জোসেফ স্ট্যালিন (জন্ম ১৮ ডিসেম্বর ১৮৭৮, মৃত্যু ৫ মার্চ ১৯৬৩) সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির সেন্ট্রাল কমিটির মহাসচিবের দায়িত্ব নেন ৩ এপ্রিল ১৯২২ এবং ১৬ অক্টোবর ১৯৫২ পর্যন্ত পদটি ধরে রাখেন। ৬ মে ১৯৪১ থেকে ৫ মার্চ ১৯৫৩ পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিপরিষদের সভাপতি ছিলেন।
স্ট্যালিনের হাতে ক্ষমতা আসার পরই তিনি ম্যাক্সিম গোর্কিকে বিশেষ সম্মান দিয়ে পুনর্বাসিত করেন। তাঁর জন্মস্থান নিঝনি নভগরদ জেলার নাম বদলে ১৯৩২ সালে এর নামকরণ করেন গোর্কি। ১৯৩২-১৯৯০ এই সময় গোর্কি নাম বহাল ছিল, কিন্তু ১৯৯০-এর পর স্থানটি পূর্বনাম নিঝনি নভগরদ ফিরে পায়।
গোর্কিকে আরো সম্মানিত করার জন্য স্ট্যালিন ১৯৩০ দশকে নির্মিত পৃথিবীর সর্ববৃহত্ উড়োজাহাজের নাম দেন ম্যাক্সিম গোর্কি। স্ট্যালিন পৃথিবীকে একটি বার্তা দিতে চেয়েছেন, আকাশযান প্রযুক্তিতে সবার সেরা সোভিয়েত ইউনিয়ন।
উড়োজাহাজ বানানোর কাজটি করেন আদ্রে নিকোলেইভিচ টুপোলেভ। স্মর্তব্য জাহাজের মূল পরিচিতি তাঁর নামেই টুপোলেভ এএনটি-২০; সোহাগ করে কিংবা সম্মান করে দেয়া নাম ম্যাক্সিম গোর্কি। এটি স্ট্যালিনের প্রপাগান্ডা এয়ারক্রাফট। ৮০০ শ্রমিকের দুই বছরের দিন-রাত খাটাখাটুনির পর পৃথিবীর বৃহত্তম উড়োজাহাজ নির্মিত হলো।
ম্যাক্সিম গোর্কির বৈশিষ্ট্য:
মোট যাত্রী ধারণক্ষমতা : ৭২ জন
ক্রু : ৮ জন
দৈর্ঘ্য : ৩২.৯০ মিটার
উইং স্প্যান : ৬৩.০ মিটার
উচ্চতা : ১০.৬ মিটার
উইং এরিয়া : ৪৮৮ বর্গমিটার
এম্পটি ওয়েট : ২৮,৫০০ কেজি
লোডেড ওয়েট : ৪২,০০০ কেজি
ম্যাক্সিমাম টেক অফ ওয়েট : ৫৩,০০০ কেজি
পাওয়ার প্লান্ট : ৮টি
সর্বোচ্চ গতি : ২২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়
রেঞ্জ : ১,২০০ কিলোমিটার।
সম্পূর্ণ ধাতব পদার্থ ব্যবহার করে এয়ারফ্রেম তৈরির জার্মান প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৪ জুলাই ১৯৩৩ থেকে ৩ এপ্রিল ১৯৩৪-এর মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা হয়। ম্যাক্সিম গোর্কির ৪০ বছরের সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবার স্বীকৃতি হিসেবে উড়োজাহাজটির নামকরণ করা হয় ম্যাক্সিম গোর্কি। বলাই বাহুল্য, পেছনে জোসেফ স্ট্যালিনের নির্দেশ না থাকলে অন্য কারো পক্ষে এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হতো না। এএনটি-২০ সে সময়কার সর্ববৃহত্ উড়োজাহাজ।
স্ট্যালিনের প্রপাগান্ডা জাহাজ হিসেবে এতে স্থাপন করা হয় রেডিও (ভয়েস ফ্রম দ্য স্কাই), ছাপাখানা, ফটোগ্রাফিক ল্যাবরেটরি, ফিল্ম প্রজেক্টর। প্রয়োজনে উড়োজাহাজটির বিভিন্ন অংশ খুলে গোটা উড়োজাহাজটিকে ট্রেনে পরিবহন সম্ভব। এটিতে প্রথম ডিরেক্ট কারেন্ট ও অলটারনেট কারেন্ট ব্যবহার করা হয়।
ভ্যাসিলি কুপ্তসভ ১৯৩৪ সালে ম্যাক্সিম গোর্কি উড়োজাহাজটিকে একটি বিখ্যাত তৈলচিত্রে ফুটিয়ে তোলেন। এটি সেন্ট পিটার্সবার্গ জাদুঘরের গ্যালারিতে স্থাপিত।
পৃথিবীর সর্ববৃহত্ ও বিস্ময়কর সামুদ্রিক জাহাজ টাইটানিকের উদ্বোধনী যাত্রাতেই সলিল সমাধি ঘটে। ম্যাক্সিম গোর্কিও দীর্ঘায়ু হয়নি।
