ইন্দিরা গান্ধীর দুই পুত্রবধূকে কেন্দ্র করে পরিবারে নানা সংকট তৈরি হয়েছিল। সঙ্গে ছিল দুই পুত্র রাজীব ও সঞ্জয়ের মধ্যে কে ইন্দিরার লিগ্যাসি এগিয়ে নেবেন সে প্রশ্নও। খুশবন্ত সিংয়ের বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইন্দিরার পক্ষপাত ছিল সঞ্জয়ের প্রতি। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকে কেন্দ্র করে পরিবারের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তিক্ততা। সংকটের সময় ইন্দিরা গান্ধীর সিদ্ধান্ত, পক্ষপাত, সঞ্জয় গান্ধীর আচরণ এসব বিষয়কে উসকে দিয়েছে। সব মিলিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর পরিবারের এ ঘটনাগুলো অনেক সময় চিরাচরিত পারিবারিক দ্বন্দ্বের কাহিনী বলে মনে হতে পারে।

দুই পুত্রবধূ সোনিয়া ও মেনকার মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী বরাবরই সোনিয়ার প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছেন। অবশ্য খুব স্পষ্ট কিংবা মেনকা গান্ধীকে ছোট করে পক্ষপাত দেখানো হয়েছে এমন কথা কেউ বলে না। ১৯৭৪ সালে সঞ্জয় গান্ধী যখন মেনকা গান্ধীকে বিয়ে করলেন, সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারের চালচিত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। মেনকা তরুণী ছিলেন এবং সোনিয়া ততদিনে পরিবারের বড় বৌ হওয়ার কারণে দেখাশোনার বিষয়ে বেশি মনোযোগ দিতেন। খাবারের মেনু থেকে রান্নাঘরের দায়িত্ব তার হাতেই ছিল। রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়ে মেনকার তেমন আগ্রহ ছিল না বলে কোনো সমস্যা হলো না সেখানে। সোনিয়া গান্ধী শুরু থেকেই একজন আদর্শ গৃহবধূর মতো করে নিজেকে গড়ে নিয়েছিলেন। কিংবা তিনি মানসিকভাবেই তেমন ছিলেন। রাজনীতিতে কোনো আগ্রহ তার ছিল না। ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধীর পরাজয়ের পর পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর ভবন ছেড়ে দিতে হয়। ইন্দিরা তার পুরো পরিবার নিয়ে ১২ উইলিংডন ক্রিসেন্টের বাড়িতে ওঠেন। বাড়িটি ছিল তাদের পূর্ববর্তী আবাসের তুলনায় অনেক ছোট। এ সময়েই সোনিয়া ইন্দিরা গান্ধীর মনে আরো বেশি জায়গা করে নেন। সোনিয়া নিজেই দুই বেলার খাবার রান্না করার পাশাপাশি রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার দেখাশোনা করতেন। কাজের লোক যথাসম্ভব কম রেখে বড় একটি পরিবার সামলানো কঠিন। পাশাপাশি ইন্দিরার পরিবারের পুরনো রাঁধুনি মারা যাওয়ার পর নতুন কাউকে নিয়োগ করার ক্ষেত্রে ইন্দিরা ভরসা করতে পারছিলেন না। সোনিয়া নিজেই সব হাতে তুলে নিয়েছিলেন।

