বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করছে যে, সর্বস্তরের মানুষের জন্য ন্যায্যমূল্যে দুগ্ধ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নোটিস এবং এতে ভুল ব্যাখ্যার কোনো সুযোগ নেই।১ কয়েকটি স্থান থেকে এই দুগ্ধ সরবরাহ করা হবে যেমন— ইন্দিরা রোড,২ গুলিস্তান,৩ লালমাটিয়া,৪ (পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিচে)।

জনগণকে আবারো জানানো যাচ্ছে যে, সবাইকে পরিচয়পত্র সঙ্গে আনতে হবে, যাতে সঠিক মানুষ এ সুবিধা ভোগ করতে পারে। পরবর্তীতে প্রতিটি পাড়ায়৫ এ ব্যবস্থা নেয়া হবে। দিন ও রাতে এ সেবা প্রদান করা হবে।৬

ধন্যবাদ

ফুটনোটসমূহ:

১) সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে এ প্রবণতা প্রথম লক্ষ করা যায়। মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে কোনো খোঁজখবর ছাড়া। কেউ বলতে পারে না কই গেল কেউ, কোথায় মিলিয়ে গেল, কেন। অতিশয় ভদ্র, বিপন্ন মানুষ থেকে রাগী যুবক অনেকেই হারিয়ে যেতে লাগল। সকাল বেলা বের হলো কোথাও যাওয়ার জন্য, কিন্তু গন্তব্যে কেউ পৌঁছল না। কেন গেল না, তার কোনো কারণ নেই, কোনো হারিয়ে যাওয়ার শব্দ নেই।

ক্রমেই মানুষের মনের ভেতরেও এটা বাসা বাঁধতে লাগল। মা-বাবারা ভুলে যেতে লাগল তাদের সন্তানদের কথা, এমনকি কখনো কখনো তাদের আদৌ কোনো সন্তান ছিল কিনা, সেই কথাটাও। সন্তান যদি ঘরে ফিরতে রাত করে, তখন তারা আশ্চর্য হয়ে পরিচয় জানতে চাইত, দরজা খুলত না। মা... বাবা... ডাক শুনে তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করত। এত রাতে কে ডাকে... কাকে ডাকে... কেন ডাকে? মা-বাবা ছুটে গিয়ে অনেক দিন ঘরে না ফেরা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ‘তুই আর বাড়ি ফিরবি না।’ সেই ছেলে তখন বিহ্বল, আতঙ্কগ্রস্ত, কেবল শুধায়, ‘বাড়ি, ঘর, মা-বাবা... আপনারা কারা?’ কথা বাড়ে না, আবার সবাই জনারণ্যে মিলিয়ে যায়। যারা এই দৃশ্য দেখে, তারা জিজ্ঞাসা করে না কারণ তারাও হয়তো কাউকে চেনে না।

রাস্তার মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে যাদের কোনো ঘর নেই, যারা ভুলে গেছে কোথায় তাদের ঘর। পথে পথে ঘোরে। পকেটে যে কটা টাকা আছে, সেসব দিয়ে ছোলা ভাজা, শর্ষে-নারকেল, ঝালমুড়ি খেয়ে জীবন ধারণ করে। যখন সব শেষ হয়ে যায়, তখন ফুটপাতে বসে পড়ে। নোংরায়-ধুলায় ঘুমায়, জানে না কই যাবে, কেন যাবে, কীভাবে যাবে। মানুষ দয়া করে, ওদের হাতে পয়সা দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে চেহারায় চেনা কেউ কিনা সন্ধান করে। এক সময় সরকার এটা নিয়ে চিন্তা করে কিন্তু অনেক সরকারি কাজের মতো এটাও তারা ভুলে যায়।

