নিচু হলেন আসাদ সাহেব। বাঁ পায়ের জুতাটা খুললেন। মোজার ওপর হাত রাখলেন। চুলকালেন একটু। তার পর তাকালেন চারপাশে। না, দেখছে না কেউ। চকিতে তুলে নিলেন মানিব্যাগটা। আবার তাকালেন। সবাই বসে আছে আপন মনে। যে যার মতো। কেউ খেয়াল করেনি। নিশ্চিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
দাঁড়িয়েই থাকতে হলো বেশ কিছুক্ষণ। সিট ফাঁকা হলো একটা। বসলেন সেটায়।
ততক্ষণে ঘাম ছুটে গেছে তার! কী সময়টাই না কাটল! বারবার পকেটে হাত দিচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল কেউ বোধহয় দেখে ফেলেছে। মনে হচ্ছিল সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে। তারই দিকে! সবার চোখের সামনে তিনি দাঁড়িয়ে। পকেটে তার কুড়িয়ে পাওয়া মানিব্যাগ। মনে হচ্ছিল এই বুঝি কেউ এসে পকেট হাতড়াবে। ধরা পড়ে যাবেন তিনি। এই বয়সে এ কেলেঙ্কারি! মুখ দেখাবেন কী করে? মুখ তিনি এখনই দেখাতে পারছেন না! কারো চোখে চোখ রাখতেও লজ্জা করছে। ছোট মনে হচ্ছে নিজেকে।
সায়েন্স ল্যাব মোড়। দাঁড়িয়েই আছে বাসটা। সামনে বিশাল লাইন। এক চুলও নড়ছে না গাড়িগুলো। আজ আবার দেরি হবে। প্রতিদিনের মতো। হোক। চিন্তা করে কী হবে? একটু বরং ঘুমিয়ে নিন। এ সময় তিনি আসলেই ঘুমান। কিন্তু পারছেন না আজ। চোখ বুজলেই নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। অপরাধীর মতো। কাঠগড়ায়। ঘুমানো গেল না তাই। যদিও ঘুমটা দরকার ছিল খুব।
ফিরতে দেরি হয়েছে কাল। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল। গেলেন না। ইচ্ছা করছিল না আসলে। কিছু করারও ছিল না। তাই ভালো লাগছিল না কিছুই। মেয়ের ঘরে গেলেন একটু। বসলেন। পড়াশোনার খোঁজখবর নিলেন। এ কথা, সে কথা বললেন। টিউটরের কথা জিজ্ঞেস করলেন। তার বাসায় কে কে আছে জানতে চাইলেন।
মা আর বড় ভাই। খুব গরিব মানুষ স্যাররা। টর টর করে বলে দিল স্মৃতি।
কথা বলতে বলতেই কাজ করে চলেছে মেয়েটা। জানালাগুলো বন্ধ করল। পর্দা টানল। মশার কয়েল জ্বালাল। পড়ার টেবিল গুছিয়ে নিল। তার পর পড়তে বসল।
কত বড় হয়ে গেছে মেয়েটা! দেখতে দেখতে!
কিছু একটা বলতে চাইছিলেন তিনি। কী একটা ভেবে আর বললেন না। কিছুক্ষণ বসে থাকলেন। চুপচাপ। তার পর উঠে পড়লেন। নিজের ঘরে গেলেন। কিছু করার নেই। ভালো লাগছে না কিছুই।
একটু পায়চারী করলেন। তার পর ডায়েরিটা খুলে বসলেন। আগে প্রতিদিন লিখতেন। এখন আর হয়ে ওঠে না। আগের কিছু লেখা পড়লেন। ভালো লাগল। ছোট ছোট সব ঘটনা। অনেকগুলো তো ভুলেই গেছেন। মনে পড়ল। স্মৃতিকাতর হলেন। অনেকবারের মতো আবার সিদ্ধান্ত নিলেন রোজ ডায়েরি লিখবেন। আবার।
মনে হলো আজকের ঘটনাটাও লিখে রাখা দরকার। না হলে ভুলে যাবেন হয়তো।
লেখাটা খুব সংক্ষিপ্ত হলো। আড়াই পৃষ্ঠার পর এগোল না। তিনি চেষ্টাও করলেন না আর।
কিছু লিখলেই তা একবার পড়ে দেখা অভ্যাস তার। পড়লেন।
এবং অবাক হলেন। লিখতে বসলে কত কিছু মনে আসে! কত ছোট ছোট ঘটনা! খুঁটিনাটি কথা!
