বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ প্রতিপাদ্যের গুরুত্ব কতটুকু? হৃদরোগের বর্তমান ঝুঁকি ও প্রবণতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস আ বিট’, অর্থাৎ হার্টের বিট ঠিক রাখতে হলে প্রথমেই হার্টকে সুস্থ রাখতে হবে। আর হার্ট কেন অসুস্থ হচ্ছে, সেটি আগে জানতে হবে। স্বাভাবিকভাবে হার্ট অসুস্থ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু যখন নানা ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব হার্টের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে, তখন হার্ট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন উপসর্গের মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়। কারো ক্ষেত্রে বুকব্যথা, কারো শ্বাসকষ্ট, কারো হার্ট ফেইলিউর, আবার কারো ক্ষেত্রে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন বা হঠাৎ মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

স্বাধীনতার পর নগরায়ণ বেড়েছে, মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসেছে, জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এর সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, পরিবেশ ও মানসিক চাপের ধরন।

এসব কারণে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা ও রক্তনালিতে প্রদাহের মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে রক্তনালিতে চর্বি জমে ব্লক তৈরি হচ্ছে। তাই ‘ডোন্ট মিস আ বিট’ শুধু হার্টের স্পন্দন নিয়ে নয়; হার্টকে সুস্থ রাখার জন্য আমাদের পুরো জীবনযাত্রার দিকে নজর দেয়ার একটি বার্তাও।

বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণগুলো কী?

এর মূল কারণ আমাদের পরিবর্তিত জীবনযাপন। আগে শিশুরা মাঠে খেলত, সাঁতার কাটত, শারীরিক পরিশ্রম করত। এখন অনেক শিশুর জীবন ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল বা স্ক্রিনে সময় কাটাচ্ছে, শারীরিক পরিশ্রম কমে গেছে। আর তরুণ বয়সে হার্ট অ্যাটাক হলে অনেক সময় প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া ‘কোল্যাটারাল’ বা বিকল্প রক্তনালির নেটওয়ার্ক যথেষ্ট থাকে না। ফলে হার্ট অ্যাটাক অনেক বেশি গুরুতর হতে পারে, এমনকি হঠাৎ মৃত্যুও হতে পারে।

হৃদরোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ? কত বছর বয়স থেকে এ ধরনের পরীক্ষা করা উচিত?

স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু পরীক্ষা করলেই হবে না, পরীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আগে আমরা ৩০-৪০ বছর বয়সের পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার কথা বলতাম। এখন আমরা বলি, ৩০ বছর বয়স থেকে ছেলেমেয়ে সবারই নিয়মিত রুটিন চেকআপ করা উচিত। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরলসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পরীক্ষা করা দরকার।

এর পাশাপাশি কিছু বংশগত রোগের ক্ষেত্রেও স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ। যেমন থ্যালাসেমিয়া। কেউ ক্যারিয়ার কিনা, সেটি আগে জানা গেলে ভবিষ্যতে বিয়ের ক্ষেত্রে তার সঙ্গীকেও স্ক্রিনিং করার পরামর্শ দেয়া যায়। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মে জটিলতা কমানো সম্ভব।

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে বলা হয় ‘সময়ই জীবন’। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত রোগী ও পরিবারের সদস্যদের কী করণীয়?

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যে রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে। কারণ হার্ট রক্ত পাম্প করতে না পারলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হয়।

তাই বুকব্যথা, বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম, গলা বা চোয়ালে চাপ কিংবা অস্বস্তির মতো উপসর্গ হলে দ্রুত হার্টের সমস্যা আছে কিনা, তা পরীক্ষা করতে হবে। এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি ব্যবস্থা নিতে হবে।

আন্তর্জাতিক মানের হৃদরোগ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যনীতিতে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন?

প্রথমেই নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে বাংলাদেশের বর্তমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ১৮ কোটি মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। হাতে গোনা কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল দিয়ে এত বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

তাই জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট বাড়াতে হবে। প্রত্যেক জেলা ও বিভাগে বিশেষায়িত হাসপাতাল, সিসিইউ ও আইসিইউ সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, দক্ষ জনবলও তৈরি করতে হবে এবং সারা দেশে তাদের সমানভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।

ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দেশে কতটা এগিয়েছে?

২০০০ সালের পর বাংলাদেশের কার্ডিওলজি চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। এখন বিশ্বের অনেক আধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসা বাংলাদেশেই করা সম্ভব। স্টেন্টিং, পেসমেকার, আইসিডি, সিআরটি থেকে শুরু করে কার্ডিয়াক সার্জারি—বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা এখন দেশে করা হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জ হলো এ আধুনিক চিকিৎসা এখনো দেশের প্রত্যন্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায়নি।

সাধারণ মানুষের জন্য আপনার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?

আমার মনে হয়, পুরো আলোচনার মূল বিষয় হলো লাইফস্টাইল মডিফিকেশন। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে, ব্যায়াম করতে হবে।