১৯৩৫ সালের ১৮ মে মস্কোর আকাশে ছিল ম্যাক্সিম গোর্কির মহড়া। ম্যাক্সিম গোর্কির ককপিটে দুই ক্যাপ্টেন আইভি মিখাইয়েভ ও আইএস জুরোভ। গোর্কি যখন আকাশে, তাকে এসকর্ট করবে আরো তিনটি ছোট ফাইটার প্লেন। পরিকল্পনা ছিল এমন, ম্যাক্সিম গোর্কিকে নিয়ে মোট চারটি উড়োজাহাজ যখন কাছাকাছি দূরত্বে একসঙ্গে থাকবে, ম্যাক্সিম গোর্কি আসলে কত বড় তা তুলনা করা সহজ হবে। ছোট ফাইটারের পাইলট নিকোলাই ব্ল্যাগিন তার উড়োজাহাজ নিয়ে ম্যাক্সিম গোর্কির কাছে দুটো চক্কর সাফল্যের সঙ্গে দিয়ে তৃতীয় চক্করের সময় উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়— দুটোই বিধ্বস্ত হয়। ম্যাক্সিম গোর্কি পতিত হয় নিকটবর্তী লোকালয়ে।
এ দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত হয়। গোর্কির দুই ক্যাপ্টেন, ৩৩ জন যাত্রী এবং এই উড়োজাহাজ নির্মাতাদের কয়েকজন ও তাদের নিকটজন। ফাইটারের পাইলট ব্ল্যাগিনের খামখেয়ালিপূর্ণ চালনাকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়ে থাকে। অবশ্য পরবর্তী সময়ের একটি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্ল্যাগিন অত্যন্ত সচেতনভাবেই দুর্ঘটনাটি ঘটিয়েছে।
ম্যাক্সিম গোর্কির প্রতিস্থাপক একটি উড়োজাহাজ তৈরি করা হয় এবং ১৯৩৮ সালে তা প্রথম আকাশে ওড়ে। একই ডিজাইনের হলেও আরো বেশি ক্ষমতার ছয়টি ইঞ্জিন সংযুক্ত করা হয়। এরোফ্লোতের হয়ে জাহাজটি রাশিয়া ও উজবেকিস্তান রুটে চলাচল করত। ১৯৪২ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাইলটের ভ্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে এটিও নোজডাইভ দিয়ে বিধ্বস্ত হয়। ক্রুসহ মোট ৩৬ জনের তাত্ক্ষণিক মৃত্যু ঘটে।
নতুন ম্যাক্সিম গোর্কিকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এটিকে বলা হয়েছে ‘অপ্রয়োজনীয় তিমি’— ততদিনে অনেক দ্রুতগামী সামরিক উড়োজাহাজ অন্যান্য দেশের বহরে যোগ হয়েছে।
ম্যাক্সিম গোর্কির মহড়া ফ্লাইটে যাত্রী হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন রাশিয়ার জন্য ট্রাক রেডিয়েটর নির্মাণ প্রকৌশলী মরিস হোয়াইট সিনিয়র। কর্মদক্ষতার কারণে তাকে মনোনয়ন দেয়া। তিনি তার দুই ছেলেকেও সঙ্গে নেবেন। সকালে কোম্পানির ড্রাইভার তিনজনকে গাড়িতে তুলল নির্ধারিত সময়ের বেশ পরে, তার পর মস্কো এয়ারপোর্টের পথও ভুল করল। তারা যখন পৌঁছলেন গেট বন্ধ, ম্যাক্সিম গোর্কি তখন উড়ে যাচ্ছে। তাদের খুব আফসোস ছিল, জীবনে এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া হলো।
কিছু সময় পর মহড়া দিতে দিতে ম্যাক্সিম গোর্কি বিধ্বস্ত হলো। ফ্ল্যাগশিপ ম্যাক্সিম গোর্কির ভেতরের ছাপাখানা প্রতি ঘণ্টায় ১২ হাজার পাতা ছাপতে পারত। বিভিন্ন রকম প্রচারপত্র উড়োজাহাজ থেকে ছাড়া হতো। প্রচারপত্রের ওপর লেখা থাকত, ‘ম্যাক্সিম গোর্কি প্রপাগান্ডা স্কোয়াড্রনের উড়োজাহাজ থেকে নিক্ষিপ্ত’।
ম্যাক্সিম গোর্কিকে বলা হলো স্ট্যালিনের ‘ফ্লাইং সার্কাস’।
মাত্র ১২টি ফ্লাইট করার পরই ‘অতিরিক্ত ভারী ও সীমিত উত্তোলনশক্তি’র ‘শ্বেতহস্তী’ ম্যাক্সিম ‘অ্যারিয়াল হুলিয়ান’ নিকোলাই ব্ল্যাগিনের কারণে বিধ্বস্ত হলো।