আকারে ছোট হলেও বছরখানেক সময় উঠে এসেছে লেখাটায়। শুরু হয়েছে দু’বছর আগে থেকে।
মেয়েটাকে নিয়ে তখন মহাঝামেলা। কোনো টিচারকেই সহ্য করতে পারে না সে। মাস গেলেই টিউটর বদলাতে হয়। টাকার মানে টাকাও যায়, আবার পড়াশোনাও হয় না। শেষে পড়াতে চাই বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করলেন এক নম্বরে। পরিচয় হলো বেলালের সঙ্গে।
খুব সাধারণ একটা ছেলে। মনে হয়েছিল এর কাছে ১০ দিনও পড়বে না স্মৃতি। কিন্তু ১০ দিন না যেতেই ভুলটা ভাঙল। আবিষ্কার করলেন, মেয়েটা মুগ্ধ হয়ে পড়ছে।
দিন দিন সে মুগ্ধতা বেড়েছে বৈকি!
ক’দিন পরই বেলালের সম্মানী বাড়ানোর জন্য চাপ দিল সে!
অবাক লাগে আসাদ সাহেবের। বিরক্তও হন। এতটুকুন মেয়ের কাছে টাকার কথা বলে! ছেলেটার কি বিবেক-বুদ্ধি নেই! ভাবলেন ভুল করে বলে ফেলেছে। আর নিশ্চয় বলবে না। তাই কিছু বললেন না। না মেয়েকে, না বেলালকে।
কিন্তু আবার ঘটল ঘটনাটা।
এর পর আরেক দিন। এবার একটু অন্যভাবে।
বাবার পাকা চুল বেছে দিচ্ছিল স্মৃতি। এ কথা, সে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ স্যারের প্রসঙ্গ উঠাল সে।
স্যারের বেতন বাবা বাড়াচ্ছে না তো কী হয়েছে! সে ঠিকই বাড়িয়ে দিচ্ছে!
কান খাড়া করলেন আসাদ সাহেব। বলে কি মেয়েটা! কীভাবে?
ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়। গর্ব করে বলল পিচ্চিটা। টিফিনের জন্য বাবা যে টাকা দেন, তার পুরোটা সে খায় না। জমিয়ে রাখে অল্প অল্প করে। খুব বেশি জমাতে পারে না। তবু। অল্প হলেও টাকা তো! মাস শেষে বাবার টাকার সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। স্যার ভাবেন, আসাদ সাহেব বাড়িয়ে দিয়েছেন।
সহ্য হয়? একটা বিহিত করতেই হবে। ডাকলেন বেলালকে। একটা শিক্ষা দেয়া দরকার পাজির হাড়টাকে।
এমন কিছু বলবেন যেন কেঁদে ফেলে সে।
এটা বলবেন। সেটা বলবেন। মনে মনে অনেকবার গুছিয়ে নিলেন।
কিন্তু কঠিন কিছু বলা হলো না।
স্মৃতির সঙ্গে টাকা-পয়সার ব্যাপারে আলাপ করতে বারণ করলেন। আর বললেন কোনো কিছুর দরকার হলে তাকে বলতে। বেলাল শুধু শুনে গেল। বলল না কিছুই।
এভাবেই কাটল কিছুক্ষণ। আরো কিছু বলবেন কিনা ভাবছেন। দেখলেন ছেলেটা কাঁদছে। অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন তিনি। কোনোমতে তাকে বিদায় দিলেন সে যাত্রা।
