ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী বলতে দক্ষিণ এশিয়ার একজন রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রীর চেহারাই ভেসে ওঠে। কিন্তু ইন্দিরা নিজেকে নাকি ভাবতেন একজন প্রকৃতিবাদী। এ নিয়ে বিশদ আলোচনায় যাওয়ার আগে শুরুতেই একটা ছোট তথ্য দিয়ে রাখা যাক। ১৯৮৪ সালের ৩ নভেম্বর নিহত ইন্দিরা গান্ধীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এতে অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন দেশের ক্ষমতাধর নেতারা। আমেরিকান যে দলটি এসেছিল তাদের মধ্যে ছিলেন একজন বিশ্বখ্যাত পক্ষীবিদ, যার সঙ্গে ইন্দিরার যোগাযোগ ছিল দীর্ঘ তিন দশকের। আর ইন্দিরার দেহ চিতার আগুনে পোড়ার আটদিন পর দেহভস্ম তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল হিমালয়ের বুকে। এ হিমালয়ের সঙ্গে তার ছিল অক্ষয় বন্ধন।

ভারতীয় ইতিহাসবিদ, লেখক জয়রাম রামেশ তার ইন্দিরা গান্ধী: আ লাইফ ইন নেচার বইতে জানিয়েছেন, সত্যিকার অর্থে ইন্দিরা যা এবং নিজেকে তিনি যা ভাবতেন তা হলো প্রকৃতিবাদী, ন্যাচারালিস্ট। রাজনীতির ঘূর্ণিতে তার জীবন আটকে পড়েছিল ঠিক, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী ভালোবাসতেন পাহাড়, পাথর, গাছ আর বন। নগরায়ণ ও শিল্পায়নের পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও তিনি প্রবল দুশ্চিন্তায় থাকতেন। এ থেকেই মোটামুটি আঁচ করা যায় তার প্রকৃতিপ্রেমের গভীরতা কেমন ছিল। এখানে স্মরণ করা যায় মোগল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের কথা। শাসন আর নানা কাজের মধ্যেও ব্যক্তিজীবনে প্রকৃতি ও পশু-পক্ষী নিয়ে তার আগ্রহ-প্রেম বিস্ময়কর।

ইন্দিরার মনে প্রকৃতির প্রতি টান তৈরি শুরু হয়েছিল তার ছোটবেলাতেই। বাবা জওহরলাল নেহরুর কাছ থেকেই তিনি দুটো আগ্রহের বিষয় পেয়েছিলেন, যা তাকে সঙ্গ দিয়েছিল সারা জীবন। তার মধ্যে একটি ছিল ইতিহাস আর অন্যটি ছিল প্রকৃতিপ্রেম। বলতে গেলে মেয়ের শিক্ষা ও জ্ঞানের দিগন্ত বিস্তৃত করেছেন জওহরলাল নেহরু নিজেই।

নানা সময়ে নানা জায়গা থেকে বাবার লেখা চিঠিগুলো যে তার মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে তা বোঝা যায় ১৯৭২ সালের ১৪ জুনে স্টকহোমে জাতিসংঘের মানব পরিবেশ নিয়ে আয়োজিত সম্মেলনে তার বক্তব্য থেকে। সেখানে তিনি বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে আত্মীয়তার এক ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠার ভাগ্য হয়েছে আমার। পাখি, গাছ, পাথরের সঙ্গে যেন আত্মীয়তা গড়ে উঠেছিল। তারা ভরা আকাশের নিচে ঘুমানোর সৌভাগ্যও আমার হয়েছে। সে সময়ে নক্ষত্রপুঞ্জের নাম আর তাদের গতিবিধিও পুরোপুরি মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

