[পুপুল জয়কার (ইন্দিরা গান্ধী: এ বায়োগ্রাফি) ও ক্যাথেরিন ফ্রাঙ্ক (ইন্দিরা) ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর জীবনী লিখেছেন, তা সমাদৃতও হয়েছে। ইন্দিরা আত্মজীবনী লেখেননি। তবে তার সাক্ষাত্কার ও অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করে ইম্যানুয়েল পাউচপ্যাডাস ইন্দিরার হয়ে মাই ট্রুথ নামের যে আত্মজীবনীমূলক বইটি লিখেছেন, তিনি তা অনুমোদন করেছেন। এটাকে ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনীর আত্মজীবনী বলা চলে। ‘মাই ট্রুথ’ থেকে কিছু অংশ অনুসৃত হচ্ছে]
১৯ নভেম্বর ১৯১৭
এলাহাবাদে আনন্দ
ভবনে আমার
জন্ম। এ
বাড়িটি ভারতীয়
সংস্কৃতি, রাজনীতি
ও শাসনের
কেন্দ্র। আমার
পূর্বপুরুষরা কাশ্মীরি—নেহরু।
আনন্দ ভবনের
সবচেয়ে প্রভাবশালী
মানুষটি হচ্ছেন
মতিলাল নেহরু,
আমার দাদা।
তারপর গুরুত্বের
দিক দিয়ে
অবশ্যই বাবা
জওহরুলাল নেহরু।
আমার নাম
ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী,
আমি খানিকটা
বখেই গিয়েছিলাম।
১৯২১ সালে
প্রিন্স অব
ওয়েলসের ভারত
সফরের সময়
গান্ধী হরতাল
ডাকেন। কংগ্রেসের
ওপর ব্রিটিশ
সরকার আঘাত
হানে, আঘাতটা
পড়ে আমাদের
পরিবারের ওপর।
নেহরু পরিবারের
সদস্যদের জেলে
ঢোকানো হয়।
বাবাকে ঘন
ঘন জেলে
ঢোকানো হতো।
আমার বয়স
১৩ বছর
হতেই দেখি
বাবা পাঁচবার
জেল খেটে
এসেছেন। মাকে
জেলে যেতে
হয়েছে। অনেক
সমস্যা হলেও
জেলে যাওয়াটা
নেহরু পরিবারের
জন্য গর্বের
ব্যাপার ছিল।
শাস্তির অংশ
হিসেবে যখন
বাবা ও
মাকে জরিমানা
করা হতো,
তারা তা
পরিশোধ করতেন
না। ফলে
পুলিশ এসে
কোনো না
কোনো সম্পদ
বলপূর্বক নিয়ে
যেত—তার
মধ্যে হাজার
রুপি দামের
কার্পেট কিংবা
গাড়িও ছিল—যার
মূল্য ৫০০
টাকা জরিমানার
চেয়ে বহুগুণ
বেশি। দেশবিরোধী
কাগজপত্র কিছু
আছে কিনা
খুঁজতে ঘরে
তল্লাশি চালাত।
বাবা-মা জেলে যেতেন বলে আমার পড়াশোনার ক্ষতি হয়েছে এমন নয়, বরং যেসব বিদ্যালয়ে আমাকে যেতে হয়েছে, তার ধরনটাই নেহরু পরিবারের জীবনযাত্রা থেকে ভিন্ন ছিল। পড়াশোনায় আগ্রহ পেতাম না।
জোন অব
আর্ক তার
বীরত্ব দিয়ে
আমাকে দারুণভাবে
মুগ্ধ করেছিলেন।
ফরাসি ভাষায়ই
পড়েছিলাম ‘লা
মিজারেবল’।
এ বইয়ের
কাহিনী আমার
মনে গভীর
ছাপ রেখে
যায়। এ
কাহিনী আমাকে
দারিদ্র্য অনুধাবন
করতে শেখায়
এবং আমার
সমাজদর্শনকে প্রভাবিত
করে। ১৯২৬
সালে মায়ের
সঙ্গে জেনেভা
সফরে এসে
ইকোল ইন্টারন্যাশনাল
স্কুলে ভর্তি
হই। তখন
আমার ইংরেজি
জ্ঞান ছিল
সামান্য। এখানে
আসার কারণ
ছিল অসুস্থ
মায়ের চিকিৎসা।
একটি ফ্ল্যাটে
মা-মেয়েকে
উঠিয়ে বাবা
চলে গেলেন।
বাড়ির বিষয়গুলো