কিন্তু ঝামেলা বাঁধল স্মৃতিকে নিয়ে। পরের দুদিন ঠিকমতো কথা বলল না। কোনো ব্যাপারে রাগ করলে ও এমন করে। রাগের কারণ জিজ্ঞেস করলেন আসাদ সাহেব।
স্মৃতির রাগ গলে জল হলো। চোখে জড়াল। আর মুখে নামল অভিযোগের সুরে।
আসাদ সাহেব একটা পচা লোক! তিনি কিছুই বোঝেন না! না বুঝেই কথা বলেন! না হলে কেন তিনি তার স্যারকে বকেছেন! কেন তিনি স্যারকে কাঁদালেন! সব দেখেছে সে। অথচ স্যারের কোনো দোষ নেই। প্রতিদিনই এক কাপড়ে পড়াতে আসেন। জুতোটা সেলাই করানো। চুলগুলো উস্কখুস্ক। দেখে সে-ই বাবাকে বলেছে টাকা বাড়িয়ে দিতে। স্যার কিছুই বলেননি। অথচ... ইত্যাদি ইত্যাদি।
ভাষা হারালেন আসাদ সাহেব। মেয়েটা তার ছোট নেই আর! কতকিছু খেয়াল করে সে। বড় মানুষের মতো!
কানটান ধরে মাফ পেলেন কোনোমতে। দুঃখ প্রকাশ করলেন। মেয়ের কাছে। বেলালের কাছেও।
ক’দিন পরের ঘটনা।
সহকর্মী হালিম সাহেবের মেয়ের বিয়ে। দাওয়াতে গেছেন আসাদ সাহেব।
একটা ছেলের সঙ্গে পরিচয় হলো। নাম আরিফ। হালিম সাহেবের ছেলের টিউটর। কথায় কথায় জানা হলো ছেলেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ইংরেজি, দ্বিতীয় বর্ষে। তার মানে বেলালের ক্লাসমেট হওয়ার কথা। সরল মনেই বেলালের কথা তুললেন তিনি। কিন্তু ছেলেটার কথা শুনে মাথা গরম হয়ে গেল তার। বেলালকে সে চেনে। একই ফ্লোরে থাকে। পাশাপাশি রুম। তবে ইংলিশে পড়ে না বেলাল। কী একটা বিষয়ের নাম বলল ছেলেটা, মনে নেই আসাদ সাহেবের।
না থাক। যে বিষয়ই হোক, ইংরেজি তো না। তাকে ঠকিয়েছে ছেলেটা। এ তিনি সহ্য করবেন না। চরম অপমান করবেন পাজিটাকে।
ফেরার পথে টগবগ করতে থাকলেন।
কিন্তু বাসায় ফিরেই নিভে গেল সব।
ঘরে ঢুকতেই ছুটে এল স্মৃতি। জড়িয়ে ধরল তাকে। তার চিত্কার থামানো দায়!
কী এমন হয়েছে, যে এত আনন্দ?
ইংরেজিতে খুব ভালো করেছে সে। ক্লাসের সর্বোচ্চ! অথচ টেনেটুনে পাস করাই তার রীতি।
মেয়ে উড়ছে আনন্দে। আসাদ সাহেবেরও ওড়া উচিত। কিন্তু পারছেন না তিনি। বারবারই তার বেলালের কথা মনে পড়ছে। এক মন বলছে মিথ্যা বললেও পড়িয়েছে ভালো। আরেক মন টানছে উল্টো সুরে। ভালো পড়ালেই কি সব চুকে যাবে? না। তার সঙ্গে প্রতারণার জবাব তিনি দেবেনই! আসুক সে কাল।
কিন্তু বেলাল এল না সে রাতে।
পরের দিনও না।
তার পরের দিনও না।
প্রতি সন্ধ্যায় অপেক্ষা করেন তিনি।
অপেক্ষা করে স্মৃতিও। দরজা খুলে রাখে। সিঁড়ির দিকে চেয়ে থাকে। স্যারকে আনন্দের কথাটা না বললেই নয়!