মুসৌরিতে থাকার সময়ে যখন ইন্দিরা ১১ বছর বয়সে পা দিতে যাচ্ছেন সে সময়ে এলাহাবাদ থেকে তাকে চিঠি পাঠান নেহরু। পরে সেসব চিঠি সংকলন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলে এক জায়গায় ইন্দিরা গান্ধী লেখেন, এসব চিঠিতে পৃথিবীর শুরু নিয়ে কথা ছিল। চিঠিগুলো আমাকে প্রকৃতিকে একটি বই হিসেবে বিবেচনা করতে শেখায়। পাথর ও গাছ নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করেছি আমি, পোকামাকড়ের জীবন নিয়েও পড়েছি আর রাতে চোখ রেখেছি তারাদের দিকে।


তবে শুধু চিঠি দিয়েই নয়, বাবার দেয়া বই থেকেও প্রকৃতির প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল ইন্দিরার। তার মধ্যে নাম উল্লেখ করা যায় সুপরিচিত নোবেলজয়ী বেলজিয়ান লেখক মরিস মেটারলিঙ্কের লেখা দ্য লাইফ অব দ্য বি বইয়ের। সেই বইয়ের কথা পরে তিনি ফিরতি চিঠিতেও উল্লেখ করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, বইটা তিনি খুব উপভোগ করেছেন। এমনকি সে সময়ে একই লেখকের লেখা দ্য লাইফ অব দ্য অ্যান্ট বইও কয়েক পাতা পড়েছেন বলে জানান তিনি। তবে পিঁপড়া নিয়ে তখনো তিনি ভালো বুঝে উঠতে পারেননি বলে চিঠিতে বাবাকে লিখেছিলেন।

ছোটবেলার সেই প্রকৃতিপ্রেম ইন্দিরা গান্ধী বয়ে নিয়ে গিয়েছেন সারা জীবন। তাই তো পরবর্তী সময়ে একা হাতে তিনি দুটি আইন তৈরির পথ সৃষ্টি করেন। তার একটি ছিল বন্যপ্রাণী সুরক্ষা নিয়ে আর অন্যটি বন সংরক্ষণ নিয়ে। তখন থেকে এখনো সেসব আইন ভারতে সচল রয়েছে। বায়ুদূষণ ও জলবায়ু নিয়েও আজকে যেসব আইন ভারতে প্রচলিত রয়েছে, সেগুলো তার আমলেই প্রণয়ন করা হয়েছিল। ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্প—প্রজেক্ট টাইগার ইন্দিরা গান্ধী করেছিলেন। এছাড়া সিংহ, কুমির, সারস, হরিণ, বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন পাখি রক্ষার জন্য তিনি বিভিন্ন আইন প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা নেন।

জীবন ও ব্যক্তিত্ব গঠনে মা কমলা নেহরুর ভূমিকার কথাও স্বীকার করেন ইন্দিরা গান্ধী। যদিও তার মতে, সেই বোধটাকে আরো দৃঢ় করেছিলেন তার ছোট মামা কৈলাস নাথ কৌল। প্রকৃতির জন্য উদ্বেগও সৃষ্টি করেন তিনিই। মামাবাড়ির কথার স্মৃতিচারণ করে ইন্দিরা গান্ধী নিজেই জানান, ছোট মামার প্রাণিবিদ্যা ও উদ্ভিদবিদ্যার প্রতি খুব আগ্রহ ছিল। সাপের প্রতিও তার তীব্র আকর্ষণ ছিল। ফলে বাড়িতে যেকোনো কিছু খুললেই একটা করে সাপ নজরে পড়ত। আর এভাবে সাপ বেরিয়ে আসার বিষয়টা নানির জন্য খুব ভীতিকর ছিল। কিন্তু মামাই আমাকে সাপ ও প্রাণীর সঙ্গে পরিচিত করে তোলে।

কাশ্মীরের চিনার গাছের প্রতি আকর্ষণ ছিল ইন্দিরার। পাহাড় ছিল তার খুব প্রিয়। ছেলেবেলায় প্রতি বছরের গ্রীষ্মের ছুটিতে কোনো না কোনো পাহাড়ে বেড়াতে যেতেন। একসময় সেই সফরের পরিমাণ এত বেশি হয়েছিল যে দাদি গিয়ে তার দাদুকে বলতেন, পাহাড়েই একটা বাড়ি বানিয়ে ফেলো না? জবাবে দাদু বলতেন, তাহলে তো ওরা প্রতিবার একই জায়গায় যাবে। তার চেয়ে বরং এই ভালো। একেকবার একেক পাহাড়ে ঘুরে আসবে।

