আম্বেরি শ দেওয়ানজি ও তিনজন সহযোগী সাংবাদিক ২০০৪ সালে খুশবন্ত সিংয়ের সাক্ষাত্কারটি নেন। রেডিফ ইন্টারভিউ হিসেবে ২৭ অক্টোবর ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয়। এ সাক্ষাত্কারে খুশবন্ত সিং ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিত্ব নিয়ে যেসব কথা বলেছেন, সেসব অংশের অনুবাদ এখানে উপস্থাপিত হলো—
২০ বছর
পর আপনি
যখন পেছন
ফিরে তাকান,
ইন্দিরা গান্ধীকে কীভাবে দেখেন?
খুশবন্ত: ইন্দিরা গান্ধীকে
নিয়ে দুটি
বিষয় বিবেচ্য:
একটি রাজনীতিবিদ,
অন্যটি মানুষ
হিসেবে। রাজনীতিবিদ
হিসেবে তিনি
কেমন, সবার
জানা; কিন্তু
মানুষ হিসেবে
কেমন, তা
তার পরিবারের
সদস্য ও
ব্যক্তিগত কর্মচারী
ছাড়া কারো
জানার কথা
নয়। বাকি
সব বানোয়াট
ও অনুমাননির্ভর।
ইন্দিরা গান্ধীর শাসন কীভাবে দেখেছেন?
খুশবন্ত: তার শাসনে
আকর্ষণীয় তেমন
কিছু নেই।
সমালোচনা সহ্য
করার শক্তি
তার ছিল
না। কিছু
মানুষকে তিনি
তার জন্য
চ্যালেঞ্জস্বরূপ মনে
করে তাদের
প্রতি বিরাগভাজন
হয়ে ওঠেন।
তার রাজত্বে
দুর্নীতি ভয়াবহ
রকম বেড়ে
যায়। দুর্নীতির
ব্যাপারে তিনি
বরং সহনশীল
ছিলেন। এটা
তার নেতিবাচক
দিক। তিনি
জানতেন, তার
কয়েকজন মন্ত্রী
বড় ধরনের
দুর্নীতিবাজ। ব্যাপারটা
যতক্ষণ তার
সঙ্গে মানিয়ে
গিয়েছে, তিনি
কোনো ব্যবস্থা
নেননি। তিনি
যতক্ষণ মানিয়ে
নিতে পেরেছেন,
দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী
সহ্য করেছেন,
আবার না
মিললে একই
অভিযোগে তাকে
অব্যাহতিও দিয়েছেন।
শিক্ষিত ও
পরিশীলিত মানুষের
সঙ্গে তিনি
অস্বস্তিবোধ করতেন।
ফলে যশপাল
কাপুর, তার
অফিসের স্টেনোগ্রাফার
আরকে ধাওয়ান
এবং তার
পাশে ঘুরঘুর
করা মোহাম্মদ
ইউনুসের মতো
মানুষের উত্থান
ঘটেছে। আমি
বিশ্বাস করি,
এর কারণ
ইন্দিরা গান্ধীর
সত্যিকারের শিক্ষা
ছিল না।
তিনি শান্তিনিকেতন
গেলেন, তারপর
বিদেশে ব্যাডমিন্টন
স্কুলে, তারপর
অক্সফোর্ডে। তিনি
কোথাও পরীক্ষায়
পাস করেননি।
কোনো ডিগ্রিও
জোগাড় করতে
পারেননি। শিক্ষিত
মানুষ হিসেবে
স্বীকৃত না
হওয়ায় তার
মধ্যে এক
ধরনের হীনম্মন্যতা
জন্মে বলে
আমার ধারণা।
যখন তিনি
তার অসুস্থ
মা কমলাকে
নিয়ে সুইজারল্যান্ড
যান, ফারসি
ভাষা শেখেন।
পক্ষে-বিপক্ষে
অনেক কথা
থাকলেও অত্যন্ত
বুদ্ধিমান ও
নিষ্কলুষ রেকর্ডের
অধিকারী মানুষের
সঙ্গে তিনি
এক ধরনের
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতেন।
দুই নম্বরি
মানুষের সঙ্গে
তিনি স্বস্তিবোধ
করতেন।
তার যে
নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে
কথা বললেন,
তা ভারতকে কেমন করে
প্রভাবিত করেছে?