কিন্তু বেলালের দেখা নেই।
না পেরে ফোন করলেন। বন্ধ।
ততদিনে রাগ কমে গেছে। মনে পড়ল ছেলেটা এ মাসের টাকাও নেয়নি। এটা কেমন হলো! খুব বিব্রত বোধ হলো তার। অস্বস্তি বোধ হলো।
অবশেষে দেখা পাওয়া গেল বেলালের। দুই সপ্তাহ পর।
সন্ধ্যার খবর দেখছিলেন। স্মৃতির ঘরে না ঢুকে বসার ঘরে এল বেলাল।
সামনে এসে দাঁড়াল।
বরাবরের মতো মাথা নিচু। হাত দুটো পেছনে। একটা আরেকটাকে ধরে রেখেছে।
আরিফের কাছ থেকে সব শুনেছে সে। খুব লজ্জিত। তাই এত দিন আসেনি। আসতও না কোনো দিন। কিন্তু কাজটা ঠিক হয়নি। তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। ক্ষমা চাইতেই এসেছে আজ।
রাগ দেখাতে পারলেন না আসাদ সাহেব। ছেলেটাকে সৎ বলেই মনে হয়। কেন এটা করেছে, জানা দরকার। সামনে বসালেন তাকে। তার পর জিজ্ঞেস করলেন কারণটা।
টিউটর চাইলেই মা-বাবারা ভালো ছাত্র খোঁজেন। ভালো ছাত্র মানে বুয়েটের ছাত্র। সায়েন্সের ছাত্র। কমার্সের ছাত্র। ভালো সাবজেক্টে পড়ে না বলে সে ভালো ছাত্র না। টিউশনি জোটে না। অথচ গণিতে আর ইংলিশে তার দখল ভালো। টিউশনি না হলে তার চলেও না। বাধ্য হয়েই তাই নাম ভাঙানো। তবে সাধ্যমতো পড়িয়েছে স্মৃতিকে। টিউশনিটা খুব দরকারও। তবু, তিনি না চাইলে আর আসবে না সে। অন্য কোনোভাবে বাঁচবে।
আসাদ সাহেব কিছু বলতে পারলেন না। না তাকে চলে যেতে, না আসতে। শুধু বললেন স্মৃতির রেজাল্ট হয়েছে। ভালো হয়েছে।
এর পর থেকে ভালোই হচ্ছে স্মৃতির ফল।
বেলালও আপন হয়ে গেছে। বিপদ-আপদে ছুটে আসে। যুক্তি-পরামর্শ দেয়। এ কাজ, সে কাজ করে দেয়। যেন পরিবারেরই একজন। সে রকমই ওঠাবসা। তেমনটাই ভাবেন আসাদ সাহেব। কিন্তু প্রকাশ করেন না। এদের এতকিছু বুঝতে দিতে নেই। দিলেই মাথায় ওঠে। বন্ধু হালিম সাহেব বলে দিয়েছেন। আরিফ নাকি তার মেজো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছিল। বুঝতে পেরে তাড়িয়ে দিয়েছেন। সাবধানে থাকতে বলেছেন।
বেলালকে তাই চোখে চোখে রাখেন তিনি। পুরুষ মানুষ দিয়ে বিশ্বাস নেই। মেয়েটাও কেমন ধা ধা করে বড় হচ্ছে। কী হতে কী হয় বলা যায় না। এমনিতেই স্যারের প্রতি মুগ্ধতার শেষ নেই তার। প্রায়ই স্যারের বেতন বাড়ানোর কথা বলে। এখনো।
আসাদ সাহেবও মনে করেন বাড়াবেন। কিন্তু পারেন না। মাঝারি চাকরি। বেতনের অর্ধেক যায় গ্রামে। মা আর পঙ্গু ভাইয়ের সংসারে। বাকিটার কিছু যায় ব্যাংকে। মেয়ের জন্য একটা ডিপিএস করে রেখেছেন। মা মরা মেয়ে। বাবাও মারা গেলে যেন পানিতে না পড়ে তার ব্যবস্থা। তার পড়াশোনার খরচ আছে। স্কুলের বেতন। কোচিং। বেলালের সম্মানী। সব বাদে যা থাকে তা দিয়ে সংসার চালানো।
