মোহনদাস গান্ধীর অস্বাভাবিক যৌন জীবনের কথা মোটেই কোনো গোপন বিষয় নয়। তিনি যৌনতা নিয়ে হরহামেশাই কথা বলেছেন। এবং তার অনুসারীরা কীভাবে কৌমার্য বজায় রাখতে পারেন তা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অবশ্য তার এসব মতামত সবসময় গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। যেমন নতুন দম্পতিদের আত্মার শুদ্ধতার জন্য গান্ধী তাদের যৌন সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েছেন। তার এই পরামর্শকে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহরু ‘অস্বাভাবিক এবং প্রকৃতি বিরুদ্ধ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
গান্ধীর বিশ্বাস, ধর্ম প্রচার এবং তার অস্বাভাবিক ব্যক্তিগত চর্চায় (যার মধ্যে আছে তার বিখ্যাত কৌমার্য, তরুণীদের সঙ্গে নগ্ন হয়ে ঘুমানো, নগ্ন নারীদের উপস্থিতিতে নিজের সংযম পরীক্ষা) কৌমার্যের যে অনুশীলন, তা কী ধর্মনিষ্ঠ প্রেরণা নাকি তার চেয়ে অনেক জটিল কোনো বিষয়? গান্ধীকে নিয়ে আমার নতুন বই লিখতে গবেষণা করার সময় তার পুরো রচনাবলি এবং প্রত্যক্ষ বিবরণসংবলিত মোটা মোটা দলিল ঘেঁটেছি। তার পর আমার কাছে অনেক বেশি অদ্ভুত এক যৌন জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
এসব উপাদানের বেশির ভাগই গান্ধীর জীবদ্দশায় উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু তার মৃত্যুর পর তাকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে তুলে ধরার সময় এসব তথ্য বিকৃত বা চাপা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মহাত্মা গান্ধী কি প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাপূর্ব ভারতীয় রাজ্য তাভানকোরের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সম্বোধিত ‘সবচেয়ে ভয়ানক, আধা-অবদমিত যৌন উন্মাদ’ ছিলেন?
গান্ধীর জন্ম ভারতের গুজরাটে। ১৮৮৩ সালে ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। তার স্ত্রী কস্তুরবার বয়স ছিল ১৪, সেসময়কার গুজরাটের সংস্কৃতি অনুসারে তার বয়স উপযুক্ত ছিল। দুজনের যৌন জীবন স্বাভাবিক ছিল এবং শিগগিরই কস্তুরবা গর্ভবতী হয়ে পড়েন।
দুই বছর পর তার পিতা যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তিনি কস্তুরবার সঙ্গে মিলিত হতে ব্যস্ত ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তার মৃত্যুশয্যায় উপস্থিত থাকতে না পারায় গান্ধী একই সঙ্গে দুঃখ ও পাপবোধের মিলিত যন্ত্রণায় ভোগা শুরু করেন। তিনি তার এই ‘কামুক প্রেম’কেই তার পিতার মৃত্যুর কারণ বলে মনে করতে শুরু করেন।
যাহোক, গান্ধী ও কস্তুরবা দম্পতির সর্বশেষ সন্তান জন্মেছিল আরো ১৫ বছর পর ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে।
প্রকৃতপক্ষে, নিজের বয়স ৩০ হওয়ার আগে গান্ধীর মধ্যে যৌনতার (বৈবাহিক যৌনতা নয়) প্রতি নিষেধাজ্ঞামূলক মনোভাব তৈরি হয়নি। সে সময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যুদ্ধে তাদের পক্ষে অ্যাম্বুলেন্স কর্পসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। বোয়ার যুদ্ধ এবং জুলুদের বিদ্রোহের সময় গান্ধীর চিন্তা ছিল কী করে তিনি মানবতাকে ‘সেবা’ দিতে পারেন এবং তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, এজন্য মানুষকে দরিদ্রতা ও কৌমার্যকে গ্রহণ করতে হবে।
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ৩৮ বছর বয়সে তিনি ব্রহ্মচর্যার শপথ নেন। অর্থাত্ তিনি আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করবেন এবং এ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশই হচ্ছে যৌনতা থেকে দূরে থাকা। হিন্দুদের কাছে কৌমার্য ব্যতীত আধ্যাত্মিক জীবনযাপন একেবারে অসম্ভব। দরিদ্রতাকে গান্ধী সহজেই আপন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় যৌনতা থেকে দূরে থাকতে। তিনি কিছু জটিল নিয়ম তৈরি করেন, যার মাধ্যমে যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলাপ, চিঠি এবং আচরণের পরও তিনি নিজেকে সংযত হিসেবে দাবি করতে পারেন। ব্রহ্মচর্যার শপথ নেয়ার এক বছরের মাথায় তিনি তার পত্রিকা ‘ইন্ডিয়ান অপিনিয়ন’-এর পাঠকদের উদ্দেশে বলেন, বিয়ে না করা চিন্তাশীল যেকোনো ভারতীয়র কর্তব্য। আর যদি একান্তই বিয়ে করতে হয়, তাহলে স্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন থেকে বিরত থাকা উচিত।
