বছর আগে ১৮ জুন ১৯৩৬ ম্যাক্সিম গোর্কি মৃত্যুবরণ করেন। নিউইয়র্ক টাইমস তার মৃত্যুতে যে শোকগাথা ছেপেছিল, তা অনূদিত হলো।
মস্কো, জুন ১৮ (১৯৩৬):
সমকালীন সবচেয়ে খ্যাতিমান রুশ ঔপন্যাসিক ম্যাক্সিম গোর্কি আজ দুপুরের সামান্য আগে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফুসফুসজনিত সমস্যার সঙ্গে তার হূদযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা যোগ হয়। তিনি দুই সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন। তার হূদযন্ত্রের দুর্বলতা উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল। গতকাল তা দ্রুত খারাপের দিকে যেতে থাকে। তিনি ৬৮ বছর বয়সে মস্কো থেকে ৩০ মাইল দূরে তার গ্রামের বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।
সাম্প্রতিক কালে সোভিয়েত সরকারের তার প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ অবস্থান থেকে আরো এগিয়ে তিনি একজন উষ্ণ সমর্থকে পরিণত হয়েছেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। ১৯৩৪-এর গ্রীষ্মে মস্কোয় ইন্টারন্যাশনাল রাইটার্স ইউনিয়নের কংগ্রেসে নেতৃত্বদানকারীর ভূমিকা পালন করেছেন। কংগ্রেস হলে টাঙানো তার ছবির আকার স্ট্যালিনের ছবির প্রায় সমান।
যদিও তিনি সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেননি। তিনি অকুণ্ঠচিত্তে সোভিয়েতের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্রতী ছিলেন। তার সম্মানে মস্কোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ত্ভায়স্কায়া স্ট্রিটের নতুন নামকরণ করা হয়েছে গোর্কি স্ট্রিট।
শনি বা রোববার একটি গণঅনুষ্ঠানে গোর্কির শেষকৃত্য সম্পাদন করা হবে, তার আগে মরদেহ রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধায় ২৪ ঘণ্টা মস্কোয় রাখা হবে।
লন্ডন থেকে নিউইয়র্ক টাইমসের বিশেষ সংবাদদাতা লিখেছেন:
তার কোনো সাহিত্যকর্ম যদি কেবল রুশ বিপ্লবের দলিল হিসেবে নয়, সাহিত্য হিসেবে টিকে থাকে, তা সেগুলো তার উপন্যাস কিংবা ছোটগল্প নয়, যা তাকে বিখ্যাত করেছে তা হচ্ছে তার স্মৃতিকথা। পুরনো শাসকের পতনের পর যখন তার স্বাস্থ্যে কুলাত লিখে যেতেন— সম্মিলিতভাবে তার স্মৃতিকথা ‘মাই ইউনিভার্সিটিস’ জীবনের গ্যালারিতে অসাধারণ সব চিত্রায়ণ, যার দেখা মেলে ডিকেন্সের বিস্ময়কর রচনাবলিতে। ‘তার নাটকের সাফল্য যতটা না তার নাটকের অন্তর্নিহিত গুণের জন্য, তার চেয়ে বেশি মস্কো আর্ট থিয়েটারের প্রশংসনীয় উপস্থাপনার কারণে।’
জর্জ বার্নার্ড শ
ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যু সংবাদ শুনে জর্জ বার্নার্ড শ বলেছেন:
আমি সাহস করেই বলছি, ঊনবিংশ শতকের লেখকদের আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। এবার বরং আমার শোকগাথা প্রস্তুত করুন। কখন কী হয়, আপনি তো জানেন না।
বীরদর্পে রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন:
