ইন্দিরা গান্ধী কেবল রাজনীতি নয়, বরং তার পোশাক, ফ্যাশনেবল লাইফস্টাইলের জন্যও আলোচিত ছিলেন। শাড়ি ছিল তার সিগনেচার স্টাইল। শাড়ি কেবল পোশাক নয়, ছিল তার রাজনীতির অংশ। শাড়ি পরা ইন্দিরার প্রতিকৃতি এখনো কতটা শক্তিশালী তা বলিউডের সিনেমাগুলো খেয়াল করলে টের পাওয়া যায়। ভারতে যেকোনো সিনেমায় নারী রাজনৈতিক নেত্রীর চরিত্রে সবসময়ই ইন্দিরার প্রতিকৃতি অনুকরণ করা হয়। হাল আমলের ক্যাটরিনা কাইফ থেকে রিচা চাড্ডা—সবাই এ পথের পথিক।

ইন্দিরা শুধু শাড়ি পরতেন না, ভারতীয় শাড়ির সমঝদারও ছিলেন। অনেক ফ্যাশন ডিজাইনার তার শাড়িগুলোকে রীতিমতো শিল্পকর্মের মর্যাদা দিয়েছেন। শাড়ি নিয়ে ইন্দিরার জানাবোঝা নিয়ে একটা ঘটনার উল্লেখ করা যায়। একবার তিনি খোলা জিপে চড়ে রাজনৈতিক প্রচারণায় অংশ নিচ্ছিলেন। হঠাৎ চারপাশের ভিড়ের মধ্যে তার চোখ পড়ে শাড়ি পরা এক তরুণীর ওপর। তিনি তত্ক্ষণাৎ তার গোয়েন্দা কর্মকর্তা জেপি দত্তকে জিজ্ঞেস করেন, মেয়েটি কোন ধরনের শাড়ি পরেছে। ইন্দিরার প্রশ্ন শুনে তিনি থতমত খেয়ে যান, কোনোমতে জবাব দিলেন—সিল্ক। ইন্দিরা শুনে বললেন, ‘না। মেয়েটা কোয়মবাটোরের (তামিলনাড়ুর শহর) হাতেবোনা শাড়ি পরে আছে। মি. দত্ত আপনি কি ইন্টেলিজেন্স জোগাড় করবেন?’

ইন্দিরার জীবনীকার সাগরিকা ঘোষ লিখেছেন, ‘ইন্দিরা গান্ধীর শাড়ি কোনো নারীসুলভ পোশাক ছিল না। এটা ছিল কর্তৃত্ব, ক্ষমতার প্রতীক।’

ইন্দিরা গান্ধীর জন্মশতবর্ষ পালিত হয়ে গেছে ২০১৭ সালে। তার মৃত্যুর পরও কেটে গেছে কয়েক দশক। কিন্তু তার শাড়ির কিংবদন্তি এখনো শক্তিশালী। শাড়ি তার রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার পরিবার ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। খাদি ছিল ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির একটি হাতিয়ার। ইন্দিরা কৈশোর বয়সে এ সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন। তখন থেকে ব্যবহার করেছেন তাঁতের শাড়ি। তবে ধীরে ধীরে তাঁতের সুতি শাড়ি থেকে বেনারসি সিল্কও তিনি গায়ে চড়িয়েছেন।

শাড়ি ছিল ইন্দিরার জাতীয়তাবাদী ভাবনার প্রতীক, একই সঙ্গে তার ব্যক্তিত্বের অংশ। জীবনের শুরুর দিকে তিনি মূলত ব্যবহার করেছেন খাদির শাড়ি। জর্জেট শাড়ি তার পোশাক হিসেবে স্থান পায়নি। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খাদি ছেড়ে সিল্ক পরলেও তা সবসময়ই ছিল তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও রাজনীতির পরিচায়ক। যেমন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি পরেছিলেন গোলাপি শাড়ি আর ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাক শিরাকের সঙ্গে সাক্ষাতে তাকে দেখা গেছে বেনারসি সিল্কে।

রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ইন্দিরা পরতেন তাঁতের শাড়ি। রাজনীতির ময়দানে শাড়ি পরা ইন্দিরার প্রতিকৃতি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এখনো শক্তিশালী প্রভাব রেখে চলেছে। পরবর্তী সময়ে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী নেত্রীরা এ স্টাইল অনুসরণ করেছেন। এমনকি তার নিজের ইতালীয় পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধীও শাড়িকে বেছে নিয়েছেন।

ইন্দিরার জন্ম ভারতের অন্যতম এক অভিজাত পরিবারে, সে আমলে তাদের অর্থ-সম্পদও নেহাত কম ছিল না। তার পরও কখনো তার পোশাকে বিলাসিতার ছাপ ছিল না। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি তাঁতের শাড়ি পরেছেন, নয়তো বেনারসি সিল্ক। ভারি এমব্রয়ডারি, জর্জেট, শিফন পরেননি। স্পষ্টতই তিনি ভারতের স্থানীয় বস্ত্র শিল্পকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার শাড়ি, সেগুলোর ডিজাইন ছিল ভারতের গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

ইন্দিরা বিদেশ সফরে সবসময় শাড়ি পরেছেন, এর ব্যত্যয় কখনো হয়নি। শীতের দেশে শাড়ির ওপরে পরেছেন জ্যাকেট। এটা ছিল তার নিজস্ব স্টেটমেন্ট। কয়েক বছর আগে ভারতের প্রয়াত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ইন্দিরার এ রীতি অনুসরণ করতে দেখা গেছে।

ইন্দিরা গান্ধীর ফ্যাশনে আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল কোনো রকম অলংকার ব্যবহার না করা। রাজনীতির বাইরে কোনো বড় অনুষ্ঠানেও তাকে কখনো অলংকার পরতে দেখা যায়নি। শাড়িই যেন ছিল তার একমাত্র অলংকার।


মাঝেমধ্যে তাকে দেখা গেছে অনেক নতুন ফ্যাশনে। যেমন শাড়ির সঙ্গে পরেছেন টি-শার্ট। শাড়ির রঙের ক্ষেত্রে তার পছন্দ দৃষ্টি কেড়েছে।

ইন্দিরা গান্ধী সারাজীবন প্রায় একই স্টাইলে শাড়ি পরেছেন। পারসি ফিরোজ গান্ধীকে বিয়ের পর মাঝেমধ্যে পারসি স্টাইলে শাড়ি পরেছেন। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর শাড়ি—ইন্দিরার এ লুক বিদেশেও আলোচিত হয়েছে। বিদেশ সফরে তার পছন্দ ছিল সিল্ক, আর যেকোনো সাধারণ সভায় তাঁতের শাড়ি।

২০১৭ সালে ইন্দিরার জন্মশতবার্ষিকীতে তার ব্যবহার করা ১০৮টি শাড়ির অনুপ্রেরণায় তৈরি করা শাড়ির প্রদর্শনী হয়েছিলে দিল্লিতে। এসব শাড়ির মধ্যে ছিল বেনারসি সিল্ক ও দক্ষিণ ভারতীয় সুতি শাড়ি। প্রদর্শনীর জন্য শাড়িগুলো বেঙ্গালুরুতে তাঁতে বোনা হয়েছিল। এসবের তত্ত্বাবধান করেন ভারতের টেক্সটাইল এক্সপার্ট পার্বতী মুদ্যায়া। ইন্দিরা গান্ধীর আলোকচিত্র, আর্কাইভ ও অনেকে ব্যক্তিগত স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে শাড়িগুলো তৈরি করা হয়। ষাটের দশকে বেড়ে ওঠা পার্বতীর মতে, ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতীয় তাঁতের শাড়ির একজন আইকন।

মুম্বাই আর্টিসান গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা রাধি পারেখেরে মতে, সত্তর ও আশির দশকে ইন্দিরা গান্ধী যে শাড়িগুলো পরেছেন, সেগুলো ভারতীয় হস্তশিল্প ও ডিজাইনের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বের প্রতীক। এগুলো সমাজবাদ ও নারীবাদী ভাবনা থেকে তৈরি হয়েছিল। অনেক ভারতীয় ডিজাইনার তখন ভারতীয় তাঁতের শাড়িকে পশ্চিমা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। সবাই জানেন, সে সময় ইন্দিরার বন্ধু ও ভারতীয় তাঁত শিল্পের বিশেষজ্ঞ পুপুল জয়কার তার ব্যবহার করা অনেক শাড়ির ডিজাইনকে ভারতীয় হস্তশিল্পের বিকাশে ব্যবহার করেছিলেন।

দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়ালে কাচের ডিসপ্লেতে দেখা যায় কালো বর্ডার দেয়া গেরুয়া রঙের একটি শাড়ি। এটি ইন্দিরা গান্ধীর একটি শাড়ি, যা তিনি জীবনের শেষ মুহূর্তে পরেছিলেন। শাড়ির গায়ে গুলির ছিদ্রগুলো স্পষ্ট, তার রক্তের দাগ অবশ্য এত বছর পর ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে। কিন্তু এ শাড়ি তার স্মৃতি আর কিংবদন্তির স্মারক হয়ে টিকে আছে। রক্তেভেজা এ শাড়ি যেন ইন্দিরার জীবন্ত ইতিহাস, জীবনের শেষ ভাগে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অশান্ত সময়ের সাক্ষী।

ইন্দিরার শাড়ি যে নিছক তার পোশাকই ছিল না—এ সত্য প্রতিষ্ঠিত। তিনি যে ডিজাইন, নির্মাণ কৌশল ও রঙের শাড়ি ব্যবহার করেছেন, তা ভারতের ইতিহাস, রাজনীতি এবং একই সঙ্গে বিকাশমান হস্তশিল্পের উত্কর্ষের প্রতীক। তিনি উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী শাড়ি ব্যবহার করেছেন দক্ষভাবে। এটা তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রকাশ বলে মনে করা হয়। একদিকে তাঁতের শাড়ি, অন্যদিকে আধুনিক ফ্যাশনে খাটো করে চুলের ছাঁটে তার ব্যক্তিত্ব ছিল অনমনীয়। অলংকার বলতে ছিল কেবল হাতঘড়ি। মাঝেমধ্যে পরতেন হাই হিল জুতা।

ইন্দিরা পরবর্তী ভারতে আরেকজন নারী নেত্রী রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়েছিলেন। তিনি তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা। তার ব্যক্তিত্বেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল শাড়ি। তিনি বেশির ভাগ সময় সবুজ শাড়ি পরতেন। এটা তার ট্রেডমার্কের মতো হয়ে উঠেছিল। কথিত আছে, তার ১০ হাজার শাড়ি ছিল। ১৯৮৯ সালে তামিলনাড়ুর লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে তার ওপর হামলা হয়েছিল। সেখানে এক মন্ত্রী তার শাড়ি ধরে টান দিয়েছিলেন। এ হামলায় তার শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া শাড়িতে অপমানিত জয়ললিতা হয়ে উঠেছিলেন দ্রৌপদীর উত্তরসূরি। এ ঘটনা তার রাজনৈতিক জীবনে বিরাট প্রভাব ফেলেছিল। প্রবল জনসমর্থন নিয়ে ১৯৯১ সালে তিনি তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হন।

তাঁতের শাড়ি নিয়ে ইন্দিরার মুগ্ধতা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন তার পুত্রবধূ সোনিয়া গান্ধীও। সেই একই সাদাসিধে তাঁতের শাড়ি, হাতঘড়ি। শাশুড়ির মতো তাকেও অলংকার ব্যবহার করতে দেখা যায় না।

ইন্দিরা কিংবা সোনিয়ার জন্য শাড়ি একটি প্রতীক। শাড়ির ক্ষেত্রে তারা ব্যক্তিগত পছন্দের পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিকেও বিবেচনায় নিয়েছেন—তামিলনাড়ুতে কাঞ্জিভরম, আসামে বোড়ো তাঁত, অন্ধ্রপ্রদেশে ইকাত শাড়ি।

ভারতের নারী রাজনীতিবিদদের জন্য শাড়ির কিংবদন্তি ইন্দিরা গান্ধীর রেখে যাওয়া। দক্ষিণ এশিয়ায় নারী নেত্রীদের সামর্থ্য, শক্তি, ক্ষমতার ইমেজ নির্মাণে শাড়ির যে ভূমিকা তা ইন্দিরা গান্ধীর নির্মাণ।

 

শানজিদ অর্ণব: লেখক ও অনুবাদক