এর মধ্যে গান্ধী সংযমের নির্দিষ্ট পথ আছে। তিনি আশ্রম স্থাপন করলেন এবং সেখানে যৌনতা নিয়ে তার প্রথম ‘নিরীক্ষা’ শুরু করলেন। বালক, বালিকাদের একসঙ্গে গোসল করা এবং ঘুমাতে দেয়া হলো, তবে অবশ্যই যেকোনো যৌন আকাঙ্ক্ষাকে আশ্রয় দেয়া চলবে না। যৌনালাপের জন্য শাস্তির বিধান ছিল। নারী ও পুরুষদের পৃথক করে রাখা হয়। গান্ধীর পরামর্শ ছিল স্বামীদের তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে একা থাকা উচিত নয়। আর যদি স্বামীরা যৌনকাঙ্ক্ষা অনুভব করেন, তাহলে তাদের শীতল পানিতে গোসল করে নেয়া উচিত।
তবে এসব নিয়ম তার নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। সুশীলা নায়ার ছিলেন গান্ধীর ব্যক্তিগত সচিবের বোন। সুশীলা যথেষ্ট আকর্ষণীয় ছিলেন। সুশীলা একেবারে কিশোর বয়স থেকেই গান্ধীর সঙ্গে ছিলেন। তিনি প্রায়ই গান্ধীর সঙ্গে গোসল করতেন এবং ঘুমাতেন। এ বিষয়ে গান্ধীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, এসব ক্ষেত্রে শ্লীলতার সীমা কখনই লঙ্ঘন হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘সে যখন গোসল করত, তখন আমি শক্ত করে আমার চোখ বন্ধ করে রাখতাম। আমি জানি না সে নগ্ন হয়ে নাকি অন্তর্বাস পরে গোসল করত। শব্দ থেকে আমি বলতে পারি যে সে সাবান ব্যবহার করত।’ গান্ধীর ব্যক্তিগত এসব সেবা তার পক্ষপাতিত্বের লক্ষণ এবং এটা আশ্রমে অন্যদের মধ্যে হিংসার জন্ম দেয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে (এবং তার স্ত্রী কস্তুরবার মৃত্যুর পর) গান্ধীর পাশে আরো অনেক নারীর ভিড় জমে। তিনি তাদেরকে তার সঙ্গে ঘুমাতে বাধ্য করতেন, যদিও আশ্রমের নিয়ম অনুসারে তারা তাদের স্বামীর সঙ্গে শোয়ার অনুমতি পেতেন না। গান্ধীর বিছানায় নারীরা শুতেন, এটা ছিল তার ‘নিরীক্ষা’র অংশ। কিন্তু তার চিঠি পড়লে মনে হবে এটা ছিল নগ্নতা বা স্পর্শহীন যৌনতা। গান্ধীর চিঠির অনেক স্পষ্ট বয়ান ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু যা অক্ষত আছে, সেখানে গান্ধীর লেখায় আছে: ‘আমার সঙ্গে বিনার ঘুমানোর বিষয়টিকে একটা দুর্ঘটনা বলা যায়। বলা যায় সে আমার খুব কাছেই ঘুমিয়েছিল।’ তাই কেউ ভেবে নিতে পারেন যে গান্ধীর নিরীক্ষা মানে নিছক তার কাছাকাছি ঘুমানো নয়।
এরই মধ্যে গান্ধীর আধ্যাত্মিক সংযম পরীক্ষার জন্য আরো আকর্ষণীয় নারীর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে সুশীলার বয়স ছিল ৩৩, এবার তার স্থানে জায়গা নিলেন তার অর্ধেক বয়সী আরেক নারী। গান্ধীর বয়স তখন ৭৭।
বাঙলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্ষত প্রশমনে গান্ধীর সফরসঙ্গী হলেন তার ১৮ বছর বয়সী নাতনি মনু। মনুও গান্ধীর সঙ্গে ঘুমাতেন। গান্ধী মনুকে বললেন, ‘আমরা দুজনই মুসলমানদের হাতে খুন হতে পারি। আমাদের শুদ্ধতার অগ্নি পরীক্ষা দিতে হবে, যাতে আমরা নিজেরা নিশ্চিত হতে পারি যে আমরা নিজেদের সবচেয়ে শুদ্ধরূপে উত্সর্গ করতে পারি। এবং এখন আমাদের দুজনের উচিত নগ্ন হয়ে ঘুমানো।’
এসব আচরণের কোনোটাই ব্রহ্মচর্যায় অনুমোদিত নয়। তাই তিনি ব্রহ্মচারীর ধারণা নিয়ে নিজের তৈরি করা মতামত তুলে ধরলেন: ‘ব্রহ্মচারী হচ্ছেন তিনি, যার মনে কখনো কোনো কামনার উদ্রেক হয় না। যিনি সবসময় ঈশ্বরের প্রতি মনোযোগী থাকেন। চেতন বা অচেতন কোনো অবস্থাতেই যার বীর্যপাত হবে না। যিনি কোনো রূপ যৌন উত্তেজনা ব্যতীত সুন্দরী নগ্ন নারীদের সঙ্গে শুয়ে থাকতে পারবেন। ...যিনি প্রতিদিন আরো একটু করে ঈশ্বরের পথে এগিয়ে যাবেন। যার সব কাজই হবে ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের জন্য, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।’ অর্থাত্, দৃশ্যমান কোনো কামনাপূর্ণ উদ্দেশ্য না দেখা যাওয়া পর্যন্ত তিনি নিজের ইচ্ছামতো যা খুশি করতে পারেন। তিনি নিজের ব্যক্তিগত চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কৌমার্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে নিয়েছিলেন।
