মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হৃৎপিণ্ড বা হার্ট। রক্ত সংবহন তন্ত্রের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে দিনরাত অবিরাম পাম্প করে সারা শরীরে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ নিশ্চিত করাই যার প্রধান কাজ। তবে আধুনিক জীবনযাত্রার অনিয়ম, মানসিক চাপ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ ও রক্তনালিসংক্রান্ত রোগ (কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ—সিভিডি) মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর এ রোগে দুই কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ প্রেক্ষাপটে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ নিয়ে পালিত হতে যাচ্ছে ‘বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬’।
হার্ট দিবস কী এবং কেন পালিত হয়?
বিশ্ব হার্ট দিবস হলো একটি বৈশ্বিক সচেতনতামূলক আন্দোলন, যার মূল লক্ষ্য হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা এবং প্রতিটা মানুষকে নিজের হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা। অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে হৃদরোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যুর প্রধান কারণ। বিশ্ব হার্ট দিবস মনে করিয়ে দেয় সঠিক সচেতনতা, জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন ও সময়মতো সুচিকিৎসার মাধ্যমে হৃদরোগজনিত মৃত্যু কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠা
বিশ্বজুড়ে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক জোট ‘ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন’-এর হাত ধরে এ দিবসের যাত্রা শুরু। সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক সংগঠনটির পেছনের ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময়। ১৯৭৮ সালে ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব কার্ডিওলজি’ এবং ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কার্ডিওলজি ফেডারেশন’ একত্রিত হয়ে গঠন করে ‘ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অ্যান্ড ফেডারেশন অব কার্ডিওলজি’। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৮ সালে এর নাম বদলে রাখা হয় ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন।
সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসা ও নাগরিক সমাজের ২০০টিরও বেশি সংস্থাকে একত্র করে হৃদ্স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছে। মূলত এ সংগঠনের তৎকালীন সভাপতি অ্যান্টনি বায়েস ডি লুনা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ ভাবনায় ২০০০ সালে প্রথমবারের মতো ‘বিশ্ব হার্ট দিবস’ আনুষ্ঠানিকভাবে পালন শুরু হয়। সেই থেকে প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন প্লাটফর্ম হিসেবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
২০২৬ এর প্রতিপাদ্য: ‘ডোন্ট মিস আ বিট’
বিশ্ব হার্ট দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশন পুনরায় শুরু করেছে তাদের সাড়া জাগানো বৈশ্বিক প্রচারাভিযান ‘ডোন্ট মিস আ বিট’। গত বছর প্রায় ১৪০টি দেশের মানুষের কাছে পৌঁছানো এ প্রচারাভিযানের মূল আহ্বান—হৃদরোগের লক্ষণ চিনুন, হৃদযন্ত্র সুরক্ষিত রাখুন এবং কার্যকর পদক্ষেপের দাবি তুলুন।

এবারের উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ তিন দিক:
১. লক্ষণ চিনুন: অনেক সময় হৃদরোগ নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের আগে স্পষ্ট প্রকাশ পায় না। মানুষের অজানা ঝুঁকি বা অপ্রকাশিত উপসর্গ সচেতনভাবে তুলে ধরতে ডব্লিউএইচএফ চালু করেছে ‘আর ইউ হার্ট স্মার্ট?’ অনলাইন কুইজ।
২. হৃদযন্ত্র সুরক্ষিত রাখুন: চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগে মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশ কারণই প্রতিরোধযোগ্য। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, হাঁটাহাঁটি, খাদ্যাভ্যাসে চর্বি ও লবণ কমানো এবং ধূমপান ত্যাগের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো যায়। এজন্য বিশ্বজুড়ে ফিরছে ‘কিপ দ্য বিট’ শরীরচর্চা চ্যালেঞ্জ।
৩. কার্যকর পদক্ষেপের দাবি: নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বৈশ্বিক উন্মুক্ত চিঠির মাধ্যমে সর্বজনীন চিকিৎসাসেবা ও জাতীয় কর্মপরিকল্পনা চালুর জোর দাবি জানানো হচ্ছে, যাতে কোনো রোগী চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।
এছাড়া হৃদ্স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা বিস্তারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের সম্মান জানাতে এ বছর নতুনভাবে চালু হচ্ছে ‘হার্ট হেলথ চ্যাম্পিয়নস’ সম্মাননা।
হৃদযন্ত্রের যত্ন নেয়া মানে কেবল রোগ থেকে নিজেকে দূরে রাখা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি স্পন্দনকে সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকার। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের প্রধান নির্বাহী বোরজানা পারভান যথার্থই বলেছেন, ‘ হৃদরোগ প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরিতে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপই প্রথম ধাপ।’ সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও সময়মতো চিকিৎসা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ দায়িত্ব শুধু ব্যক্তির একার নয়—পরিবার, সমাজ, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই গড়ে উঠতে পারে হৃদস্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ। বিশ্ব হার্ট দিবসের তাৎপর্যও তাই একদিনের সচেতনতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিদিনের অভ্যাসে হৃদযন্ত্রের যত্নকে জায়গা করে দেয়ার মধ্যেই এর প্রকৃত সার্থকতা।