খুশবন্ত: মানুষকে পরস্পরের
বিরুদ্ধে লেলিয়ে
দেয়ায় তিনি
ছিলেন ওস্তাদ।
তিনি কাউকে
কাউকে পৃষ্ঠপোষকতা
করতেন। যখন
দেখতেন এ
লোকটি বেশি
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে
উঠছেন, তখন
তাকে কোনো
জ্যেষ্ঠ পদে
না বসিয়ে
তার ঘনিষ্ঠ
একজন সহযোগীকে
সেখানে বসাতেন।
তিনি জানতেন,
এতে দুজনের
মধ্যে বিরোধ
বাধবেই। সবচেয়ে
বড় উদাহরণ
ভিপি সিং।
তার বড়
ভাই (সান্তা
বক্স সিং)
বিশ্বাস করতেন,
তাকে মন্ত্রী
বানানো হবে।
কিন্তু তা
না করে
দুই ভাইয়ের
মধ্যে কম
যোগ্যতাসম্পন্ন ভিপি
সিংকে বেছে
নিলেন। এতে
দুই ভাইয়ের
মধ্যে শত্রুতা
বাড়ল। তিনি
দক্ষতার সঙ্গে
ভাইদের পরস্পরের
বিরুদ্ধে শত্রুতা
সৃষ্টি করে
ও জিইয়ে
রেখে সংসার
ভাঙার কাজটি
করলেন। যে
খেলা তিনি
খেলেছেন, শেষ
পর্যন্ত তা
দেশের জন্য
মঙ্গল ডেকে
আনেনি।
তার জারি
করা জরুরি
অবস্থা নিয়ে
কী বলবেন?
খুশবন্ত: হ্যাঁ, এটা
সত্য। কিন্তু
যখন জরুরি
অবস্থার কথা
আসে, বিরোধী
দলের আচরণও
ছিল ন্যক্কারজনক।
কোনো সন্দেহ
নেই, দেশ
তখন নৈরাজ্যের
দিকে এগিয়ে
যাচ্ছিল। আমার
মনে পড়ছে,
স্কুল খুলছে
না, কলেজ
বন্ধ, বড়
বড় মিছিল,
দাঙ্গা। নয়াদিল্লিতে
জয়প্রকাশ নারায়ণ
যখন বিশাল
শোভাযাত্রা করলেন,
তিনি বিক্ষুব্ধ
মিছিলকারীদের বললেন,
এমপিদের ঘেরাও
করো, তাদের
অফিস করতে
বাধা দাও।
সে সময়ে
গুজরাটে এমনই
ঘটছিল (নবনির্মাণ
দাঙ্গায় পার্লামেন্ট
অবরুদ্ধ ছিল),
তিনি দিল্লিতে
একই কাজ
করার আহ্বান
জানালেন, নির্বাচিত
প্রতিনিধিরা যেন
তাদের কাজে
যোগ দিতে
না পারেন।
আরো খারাপ
কাজ করলেন—পুলিশ
ও সেনাবাহিনীকে
আহ্বান জানালেন,
তারা যেন
এমপিদের পতন
ঘটিয়ে দেয়।
যেকোনো গণতন্ত্রে
প্রতিবাদেরও একটা
সীমা আছে,
কিন্তু তা
সীমা ছাড়িয়ে
গেল। অন্য
নেতারা ইন্দিরার
ভগ্নদশা দেখে
ভাবছিলেন, তিনি
নিজ থেকেই
তার ধ্বংস
ডেকে আনবেন।
আমি জয়প্রকাশ
নারায়ণকে জানতাম
এবং খুব
পছন্দ করতাম।
আমি তাকে
চিঠিতে জানাই,
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে
প্রতিবাদের সীমা
তিনি লঙ্ঘন
করছেন। তিনি
একটি দীর্ঘ
জবাব লেখেন,
আমি তা
ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে
প্রকাশ করেছিলাম।
কিন্তু কিছু
ঘটার আগেই
এলাহাবাদ হাইকোর্টের
রায় হয়ে
গেল। ইন্দিরা
গান্ধী জরুরি
অবস্থা ঘোষণা
করলেন। আমি
বিশ্বাস করি,
তিনি ঠিক
কাজটিই করছেন,
তার হাতে
আর কোনো
বিকল্প ছিল
না।
এত বছর
পরও কি
তিনি মনে
করেন, জরুরি
অবস্থা ঘোষণা
যুক্তিযুক্ত ছিল?