১৯২৮-এ ম্যাক্সিম গোর্কির রাশিয়ায় প্রত্যাবর্তন বীরদর্পে মার্চ করে ফিরে আসার মতো। সম্মান— এত সম্মান কোনো রুশ লেখকের ওপর বর্ষণ করা হয়নি। প্রচীন শহর নিঝনি নভগরদ পুরনো নাম হারিয়েছে, ১৯৩২-এ সেই শহরের নাম হয়েছে গোর্কি। তখনকার সবচেয়ে বড় উড়োজাহাজটির নাম ‘চেলকাশ’ গল্পের রচয়িতা ম্যাক্সিম গোর্কির নামে। ১৯৩৫ সালে আকাশে মহড়ার সময় জাহাজটি বিধ্বস্ত হয়।
ইউনাইটেড সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিকপ্রধান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ম্যাক্সিম গোর্কি ইনস্টিটিউট।
গোর্কির সাম্প্রতিক নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দস্তিগায়েভ’ ও ‘ইয়েগর বুলেভিচ’, উপন্যাস ও ইতিহাসভিত্তিক রচনার মধ্যে ‘আদার ফায়ার্স’, ‘বাইস্ট্যান্ডার’ ও ‘দ্য ম্যাগনেট’। যদিও সাধারণ রুশ নাগরিকদের ওপর তার বিপুল প্রভাব। রুশ নব্য স্কুলের লেখকরা তার শেষ বয়সের গুরুভার লেখাগুলো নিয়ে কিছুটা বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। নতুন শতাব্দীর শুরুতে তার খ্যাতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে। কিন্তু শেষ দিকে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার একজন আধা-রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
১৯৩৪-এর আগস্টে ম্যাক্সিম গোর্কি সোভিয়েত লেখকদের প্রথম কংগ্রেস উদ্বোধন করেন। ১৯৩৩ সালের হিসাবে রাশিয়ায় তার মোট এক কোটি বই হাতে হাতে ঘুরছে।
লিখতে শুরু করে অ্যালেক্সিস ম্যাক্সিমোভিচ প্লেশকভ ম্যাক্সিম গোর্কি নাম নেন। নতুন নামের মানে তিতকুটে ম্যাক্সিম— তিতকুটে একজন। তার জন্ম রাশিয়ার নিঝনি নভগরদ শহরে ১৪ মার্চ ১৮৬৮। তার বাবা ছিলেন একজন ভ্রাম্যমাণ আসবাব নির্মাতা। লেখক হিসেবে তার উত্থান বিস্ময়কর। একজন সম্পাদক তার আত্মজীবনী চাইলে গোর্কি নিজেই একটি জীবনপঞ্জি তৈরি করে তার কাছে দাখিল করেন:
“১৮৬৮: নিঝনি নভগরদে জন্ম; ১৮৭৬: মুচি হিসেবে জুতার দোকানে কাজ শুরু; ১৮৭৯: ডিজাইনার, পেইন্টার হওয়ার জন্য শিক্ষানবিশ; ১৮৮০: ভোলগা নদীতে জাহাজের কেবিন বয় (জাহাজের পাঁচক পড়তে শেখায়); ১৮৮৩: বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে চাকরি; ১৮৮৪: কুলি; ১৮৮৫: রুটির দোকানে কর্মচারী; ১৮৮৬: যাত্রাপালায় ডামি হিসেবে অভিনয়; ১৮৮৭: ফল বিক্রেতা; ১৮৮৮: আত্মহত্যার প্রচেষ্টা; ১৮৮৯: রেলওয়ে শ্রমিক; ১৮৯০: একজন উকিলের কেরানি (সেখানেই লিখতে শেখা); ১৮৯১: লবণ কারখানার অপারেটর, তার পর বাউণ্ডুলে; ১৮৯২: প্রথম উপন্যাস ‘মাকের চুদ্রা’ লেখা; ১৯০৩: খ্যাতি ও আর্থিক সমৃদ্ধি।”
তার বয়স যখন কেবল পাঁচ বছর, মা-বাবা তাকে পরিত্যাগ করেন। দাদা তাকে প্রতিপালন করেন। তিনি ছিলেন কৃপণ ও নির্মম বুড়ো। তার পরিণত বয়সের লেখায় ঠিকানাহীন মানুষরা যে অমরত্ব লাভ করেছে, এটাই ছিল তার নিয়তি। শীত ও ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, উপেক্ষা ও দীনাবস্থাই তার জীবনের প্রথম দিককার সময়গুলোকে দখল করে আছে। কলেরায় আক্রান্ত হয়ে তাকে স্কুল ছেড়ে দিতে হয়, আর কখনো স্কুলে ফেরা হয়নি। তার বাবারও কলেরায় মৃত্যু হয়। তিনি সেরে উঠতে উঠতে মায়ের মৃত্যু হয় যক্ষ্মায়। কেবল রোগ এই শিশুকে জানিয়ে দেয়, তার কোনো সহায়-সম্পদ নেই, তাকে এখন থেকেই কাজ করে খেতে হবে।