কিন্তু সংসারে সবকিছু সামলে চলা তো এত সহজ নয়। সঞ্জয় গান্ধী এ সময়ে নানা ছুতো নিয়ে সোনিয়া ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন। এর মধ্যে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন বিকে নেহরু। একদিন একটি ডিম ঠিকমতো ভাজা হয়নি বলে সঞ্জয় সেটা সোনিয়ার দিকে ছুঁড়ে মেরেছিলেন। সঞ্জয়কে নিয়ে নানা রকম কথাই প্রচলিত আছে। রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ তার ছিল এবং কূটবুদ্ধিও। সোনিয়াকে এক সময় তিনি মারুতি টেকনিক্যাল সার্ভিসেসের ডিরেক্টর হিসেবে নিয়োগ করেন। এতে সোনিয়ার নিয়মিত বেতনের পাশাপাশি ১ শতাংশ কমিশন, বাড়ি, ভ্রমণ ইত্যাদি সুবিধাদি দেয়ার কথা ছিল। সোনিয়া সে সময়ে এ বিষয় সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না। পরে জানা যায় একজন বিদেশী নাগরিক হিসেবে তিনি এ ধরনের কোনো দায়িত্বে থাকতে পারেন না। সঞ্জয় মূলত সোনিয়াকে সামনে রেখে নিজের লাভ লুটতে চেয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানটি নানা রকম আর্থিক লেনদেন, ঋণ গ্রহণ করেছিল। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে তদন্ত কমিশনও গঠিত হয়। ১৯৭৫ সালের ২১ জানুয়ারি সোনিয়া এ পদ থেকে ইস্তফা দেন। রাজিব গান্ধীর শাসনামলে বিষয়টি পুনরায় সামনে আনা হয়। নিশ্চিত করা হয়, সোনিয়া কখনই তার ২ হাজার ৫০০ রুপির বেতন গ্রহণ করেননি বা মারুতির অফিস, ফ্যাক্টরিতে যাননি।

ইন্দিরা গান্ধীর দুঃসময়ে অর্থাৎ ১৯৭৭ সালের পর জনতা সরকার তার বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। ইন্দিরা গান্ধীর শাসনের সময়কার নানা বিষয় সামনে তুলে এনে তার জনপ্রিয়তা নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছে। মেনকা গান্ধী সে সময়ে ‘সূর্য’ নামক একটি ম্যাগাজিনের মাধ্যমে ইন্দিরা ও পরিবারের ইমেজ রক্ষা করার চেষ্টা করেন। মেনকা এ সময়ে নিজেকে পরিবারের রক্ষাকর্তা হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন এবং বিষয়টি যেন সবাই স্বীকার করে তিনি সেটাও চাইতেন। কিন্তু দেখা গেল ইন্দিরা গান্ধী মূলত সোনিয়ার প্রতিই নির্ভরশীল। পারিবারিক জটিলতা এ সময়ে কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল সে সম্পর্কে বিকে নেহরু তার নাইস গাইজ ফিনিশ সেকেন্ড স্মৃতিচারণে লেখেন, ‘সমস্যাগুলো এমন ছিল যে সোনিয়া ছিল রাঁধুনি আর মেনকা মাঝেমধ্যেই খেত না। ইন্দিরার দুই পুত্র এবং পুত্রবধূ নিশ্চিতভাবেই ভালো সময় পার করছিলেন না।’ সাংবাদিক-লেখক খুশবন্ত সিং লিখেছেন, ‘রাজিব আর সোনিয়া তাদের ছেলেমেয়েদের জন্মদিন উদযাপনকালে আমি একবার সেখানে গিয়েছিলাম। আমি খেয়াল করলাম দুই ভাই ও তাদের স্ত্রীরা বাড়ির দুই আলাদা প্রান্তে বসে আছে। তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ খুবই কম।’

ইন্দিরা গান্ধীর পক্ষপাতের পাশাপাশি তার দুই পুত্রের মতো দুই পুত্রবধূর চারিত্রিক পার্থক্য ছিল খুব বেশি। সোনিয়া ছিলেন শান্ত ও মিতভাষী। জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে সোনিয়া এবং রাজিব কারোর সায় ছিল না কিন্তু তারা এ বিষয়ে নীরব ছিলেন। রাজনীতিতেও এদের কারও আগ্রহ ছিল না। এমনকি রাজিব গান্ধীকে রাজনীতিতে আনার প্রসঙ্গে সোনিয়া বরাবর নিজের অসম্মতি প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে মেনকা ছিলেন উচ্চাভিলাষী। কথাবার্তার ক্ষেত্রে কখনো তার লাগাম ছিল না। নতুন বউ হয়ে আসার পর ঘরের কাজে তার আগ্রহ না থাকলেও ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বসে তার ভাষণ ঠিক করে দিতে দিতে মেনকার মধ্যে রাজনীতি করার ইচ্ছা তৈরি হয়েছিল। এক পর্যায়ে মেনকার মা অমিতেশ্বর আনন্দ ইন্দিরা গান্ধীর পার্শ্বচর হয়ে ওঠেন। তিনি এ পরিবারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করতেন। সঞ্জয়ের আমলে পরিবারটি অল্পদিনে অর্থ ও রাজনৈতিক দিক থেকে ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করলে মানুষের মধ্যে নানা কথা উঠতে শুরু করে।