দেশের দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে ইন্দিরা একবার এলাহাবাদের কারাগারে বন্দি ছিলেন। সে সময় পাখি দেখা নিয়ে তার দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহ তৈরি হয়। ভারতীয় পাখি নিয়ে এক বইতে ১৯৫৯ সালে তিনি লেখেন, বেশির ভাগ ভারতীয়র মতোই সে সময় আমিও পাখিকে সাধারণ চোখেই দেখতাম। তখন আমার হাতে আসে সালিম আলীর দেরাদুন জেল থেকে লেখা দ্য বুক অব ইন্ডিয়ান বার্ডস বইটি। সেটা আমাকে ভাবতে শেখায় কত কিছু মিস করে গেছি আমি। সালিম আলীর সঙ্গে ইন্দিরার বেশ ভালো যোগাযোগ ছিল।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই প্রকৃতিপ্রেমকে ইন্দিরা গান্ধী তার দায়িত্বের অংশ হিসেবে নিয়েছিলেন। প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য দরকারি উদ্যোগ-আইন তৈরিতে মনোযোগ দেন। পুপুল জয়কারকে তিনি বলেন, আমি ফুল বা প্রাণীর চেয়ে গাছ বেশি ভালোবাসতাম। আমার কিছু পোষা প্রাণীও থাকত। কিন্তু গাছকে মনে করতাম জীবনদায়ী। গাছের ওপর উঠে বসে থাকতাম। কিছু জায়গা ছিল, যেখানে লুকিয়ে বসে বই পড়তাম। বিরক্ত করার মতো কেউ নেই। পুনের স্কুলে যাওয়ার সময়ও আমি এমন করেছি। সবার চিত্কার শুনতাম, ও কোথায় গেল! কিন্তু গাছ থেকে নেমে আসতাম তখনই যখন আমার মন চাইত।

একইভাবে বই পড়ে পাখির প্রতিও ভালোবাসা তৈরি হয় ইন্দিরা গান্ধীর। পরবর্তী সময়ে তিনি অভিবাসী পাখি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে সাইবেরীয় সারস রক্ষায় ১৯৮০ সালের শুরুর দিকে বেশকিছু পদক্ষেপও নেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পাওয়া তার বাসভবনও ছিল যেন একটা ছোটখাটো চিড়িয়াখানা। সেখানে কুকুর থাকত সবসময়ই। এছাড়া ছিল তোতা, পায়রা, কাঠবিড়ালি ইত্যাদি। পরে সেখানে যুক্ত হয় বাঘের ছানাও।

১৯৪০ সালের মাঝামাঝি পরিষ্কার বোঝা যায়, ইন্দিরা গান্ধীর পাখি নিয়ে জ্ঞান বেশ বিস্তৃত হয়েছে এবং তিনি পাহাড়ের প্রতি খুব বেশি আকৃষ্ট হয়ে গেছেন। পরবর্তী সময়ে সেটা আরো বেশি প্রকাশিত ও চর্চিত হয়েছে, যখন তিনি ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যেসব বই তিনি পড়েছেন, যেসব স্কুলে শিখেছেন, যেসব জায়গায় তিনি ছুটি কাটাতে গেছেন আর যাদের সঙ্গে খুব কাছ থেকে মিশেছেন, তারাই তার মনে প্রকৃতির প্রতি এক গভীর সম্পর্ক তৈরি করে দিয়েছে।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকৃতি সংরক্ষণবাদীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তিনি সবসময় তাদের সঙ্গে আলাপ করতেন বিভিন্ন বিষয়ে জানার আগ্রহ থেকে। ইন্দিরার দুয়ার তাদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

 

সূত্র: ইন্দিরা গান্ধী: আ লাইফ ইন নেচার, জয়রাম রমেশ

 

শর্মিলা সিনড্রেলা: সাংবাদিক