খুব যে খারাপ চলে তা না। তবে বাড়তি খরচের জো নেই। বাড়তি এক টাকাও বের করতে পারবেন না তিনি। কেউ পিস্তল ঠেকালেও না। সম্মানীটা বাড়াবেন কোত্থেকে? পাগলী মেয়ে এতসব বোঝে না। তার শুধু জেদ। আর যুক্তি। আর গাল ফুলানো।
আশ্বাস দেন আসাদ সাহেব। আগামী মাসে বাড়াবেন। কিন্তু সেই আগামী মাস আর আসে না।
এর মধ্যেই শুনছেন ব্যবসার অবস্থা ভালো না। ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নানা উপায়ে চেষ্টা চলছে। টেবিলে টেবিলে টিস্যু পেপার দেয়া বন্ধ। দিনে একবারের বেশি চা খাওয়া নিষেধ। ইত্যাদি। এবং বাড়তি লোক ছাঁটাই।
চাকরি গেলে চলবে কী করে? ঘুম হচ্ছিল না তার।
দুশ্চিন্তার অবসান হলো কাল। ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত। মন দিয়ে কাজ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে বেশি করে খাটতে হবে। তা খাটবে। চাকরি হারানোর চেয়ে বেশি খাটা ভালো।
কী একটা কাজে তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলেন বস। তাদেরও যাওয়ার সুযোগ হলো। বের হলেন আসাদ সাহেব। বেরিয়েই মনে হলো অন্য দুনিয়ায় এসে পড়েছেন। গরম বাতাস। এসির মধ্যে থেকে থেকে স্বভাব বদলে গেছে। শরৎ শেষের ঠাণ্ডা বাতাসও গরম লাগে!
ঘড়িতে সাড়ে ৫টা। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে রাস্তাগুলো। আরেকটু পরই আসর পাতবে জ্যাম। এই জ্যামের কারণেই তার ঢাকায় থাকতে ইচ্ছা করে না। মেয়েটার পড়াশোনার জন্য এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। তবে অবস্থা আরো খারাপ হলে কী করেন, বলা মুশকিল।
বাসে উঠলেন তিনি। উঠেই সিট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আজ মনে হয় ভাগ্যটা ভালো। সিট পাওয়া গেল। আর সিট পেলেই তার প্রধান কাজ হলো চোখ বোজা। মুখের ওপর রুমালটাকে শুইয়ে দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেন। অভ্যাসটা অনেক দিনের। উপভোগই করেন তিনি। আজো করলেন।
তন্দ্রা কাটল ছোট্ট একটা ঝাঁকুনিতে। ততক্ষণে বাস ভরে গেছে। ঘেমে নেয়ে উঠেছেন তিনি। জামাটা লেপ্টে গেছে। অস্বস্তি লাগছে। সোজা হয়ে বসলেন।
তখনই বেলালকে দেখলেন তিনি। তার বাসেই উঠল ছেলেটা। তার পর যা ঘটল, তা দেখার কোনো প্রস্তুতি তার ছিল না। তাই মনে হলো তিনি নড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
