হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি—চিকিৎসার মান, রোগীর নিরাপত্তা নাকি রোগীর সন্তুষ্টি?

এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই; এগুলো একে অন্যের পরিপূরক। তবে অগ্রাধিকারের দিক থেকে আমরা রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মানকেই সবার উপরে রাখি। একজন রোগী যখন হাসপাতালে আসেন, তখন সঠিক ও মানসম্মত চিকিৎসার মাধ্যমে তাকে দ্রুত ও নিরাপদে সুস্থ করে তোলাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। আর যখন রোগী সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় সঠিক চিকিৎসা ও আন্তরিক সেবা পান, তখনই তার মনে পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি তৈরি হয়। এর পাশাপাশি হাসপাতালের সামগ্রিক পরিবেশ এবং চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে রোগী ও তার পরিবার এখানে চিকিৎসা নেয়ার পুরো সময়টিতে স্বাচ্ছন্দ্য ও নির্ভরতা অনুভব করেন।

বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ নিয়ে রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ইউনিভার্সেল হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যয় রোগীদের নাগালের মধ্যে রাখতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে?

ইউনিভার্সেল কার্ডিয়াক হাসপাতালে আমরা সবসময় চেষ্টা করি আধুনিক ও বিশ্বমানের সেবা বজায় রেখেই চিকিৎসা ব্যয়কে যৌক্তিক ও সাধ্যের মধ্যে রাখতে। আমাদের সেবামূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে রোগীরা আস্থার সঙ্গে মানসম্মত সেবা নিতে পারেন। এর পাশাপাশি অসচ্ছল ও প্রকৃত অর্থে প্রান্তিক রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ ছাড় ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা তহবিল রয়েছে। তবে এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে সামগ্রিকভাবে দেশে একটি কার্যকর ও টেকসই স্বাস্থ্য বীমা (হেলথ ইন্স্যুরেন্স) ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি, যা মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেণীর মানুষের চিকিৎসার আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।

আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি যোগ করার পাশাপাশি সেগুলো পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করাও জরুরি। এক্ষেত্রে ইউনিভার্সেল হাসপাতালের পরিকল্পনা কী?

দক্ষ জনবল তৈরি করার ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরই একটি বড় সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি অনেক সময় দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়। কিন্তু দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য জনবল তৈরির ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আমাদের মেডিকেল কলেজ আছে। আমরা ডাক্তার তৈরি করি এবং তারা খুব ভালো করছে। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় তারা ভালো ফল করে, অনার্স মার্কস ও পজিশন পায়। বিদেশী শিক্ষার্থীরাও আমাদের এখানে পড়তে আসে এবং নিজেদের দেশে গিয়ে লাইসেন্সিং পরীক্ষায় শতভাগ পাস করে। এটা আমাদের মানসম্মত শিক্ষা দেয়ার সক্ষমতার একটি দিক। পাশাপাশি আমাদের নার্সিং কলেজ আছে। সেখানে মিডওয়াইফারি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত শিক্ষা দেয়া হয়। কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নার্সিং শিক্ষকদের অনেকেরই প্রশিক্ষণ নেই। তাই দেড়-দুই বছর ধরে আমরা নার্সিং শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স বা টিওটি শুরু করেছি। এছাড়া আমরা ইউনিভার্সেল মেডিকেল অ্যান্ড টেকনিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট করেছি। এখানে নার্স, ডাক্তারসহ হাসপাতালের বিভিন্ন সেক্টরের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ফার্মেসি, ইমেজিং, ফ্রন্ট ডেস্কসহ বিভিন্ন সাপোর্ট সার্ভিসের কর্মীদেরও রোগীর সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ ধরনের প্রশিক্ষণ ১০ বছর ধরে দেয়া হচ্ছে। ফলে তুলনামূলকভাবে আমাদের কর্মীরা সার্ভিসের দিক থেকে ভালো। প্রশিক্ষিত কর্মীদের ধরে রাখাও একটি চ্যালেঞ্জ, কারণ তারা অন্য জায়গায় চলে যান।

দেশে এমন কী ধরনের চিকিৎসাসেবা ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে রোগীদের বিদেশমুখিতা কমানো যায়?

এর দুটি দিক আছে। প্রথমত, চিকিৎসার মান, চিকিৎসকদের অ্যাটিটিউড, সেবা প্রদানকারীদের আচরণ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কভিডের সময় মানুষ দেশের বাইরে যেতে পারেনি। তখন দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো মিলে বিপুলসংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর একটা আস্থা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী সময়েও বিভিন্ন কারণে অনেকে দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন এবং দেশের চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এতে দেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা আরো বেড়েছে।

10

তবে শুধু হাসপাতাল তৈরি করলেই হবে না। সরকার, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং জনগণ—এ তিন পক্ষকে নিয়ে একটি সমন্বিত নীতি তৈরি করতে হবে। মানুষকে জানাতে হবে বাংলাদেশে কী ধরনের চিকিৎসা হচ্ছে। অনেক মানুষই জানে না দেশে এখন বড় বড় চিকিৎসা ও জটিল অস্ত্রোপচার হচ্ছে। কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন ও লিভার ট্রান্সপ্লান্টেশনের মতো চিকিৎসাসেবা দেশে আরো সম্প্রসারিত হলে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানো গেলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা আরো উন্নত হবে।

ইউনিভার্সেল হাসপাতালে কার্ডিয়াক বিভাগ চালুর পেছনে মূল লক্ষ্য কী ছিল?