খুশবন্ত: আমি এখনো
বিশ্বাস করি,
যখন তিনি
জরুরি অবস্থা
ঘোষণা করেন,
তখন এটা
করার সংগত
কারণ ও
অধিকার তার
ছিল। বিরোধীদলীয়
নেতারা সে
সময়ে বেপরোয়া,
দায়িত্বহীন ও
দেশবিরোধী আচরণ
করতে থাকেন।
তারা নৈরাজ্যের
সমারোহ উপভোগ
করছিলেন।
আমার স্পষ্ট
মনে আছে,
জরুরি অবস্থা
ঘোষণার পর
সাধারণ মানুষের
মধ্যে স্বস্তি
ফিরে আসে।
স্কুল খোলে,
কলেজে ক্লাস
শুরু হয়,
সময়মতো ট্রেন
ছাড়ে। দেশে
স্বাভাবিক অবস্থা
ফিরে আসায়
এক ধরনের
কৃতজ্ঞতার আবহ
বিরাজ করে।
এতে অবশ্যই
জনগণের স্বাধীনতা
কেড়ে নেয়া
হয়।
আগের প্রশ্নের জবাবে আপনি
বলেছেন, যখন
ভারতে জরুরি
অবস্থা ঘোষণা
করা হয়,
দেশে স্বস্তি ফিরে আসে।
তার পরও
তিনি নির্বাচনে হেরে গেলেন। তাহলে সমস্যাটি কোথায়?
খুশবন্ত: সমস্যা আমার
মতে, ক্ষমতার
অপব্যবহার।
তারপর তো
তিনি আবার
ক্ষমতায় ফিরে
আসেন। এটা
কি জনতা
পার্টির অদক্ষতার কারণে, নাকি
জনগণ বলেছে,
তোমাদের অনেক
শাস্তি দিয়েছি, এখন তোমাদের ফেরত চাই।
নাকি দুটোর
সমন্বয় ঘটেছে?
খুশবন্ত: আমার মনে
হয় ঠিকই
বলেছেন, ততদিন
তার বিরুদ্ধে
ক্ষোভ ও
তিক্ততা প্রশমিত
হয়েছে। পরিস্থিতি
সামাল দিতে
মোরারজি দেশাই
ও চরণ
সিং সম্পূর্ণ
ব্যর্থ হলেন।
লোকজন বলাবলি
করতে লাগল,
ইন্দিরা তাদের
চেয়ে অনেক
ভালো ছিলেন।
কিন্তু গদিতে
তার পরবর্তী ক’বছর
আরো বেশি
খারাপ ছিল;
আগে লক্ষ্য সাধনের যে
শক্তি তার
ছিল, তখন
আর তা
নেই।
খুশবন্ত: আমার মনে
হয়, এটা
ঘটেছিল সঞ্জয়
গান্ধীর মৃত্যুর
কারণে (জানুয়ারি
১৯৮০ তিনি
ক্ষমতাসীন হলেন,
ছয় মাস
পর সঞ্জয়ের
বিমান দুর্ঘটনাজনিত
মৃত্যু)।
সঞ্জয় তার
ওপর খবরদারি
করতেন। তার
মৃত্যুর পর
ইন্দিরার নোঙর
ছিঁড়ে গেল।
তিনি বড়
ছেলে রাজীবকে
উপেক্ষা করে
(তিনি তাকে
মনে করতেন
বুদ্ধির ঘাটতিসম্পন্ন
মানুষ) সঞ্জয়কে
প্রধানমন্ত্রী পদের
দিকে এগিয়ে
নিয়ে যাচ্ছিলেন।
সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর তিনি দোনোমনো হয়ে পড়েন, মনস্থির করতে পারছিলেন না, নার্ভাস ব্রেকডাউনের কবলে পড়েন। রাতে ঘুমাতে পারতেন না, চোখের নিচে গভীর কালি পড়ে। আমার মনে হয়, এ রকম মানসিক অবস্থার মধ্যে তিনি আনাড়ির মতো অপারেশন ব্লু স্টার পরিচালনার আদেশ দেন।