দেখাশোনা আমাকেই
করতে হয়।
ইকোল ইন্টারন্যাশনাল
ছেড়ে ইকোল
ন্যুভেল স্কুলে
ভর্তি হই।
এটি আমার
জন্য স্মরণীয়
অধ্যায়। প্রকৃতির
বিভিন্ন বিষয়
নিয়ে এখানে
পড়ানো হতো—গাছপালা,
কীটপতঙ্গ।
১৯২৮ সালে
বাবা আমাকে
চিঠি লিখতে
শুরু করেন,
যা পরে
‘লেটারস
ফ্রম আ
ফাদার টু
হিজ ডটার’
নামে গ্রন্থাকারে
প্রকাশিত হয়।
জেলে থাকার
সময় শুরু
করেন একটি
চিঠি সিরিজ—যার
সবটাই শিক্ষণীয়।
বাবা বহু
কিছু আমাকে
বলতেন, তার
অনেকটাই ছিল
আমার অনুধাবন
ক্ষমতার বাইরে।
বাবার সঙ্গে
প্রতিদিন কমবেশি
দৌড়াতে হতো,
সাঁতার কাটতে
হতো—বাবা
আমাকে পানির
ভেতর ঠেলে
দিতেন এবং
প্রত্যাশা করতেন
আমি যেন
নিজের চেষ্টায়
ফিরে আসি—সাঁতার
শেখানোর এ
এক পদ্ধতি;
কিছুটা হলেও
ঘোড়ায় চড়া
আমাকে শিখতে
হয়েছে। সারাক্ষণ
বকাঝকা করা
এলাহাবাদ কনভেন্ট
স্কুল আমার
ভালো লাগেনি,
ব্রিটিশ শিক্ষকরা
ভারতীয় শিক্ষার্থীদের
খুব সমালোচনা
করতেন।
মৃদুলা সারাভাই
নামের একজন
কংগ্রেস নারী
নেত্রী ও
পারিবারিক বন্ধু
আমাকে শিশুদের
চরকা কাটার
সংগঠনে ঢুকিয়ে
কার্যত রাজনীতির
সঙ্গে জড়িয়ে
ফেলেন। আমি
কংগ্রেসে যোগ
দিতে চেয়েছি,
উড়োজাহাজের পাইলট
হতে চেয়েছি।
মনে পড়ছে,
বাবা ১৯২৯
সালে কংগ্রেসের
প্রেসিডেন্ট হওয়ার
পর যে
মিছিল বের
হয় তাতে
একটি সাদা
ঘোড়ায় চড়ে
তিনিই মিছিলের
নেতৃত্ব দেন।
আর তখন
ব্যান্ড সুর
বাজাচ্ছিল ‘গড
সেভ দ্য
কিং’।
মতিলাল নেহরুর
মৃত্যুর পর
মায়ের সঙ্গে
সিংহলে (শ্রীলংকা)
গিয়ে দেশটা
খুব ভালো
করে দেখি।
দক্ষিণ ভারতে
এসে বর্ণপ্রথা
ও বৈষম্য
দেখে হতবুদ্ধি
হয়ে যাই।
এমনকি ব্রাহ্মণদের
মধ্যেও উঁচু
জাতের ব্রাহ্মণ
ও নিচু
জাতের ব্রাহ্মণ।
মানুষের সন্তান
অস্পৃশ্য হতে
পারে, এ
ধারণাই আমাদের
বাড়িতে ছিল
না। দাদার
ভৃত্য হরি
সামাজিক বিভাজনে
আনটাচেবল বা
অস্পৃশ্য। কিন্তু
সে তো
আমাদের পরিবারের
সদস্যদের মতোই
ছিল। কখনো
কখনো আমাদের
সঙ্গে আহার
করত। বর্ণবৈষম্য
আমাকে পীড়া
দিতে থাকে।
১৯২৯-এর
ডিসেম্বরের শেষ
দিন রাতের
খাবারের সময়
ফোন বাজতে
থাকে, আমি
ফোন ধরি।
অন্য প্রান্ত
থেকে শুধু
বলল, মিসেস
নেহরুকে কাল
সকালে গ্রেফতার
করা হবে।
তারপর ফোন
রেখে দেয়।
এর বেশি
কিছু জানা
গেল না,
কিন্তু সতর্ক
হওয়া গেল।
কিছু কাগজপত্র
সরিয়ে ফেলা
হলো, মায়ের
জন্য স্যুটকেস
গোছানো হলো।
১৯৩০ সালের
১ জানুয়ারি।
নতুন বছরের
প্রথম দিন
ভোরে মাকে
গ্রেফতার করে
জেলে নেয়া
হলো। মা
যেন জেলে
যেতে পেরেই
খুশি, কিন্তু
আমার মধ্যে
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
হলো।
লবণ সত্যাগ্রহ
আন্দোলনের দিনগুলোয়
আমি কনভেন্টের
ছাত্রী। ফিরোজও
সেখানে পড়াশোনা