কার্ডিয়াক বিভাগ চালুর পেছনে মূলত দুটি বিষয় কাজ করেছে। একদিকে অল্প বয়সী মানুষের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কিছু ঘটনা আমাদের প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। অন্যদিকে আমাদের হাসপাতালে প্রচুর রোগী আসেন। তাদের কার্ডিয়াক সমস্যা হলে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হতো। কিন্তু রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে পাঠাতেই অনেক সময় তার মৃত্যু হয়ে যেত।

এ দুই বিষয় বিবেচনা করে আমাদের কাছে মনে হলো, নিজেদের একটি কার্ডিয়াক ইউনিট থাকা খুব জরুরি। সেখান থেকেই ২০১৬ সালে বাংলাদেশের দুজন প্রথিতযশা কার্ডিয়াক বিশেষজ্ঞ—একজন ইন্টারভেনশন ও একজন সার্জারি বিশেষজ্ঞকে নিয়ে উদ্যোগটি শুরু হয়। এ উদ্যোগের পেছনে আমাদের এমডি ড. আশীষ চক্রবর্তীর সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও ভূমিকা ছিল।

হৃদরোগীর সংখ্যা বাড়ছে। সেই তুলনায় কার্ডিয়াক বিভাগের বেড, সিসিইউ ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে বাড়ানো হচ্ছে?

প্রযুক্তির কোনো শেষ নেই। এটি একটি কন্টিনিউয়াস প্রসেস। যেমন কন্টিনিউয়াস মেডিকেল এডুকেশন বা সিএমই চলে, তেমনি চিকিৎসাসেবার প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নও চলতে থাকে। রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্পেস সংকট রয়েছে। তার পরও আমরা ধারাবাহিকভাবে সক্ষমতা বাড়িয়েছি। দুই মাস আগেও আমরা প্রায় ২০টি ক্রিটিক্যাল কেয়ার বেড বাড়িয়েছি। কার্ডিয়াকও একটি ক্রিটিক্যাল কেয়ার, ফলে কার্ডিয়াক রোগীরাও এসব সুবিধা নিতে পারবেন। পাশাপাশি আমাদের ফেজ টু-এর বড় ধরনের নির্মাণকাজ চলছে। আশা করছি, আগামী ছয় মাস পর থেকে এর কিছু কার্যক্রম শুরু হবে এবং আগামী ১২ মাসের মধ্যে আরো কার্যক্রম শুরু হবে। পুরো প্রকল্প শেষ হতে হয়তো দুই বছর লাগবে। এতে সিটের সংখ্যা অনেক বাড়বে এবং আমরা আরো বেশি রোগীকে সেবা দিতে পারব। চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যাও সেই অনুযায়ী বাড়ানো হচ্ছে। আমরা ডাক্তার, নার্স ও মাস্টার্স নার্স তৈরি করছি। ইন্টার্নিদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ভালো করলে এবং আগ্রহ থাকলে তাদের ছয় মাস থেকে এক বছরের জন্য কার্ডিয়াক ইউনিটে কাজের সুযোগ দেয়া হয়। সিনিয়র পর্যায়ের কর্মীদেরও প্রয়োজনে দেশের বাইরে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখন কোথায় প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন পেশাদার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি করা এবং পারস্পরিক আস্থার ক্ষেত্রটি তৈরি করা। রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা খুব বেশি প্রয়োজন। অনেক সময় রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকদের ওপর চড়াও হন। এটি খুবই অমানবিক বিষয়। আবার চিকিৎসকদের প্রতিও আমার অনুরোধ থাকবে, তারা যেন সময় দিয়ে রোগীকে দেখেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য বীমার একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা দরকার। কারণ হঠাৎ একটি বড় চিকিৎসা ব্যয় রোগীর ওপর চলে এলে অনেকের পক্ষে সেটি বহন করা সম্ভব হয় না। সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্বাস্থ্যসেবার একটি বেঞ্চমার্ক বা স্ট্যান্ডার্ড প্রোটোকল তৈরি করা। শুধু অনুমতি পেলেই কোনো প্রতিষ্ঠান যেন চিকিৎসাসেবা শুরু করতে না পারে। পর্যাপ্ত সক্ষমতা ও মান নিশ্চিত না করে কোনো হাসপাতাল চালু হলে শেষ পর্যন্ত রোগীরই ক্ষতি হয় এবং তাকে আরো বেশি অর্থ খরচ করে তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে যেতে হয়। এই বেঞ্চমার্ক তৈরি করা গেলে অনেক সমস্যা কমে যাবে। সবাই মিলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যাতে একজন মানুষও স্বাস্থ্যসেবাবঞ্চিত হয়ে মারা না যায় এবং টাকার অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়। আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ যেন বাংলাদেশেই স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে।