হাওড়ের জোছনার নাকি বেজায় শান। সেখানে পূর্ণিমার রাতে চাঁদ উঠে দুটো। একটা থাকে সীমাহীন আকাশের ওপারে, আরেকটা থাকে আধা হাত পানির ভেতর— হাত ছোঁয়ালেই ধরা যায়! পুরো হাওড় জোছনা হয়ে নাচে তখন! সে চাঁদের টানেই একদিন মধ্য জুলাইয়ে বিবাগী মন ঘর ছাড়ল। দুদিন আগেই চলে গেছে পূর্ণিমা। আমাদের ভরসা মাঝরাতের চাঁদ; ভ্রমণবন্ধু সৈকত আশ্বস্ত করল, পূর্ণিমা গেছে তাতে কী, কৃষ্ণপুরের ডাকবাংলোর ছাদে মাঝরাতে এক দণ্ড বসতে পারলেই হলো— পুষিয়ে যাবে!
কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে রাত ১২টার হাওড় এক্সপ্রেসের শোভন কামরায় বসে পড়লাম দুজন। সকাল ৮টার মধ্যেই পৌঁছানো গেল মোহনগঞ্জ! মোহনগঞ্জ থেকে মোটরসাইকেলে যেতে হবে বোয়ালি। কিন্তু ঝিরিঝিরি বৃষ্টির কারণে সে চেষ্টা ব্যর্থ হলো। তবে থেমে থাকতে হলো না এক মুহূর্তও। বোয়ালিতে এখন লেগুনাও যায়। ১ ঘণ্টার মধ্যেই ভাটির দেশের লিলুয়া হাওয়া এসে পরশ বোলাতে লাগল শরীরে!
২.
বোয়ালি বাজারটাই হাওড়ের মাঝখানে। এখানকার ব্রিজে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে পৃথিবীর তিন ভাগ যে জল আর এক ভাগ মাটি, তা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয় না। নতুন হওয়া ব্রিজের মাথায় নৌকার সারি! হাওড়ের জীবনের সঙ্গে নৌকা বাঁধা। প্রায় সব নৌকাই টিনের ছইয়ের। অন্য অঞ্চলে বোধহয় টিনের ছইয়ের নৌকা চোখে পড়ে না তেমন। নৌকা যাচ্ছে নানা প্রান্তের গ্রামে। আমরা খালিয়াজুরির নৌকায় চড়ে বসলাম। আগে এই খালিয়াজুরি পৌঁছাতে দিন পেরিয়ে যেত। এখন দেড় কি ২ ঘণ্টা লাগে। সে খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ভাটির দেশের নৌকাগুলো চালাতে হতো বৈঠা দিয়ে, দাঁড় টানারও উপায় ছিল না। ভাটির দেশে তরী থাকে বটে, তীর
খুঁজে পাওয়া মুশকিল। হাওয়া বুঝে পাল তুলে দেয়া হতো। পালে হাওয়া লাগলে নৌকা পেত গতি, না পেলে দুর্গতি। নৌকায় বসে থাকতে হতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাঝিরা নৌকায় শুত নৌকায়ই ঘুমাত। নাওয়া-খাওয়া সব ওখানেই। নৌকার এক সাইডে রান্নার ব্যবস্থা থাকত— সেখানে এখন মোটর। ভট ভট শব্দ তোলে চোখের পলকেই নৌকা কোথা থেকে এসে যে কোথায় মিলিয়ে যায়, এক আজব কারবার! কত রকমের নৌকা যে আছে এই হাওড়ের বুকে! একেক নৌকার একেক ভাও। সেই নাও দেখে ভাটির গায়েন শাহ আবদুল করিম গান বাঁধেন— মহাজনে বানাইয়াছে ময়ূরপঙ্খী নাও/ সুজন কাণ্ডারি নৌকা সাবধানে চালাও/ বাইচ্ছা বাইচ্ছা পাইক তুলিয়া নাওখানা সাজাও/ ঝোঁক বুঝিয়া ছাড়ো নৌকা/ সুযোগ যদি পাও।
ছইয়ের ভেতর যাত্রীবোঝাই হয়ে আছে— নারী, পুরুষ, শিশু। কেউ যাবে জগন্নাথপুর তো কেউ যাবে রসুলপুর। আমাদের গন্তব্য খালিয়াজুরি, সেখানকার ডাকবাংলোয় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে কৃষ্ণপুর যাব।
নৌকা যত হাওড়ের গভীরে যেতে থাকে, তত বেশি হাওয়া উন্মাতাল হয়ে ওঠে। যত বেশি হাওয়া উন্মাতাল হয়, তত বেশি ঢেউ টালমাটাল হয়ে ওঠে। সে ঢেউয়ের এমনই তোড়, জল তল থেকে ছাপিয়ে উঠে নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে হূিপণ্ড পর্যন্ত আছড়ে পড়ে। কোথা থেকে আসে হাওড়ের এত জল! মূলত বৃষ্টি থেকেই। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জে যত বৃষ্টি হয়, তার পানি এসে নিম্নাঞ্চলে জমে জমে তৈরি হয় হাওড়। পরে নদীর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন পাহাড়ের ঢলের পানি এসে হাওড়কে জাগিয়ে দেয় নতুনভাবে। সারা বর্ষাকাল হাওড় একটা সামুদ্রিক আবহ তৈরি করে পানির ঘেরে বেঁধে রাখে লাখো মানুষের জীবন। যুগের পর যুগ এ আবহে হাওড়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভিন্ন এক সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা। উদাসী হাওয়ার বৈরাগ্যের টানে এ হাওড় প্রান্তরে জন্ম হয়েছে সৈয়দ শাহনুর, শীতালাং শাহ, দুর্বিন শাহ, রশিদউদ্দিন, জালালউদ্দিন, উকিল মুন্সি, শাহ আবদুল করিমের মতো আরো কত নাম না জানা শিল্পীর।
নেত্রকোনার এ হাওড়ের ব্যাপ্তি গিয়ে মিশেছে সুনামগঞ্জের বিশাল অঞ্চলের সঙ্গে। এখান থেকে সরাসরি নৌকা নিয়ে চলে যাওয়া যায় সুনামগঞ্জের যেকোনো প্রান্তে, পাহাড়ঘেরা শ্যামলিমা তাহিরপুরের টেকেরঘাট। ভারতীয় সীমানার পাহাড়গুলোর কারণে যেখানে হাওড়ের প্রকৃতি আরো নয়নাভিরাম হয়ে উঠেছে। বড়ই বিচিত্র হাওড়ের প্রকৃতি, আমরা জগন্নাথপুর যেতে না যেতেই আকাশের বিশাল এক প্রান্ত কালো মেঘে ভরে উঠল। হাওড়ের বৃষ্টি হলো সেই অনাগত অতিথির মতো, যে সময় বুঝে না অসময় বুঝে না, হুট করেই বিনা নোটিসে বাড়িতে এসে হাজির হয়; তার পর বিছানা-বালিশে এমনভাবে গেড়ে বসে যে, একদিন যায় দু’দিন যায়, ফেরার কোনো লক্ষণ নেই; বোঝেও না যে, আদর দিন দিন কমে যাচ্ছে। প্রথম দিন তো খুব মোরগ-পোলাও হলো, তার পর দু-তিনটা দিন চলল মাছ-ভাত; চার-পাঁচদিন পর বাড়ির কর্তা গিন্নিকে পরামর্শ দিলেন, আলু ভর্তা করে রাখো। সেই আলু ভর্তা খেয়েই তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলে বলতে থাকে— অমৃত! অমৃত! একদিন-দুদিন-তিনদিন-চারদিন একটানা বৃষ্টি চলছে তো চলছেই। থামার আর নাম নেই। আর যত বৃষ্টি হচ্ছে, ভরাট হচ্ছে হাওড়ের যৌবন। পানি ছাপিয়ে ছাপিয়ে উঠে যাচ্ছে গুচ্ছগ্রামগুলোর পা থেকে হাঁটু পর্যন্ত। আর ঘরবন্দি মানুষগুলোর সময় কাটছে ঘরে বসে বসে অথবা এ-বাড়ি ও-বাড়ির মানুষগুলোর সঙ্গে গল্পসল্প আর গানবাজনার মাধ্যমে! আমাদের ভাগ্য ভালো যে, বৃষ্টি আর শেষ পর্যন্ত নামল না। কালো মেঘদল আমাদের দিকে কিছুক্ষণ উঁকিঝুঁকি মেরে, ‘না থাকগে আরেক দিন আসব’— এমন একটা ভাব নিয়ে গা মুচড়ে মুহূর্তেই ব্যাক টু দ্য প্যাভিলিয়ান— আকাশের কোন গভীরে হারিয়ে যায়।
৩.