সাধারণ মানুষ অবশ্য এটা ‘ভুলে যাওয়া মানুষের’ সমিতি করে। সবাইকে আহ্বান জানায় তাতে অংশগ্রহণ করার জন্য। অনেকে প্রথম প্রথম আসে কিন্তু কেউ কাউকে চেনে না, নাম ধরে ডাকে না, নিজে বা অন্যরা বিব্রত হওয়ার আশঙ্কায়। অনেক সময় জড়িত হওয়ার পর নিজের নাম বা ইতিহাস জানার চেষ্টা করে। ‘তুমি কি আমার সন্তান? আপনি কি আমার বাবা?’ ক্রমে মানুষ যত বেশি ভুলতে থাকে এই সমিতির সভায় সমাগম তত কমতে থাকে, এক সময় এই সমিতির ঠিকানা মানুষ ভুলে যায়, আবার এ রকম কোনো সমিতি ছিল সেটির কথা। শেষ পর্যন্ত পিয়নটা তালা মেরে চলে গিয়ে ফিরতে ভুলে যায়। আর কেউ এর খোঁজ নেয়নি কোনো দিন, তারা, যাদের কিছু মনে পড়ে না।

২) ইন্দিরা রোড

শহরের মাঝখানে এ রাস্তার নামকরণ হয় ইন্দিরা দেবী নামের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় তাপসী মহিলার নামে। তিনি সারা জীবন ধর্ম চর্চায় সময় কাটান এবং ভক্তদের দয়া দাক্ষিণ্যে চলতেন। একদিন হঠাত্ লক্ষ করলেন যে, অনেকের দান করা ধাতুর মুদ্রা তার হাতের মধ্যে কাগজের বড় বড় নোটে পরিণত হতে থাকে। এ খবর পাওয়ায় পর হাজার হাজার মানুষ তার কাছে ছুটে আসতে থাকে তাদের মুদ্রাসমূহ নিয়ে। কিন্তু সব ক্ষেত্রে সেসব মুদ্রা টাকায় বনে না, মুদ্রাই রয়ে যায়। সেই মহীয়সী নারীও জানতেন না কেন এমনটা হয়। বহু মানুষ আসত তার কাছে হাতভর্তি, ব্যাগভর্তি, বস্তাভর্তি মুদ্রা নিয়ে। তিনি অসহায়ের মতো ওদের ছুঁয়ে বসে থাকতেন, কখনো কাজ হতো, কখনো হতো না। তিনি এই অদ্ভুত অনিশ্চিতির কোনো দিশা পেতেন না, মাঝে মধ্যে সন্ধ্যায় যখন আজান শোনা যেত মসজিদ থেকে, যেখানে অসহায়, সহায় মানুষজন যেত, তিনি কাঁদতেন। কেউ তার কান্নায় সায় দেয়নি, অস্থির হয়েছে কারণ তার ক্রন্দন ছিল অবুঝ, তাদের অবস্থা ছিল হতাশায় ভরা। যেদিন তিনি মারা গেলেন, সেদিন আকাশে চাঁদ ছিল না, মেঘ ছিল, বৃষ্টি ছিল। দীর্ঘক্ষণ আষাঢ়ের ক্রমাগত গ্রীষ্মের আবহাওয়ায় তিনি চলে যান। শুয়ে ছিলেন মাদুরের ওপর, একসময় মিলিয়ে যান। তার এক হাতে নকশা করা একটি চামচ দিয়ে উপরে ফেলা নিজের চোখ, অন্য হাতে কয়েকটি বাহারি মোহর, যার সোনালি রঙ ওই মৃদু আলোতেও চক চক করতে থাকে।

এর কয়েক দিন পর উনার এক চক্ষু প্রতিমূর্তি দেখা যায় বাড়ির আশেপাশে। এক চোখ যেটা থেকে গড়ায় ফোঁটা ফোঁটা রক্ত, আর অন্য চোখ দিয়ে অশ্রু। কয়েকজন মানুষ জানায় যে, সেই জলের বিন্দু যাদের হাতে পরে সেটা মোহরে পরিণত হয়।

