শিরোনামে একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। ১৮৬৫ সালে ব্রেকিং নিউজ কথাটি মোটেও চালু হয়নি। ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় ব্রেকিং নিউজ কথাটি তখনো কারেন্সি পায়নি।
১৯৩০ দশকে ক’বার উচ্চারিত হলেও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জন ফিটজেরাল্ড কেনেডি যেদিন আততায়ীর হাতে নিহত হলেন, সেই ২২ নভেম্বর ১৯৬৩ সিবিএস টেলিভিশনের অ্যাংকরম্যান ওয়াল্টার ক্রনকাইটের মুখে কেনেডি নিহত হওয়ার ‘ব্রেকিং নিউজ’টি বারবার শোনা যায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ব্রেকিং নিউজও দিয়েছেন ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্লেয়ার হোলিংওয়ার্থ (১৯৭১-এ ক্লেয়ার বাংলাদেশও সফর করেছেন)। ওয়াল্টার ক্রনকাইট ছিলেন (৪ নভেম্বর ১৯১৬-১৭ জুলাই ২০০৯) আমেরিকার সেরা ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট।
১৮৬৫-এর ১৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনের ফোর্ড থিয়েটারে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন আততায়ীর গুলিতে নিহত হলেন। সেই সংবাদটিও পরিবেশন করল রয়টার। কিন্তু ইউরোপে পুরো খবরটি পৌঁছাতে রয়টার ১২ দিন লাগিয়ে দিল।
তখন রয়টারের অফিস নিউইয়র্কে, একটি ছোট অফিস আয়ারল্যান্ডে এবং নিজস্ব একটি টেলিগ্রাফ লাইন— ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের এই ছিল ভরসা। এ কাজে প্রধান সহায়ক জেমস ‘টাগবোট’ ম্যাকলিন। ম্যাকলিনের এ টাগবোট খেতাবপ্রাপ্তি একেবারে অমূলক কিছু ছিল না। আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যু সংবাদ বহনের জন্য স্বাভাবিক যে ব্রিটিশ মেইল স্টিমার ব্যবহূত হত, তার পৌঁছাতে আরো দেরি ছিল। সে সময় তাই জেমস ম্যাকলিন ভাড়া করা একটি টাগবোটে করে সমুদ্রগামী এক জাহাজ গিয়ে, জাহাজের ক্যাপ্টেনকে বিষয়টি বুঝিয়ে সম্মত করেন। ম্যাকলিন লিংকন হত্যাকাণ্ডের বেশ নাটকীয় বিবরণ পাঠিয়েছিলেন। তিনি তার বিশেষ ডেসপাচে লিখেছিলেন, কেমন করে অভিনেতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ব্যক্তি পল উইলকিস বুথ ফোর্ড থিয়েটারের ড্রেস সার্কেলের শেষ দিকে প্রহরাধীন রাষ্ট্রীয় অতিথিদের বক্সের ভেতর ঢুকে লিংকনের মাথার পেছনে পিস্তল তাক করে গুলি করেন।
জন উইলকিস বুথ রাত দশটার দিকে, যখন শো চলছিল পেছন থেকে প্রেসিডেন্টের মাথায় গুলি করেন; .৪১ ক্যালিবারের ডেরিঞ্জার পিস্তল দিয়ে।
এরপর বুথ প্রেসিডেন্টের বক্স থেকে মঞ্চে লাফিয়ে উঠে, হাতের ছুরি উঁচিয়ে চিত্কার করে বলতে থাকেন:‘সিক স্যাম্পার টাইরানিস’ (লাতিন ভাষায় এর অর্থ: ‘স্বৈরাচারীদের পরিণতি সব সময় এরকমই হয়’), এরপর বুথ স্টেজের পেছন দিকে ছুটে গিয়ে একটি কানাগলিতে রাতের আঁধারে ঘোড়ায় চেপে পালাতে উদ্যত হন। কয়েক ঘণ্টা পর লিংকনের মৃত্যু হয়।
সৈন্যরা বুথকে ধাওয়া করে, কানাগলির একপ্রান্তে একটি শস্যাগারে আটকে ফেলতে সমর্থ হয়। তখন তার পালানোর আর কোনো পথ খোলা রইল না। সেখানেই গুলিতে বুথের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু গুলিটি তার নিজের বন্দুকের ছিল না সৈন্যদের কারো বন্দুকের, এটা কেউ জানে না।