জুতার কারখানায় শিক্ষানবিশ হিসেবে একটা দীর্ঘ সময় কাজে লেগে থাকা আর ভালো লাগছিল না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দিনভর কাজ, বস্তিজীবন, অন্ধকার সেলারে থাকা, বিষাক্ত পরিবেশ থেকে মুক্তির একটিই পথ— পালিয়ে যাওয়া। তিনি তাই করলেন।
ভোলগা এলাকায় বাউণ্ডুলের মতো ঘোরাঘুরির সময় ক্যাপ্টেন মিকাইল স্যামোইর তাকে পছন্দ করে জাহাজে তুলে নিলেন। তিনি এই কেবিন বয়কে লেখাপড়া শেখাতে চাইলেন, কিন্তু বইপত্রে গোর্কির প্রচণ্ড ঘৃণা। বইয়ের ভেতর যে সৌন্দর্য আছে, তা বুঝতে তার দীর্ঘ সময় লেগে গেল। গোর্কি সবার আগে পড়লেন বাইবেল, তার পর আরব্য রজনী, তার পর তিনি উৎসহী হয়ে উঠলেন সেরা রুশ লেখকদের বইপত্রের প্রতি। যখন বুঝলেন তিনি কতটা অশিক্ষিত, তিনি শিক্ষার পথে নামলেন।
তিনি কোথাও পড়েছেন তলস্তয় কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাই ১৫ বছর বয়সে ক্যাপ্টেনকে বিদায় জানিয়ে কাজানের পথ ধরলেন। পথের শেষে নিয়তি তার জন্য হতাশাই নির্ধারণ করে রেখেছিল, তিনি বিরক্ত হয়ে শুনলেন, তিনি যে শিক্ষা চান তা বিনা পয়সার নয়, তা কিনে নিতে হয়। তিনি চলে গেলেন রুটি-বিস্কুটের কারখানায়, আয় প্রতি মাসে ৩ রুবল, যুক্তরাষ্ট্রের হিসাবে দেড় ডলার।
‘একুশজন এবং আরো একজন’ গল্পে রুটির কারখানার সেই জঘন্য নোংরা, ঘাম ঝরা, চুলা থেকে লাফিয়ে আসা গনগনে জিহ্বা অমরত্ব পেয়ে গেছে। তার কল্পনায় উদ্দীপ্ত করেছে তার শোনা তিফলিস শহরের আধো-বর্বর মানুষদের বিস্ময়কর ছবি। ক্রাইমিয়া যাবেন বলে রুটির কারখানার কাজ ছেড়ে দিলেন। কিন্তু সেবার বেশি দূর যেতে পারেননি। তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিয়ে ঘুরঘুর করছিলেন, একজন আগন্তুক তাকে থামিয়ে দেন। তিনি একজন আইনজীবী, তার জীবনকাহিনী শুনে তিনি প্রবৃত্তিতাড়িত এই যুবককে একটি চাকরি সাধলেন। গোর্কি উকিলের অফিসে কেরানি হয়ে গেলেন এবং পড়াশোনায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি তার এই উপকারীর কাছ থেকে সরে এসে ১৮৯২ সালে তিফলিস পৌঁছলেন। সেখানে চাকরি পেলেন রেলওয়ে ওয়ার্কশপের। প্রথম গল্পটি সেখানেই লিখেছেন; কিন্তু বিখ্যাত রুশ ছোটগল্পকার ভ্লাদিমির কোরোলেঙ্কোর সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত তার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো সৃষ্টি হতে শুরু করেনি। অন্য রুশ লেখকদের বেলায় না হলেও গোর্কিকে উত্সাহের সঙ্গে বরণ করা হলো। তিনি লক্ষ মানুষের অন্তরে প্রতিধ্বনির সন্ধান পেলেন। পৃথিবীজুড়ে তিনি মানুষের অনুমোদন পেয়ে গেলেন, তিনি অনূদিত হতে থাকলেন বিভিন্ন ভাষায়।