শহরের বহু মানুষ তার মৃত্যুতে আহত হয়। তারা তখন মাজার করার কথা ভাবছে, তখন ঘোড়ায় চড়া কয়েকজন অশ্বারোহী এসে তার অশরীরী রুহকে হত্যা করে সন্ধ্যা আকাশে। আকাশ থেকে মুদ্রা আর অশ্রুর নহর বয় সারা দিন। কিন্তু যারা সেসব হাতড়ে তোলে, সেসব মিলিয়ে যায়। পরে কিছু ভক্ত একটি মাজার করে কিন্তু তার এই সব স্মৃতি হারিয়ে যেতে থাকে এবং ক্রমেই মানুষ ভুলেই যায় কেন তারা এখানে আসে জিয়ারত করতে। কিন্তু মানুষ আসে কোনো কিছুর টানে কেউ বলতে পারে না ভালভাবে। একদিন এই শহরের সব এক চক্ষু মানুষ কেন সমবেত হলো, সেটাও কেউ বলতে পারে না। তবে এর পর মানুষের ভিড় থামেনি।

৩) গুলিস্তান

কবে থেকে এই গণহারে খুন শুরু হলো, তার এমন কোনো তারিখ পাওয়া যায় না, তবে সবাই বলে এটা সবসময় ছিল। কিন্তু ইদানীং বেড়ে গেছে। ফলে অনেক মানুষ এতে অংশগ্রহণ করতে পারছে। সবার না হলেও অনেকের হাতে রক্ত। এর সঙ্গে কীসের যোগাযোগ বলা যাচ্ছে না নিশ্চিত করে যুদ্ধ পরবর্তী শহরে আনন্দ-বিনোদন কম হওয়া নতুন কিছু নয়।

সিনেমার হলওলার আকাল পড়ে। নতুন কোনো ছবি দেখাতে পারে না। একজন উত্তম কুমারের একটা পুরনো ছবি সংগ্রহ করে কিন্তু দেখার পর সবাই ক্ষেপে যায়। তাদের চোখে যে রঙের আগ্রহ, তা এই মেন্দা মার্কা নায়ক দেখে কারো সাধ মেটে না। তারা প্রতিবাদী মিছিল বের করে যাতে তারা গোটা গুলিস্তান এলাকা প্রদক্ষিণ করে রক্তের দাবিতে কিন্তু রক্ত রঙ মেলে না। একজন চীনা বাদামওয়ালা কোন দিকে না তাকিয়ে ছোট ছোট কাগজের ঠোঙায় আটআনা এক টাকায় বাদাম ভরছিল রাস্তার পাশে। শেষ পর্যন্ত তাকে সবাই মিলে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তার পর বালকটি উচ্ছিষ্ট বাদাম মুখে দিয়ে উত্তম কুমারের বিব্রতকর অভিজ্ঞতা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালায়।

৪) রক্তমৃত্তিকা

তাকে সে এই নামে ডেকেছিল যুদ্ধে যাওয়ার আগে, নীরবে-নিভৃতে। খুব ভোর বেলা যখন বকুল ফুল সংগ্রহ করতে আসত তাদের বাগানে সে ও তার ভাই, পেটের কৃমির ওষুধের জন্য, তাকে সে দেখেছিল। মেয়েটিকে হাত ধরে তার ভাই গাছের নিচে পড়ে থাকা ফুল তুলে হাতে দিত, নাম নিত— জবা, বকুল, গন্ধরাজ— যাতে মেয়েটি নিজের গালে ঘষে ওইসব বিচিত্র নাম জানতে-শিখতে পারে। সে মেয়েটির ভাইয়ের সঙ্গে ফুল কুড়িয়ে দিয়েছিল, বলছিল এই বাড়ির মাটির রঙ লাল, রক্তমৃত্তিকা মেয়েটি কিছু উত্তর দেয়নি কেবল তার দিকে অন্ধ চোখ দুটি দিয়ে তাকিয়ে ছিল, যাতে কোনো চেনার সুযোগ নেই।