পল ইউলিয়াস রয়টারের সংবাদ সংস্থা লিংকন খুনের আগে থেকেই ইউরোপে সবার আগে খবর পাঠানোর জন্য একটি এক্সপ্রেস সার্ভিস চালু রেখেছিল। আমেরিকান সিভিল ওয়ার-সংক্রান্ত যেকোনো সংবাদ রয়টার অন্য যেকোনো সংবাদ সংস্থার আগে পাঠিয়ে দিয়ে যথেষ্ট আস্থাভাজন হয়েছে। আটলান্টিকের ওপারে সংবাদ পাঠানোর জন্য টেলিগ্রাফের তার বসানোর কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে তখন ব্রিটেনগামী স্টিমারই ছিল একমাত্র ভরসা। ব্রিটেনগামী সেসব স্টিমার দ্রুত ধরার জন্য পল ইউলিয়াস রয়টার টাগবোটের ব্যবস্থাও রেখেছিলেন।
জেমস ম্যাকলিন লিখলেন, ‘তবে রে শয়তানের প্রেতাত্মা! তুই নিজেই খুনি, এমন খুনে তোর অন্তর সায় দিল!’ লন্ডন থেকে টেলিগ্রাফ লাইন পশ্চিমে আয়ারল্যান্ডের কর্ক শহর পর্যন্ত সম্প্রসারিত ছিল। কোনোভাবে সংবাদটি কর্ক পর্যন্ত না পৌঁছাতে পারলে এমনকি লন্ডনও এত বড় একটি সংবাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত থাকবে।
রয়টার সাহেব রাষ্ট্রীয় স্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগের জন্য অপেক্ষা না করে কর্ক থেকে ৬০ মাইল দূরে আয়ারল্যান্ডের মানচিত্রে একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ক্রুকহ্যাভেন পোতাশ্রয় পর্যন্ত নিজের টাকা খরচ করে টেলিগ্রাফের তার টানালেন (১৮৬৩)। আয়ারল্যান্ড সমুদ্রের খুব কাছাকাছি সাউথ-ওয়েস্ট পয়েন্টে একটি মেইল স্টিমার থেকে ছোট জাহাজে চিঠিপত্র ও অন্যান্য বার্তা আনা হতো। সেই জাহাজটির নাম ছিল মার্সেই।
নিউইয়র্কের রয়টার এজেন্ট ওয়াটার-টাইট ক্যানেস্তারায় এসব ভরে উপরে ছোট পতাকা টানিয়ে এবং রাতে নীল আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করে এগুলো জাহাজের পার্সারের কাছে সোপর্দ করতেন। রয়টারের জাহাজ মার্সেই মেইল স্টিমারের কাছাকাছি এলে এগুলো পানিতে ছেড়ে দেয়া হতো। তিনজন কর্মচারীকে মেইল স্টিমার আসার আগ থেকেই প্রস্তুত রাখা হতো, তারা এগুলো পানি থেকে ছোট মার্সেই জাহাজে তুলতেন। আবহাওয়া যত প্রতিকূলই হোক না কেন, তাদের দায়িত্ব ছিল চিংড়ি ধরার জালের মতো জালে আটকে ক্যানেস্তারাগুলো উদ্ধার করা। আর ক্রুকহ্যাভেন পৌঁছার পর একদণ্ড সময়ও নষ্ট করা হতো না। রয়টারের নিজস্ব মালিকানাধীন টেলিগ্রাফে এগুলো কর্কে পাঠানো হতো, কর্ক থেকে লন্ডন। তীব্র প্রতিযোগিতা— খবরটি কার মাধ্যমে বিশ্ববাসী জানবে। ব্যবস্থাপনাগুণে পল ইউলিয়াস রয়টার বরাবরই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিল।
১৮৬৫-এর ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় থিয়েটার উপভোগ করার সময় লিংকন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কিছুক্ষণের মধ্যে মারাও গেছেন। রয়টার পরিবেশিত এ সংবাদ ১২ দিন পর, ২৬ এপ্রিল মাঝ-সকালে লন্ডন এ খবর জানতে সক্ষম হয়। আব্রাহাম লিংকনের নিহত হওয়ার খবরটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মর্মান্তিক ও শোকাবহ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র, বাজারে তীব্র প্রভাব পড়ে এ ঘটনার। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে যারা কনফেডারেশনের সমর্থক ছিলেন, তারাও সন্ত্রস্ত্র হয়ে পড়েন এ মৃত্যুতে। লিভারপুল এক্সচেঞ্জে, যেখানে কনফেডারেশনের সমর্থকের সংখ্যাই বেশি, কেউ একজন ‘হুররা’ বলে চেঁচিয়ে উঠেছিল, শেয়ার ব্যবসায়ীদের একজন পাল্টা চেঁচিয়ে ওঠে, ‘তবে রে শয়তানের প্রেতাত্মা! তুই নিজেই খুনি। এমন খুনে তোর অন্তর সায় দিল!’ যদিও এটি একটি দুঃসংবাদ দ্রুত পরিবেশনার প্রতিযোগিতায় স্বল্পতম সময়ে (মাত্র ১২ দিনে!), পরিবেশন করে রয়টারই বিজয়ী হন।