বেলা ১১টার মধ্যেই পৌঁছানো গেল খালিয়াজুরি। এটি উপজেলা শহর। চারদিক পানিবেষ্টিত হলে কী হবে ভেতরে দেখলাম লেগুনার আনাগোনা। এক প্রান্তের ঘাট থেকে লেগুনায় আমরা অন্য প্রান্তে পৌঁছলাম। এখানেই রয়েছে সরকারি ডাকবাংলো। ডাকবাংলোসংলগ্ন হাওড়ের পথটি অনন্যসুন্দর। একপাশে হাওড়ের পানি এসে বারবার চুমু খাচ্ছে পথটিতে, অন্যপাশে বড় বড় গাছ মাতৃছায়ার মতো মুগ্ধতা বুনে চলেছে। জোছনারাতে নাকি আরো অপার্থিব সৌন্দর্য তৈরি করে এ পথ। সারা রাত যেখানে হেঁটে-বসে বিচরণ করা যায়। মাঝে মধ্যেই বসার জন্য সিমেন্টের বেঞ্চি তৈরি করা হয়েছে। আমরা খালিয়াজুরিতে এসে উপস্থিত হয়েছি ওর এক ভীষণ কষ্টের দিনে। খালিয়াজুরি উপজেলায় আজ একটি স্কুল ও কলেজকে সরকারীকরণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। স্কুল ও কলেজের কোনো একটিও পায়নি খালিয়াজুরি। স্কুল সরকারীকরণ করা হয়েছে শালদিঘী গ্রামের আর কলেজ সরকারীকরণ করা হয়েছে কৃষ্ণপুরের। খালিয়াজুরির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েরা বিক্ষোভে নেমে এসেছে পথে। তারা স্লোগানে স্লোগানে আওয়াজ তুলছে— খালিয়াজুরির কোনো একটি স্কুল বা কলেজকে সরকারীকরণ করতে হবে। বিক্ষুব্ধ শুধু যে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা তাই না, দোকানে বসে থাকা, পথে হেঁটে যাওয়া প্রতিটি মানুষের মনে ক্ষোভ— কেন উপজেলা শহরকে বাদ দিয়ে অন্য গ্রামের স্কুল ও কলেজকে সরকারীকরণ করা হলো! প্রতিটি মানুষ যেন তাদের দাবিতে এক হয়ে উঠেছে।
৪.
খালিয়াজুরির ডাকবাংলোয় ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে হাওড়ের পারের ঘন বৃক্ষের ছায়াবেষ্টিত পথে কিছুক্ষণ উদ্দেশ্যহীন হাঁটাফেরা করে আমরা আমাদের মূল গন্তব্য কৃষ্ণপুরের উদ্দেশে নৌকায় উঠে বসলাম। যাত্রী মাত্র দুজন হওয়ায় এবার নৌকা নিতে হলো রিজার্ভ। ঘণ্টা দেড়েকের জন্য দিতে হবে ৫০০ টাকা। খালিয়াজুরি থেকে কৃষ্ণপুরের হাওড়ের পথের ঢেউ আরো বড় আরো বুক ধড়ফড়ানো! নৌকাকে দুলিয়ে দুলিয়ে বারবার টালমাটাল করে দিচ্ছিল। দিগন্তের পর হাওড়ের দিগন্ত ভাঙতে ভাঙতে টের পাচ্ছিলাম, একেক প্রান্তরের ঢেউ একেক রকম। কোনো কোনো ঢেউ সম্রাট মহামতি আকবর হওয়ার অনুভব এনে দিচ্ছিল। এমনভাবে নৌকাটা একটু সামনে গিয়ে ডানে হেলে আবার বামে মোচড় মারছিল যে, মনে হচ্ছিল যেন সম্রাট আকবর হয়ে বসে আছি গজদন্ত পিঠে। আবার কোনো ঢেউ এনে দিচ্ছিল রোলার কোস্টারে দোলার অনুভূতি। প্রবলভাবে একবার ডানে নামছে আবার