কয়দিন পর মেয়েটির আত্মহত্যার খবর জানা যায়। সবাই বলে মেয়েটি উন্মাদ ছিল কেবল ভোর বেলা কয়েক ঘণ্টার জন্য তার মুক্তি হতো। তখন সে ফুল কুড়াতে যেত, বাকিটা সময় সে থাকত তালাবদ্ধ ঘরে। কোনো এক ভোরে যখন সে সব বুঝতে পারল, তখন সে আত্মহত্যা করে।

৫) পাড়া

পাড়ার মধ্যে আক্রমণ হলে তারা পালিয়ে যায় কিন্তু পানির মিস্ত্রিটা পালায়নি, কারণ তার জানা ছিল না সে কোনো দোষ করেছে কিনা। তাকে ধরে ফেলে দুই দলের মাঝখানে রেখে তারা কয়েকজন গোল হয়ে দাঁড়ায়। তাকে স্বীকার করতে বলে কিন্তু যেহেতু সে জানে না, তার কি দোষ, তাই সে নীরব থাকে। তারা তাকে দলের মাঝ থেকে মুক্তি দেয়। পালাতে বলে, সে নড়ে না। তার চোখের দিকে সে তাকায়। অন্ধকারে কোনো ভয়, লজ্জা, অপমান কিছুই নেই...

৬) রাতের বেলা

তৃতীয় রাত তার নিদ্রা অসমাপ্ত রয়ে গেল নিশিদের ডাকাডাকিতে। সে জানালা বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে কিন্তু সম্ভব হয় না। কারণ যারা রাতে আসে, তাদের জন্য দিন-রাত সমান, দেয়াল, ছায়া সমান, তারা আসে নীরবতা ভাঙতে। সে কয়েক দিন নেমে গেছে। তাতে একটি টুকরি যাতে মরা পোকমাকড় আর দু-একটি পাখির লাশ সে উঠিয়ে রাখে। তারা দরজায় কড়া নাড়ে, ডাকে নাম ধরে। সে উত্তর দেয় না। যাদের রাতে আসার স্বভাব, ডাকার অভ্যাস, তাদের উত্তর দিতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু দরজায় আওয়াজ করতেই থাকে, ‘হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার’ বলে ডেকে ওঠে।

সে রাত প্রহরীর কাছে বিচার দেয়ার চেষ্টা করে কারণ রাতে প্রহরী পাল্টায়। তারা পাড়ার নাম জিজ্ঞাসা করে, তার নাম জানতে চায়। সে জানে যারা ভুলে যায়, তারা অনেকেই প্রহরী হয়, রাতের বেলা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আলস্যভরে গেলাস গেলাস দুধ খাওয়ার ইচ্ছা জানায় বাড়ির মেয়েদের কাছে।

যারা ঘণ্টা বাজিয়ে প্রহর জানায় তারা নীরব থাকে, তবু তারা কেউ কেউ তার দিকে বেদনাভরা চোখে তাকায়। কারণ তাদের মতো সেও অনিদ্রিত, অসহায়।

সে নেমে এসেছিল ছায়া নিস্তব্ধের কাছে, যারা তাকে দেখে নীরব হয়ে যায়, যাদের স্মৃতির ভারে ঘুম আসে না, যারা মানুষের ‘আহার, আহার’ ধ্বনি না শুনে আকাশের দিকে বৃষ্টি আর বল্লমের বর চায়। সে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাদের উন্মাদ চোহারায় কোনো ক্ষোভ নেই, কোনো লজ্জা নেই, ভয়-ভাবনা কিচ্ছু নেই, কেবল পরিত্রাণের তাবিজ খোঁজে চোখে। সে কিছু দেখে না, যাদের পদযুগল মাটিতে পড়ে না, যাদের চোখে ছায়ার অনুসন্ধান নেই। তাদের কথা অস্ফুট, তাকে দেখে অপ্রস্তুত কেবল ওই অকাল রাতের বড় বড় সারস আর ধনেশ পাখিদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজে তাদের ইচ্ছাগুলো মিলিয়ে যায়।