সোনিয়ার নীরবভাবে পারিবারিক দায়িত্বপালন তাকে ইন্দিরার প্রিয় করে তুলেছিল। ইন্দিরা গান্ধীর পারিবারিক বন্ধু পুপুল জয়কার ও মোহসিনা কিদোয়াই এ বিষয়ে বেশকিছু কারণ দেখান। কিদোয়াই বলেন, ‘অনেক দিক থেকে তিনি ভারতীয় নারীদের চেয়েও ভারতীয় ছিলেন। কারুশিল্প, পুরনো জিনিসের প্রতি তার (সোনিয়ার) রুচির তারিফ ইন্দিরাজি সব সময়েই করতেন।’ সীমান্ত গান্ধী বলে পরিচিত আবদুল গাফফার খান ভারতে এলে তার দেখভালের দায়িত্ব সোনিয়া সুচারুরূপে পালন করেন।

কিন্তু এহেন ‘ভালো বৌ’ সোনিয়া গান্ধী পরিবারে শান্তিরক্ষায় মেনকার সঙ্গে সমঝোতা করেননি। অবশ্য মেনকা ও সঞ্জয় তার সঙ্গে যেমন খারাপ ব্যবহার করেছেন তাতে সোনিয়ার কাছের লোকদের মতে এটা তার স্বাভাবিকভাবেই করার কথা। তবে সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যুর পর ইন্দিরা গান্ধী মেনকাকে নিজের সহকারী করার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু এ সময়ে সোনিয়া গান্ধী এ বিষয়ে বাদ সাধেন। তার বাধা দেয়ার কারণ ছিল মেনকার হিসাব না করে কথা বলা এবং উচ্চাভিলাষ। অবশ্য মেনকা গান্ধীর মতে, সঞ্জয় মারা যাওয়ার পর ইন্দিরার বাড়িতে তার ঠাঁই ছিল না। তার ভাষায়, ‘আমি তাদের কাছে শুধু মেনকা ছাড়া আর কিছু ছিলাম না।’ কিন্তু আদতে মেনকার উচ্চাভিলাষ, নিজস্ব পার্টি তৈরি করা এবং সেখানে গান্ধী-নেহরু পরিবার নিয়ে নানা রকম বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করায় ইন্দিরা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধ্য হন।

কথিত আছে, জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধী তার বিশ্বস্ত লোকজন নিয়ে তার মায়ের ক্ষমতা ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ভারত নিয়ন্ত্রণ করতেন। দেখা যায় আসলে ওই সময়ের পরেই সঞ্জয়ের মেজাজ খিটখিটে হয় এবং সঞ্জয়-মেনকার উচ্চাভিলাষ পূর্ণতা না পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে সংকট তৈরি হয়। মেনকা গান্ধী গান্ধী-নেহরু পরিবারের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধারণ না করলেও পরিবারকে ব্যবহার করার একটা প্রবণতা তার ছিল। সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর তিনি আবেগ এবং অন্যান্য সুবিধা ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। রাজনীতিতে আগ্রহী না হলেও সোনিয়ার দূরদৃষ্টিতে এসব ধরা পড়েছিল। কিন্তু আরো গভীরে হয়তো বিষয়টা অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের দুই বধূর দ্বন্দ্ব থেকেই সূত্রপাত, যেখানে সোনিয়া নীরব এবং মেনকা আজও সরব।

 

আলী আমজাদ: লেখক