প্রথম গল্পের পথ ধরে তার ‘চেলকাশ’ গল্পটি বৃহত্তর পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তার পর লিখতে শুরু করলেন পতিতা থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জীবনের বাস্তব কাহিনী। অবশ্য তার প্রিয় বিষয় হয়ে উঠল সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী মানুষ। এই শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে ব্যক্তিগত জ্ঞান থেকে লেখা কাহিনী তার পাঠকের অন্তর ছুঁয়ে যায়। উচ্চ আদর্শের কিছু নাটকও তিনি লিখেছেন, যেমন ‘অ্যাট দ্য লোয়েস্ট ডেপথ’ মস্কোয় সফল প্রদর্শনী করেছে।
গোর্কি তার লেখায় বিপ্লবী ধ্যান-ধারণা প্রকাশের যে চর্চা করেছেন, শুরুতে সেন্সরকে কাঁচি চালানোর সুযোগ না দিলেও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন, বিশেষ করে যখন সমাজতান্ত্রিক সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হন। বহুবার তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ‘রাষ্ট্রদ্রোহী উচ্চারণ’; জানুয়ারি ১৯১৫ থেকে তিনি কার্যত আট বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন।
১৯০৬-এর বসন্তকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আসেন তার সঙ্গে মাদাম গোর্কি হিসেবে, যিনি সফর করেন জানা যায় তিনি অভিনেত্রী কুমারী আন্দ্রেয়িভা, এই বিপ্লবী লেখকের সঙ্গে আর কোনো বৈবাহিক সম্পর্ক নেই; এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। তার কোনো কিছুতে আমেরিকান সমাজ অংশগ্রহণ করতে রাজি হয়নি; তখন ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে গোর্কি তার স্ত্রীর সঙ্গে বহু বছর একসঙ্গে বসবাস করেন না এবং রুশ আইন অনুযায়ী স্ত্রীর কাছ থেকে তালাকপ্রাপ্তি একটি অসম্ভব কাজ, কিন্তু তাতেও বরফ গলেনি। নিউইয়র্কের হোটেল তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং শেষ পর্যন্ত কিছুকাল নির্জনে কাটানোর পর আমেরিকার তীব্র নিন্দা করে এই দেশত্যাগ করেন। ১৯০৭ সালে যক্ষ্মার কারণে তিনি যখন মৃত্যুর ছায়াতলে, ইতালির ক্যাপ্রিতে গোর্কি এই অভিনেত্রীকে বিয়ে করেন।
১৯১৩ সালে জার ঘোষিত সাধারণ ক্ষমায় তাকে অভিযোগমুক্ত করা হয়। প্রথমে তিনি এই সুযোগ গ্রহণ করে রাশিয়ায় ফিরতে অস্বীকার করেন, অবশ্য পরে ১৯১৪ সালে সেখানে ফিরে যান। অল্পদিনের মধ্যেই প্রথম মহাযুদ্ধ শুরু হয়। বয়স তখন ৪৬ বছর, কিন্তু স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে, যদিও তার যুদ্ধবিরোধী শান্তিবাদী হওয়ার কথা, তিনি প্রাইভেট হিসেবে রুশ সেনাবাহিনীতে নিজেকে তালিকাভুক্ত করলেন এবং গ্যালিসিয়া সীমান্তে নিয়োজিত হলেন। তিনি বললেন, যুদ্ধে যদি জার্মানি জিতে যায় তাহলে তা ইউরোপে ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনবে। এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ইউরোপকে রক্ষা করতে তিনি নিজের আদর্শ বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলেন।
১৯১৭তে যখন বিপ্লব শুরু হলো, গোর্কি তখন নিবেদিত বিপ্লবী। রাজনীতিতে সক্রিয় এবং নিজের ‘ফ্রি লাইফ’ পত্রিকা সম্পাদনা করে চলেছেন। বৈপ্লবিক প্রবণতার জন্য এটিকে আগে দাবিয়ে রাখা হয়েছে।
যখন আলেকজান্ডার কেরেনস্কি ক্ষমতা হারালেন, বলশেভিকদের সঙ্গে গোর্কির তিক্ত মতানৈক্য শুরু হয়ে গেল। নিজ নামে প্রতিদিনই সম্পাদকীয় ও বুলেটিনে তাদের আক্রমণ করতে থাকলেন। তার বিরোধিতা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি, শিগগিরই বলশেভিকরা তাদের স্বার্থে গোর্কিকে রাজি করিয়ে ফেলল।
বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তার সাময়িক বিরোধের কারণে সোভিয়েত আদর্শের প্রতি তার আনুগত্য বিভিন্ন সময় সন্দেহের সঙ্গে দেখা হতো; তবে এটাও সত্য, বলশেভিকদের মৌলনীতি থেকে তিনি তার সমর্থন কখনো প্রত্যাহার করে নেননি।
১৯১৮ সালে তিনি সোভিয়েত ব্যুরো অব প্রপাগান্ডার প্রথম নির্বাহী নিয়োজিত হন। পরের বছর গোড়ার দিকে তিনি পেট্রোগাদ সোভিয়েতের সদস্য নির্বাচিত হন। তার স্ত্রীও শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তার পদ লাভ করেন।
১৯২৪ সালে সোভিয়েতের সঙ্গে গোর্কির রাজনৈতিক যোগাযোগ শেষ হয়ে যায়— এটা তার স্বাস্থ্যগত কারণে হতে পারে কিংবা তিনি অনুভব করেছেন যে, শাসকগোষ্ঠীর শুভদৃষ্টি তার ওপর আর নেই। তিনি জার্মানি, ফ্রান্স ও ইতালির উদ্দেশে রাশিয়া ছেড়ে যান।
আসলে শেষ দিকে গোর্কিকে তার কার্যক্রম ও বক্তৃতা-বিবৃতিতে দেখাতে হয়েছে যে, তিনি সোভিয়েত আদর্শের সঙ্গে আন্তরিকভাবে একমত। বলশেভিক রাজত্বের ১০ বছর পূর্তির উৎসবের সময় গোর্কি সোভিয়েত সরকারকে লিখিত অভিনন্দন জানিয়েছেন।
রাশিয়ায় থাকা অবস্থায় তিনি সাহিত্যকর্ম ত্যাগ করেন। বিদেশে এসে আবার তা শুরু করেন। রাশিয়া ছেড়ে যাওয়ার দু-এক বছর পর মনে করা হচ্ছিল তিনি ধীরে ধীরে যক্ষ্মা-মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছেন। কিন্তু ইতালির সোরেন্তোতে একটি ভিলা কেনার পর এবং সেখানে বসবাস শুরু করার পর তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলেন। সোরেন্তোতে রচিত তার আত্মজীবনীই তার শ্রেষ্ঠ কাজ, এটি ডায়েরি আকারে লেখা। তিনি কিছু উপন্যাস ও নাটকও লিখেছেন, যা তার প্রথম দিককার কাজের মতোই বলে মনে করা হয়। তার ৬০তম জন্মদিনে, ১৯২৮-এর মার্চে তার পোর্ট্রেট দিয়ে বিশেষ ডাকটিকিট ছেড়ে সোভিয়েত সরকার তাকে সম্মান দেখিয়েছে। গোর্কি এভাবে সম্মানিত প্রথম সোভিয়েত লেখক।
২.
অবিচুয়ারির বাইরে একটি অভিমত:
সোভিয়েত সমাজে গোর্কির অবস্থান বিতর্কিত। হোয়াইট সি ক্যানেল নির্মাণ প্রপাগান্ডায় নেতৃত্ব দিয়েছেন গোর্কি। এতে বহু কয়েদি ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ‘দ্য গুলাগ আর্কিপেলাগো’ উপন্যাসে সোলঝেনিিসন বলেছেন: গোর্কির সব ধরনের কাজ ‘বস্তুগত নিজস্ব স্বার্থে’ পরিচালিত হতো।
গোর্কি মৃত্যুবরণ করেছেন, না তাকে হত্যা করা হয়েছে— এ বিষয়ে একটি বিতর্ক এখনো রয়েছে।