বামে নামছে। পয়সা পুরো উসুল। এমন রোলার কোস্টারের দোল খাওয়ার জন্য ফ্যান্টাসি কিংডমে দুজনকে অন্তত ৫০০ টাকা খরচ করতে হতো। আবার ঢেউগুলো তৈরি করছিল বিভিন্ন ইমেজ। ঘোড়ার পর ঘোড়া একসঙ্গে ছুটে চলেছে যুদ্ধের ময়দানে। ঢেউ উঠছে নামছে— যেন সৈন্যদের মস্তক আর ঘোড়ার মুখের ওঠানামা— কোনো ক্ল্যাসিক ফিল্মের দৃশ্য! নাহ! মোটেও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠেনি নৌকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই বসে থাকা। আর হাওড়ের হাওয়ার সুরের গুনগুনানি তো ছিলই— কে যাস রে ভাটি গাঙ বাইয়া...আমার ভাইধন রে কইয়ো, নাইওর নিতো বইলা...তোরা কে যাস কে যাস! তখন তো নৌকায় যেতে যেতে চোখ চঞ্চল হয়ে ওঠারই কথা— কোনো গ্রামের কোনো উঠোনে কোনো নারীর নাকছাবি ছাপিয়ে উদাস করুণ চোখ দেখা যায় কিনা কিংবা নড়ে ওঠে কিনা কোনো ঘাটের কিনারায় কারোর শাড়ির আঁচল!
দূর থেকে দেখেই মনে হচ্ছিল কৃষ্ণপুর গ্রামটার মধ্যে অসাধারণত্বের কী জানি কিছু একটা রয়েছে! ঘাটটা বেশ জমকালো, বেশ কয়েকটি বড় নৌকা, স্টিমার পাশাপাশি গায়ে গা ঠুকে দাঁড়ানো, টানে তিন-চারটে দোকানের পাকা বিল্ডিং আভাস নিয়ে এসেছে শাহরিক মেজাজ। এ ঘাটটায় ভিড় বলে আমাদের নামিয়ে দেয়া হয় একটু দূরের এক ছায়াশীতল ঘাটে। ঘাটে রাজহাঁসের দল মাথা উঁচিয়ে দুলিয়ে যেন আমাদেরকেই স্বাগত জানাল। যাকে বলে একেবারে রাজসিক একটা ভাব! গ্রাম হয়েও কৃষ্ণপুর ঠিক যেন গ্রাম নয়। আমরা ডাকবাংলোর দিকে যেতে যেতে লক্ষ করি, পথের দু’পাশে দোকান, হোটেল, চা-স্টল। আর পথে মানুষের ভিড়। নানা বয়সী মানুষ হাঁটছে, দাঁড়িয়ে-বসে গল্প করছে। সবার মধ্যেই উত্সব ও আনন্দের ছায়া। আরেকটু পথ এগোতেই মাইক থেকে ভেসে এল গান। আনন্দের গান। এমন উত্সব-মুখরতার কারণ কী! জানা গেল কৃষ্ণপুর হাজী আলী আকবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে আজ সরকারীকরণের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সে কারণেই কৃষ্ণপুরের ঘরে ঘরে আনন্দ। আজ ঈদ। সারা কৃষ্ণপুরে যেন ঘটেছে নতুন প্রাণের সঞ্চার। এ কলেজটি সরকারীকরণের ফলে কৃষ্ণপুরের অর্থনৈতিক জগতেও এসেছে সম্ভাবনার নতুন জোয়ার। ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য কলেজের আলাদা হোস্টেল থাকলেও ছেলেমেয়েরা নিজেদের মতো বাড়িভাড়া নিয়ে থাকতে পছন্দ করে। তাছাড়া নানা কারণে লোকজনের আসা-যাওয়াও বেড়ে যাবে। তাই বাড়িভাড়া দিয়ে আয়ের একটা পথ তৈরি হলো। দোকানে বিক্রিবাট্টা বেড়ে যাবে, হোটেল দিলেও চলবে খুব। এ কলেজটি ছাড়াও কৃষ্ণপুরে রয়েছে কিন্ডারগার্টেন, মহিলা স্কুল, উচ্চ বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা। যেতে যেতে গ্রামের শেষপ্রান্তে যাই। রাস্তার একপাশে হাজী আকবর আলী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, আরেক পাশে আমাদের সেই ডাকবাংলো। আরেক পাশে বললে ভুল হবে, হাওড়ের পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে ডাকবাংলোটি। একটা লম্বা সিঁড়ি দিয়ে গ্রামের সঙ্গে তার সংযুক্তি। তিন পাশ ভরা পানি, তার মধ্যে দোতলা এ ডাকবাংলো। সারাক্ষণই ঢেউয়ের গান বাজে! যেদিকেই চোখ যায় হাওড়ের জলে চোখ ভিজে যায়, অন্তর ধোয়া হয়। ছাদে রোদ-ছায়া-আলো-হাওয়ার অর্কেস্টা বেজেই চলেছে অবিরাম।
ডাকবাংলো এতটাই জাদুকাড়া যে, সেখান থেকে বেরুতে মন চায় না! তবু বেরুতেই হয়। পেট ক্ষুধায় চো চো করছিল। বেলা তো আর কম হয়নি! ঘড়ির কাঁটা কখন ২টা পেরিয়ে গেছে। তাছাড়া গ্রামটা ঘুরে ঘুরে দেখার প্রবল ইচ্ছাও তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। খাবার খুঁজতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হলো। এতগুলো হোটেল, চা-স্টল কিন্তু কোথাও ভাত বা রুটির ব্যবস্থা নেই। শিঙ্গাড়া, পুরি, মিষ্টির সমাহার। কলেজের একজন শিক্ষক ভাই ভাই হোটেলের সন্ধান দিলেন। কলেজেরই দারোয়ান আর তার স্ত্রী মিলে ঘরোয়াভাবে চালায় এ হোটেল। কিন্তু খাবার খেতে গিয়ে মন খারাপ হয়ে যায় যখন একটা চার কি পাঁচ বছরের ছেলে এসে খাবার সার্ভ করে। ও এসে টেবিল মোছে, ভাত এনে দেয়, তরকারি এনে দেয়। পরে খেয়াল করেছি, হাওড় অঞ্চলের শিশুরা নিজের আগ্রহেই কাজেকামে যুক্ত হয়ে পড়ে, মা-বাবারাও উত্সাহ দেয় কাজকর্মে। তাই বলে যে পড়াশোনা করে না তা নয়। এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো জ্বলেছে ভালোভাবেই। সবাই ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠায়। স্কুল তো রয়েছেই, ব্র্যাকও দেখলাম নৌকাকেন্দ্রিক বিদ্যালয় চালু রেখেছে। যাহোক, বোয়াল মাছের ঘণ্ট দিয়ে পেট পুরে ভাত খাওয়া গেল। হাওড়ে এখন মাছ ধরার মৌসুম চলছে। এ বাড়ির গৃহিণীর রান্না এতটাই সুস্বাদু যে আমরা পরদিন দেশী টাটকা মাছ কিনে তাকে রান্নার জন্য দিয়েছিলাম। এত মজা করে মাছ খাওয়া হয়নি অনেক দিন। তবে এই মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে নতুন এক জোতদার শ্রেণীর আবির্ভাব হয়েছে হাওড় অঞ্চলে! সে অনেক কথা!