তার ব্যক্তিগত চর্চার উদ্দেশ্য ছিল আধ্যাত্মিক কিন্তু তিনি তার এ যৌনতার পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাও সেই সময়ে যখন ভারত ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথে এগিয়ে চলেছে স্বাধীনতার দিকে। গান্ধী বলেন যে, তিনি দেশের জন্য যে সত্যিকার সেবা দিচ্ছেন, সেখানে এ ধরনের অনুশীলনের প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু নিজের সততা বা ন্যায্যতা নিয়ে গান্ধী যত দৃঢ় হচ্ছিলেন, ততই তার পরিবারের সদস্য এবং নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদরা তাকে নিয়ে আলোচনা এবং সমালোচনা করছিলেন। তার অনেক কর্মী পদত্যাগ করেন, যার মধ্যে আছেন তার পত্রিকার দুই সম্পাদক। এ দুই সম্পাদক নারীদের সঙ্গে শয়ন নিয়ে গান্ধীর নৈতিক বক্তৃতা ছাপতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তবে গান্ধী এসব আপত্তিকে বরং নিজের পরীক্ষা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে ব্যবহার করলেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি মনুর আমার সঙ্গে ঘুমানো উচিত। কিন্তু এখন যদি আমি তাকে আমার সঙ্গে শুতে না দিই, সেটা কি তাহলে আমার সংযমের দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হবে না?’
১৯৪৭ সালে গান্ধীর সঙ্গে যুক্ত হলেন কানু গান্ধীর অষ্টাদশী স্ত্রী আভা। সে বছরের আগস্ট নাগাদ তিনি মনু ও আভা দুজনকে সঙ্গে নিয়েই ঘুমাতে শুরু করলেন।
১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে যখন গান্ধীকে হত্যা করা হয়, তখন তার পাশে ছিলেন মনু ও আভা। গান্ধীর জীবনের শেষ বছরগুলোয় মনু সবসময় তার সঙ্গে থাকতেন। যদিও পরিবারের সদস্যরা মনুকে সরিয়ে নিতে চেষ্টা করছিলেন। গান্ধী তার পুত্রকে লেখেন: ‘আমি মনুকে বলেছি সে যেন আমার সঙ্গে একই বিছানায় শোয়ার বিষয়টি লেখে।’ কিন্তু এই মহান নেতার ভাবমূর্তির রক্ষকরা তার জীবন থেকে এই বিষয়টি মুছে দিতে আগ্রহী ছিলেন। গান্ধীর পুত্র দেবদাস মনুকে দিল্লি স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিলেন। এ সময় তিনি মনুকে বিষয়গুলো নিয়ে মুখ বন্ধ রাখতে অনুরোধ করেন।
১৯৭০-এর দশকে সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গান্ধীর এ চর্চাকে সুশীলা মহান হিসেবে অভিহিত করেন। ‘যখন নারীদের— মনু, আভার এবং আমার সঙ্গে গান্ধীর সংস্পর্শ নিয়ে মানুষজন প্রশ্ন করা শুরু করে, ততদিনে ব্রহ্মচর্যার পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটার সময় সেগুলোকে ব্রহ্মচর্যার পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে কোনো প্রশ্ন ছিল না।’ অর্থাত্ মনে হয় গান্ধী ইচ্ছামতো জীবন যাপন করেছেন। প্রশ্ন উঠলে তিনি তার পছন্দকে একটি কসমিক ব্যবস্থা হিসেবে তুলে ধরেছেন। অনেক মহান মানুষের মতো গান্ধীও নিজের পছন্দ অনুসারেই নিয়ম তৈরি করে নিয়েছিলেন।
সাধারণত বলা হয় যে, গান্ধী জীবিত থাকাকালে তার যৌনাচারণ তার সুনামকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর বহুদিন তার জীবনের এই দিকটি উপেক্ষা করা হয়েছে। কেবল এখনকার সময়ে বিভিন্ন টুকরো তথ্য জোড়া দিয়ে গান্ধীর নিজের যৌনতার ওপর অতি আত্মবিশ্বাসের একটি সামগ্রিক চিত্র দেখতে পাই। ঘটনাক্রমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সময়ই রাজনীতিবিদরা তাকে পাশে সরিয়ে দিয়েছিলেন। তার যৌন সংযমের নীতি ভারতকে খণ্ডিত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি। কংগ্রেসের নেতারাই ভারতের স্বাধীনতা লাভের শর্তগুলো নিয়ে আপস রফা করেছিলেন।
লেখাটি দি ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত
অনুবাদ: শানজিদ অর্ণব