যাত্রীদের দিকে মুখ করে দাঁড়াল বেলাল। কাঁধে ব্যাগ। কয়েকটা বই বের করল সে। তার পর শুরু হলো বক্তৃতা। জমিজমা বিষয়ে অতিদরকারি একটা বই ওটা। পড়লে যা যা জানা যাবে বিস্তারিত বলল। আরেকটা কী বের করল এর পর। চরকার মতো ডিজাইন। মাঝারি আকারের। সাধারণ জ্ঞানের আকর নাকি ওই চরকাটা। কী কী জানা যাবে, কোনটার কী গুরুত্ব— বোঝাচ্ছে সে। একটানা কথা বলছে। একদমে। অথচ এ ছেলেই কিনা চুপচাপ বসে থাকে তার বাসায়। সাত চড়েও রা করে না। অবাক লাগছে আসাদ সাহেবের।
গুণাগুণ বর্ণনা শেষ। এবার দামের পালা। প্রকাশনীর পক্ষ থেকে তার কাছে দাম কম। দোকান থেকে কিনলে ডাবল। ফলে নিতেই যদি হয়, এখান থেকেই নেয়া ভালো। বলতে বলতে বই দিতে লাগল সবাইকে। পছন্দ হলে নেবেন না হলে না। নিলে লাভ, না নিলে ক্ষতি নেই।
আসাদ সাহেব বসেছেন পেছনের দিকটায়। বেলাল আসার আগেই রুমালের ঘোমটা পরলেন। কিছুক্ষণ পর সামনে গেল ছেলেটা। ছড়িয়ে দেয়া বইগুলো ফেরত নিল। একটা বইও বিক্রি হয়নি। তবু মুখখানা হাসিমাখা। দাঁড়িয়ে থাকল গেটের কাছে। তার পর নেমে গেল। জিগাতলা মোড়ে।
তাকিয়ে থাকলেন আসাদ সাহেব। উত্সুক অবাক দৃষ্টি।
আরেকটা বাসে গিয়ে উঠল বেলাল। আগের মতো করেই দাঁড়াল। দেখা যাচ্ছে।
সিগনাল ছেড়েছে। দূরত্ব বাড়ল বাস দুটোর। একটা ছাড়িয়ে গেল আরেকটাকে। কিন্তু তিনি ছাড়তে পারলেন না। পড়ে থাকলেন বেলালের কাছে। তার বইয়ের ব্যাগটায়। নানা চিন্তা হচ্ছে। শংকর মোড় তার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু খেয়াল করতে পারলেন না। বেশ কিছু দূর গিয়ে বাস থামালেন তিনি। এতটা পথ এবার হাঁটতে হবে! কী আর করা। হাঁটতে লাগলেন।
ধানমন্ডি পনেরো। চেনা ঠিকানা।
কিন্তু পথ আজ এগোতে চাইছে না। মাথা ভার হয়ে আছে। নানা প্রশ্ন খেলছে মনে। লক্ষ করলেন প্রতিটি প্রশ্নেরই উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন তিনি। যেন তারই আরেক সত্তা তার সঙ্গে সওয়ালজবাব খেলছে। কৌতূহলী নিরীহ প্রশ্ন, আর কাটা কাটা ঝাড়া জবাব!
বেলাল এভাবে আসে প্রতিদিন তার মেয়েকে পড়াতে। এত কষ্ট করে!
হ্যাঁ! এতে অবাক হওয়ার কী আছে। পড়াশোনার জন্য মানুষ কত কী করে! আর এ তো ফেরিগিরি।
আচ্ছা এমন করে ফেরি করতে অনেককেই তো দেখেন তিনি। তাদের মধ্যে ভার্সিটি পড়ুয়া আর কেউ কি আছে?
থাকতেও পারে। পৃথিবীতে বেলালদের কি অভাব আছে?
এভাবে বিক্রি তো বেশি হয় না। অন্যদেরও দেখেছেন। তাহলে এত কষ্ট করে লাভ কী?
কী লাভ! বিনা লাভে গাছের পাতাও নড়ে না। প্রথমত ফেরিওয়ালাদের বাস ভাড়া লাগে না। আর যতটুকুই বিক্রি হয়, তাতে লাভ একেবারে কম না।
বাস থেকে বাসে যেতে হয়। সময়সূচি ঠিক থাকে না। এজন্যই কি মাঝে মাঝে দেরি করে আসে সে?