কৃষ্ণপুরের পথেপ্রান্তে ঘুরতে ঘুরতে আমার ভ্রমণবন্ধু সৈকত খোঁজে পাখি আর আমি খুঁজি বাউল। সারা জীবন শুনে এসেছি হাওড়ের জলমগ্ন উদাস প্রকৃতি সংবেদনশীল মানুষের হূদয়ে জাগিয়ে দেয় বৈরাগ্যের বিহগ, সেই দহনে তারা গান লিখে, গান গায়। কিন্তু হাওড়ের তো আর সেই দিন বা পরিবেশ নেই। কৃষ্ণপুরের ঘরে ঘরে এখন বিদ্যুতের আলো। অনেকের হাতেই স্মার্টফোন। নৌকার মালিক ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেয়— খালিয়াজুরি থেকে কৃষ্ণপুর যাচ্ছি প্রতিদিন। একটা মোবাইল ফোনের দোকানও দেখলাম। সেখানে মোবাইলের সিম থেকে শুরু করে মেমোরি কার্ড, মায় নতুন ডিজাইনের মোবাইল সেটের বিপুল সমাহার! এখানে বৈরাগ্যের বিহগের অবকাশটাই-বা কোথায়! পরিস্থিতি পাল্টানোর কারণেই কিনা, রঙ-বেরঙের পাখিও কমে গেছে। সৈকত বলল, আগে যেসব গাছ ছিল, ঝোপ-জঙ্গল ছিল, সেসব আর নেই— পাখি থাকবে কী করে! পাখি না থাকলে কী হবে, বাউলের সাক্ষাত্ না মিললে কী হবে, হাওড়ের মানুষের সহূদয়তা এখনো আছে। অনেক নবীনের সঙ্গে যেমন কথা হলো, অনেক প্রবীণের সাক্ষাত্ও পেলাম। আজিমউদ্দিন নামের সত্তরোর্ধ্ব একজন মানুষ জানালেন, তাদের আদি বাড়ি নরসিংদী। দাদা ছিলেন খুব শৌখিন মানুষ। খালি দুধ আর মাছ খাওয়ার জন্য চলে এসেছিলেন হাওড়ে। এখানে সব টাটকা টাটকা পাওয়া যায়। তবে আফসোসও আছে খুব। বলেন, নরসিংদীতে আমাদের জমি আছে। শরিকরা খায়। কি যে দাম হয়েছে সেই জমির! সবাই বড়লোক হয়ে গেছে! কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। নিজের হিস্যার জমি যে চাইব, সংকোচ লাগে! একবার গেছিলাম। চাইতে পারিনি। তার কাছ থেকেই জানলাম, কৃষ্ণপুর কিংবা হাওড়ের মানুষের আয়ের উত্স নৌকা, মাছ মারা এবং ফসল ফলানো। পানি চলে যাওয়ার পরই শুরু হবে ধান বোনার মৌসুম। এখন যেসব জায়গায় শুধু পানি আর পানি, সেসব জায়গায় দেখা যাবে ধানক্ষেতের অন্তহীন সবুজ! তবে অন্যান্য মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুধু ধান কিংবা মাছ মারা বা নৌকা চালানোর ওপর তারা নির্ভরশীল নয়, আজ হাওড়ের মানুষ শিক্ষিত হয়েছে, অনেকেই দূরদূরান্তে চাকরি করে, শহরে গিয়ে উপার্জন করে নানা পন্থায়। বাংলাদেশের আর ১০টি গ্রামের সঙ্গে তেমন পার্থক্য নেই।
নরসিংদী থেকে শুধু আজিমউদ্দিনই কৃষ্ণপুরে এসে নতুন বসতি গড়েননি, আরো অনেক পরিবারই এসেছে সেখান থেকে। তবে এখানে কুমিল্লার মানুষই বেশি। কুমিল্লায় নিজের ভিটাবাড়ি রেখে এখানে এসেছিলেন একটু ভালোভাবে বাঁচার স্বপ্ন নিয়েই। এখনো তারা সেই স্বপ্নের পেছনেই ছুটছেন।
অনেক রাত অবধি আমরা— আমি আর সৈকত ডাকবাংলোর বিশাল ছাদটায় বসে থাকি। হাওড়ের লিলুয়া বাতাসে কি যে সুখের রোমাঞ্চ! জলের গান আছড়ে আছড়ে ভেঙে পড়ছে আমাদের হূদয়ে। চাঁদের আর দেখা পেলাম না। হাওড়ের প্রকৃতি বড় বিচিত্র। সারাক্ষণই আকাশ মেঘে ঢেকে থাকল। উল্টো লাঠিচার্জের মতো একসময় শুরু হলো গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। শেষ পর্যন্ত জোছনার অপেক্ষায় বসে থাকাটাই অসম্ভব হয়ে উঠল!