রয়টারের কারণেই দ্রুত এই দুঃসংবাদটি পরে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। লন্ডনের মতো নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিল অন্যত্রও।
পেছনের গল্পটা আরো বড়
১৯৫ ব্রডওয়েতে ১৮৬৫-এর গুড ফ্রাইডের সন্ধ্যায় রুটিনমাফিক কাজ চলছে। এটা ছিল তখনকার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের হেড কোয়ার্টার, এখন টমসন-রয়টার একীভূত হওয়ার পর টমসন-রয়টারের অফিস। পাঁচদিন আগে কনফেডারেসির সমর্থকরা আত্মসমর্পণ করেছেন, এটিই এখনো প্রধান খবর। চার বছরের গৃহযুদ্ধে ছ’লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ট্রান্সআটলান্টিক কেবল স্থাপনের মতো দুরূহ কাজটি না হওয়ায় মেইল স্টিমারেই ইউরোপে সংবাদ পাঠাতে হয়। লন্ডনকে কেন্দ্র ধরে সে সময় ডাক পাঠাতে যে সময় লাগত, তার একটি খতিয়ান জানা আবশ্যক:
লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক ১২ দিন
লন্ডন থেকে আলেকজান্দ্রিয়া ১৩ দিন
লন্ডন থেকে কনস্টান্টিনোপল ১৯ দিন
লন্ডন থেকে বোম্বে ৩৩ দিন
লন্ডন থেকে কলকাতা ৪৪ দিন
লন্ডন থেকে সিঙ্গাপুর ৪৫ দিন
লন্ডন থেকে সাংহাই ৫৭ দিন
লন্ডন থেকে সিডনি ৭৩ দিন
এটা ছিল স্বাভাবিক সমুদ্রযাত্রা অনুসারে, কিন্তু সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ে এ হিসাব গড়মিল হয়ে যেত।
রাত ১১টার দিকে এপির নিজস্ব মালিকানাধীন টেলিগ্রাফ মেশিন খটখট শব্দ করে একটি বার্তা দিতে থাকে। বার্তাটি এসেছে ওয়াশিংটন থেকে। সোর্স কোড ভেঙে দ্রুত বার্তাটি লিখে নিলেন দক্ষ টেলিগ্রাফ অপারেটর। বার্তায় বলা হয়েছে: প্রেসিডেন্ট লিংকন গুলিবিদ্ধ। ফলে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এপির সঙ্গে ইউলিয়াস রয়টারের আগে থেকেই বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল। চুক্তি অনুযায়ী এপি সম্ভাব্য প্রথম জাহাজে আমেরিকান সংবাদ ইউলিয়াস রয়টারের লন্ডন এজেন্সির মাধ্যমে ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যে পাঠাতে পারবে। বিনিময়ে রয়টার এপিকে সেখানকার সংবাদ আটলান্টিকের এ পাড়ে প্রচারের জন্য হস্তান্তর করবে।
হাডসন থেকে ইংল্যান্ডগামী প্রথম জাহাজটি শনিবার বিকাল পাঁচটার আগে ছাড়ছে না। অথচ মধ্যরাতেই কানাডিয়ান জাহাজ নোভা স্কটিয়া বন্দর ছেড়ে যাওয়ার কথা, তাতে লিংকনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পাঠিয়ে দিতে পারলে কাজটা অনেক এগিয়ে যায়। নোভা স্কটিয়া ভিড়বে অরিগনের পোর্টল্যান্ডে, সেখানে নিজস্ব টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। টেলিগ্রাফে লিংকনের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পৌঁছে গেল নোভা স্কটিয়ায়।
কিন্তু শনিবার সকাল ৭.২২ মিনিটে প্রেসিডেন্ট লিংকন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার মানে নোভা স্কটিয়া জাহাজ যখন ছাড়ল সংবাদ ততক্ষণে বদলে গেছে: প্রেসিডেন্ট কেবল গুলিবিদ্ধ নন, তিনি নিহতও হয়েছেন।