করছিল। সেদিন
পতাকা উত্তোলনের
কর্মসূচি ছিল।
আমার ধারণা,
ফিরোজই আমাকে
আগে দেখেছে।
কেউ একজন
পতাকা উত্তোলন
করছিলেন। আমি
সেখানে পৌঁছতেই
পুলিশ লাঠিচার্জ
শুরু করল।
পতাকা উত্তোলনকারী
লোকটিকে গ্রেফতার
করা হলে
তিনি তার
হাতের পতাকা
আমাকে দিয়ে
বললেন, পড়তে
দিও না।
আমি উত্তেজিত
ও গর্বিত
বোধ করলাম।
আমি পড়ে
গিয়ে আহত
হলেও পতাকাটি
পড়তে দিইনি।
কেউ একজন
আমার হাত
থেকে পতাকাটি
তুলে নেন।
লাঠিচার্জের সঙ্গে
সেই আমার
প্রথম পরিচয়।
১৬ বছর বয়সে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে যোগ দিলাম। ভোর ৪টায় ঘুম থেকে উঠতে হতো, নিজের কাপড়চোপড় আমাকেই ধুতে হতো, রুম পরিষ্কারও নিজেই করতাম। পড়ার ফাঁকে ছবি আঁকা ও নাচ শেখায় ব্যস্ত থাকতাম। আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমাদের কাজ দেখার জন্য তিনি ঘন ঘন আসতেন। মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে তার উৎসাহ অনেক। কখনো নাচের ক্লাস তার বাড়িতেই হতো। তার কাছে নির্ধারিত সময়ের বাইরে অনধিকার প্রবেশের সাহস পাইনি। সাংস্কৃতিক অনুশীলন চলত সন্ধ্যার পর। আমরা পায়ের কাছে আসন গ্রহণ করতাম। তিনি কখনো আবৃত্তি করতেন, উঁচু কণ্ঠে কিছু পাঠ করে শোনাতেন। আমরা তার ছবি আঁকা দেখতাম। তিনি চেয়েছিলেন, বিশ্বভারতীতে বিশ্বমানব গড়ে উঠবে। ভারতীয় হিসেবে তিনি গর্ববোধ করতেন। গুরুদেব মুক্তি বলতে কেবল দাসত্ব থেকে মুক্তি বুঝতেন না। কুসংস্কার দাসত্ব ও সংকীর্ণতা থেকেও মুক্তি ছিল তার কাম্য।
সারা রাত
ভারতীয় সংগীতের
আসর বসত।
শনিবারের প্রদর্শনীর
জন্য সাজসজ্জা
করতাম। শান্তিনিকেতন
ছিল শিল্প
ও শান্তির
জন্য নিবেদিত।
সেখানে অনেক
বিদেশী ছাত্রছাত্রী
আসত। হাঙ্গেরির
একজন শিল্পীর
সঙ্গে আমার
বচসা হয়।
তিনি বিরক্তি
সৃষ্টি করতেন,
ক্লাসে ঢোকার
সময় জুতো
খুলতে অস্বীকৃতি
জানাতেন। সেখানে
নন্দনাল বসুর
মতো বিখ্যাত
ভারতীয় শিল্পী
আমাদের শিক্ষক
ছিলেন। আমি
সেখানে খানিকটা
জার্মান ভাষা
শিখেছি।
বাবা জেল
থেকে বেরোনোর
পর ২৬
মার্চ ১৯৪২
ফিরোজ আর
আমার বিয়ে
হয়ে গেল।
ফিরোজ পার্সি
হওয়ায় তাকে
বিয়ে করা
নিয়ে অনেকের
আপত্তি ছিল,
সমালোচনার ঝড়ও
উঠেছিল। তাকে
বিয়ে করার
মধ্য দিয়ে
ভারতীয় প্রতিষ্ঠিত
রীতির বরখেলাপ
করেছিলাম। যদিও
এ ধরনের
মিশ্র বিয়ে
আগেও হয়েছে,
কিন্তু সাধারণ
মানুষের কাছে
যেন এটাই
ছিল প্রথম
রীতি ভাঙা
বিয়ে। এ
বিয়েতে আমার
পরিবারেও বিমর্ষতা
নেমে আসে।
তবে যাদের
বেশি রেগে
যাওয়ার কথা
ছিল, যেমন
আমার নানি
খুব সহজেই
মেনে নিয়েছিলেন।
আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক





