি, তারিক, আমার জন্য সেটা বরং ভালোই হয়েছে।’ আমি কারণ জানতে চাইলাম। ‘বেলজিয়ামে আমি ট্রটস্কিবাদী ছিলাম, তোমার মতো একই আন্তর্জাতিক সংগঠনে।’
‘তুমি এখন কোথায়?’
‘বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী।’
আমি বললাম: ‘বেশ, একটা কিছু তো হয়েছ, কারণ তুমি তো অর্থ বা প্রতিরক্ষামন্ত্রীও হতে পারতে, সেটা তোমার মুখ ঢাকার পক্ষে যুক্তিযুক্ত হতো। তবে ভালো কিছু কি করছ?’
‘বেশ, সে বিচারের ভার তোমার ওপর।’
কার্যত প্রতিটি ইউরোপীয় সরকারে চরম বামের কাউকে না কাউকে আপনি পাবেনই। ১০ বছরের জন্য ইইউর প্রধান হোসে ম্যানুয়েল বররোসো পর্তুগালে মাওবাদী ছিলেন, লিসবনে মাওবাদী দপ্তরের জন্য আসবাবপত্র ছিনতাইয়ের হামলা সংগঠনের জন্য বেশি পরিচিত তিনি। এখন তিনি গোল্ডম্যান স্যাকসের অনির্বাহী চেয়ারম্যান। ড্যানিয়েল কোহন-বেনডিট এ মুহূর্তে আমরা যখন আলাপ করছি, এলিসি প্রাসাদে মাখোঁকে পরামর্শ জোগাচ্ছেন। এমন নয় যে তারা চেষ্টা করেননি, তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ ততদিনে তারা পুরোপুরি ছিদ্রান্বেষীতে পরিণত হয়েছিলেন। আমার কাছে যেটা রীতিমতো আমুদে ব্যাপার সেটা হলো, চরম বামের বেশকিছু গোঁড়া কিংবা এর প্রান্তসীমায় থাকা লোকজন এখন সমানভাবে সরকারের মন্ত্রী হিসেবে গোঁড়ামি করছেন কিন্তু অন্য পক্ষে। ব্রাজিলে যারা লুলার সঙ্গে ছিলেন তাদের কেউ কেউ ল্যাম্বারটিস্টে উপদলের সাবেক ট্রটস্কিপন্থী ছিলেন। এ উপদলটি ফরাসি সোস্যালিস্ট পার্টিতে প্রবেশ করে আমাদের জোসপিনকে উপহার দিয়েছে, যিনি নিজের প্রথম মেয়াদে নব্য উদারবাদের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জোসপিন যেটা বিদ্রোহ করেনি এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বী উপদলের অ্যালাইন ক্রিভাইনের মুখোমুখি হয়ে তার কানে ফিসফিস করে বলেছেন, ‘আমরা সবসময় আপনাকে বলেছি আপনার আগেই আমরা ক্ষমতায় আসব।’
লেবার পার্টিতে কী ঘটবে, সেটা এক কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। দলের অভ্যন্তরসহ অনেকেই লেবার পার্টিকে বাতিল করে দিয়েছেন। তারপর যা ঘটার ঘটেছে। এখন সন্দেহাতীতভাবে তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে নিজেকে কোনো কিছুতে পরিবর্তিত করতে পারে কিনা, দেখার জন্য দলের অভ্যন্তরে সংগ্রাম চলছে। যদি না পারে, ওরা বিদায় নেবে— আজকের দিনে রাজনীতি বড়ই অস্থির। লেবার পার্টির কর্তাব্যক্তিরা এটা বুঝতে পারবেন বলে আমি আশা করি: দীর্ঘদিন ধরে কোনো কিছুই নিশ্চিত ধরে নেয়া যাবে না। কারণ তরুণদের কোনো সাংগঠনিক আনুগত্য নেই, লেবারে যোগদানকারীরা ব্যক্তি হিসেবেই যোগ দিয়েছেন। ট্রেড ইউনিয়ন-লেবার সংযোগ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক। এখন আর সে জিনিসের অস্তিত্ব নেই, ইউরোপজুড়ে ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা দারুণ কমে গেছে, ব্রিটেনে বিপুল কমতি ঘটেছে। সুতরাং লোকে যদি মনে করে যে তাদের হতাশ করা হয়েছে, প্রথম মেয়াদে প্রতিশ্রুতি লেবার পূরণ করতে পারবে না, ওরা স্রেফ সরে দাঁড়াবে, তখন খোদাই জানেন কী অবস্থা হবে। এদিকে লেবার পার্টির পরাজয়সহ করবিনকে যেকোনো মূল্যে অপদস্থ করার লক্ষ্যে নতুন করে অভিযান শুরু হয়েছে। ব্লেয়ার তো প্রকাশ্যে করবিনকে পরাস্ত করার একমাত্র উপায় হিসেবে গণভোটের ফলাফল বাতিল করতে একটা কমন প্লাটফর্মে যোগ দিতে টোরিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমি মনে করি, করবিন জিততে পারেন। তার হাবভাব ও আচরণ প্রথাগত রাজনীতিবিদদের মতো না হওয়াটা লেবারে ফিরে আসা বা প্রথমবারের মতো বামপন্থী সোস্যাল-ডেমোক্রেটিক রাজনীতি আবিষ্কারকারী বেশির ভাগ লোকের জন্যই প্লাস পয়েন্ট।