এপির সঙ্গে চুক্তির পরও রয়টার জেমস হেকসার নামে একজন জার্মানকে নিউইয়র্ক প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। জেমস হেকসারকে পরবর্তীতে ইউলিয়াস রয়টার তাঁর শ্রেষ্ঠ কর্মীদের একজন মনে করতেন। হেকসার ১৮৬৪তে রয়টারের টিমে যোগ দেন। রয়টারের পরিকল্পনা অনুযায়ী হেকসারকে যে কোনো প্রকারে এপির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হবে। কেবল তা-ই নয়, নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের দিন শেষের শেয়ারের দর পাঠানোর মতো বাণিজ্যিক কাজটিও তাকে করতে হয়। তিনি সম্ভবত আমেরিকার লিটল জার্মানিখ্যাত হোবোকেনে বসবাস করতেন। গুড ফ্রাইডে উপলক্ষে স্টক এক্সচেঞ্জ অফিস বন্ধ। সুতরাং এটা ছিল তার জন্য একটা শান্ত দিন।
লিংকনের মৃত্যুর দুঃসংবাদটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রয়টারের আটলান্টিকের ওপারের বাণিজ্যিক খদ্দেরদের পৌঁছে দিতে হবে। আমেরিকার শেয়ারবাজারে তাদের যথেষ্ট বিনিয়োগ রয়েছে। বড় মাপের যেকোনো ঘটনার প্রভাব তাদের ব্যবসায় পড়বে— কারণ শেয়ারের দাম বাড়া-কমা, ধস নামা— সবই নির্ভর করে রাজনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর।
এপির পোর্টল্যান্ড টেলিগ্রাফ লাইনে হেকসারের প্রবেশাধিকার ছিল না। মধ্যরাতে তাঁর নজরে এল টিওটোনিয়া নামে একটা জাহাজ হামবুর্গের উদ্দেশে রওনা হয়েছে, জাহাজটি পথে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দরেও থামবে।
বন্দরে গিয়ে হেকসার দেখলেন টিওটোনিয়া মাত্র বন্দর ছেড়ে গেছে। জেমস হেকসার মরিয়া হয়ে উঠলেন। যেভাবেই হোক টিওটোনিয়াকে ধরতে হবে। তিনি একটি দ্রুতগামী টাগবোট ভাড়া করলেন। তাঁর হাতে সর্বশেষ খবর— লিংকন ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছেন। হেকসার সবচেয়ে দ্রুতগামী টাগবোটটি নিলেন। এটির মালিক হোবোকেনের ক্যাপ্টেন স্মিথ। ভাগ্যপ্রসন্ন। টাগবোট টিওটোনিয়াকে ধরে ফেলল।
আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আয়ারল্যান্ডের উত্তর উপকূল হয়ে নোভা স্কটিয়া লিভারপুল পৌঁছে যখন আমেরিকার দুঃসংবাদটি দেবে আর তা আয়ারল্যান্ড থেকে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে লন্ডনে পৌঁছাবে তা টিওটোনিয়া সাউদাম্পটন পৌঁছার একদিন আগে। তবে এ সংবাদগুলো পূর্ণাঙ্গ নয়— তাতে আছে শুধু আব্রাহাম লিংকন গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর। কিন্তু জেমস হেকসার টিওটোনিয়ায় দিয়েছেন সর্বশেষে সংবাদ।
টিওটোনিয়া থেকে ইউলিয়াস রয়টারের নিজ মালিকানাধীন একটি ছোট জাহাজ সর্বশেষ সংবাদটি নিয়ে আয়ারল্যান্ডের কর্কে পৌঁছালে, কর্ক থেকে টেলিগ্রাফে তা পৌঁছে যায় লন্ডনে।
ফলে এপি যে সংবাদ বহন করে আনছিল, তার আগেই জেমস হেকসারের পাঠানো রয়টারের নিজস্ব সংবাদ ইউরোপের সব গণমাধ্যমের পেয়ে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু তা হয়নি।
ইউলিয়াস রয়টার তত দিনে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী। তিনি জেমস হেকসারের এত কষ্টের রিপোর্টটি কোনো খবরের কাগজে পাঠাননি।
কেন?
