দেশে হৃদরোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা এখন শতভাগ-এমনটাই জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আধুনিক ক্যাথল্যাব, উন্নত ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারির সুবিধা তৈরি হয়েছে। এনজিওগ্রাম, রিং বা স্টেন্ট স্থাপন থেকে শুরু করে বাইপাস সার্জারি, ভালভ প্রতিস্থাপন ও জন্মগত হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচারও এখন দেশে করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি বিশেষায়িত চিকিৎসক ও কার্ডিয়াক সার্জন তৈরির মাধ্যমেও এ সক্ষমতা বাড়ছে। আগে যে ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য রোগীরা দেশের বাইরে যেত, বর্তমানে তা দেশেই করা সম্ভব হচ্ছে। হৃদরোগ চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ।

তবে এ সক্ষমতার বড় একটি অংশ এখনো রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক। বিশেষ করে জটিল হৃদরোগের চিকিৎসা, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ও কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীদের ঢাকায় আসতে হচ্ছে। জেলা পর্যায়ে ইসিজি, ইকো বা প্রাথমিক হৃদরোগ নির্ণয়ের কিছু সুবিধা থাকলেও ক্যাথল্যাব, জরুরি ইন্টারভেনশন ও কার্ডিয়াক সার্জারির মতো বিশেষায়িত সেবা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে ঢাকার বাইরে কোনো রোগীর হার্ট অ্যাটাক হলে চিকিৎসার জন্য দ্রুত রাজধানীতে স্থানান্তর করতে হয়। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত রক্তনালির ব্লক খুলে দেয়া সম্ভব না হলে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের হৃদরোগ চিকিৎসায় এখন যে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ক্যাথল্যাব, দক্ষ ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, কার্ডিয়াক ক্রিটিক্যাল কেয়ার ও প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানো গেলে রোগীদের ঢাকামুখী চাপ কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজন হলে দ্রুততর রেফারেল ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। কার্ডিয়াক চিকিৎসার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের তৃণমূল পর্যায়ে এ সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের মোট সংখ্যা নিয়ে হালনাগাদ জাতীয় কোনো হিসাব নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ (জিবিডি) গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে হৃদরোগে ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৫৬২ জন মারা যান। একই সময়ে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নন-ল্যাবরেটরিভিত্তিক ঝুঁকি সারণি ব্যবহার করে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর ১০ বছরের কার্ডিওভাসকুলার ঝুঁকি: জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের ফলাফল’ শীর্ষক জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সী মানুষের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশের আগামী ১০ বছরে প্রাণঘাতী বা অপ্রাণঘাতী কার্ডিওভাসকুলার ঘটনার ঝুঁকি ১০ শতাংশ বা তার বেশি। অর্থাৎ এ বয়সী প্রতি চারজনে প্রায় একজন উল্লেখযোগ্য সিভিডি ঝুঁকিতে রয়েছেন। গবেষণাটি ২০২১ সালে পিএলওএস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ও ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। কারণ হৃদরোগের অনেক ঝুঁকি জীবনযাপন ও আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, তামাক বর্জন, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত ঘুম হৃৎস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন হাইপারটেনশন ২০২৫’-এর বাংলাদেশ প্রোফাইল অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে মোট ৯ লাখ ১৭ হাজার ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগে মারা যান ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ জন। অর্থাৎ সিভিডিতে দৈনিক গড়ে প্রায় ৭৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হৃদরোগের সাম্প্রতিক আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় ডব্লিউএইচএফের বাংলাদেশ প্রোফাইলে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে সিভিডিতে ৪ লাখ ১৫ হাজার ২৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে বয়স সমন্বিত সিভিডি মৃত্যুহার ছিল প্রতি লাখে ৩৭১ জন এবং নতুন সিভিডি আক্রান্তের বয়স সমন্বিত হার ছিল প্রতি লাখে ৫৯৪ জন। বৈশ্বিকভাবে বয়স সমন্বিত সিভিডি মৃত্যুহার যেখানে প্রতি লাখে ২১২, বাংলাদেশে তা ৩৭১ জন।

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হৃদয় দিবস। এ বছর দিবসটির বৈশ্বিক প্রচারের মূল বার্তা ‘ডোন্ট মিস আ বিট’। হৃদরোগের সতর্কসংকেত অনেক সময় উপেক্ষিত বা শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে এবারের প্রচারণায় লক্ষণ চেনা, হৃৎস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও সময়মতো পদক্ষেপ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষের মোট সংখ্যা নির্ধারণে জাতীয় পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান রোগটির ভয়াবহতা বোঝার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে বছরে দুই লাখের বেশি হৃদরোগে মৃত্যু, ৪০ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশের উল্লেখযোগ্য সিভিডি ঝুঁকি এবং সিভিডিজনিত ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ জনের মৃত্যুর তথ্য হৃদরোগ প্রতিরোধকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে আনছে।