হতে পারে। আবার দেরি হলে রাতের খাবারটা খেয়ে যেতে পারে বলে ইচ্ছা করেও দেরি করে!
না, এ উত্তরটা নিতে পারলেন না আসাদ সাহেব।
িএর পর পৃষ্ঠা: ৭
পড়া শেষে বেশি রাত হলে কিংবা ভালো রান্না হলে বেলালকে খেয়ে যেতে বলেন তিনি। কিন্তু এমন তো ঘটে কালেভদ্রে।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘরে ঢুকলেন তিনি।
খুব যে গুছিয়ে লিখতে পেরেছেন, তা মনে হলো না। তবু ভালো লাগছে লিখতে পেরে। খারাপ লাগাটা যদিও ছেড়ে যায়নি এখনো। তবু। ঝাড়া মেরে উঠলেন।
উঁকি দিলেন মেয়ের ঘরে। বেলাল এসেছে। পড়াচ্ছে।
পড়ার সময় তিনি মেয়ের ঘরে যান না। কখন কী প্রশ্ন করে বসে। এখনকার পড়াশোনা খুব একটা বোঝেনও না। বেশ কিছুদিন উল্টোপাল্টা উত্তর দিয়ে লজ্জা পেয়েছেন। এ সময়টুকুতে তাই সাবধান থাকেন।
তবে আজ গেলেন।
হাসাহাসি করছে ওরা। বেলালের দিকে তাকালেন। কী অদ্ভুত পৃথিবী! কে বলবে এ ছেলেটাই আসার পথে ফেরি করে এসেছে! ওই তো ব্যাগটা। পায়ের কাছে রাখা। প্রতিদিনই ওটা নিয়ে আসে সে। খেয়াল করেছেন আসাদ সাহেব। কিন্তু এর ইতিহাস যে এমন হতে পারে, ভাবনাতেও আসেনি কখনো।
কুশল বিনিময় হলো।
কেমন মায়া মায়া লাগছে তার। জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে ছেলেটাকে। একটু কাঁদতে ইচ্ছা করছে।
কিছুই করা হলো না। বের হয়ে গেলেন। পায়চারী করলেন কিছুক্ষণ। তার পর বসলেন টিভির সামনে। মন বসছে না। অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে ছেলেটাকে সাহায্য করা দরকার। কিন্তু কীভাবে পারবেন! কী করা যায় ছেলেটার জন্য? আয়ের অন্য উৎস নেই। অফিসের উপরি আয়ও নেন না। স্মৃতির মা মরার পর মনে হলো এই অসৎ টাকার ওষুধ খেয়েই মরেছে। এই মৃত্যু একটা ইঙ্গিত। ইঙ্গিতটা তিনি বুঝলেন। পরদিনই জানিয়ে দিলেন উপরির হিস্যা তিনি নেবেন না। তাকে বাদ দিয়েই তাই ভাগ হয় টাকাটা। আবার কি পা বাড়াবেন ওপথে? যা পাবেন, সব দিয়ে দেবেন বেলালকে। ভালোই চলে যাবে ছেলেটার। একটু আরাম করে পড়তে পারবে। এত কষ্ট করতে হবে না আর। বিনিময়ে তিনিই না হয় একটু ভাগ নিলেন পাপের! নেবেন নাকি?
ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিছু না খেয়েই।
সকালে উঠলেন খুব ভারী একটা মাথা নিয়ে। ঘুম হয়নি। উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখেছেন। বেলালের কথা মনে হয়েছে। সকালেও সেই চিন্তাই সাথী হলো।
অনেক ভেবে ঠিক করলেন হালিম সাহেবকে খুলে বলবেন। একটা উপায় নিশ্চয় বের হবে।
চিন্তাটা সঙ্গে নিয়েই বাসে উঠলেন। সিট পাননি। দাঁড়িয়ে আছেন। সকালের রোদ। সকালের হাওয়া। খারাপ লাগছে না। কন্ডাক্টর এল। ভাড়া দিলেন তিনি। লোকজন উঠছে। তাকে আরেকটু পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে বলল কন্ডাক্টর। তিনি সরে গেলেন। তখনই খেয়াল করলেন। সামনেই একটা মানিব্যাগ। তারটা নয় তো! না, তারটা পকেটেই আছে। তাহলে? কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। কেউ খুঁজছে না। কী যেন হয়ে গেল তার! আবেগের দমকা হাওয়ায় উড়ে গেল বুদ্ধি-বিবেচনা। কুড়িয়ে নিলেন ব্যাগটা।
তার পর থেকেই পুড়ছেন। ভেতরে ভেতরে।
বাসটা এখন পল্টন মোড়ে। লোকজন নামছে। নামাদলের একজন বলে উঠল তার মানিব্যাগ হারিয়েছে। শুনেই তিনি হাত দিলেন পকেটে। আছে।
লোকটা কাঁদছেন। ছেলে বিদেশে পড়ে। তার জন্য পাঠাবেন বলে ব্যাংকে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মানিব্যাগটা হারিয়ে গেল। এতগুলো টাকা। কী হবে তার?
মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছা করছে আসাদ সাহেবের। ইচ্ছা করছে ব্যাগটা বের করে দিতে। কি কুক্ষণেই না ওটা হাতে নিয়েছিলেন তিনি! কী মনে করে নিয়েছিলেন? কেন নিয়েছিলেন? জানেন না। শুধু জানেন নিয়েছেন। এখন আর কিছু করার নেই। সবাই তাকে চোর সাব্যস্ত করবে। লজ্জাটা তিনি সইতে পারবেন না। নিজের ওপর রাগ হলো।
লোকটা এখনো খুঁজে যাচ্ছে ব্যাগটা। প্রতিটি সিটের নিচে ঢুকছেন তিনি। হন্যে হয়ে খুঁজছেন।
অমানুষ অমানুষ লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হাত নাড়াতেও ভয় হচ্ছে তার। কেউ যদি বুঝে ফেলে! বসে থাকতে পারলেন না আর। নেমে পড়লেন। অফিস এখনো অনেক দূর। তবু। আজ হেঁটেই যাবেন। মনস্থির করলেন। দেরি হবে। হোক।
কিছুই ভালো লাগছে না। চোর চোর মনে হচ্ছে।
কিছু দূর গিয়ে মনে হলো পা উঠছে না। দাঁড়িয়ে পড়লেন। কী করা যায়! ব্যাগটা ফেরত দিলে কেমন হয়? ভাবতেও পারছেন না কিছু। দাঁড়িয়েই থাকলেন কিছুক্ষণ। তার পর ঘুরলেন। যা হয় হবে।
বাসটা তখনো দাঁড়িয়ে। হাঁটি হাঁটি এগোলেন সেদিকে।
ভালো লাগছে তার। দেরিতে হলেও ভুলটা শুধরে নিতে পারছেন।
জমে যাওয়া পশুর মতো দাঁড়িয়ে আছে বাসটা। নিশ্চল। নিথর।
হঠাৎ চলতে শুরু করল।
বাসটা ধরতে হবে। দৌড়াচ্ছেন তিনি।
বাসের গতি বেশি না। এক পা-দু পা করে এগোচ্ছে। ছোট্ট একটা লাফ দিলেন। উঠে পড়লেন দরজায়। প্রচণ্ড ভিড়। একটু জায়গা করে নিলেন পা রাখার। তার পর হাত দিলেন পকেটে। ওখানেই রাখা তার গন্ধমের ফল। কিন্তু এ কী! মানিব্যাগটা নেই! নেই তো নেই!
সহসা হাত চলে গেল পেছনের পকেটে। স্মৃতির ডিপিএসের টাকাটা নিয়ে যেখানে অপেক্ষা করছে নিজেরটা। না, সেটাও নেই! আশ্চর্য!