তিনি খবরটি কেবল কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছেন আর তার নিজের ক’জন বন্ধুবান্ধবের কাছে— তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন শেয়ারবাজারে ধস নামবে। এর সঙ্গে তাঁর নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থও জড়িত। অথবা এপির সঙ্গে চুক্তিতে এমন কিছু হয়তো থেকে থাতে পারে যার কারণে জানা থাকলেও এপির আগে কোনো মার্কিনি সংবাদ রয়টার পরিবেশন করতে পারবে না। কিন্তু খবরটি রটে গেল ঠিকই— ব্যাপারটা এ রকম: লন্ডনস্থ আমেরিকান পিবডি ব্যাংকের কেউ একজন তার বন্ধু বললেন, বন্ধু জানালেন লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অন্য বন্ধুকে; তিনি জানালেন লিভার পুল স্টক এক্সচেঞ্জের বন্ধুকে। হেকসারের সংবাদটিকে তাত্ক্ষণিকভাবে একটি ‘রহস্যজনক বার্তা’ বিবেচনা করা হলো, কেউ মনে করলেন শেয়ারবাজারে হোঁচট খাওয়ানোর জন্য এ এক গুজব! চরম সত্যি এ সংবাদটিকে তেমন গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করা হলো না। নোভা স্কটিয়া জাহাজ ঘুরে এপির টেলিগ্রাম যখন প্রকাশ হলো, সঙ্গে সঙ্গে তা নিশ্চয়নের জন্য ছাড়া হলো জেমস হেকসারের
‘রহস্যময় সংবাদ’।
৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮
গান্ধী গুলিবিদ্ধ
জানুয়ারি ১৯৪৮। ঘটনাটি নয়াদিল্লির। অপরিচিত একটি কণ্ঠ ফিসফিস করে বলছে, ‘ম্যান ফায়ার্ড ফোর শটস অ্যাট গান্ধী... ম্যান ফায়ার্ড ফোর শটস অ্যাট গান্ধী ম্যান ফায়ার্ড’।
কিন্তু এ কার কণ্ঠ? কে ফোন করলেন? তাকে কি বিশ্বাস করা যায়! গুলিতে কি ভারতের স্বাধীনতার স্থপতি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী নিহত হয়েছেন?
এ পাশে ফোন ধরেছেন ডুন ক্যাম্বেল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কার পরীক্ষিত সাংবাদিক।
মিত্রশক্তির ফ্রান্স অবতরণের তিনি সাক্ষী। কিন্তু স্বরটি যে তার তেমন চেনা নয়।
‘একজন মানুষ গান্ধীকে চারবার গুলি করেছে। ...চারবার গুলি করেছে...।’ ক্যাম্পবেলও নাছোড়বান্দা। জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি নিহত হয়েছেন? তিনি কি নিহত?
‘জানি না। কেউ জানে না। গান্ধীকে চারটে গুলি করেছে, নিহত কিনা কেউ নিশ্চিত নয়। কিন্তু সবচেয়ে খারাপটাই আশঙ্কা করা হয়েছে।’
ক্যাম্পবেল রয়টারের হয়ে সংবাদটি ছেড়ে দিলেন। এমনকি কেবল অফিসের কেরানিও সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঘটনা কি সত্যি?’
তাই তো? যদি মিথ্যে হয়! তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কে বলছেন?’
‘আমি রায় বলছি।’
রায় তো খুব সাধারণ একটি ভারতীয় নাম। ভারতীয় এপিআই— অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব ইন্ডিয়ার তখনকার মালিকানা ছিল আসলে রয়টারের। পরে এর নাম হয় প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া। ডুন ক্যাম্পবেল এর আগে এপিআইতে চাকরি করতেন। তরুণ পি আর রায়ের কথা তার মনে পড়ল।
ক্যাম্পবেলই তাকে বলেছেন, গরম কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে ফোনে খবর দেবে। রায় তা-ই করেছে।
গোটা পৃথিবীকে সংবাদটি প্রথম জানিয়েছে রয়টার। পরবর্তী সংস্থার খবরটি আসে ৭ মিনিট পর। ভারতীয় বেতারে গান্ধীর মৃত্যু সংবাদ প্রচার হওয়ার ১৬ মিনিট পর রয়টার পৃথিবীকে জানিয়ে দেয় গান্ধীর মৃত্যু সংবাদ।
ডুন ক্যাম্পবেল পরে রয়টারের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার ও এডিটর হয়েছিলেন আর ১৯৮৮ সালে রায় কলকাতায় অবসর জীবন কাটাচ্ছিলেন।




