মাদাম গোর্কি পরিচয়ে যে ভদ্রমহিলা ম্যাক্সিম গোর্কির সফরসঙ্গী হয়ে ১৯০৬-এর বসন্তকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন নিউইয়র্কের হোটেল তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তারা বলেছে তিনি আসলে মাদমোয়াজেল আন্দ্রিয়েভা।
মারিয়া আন্দ্রিয়েভা রুশ দেশে বিখ্যাত নাম, নামকরা অভিনেত্রী। তিনি চলে এসেছেন চাষাভুষার মতো চেহারা ম্যাক্সিম গোর্কির সঙ্গে! মারিয়ার জন্ম ৪ জুলাই ১৮৬৮, বাবা ফিয়োদর আলেক্সেন্দোভিচ ফিউদোরভ-ইয়োর্কোভস্কি একটি বিখ্যাত থিয়েটারের পরিচালক, মা একজন মঞ্চাভিনেত্রী। মারিয়া নিজেও অভিনয়ের পথে পা রাখল। ড্রামা স্কুলের পাঠ নিয়ে ১৮ বছর বয়সে মারিয়া কাজান মঞ্চে কাজ করতে চলে এল এবং তার চেয়ে ১৮ বছরের বড় রেলসড়ক নিয়ন্ত্রক আদ্রে জেলিয়াবুশকিকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি সন্তান ইউরি (পরবর্তীকালে খ্যাতিমান চিত্রপরিচালক) ও ইয়েকাতেরিনা। পরিবারের সঙ্গে তিফলিস অবস্থানকালে তার অভিনয়খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তার পর মস্কো এসে বিখ্যাত কনস্ট্রানটিন স্ট্যানিসলাভস্কির সঙ্গে মস্কোর আর্ট থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেন।
ওদিকে মার্ক্সবাদী সাহিত্যকর্ম তাকে আকৃষ্ট করতে থাকে। তিনি গোপনে রাশান সোস্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে যোগ দেন। ম্যাক্সিম গোর্কির সঙ্গে তার প্রথম দেখা ১৯০৩ সালে সেবাস্তপোলে। আন্দ্রিয়েভার দুর্নিবার আকর্ষণ উপেক্ষা করার মতো পুরুষ খুব কমই ছিলেন। ম্যাক্সিম গোর্কির সঙ্গে যখন তার দেখা হয়, গোর্কিও নিজেকে সংবরণ করতে পারেননি। ইলিয়া রেপিনের মতো পোর্ট্রেট পেইন্টার আন্দ্রিয়েভাকে আঁকতে এগিয়ে আসেন। অনেক বিপ্লবীর সঙ্গে তার সখ্য স্থাপিত হয়। নাটক ও রাজনীতি নিয়ে টানাপড়েন, ওদিকে গোর্কির জন্য ভালোবাসা— একসময় তিনি অভিনয় ছেড়ে দেন। গোর্কির সঙ্গে পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কিছু সময় কাটিয়ে ইতালির আইল অব ক্যাপ্রিতে বসতি স্থাপন করেন। গোর্কির সঙ্গে বয়সের ব্যবধান নেই, বরং মারিয়া তার চেয়ে কয়েক দিনের বড়। তাদের সিভিল ম্যারেজের পথে যেতে হয়।
গোর্কির স্ত্রী ইয়েকাতেরিগ পেশকোভার সঙ্গে তার দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক না থাকলেও রাশান অর্থোডক্স চার্চের কঠোর বিধিবিধানের কারণে তালাক দিতে পারছিলেন না। গোর্কির আমেরিকা মিশনটি ছিল মূলত বলশেভিক বিপ্লবীদের জন্য ‘তহবিল সংগ্রহের অভিযান’। ২৮ মার্চ ১৯০৬ তিনি আন্দ্রিয়েভাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আগমন করেন। শুরুতে অত্যন্ত সহানভূতিপ্রবণ ছিলেন মার্ক টোয়াইন; তিনি গোর্কির তহবিল সংগ্রহের জন্য গঠিত কমিটির সভাপতি হন। কিন্তু গোর্কির সঙ্গের নারী তার স্ত্রী না রক্ষিতা, এ বিতর্ক উঠলে গোর্কিকে যারা যুক্তরাষ্ট্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সেই সব স্পন্সর পিছু হটে; মার্ক টোয়াইনও একসময় কমিটির সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরিস্থিতি কথিত ‘নারীঘটিত কারণে’ এতটাই গোর্কির প্রতিকূলে চলে যায় যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্য তাকে তিনবার হোটেল বদল করতে হয়। তাতেও রক্ষা হয়নি মধ্যরাতে তাদের হোটেল থেকে বের করে দেয়া হয়।
খ্যাতিমানদের মধ্যে একমাত্র এইচজি ওয়েলস তাদের পক্ষে কলম ধরেন। পুরো আচরণের নিন্দা জানিয়ে দ্য ইনডিপেনডেন্ট একটি প্রতিবেদন নিবন্ধ প্রকাশ করে ‘দ্য সোস্যাল লিঞ্চিং অব গোর্কি অ্যান্ড আন্দ্রিয়েভা’ শিরোনামে। শেষ পর্যন্ত গোর্কির এক শুভানুধ্যায়ী আন্দ্রিয়েভাকে তার বাড়িতে নিয়ে রাখে। উইলিয়াম ডিন হাওয়েলস সন্দেহ প্রকাশ করেন, এই কেলেঙ্কারির পর আড়াই হাজার ডলারের তহবিল সংগ্রহও সম্ভব নয়। অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ ম্যাক্সিম গোর্কি ১৯০৬ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন। তার পর ম্যাক্সিম গোর্কি আন্দ্রিয়েভাকে নিয়ে দীর্ঘদিন কাটিয়েছেন ক্যাপ্রিতে। ক্যাপ্রিতে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন এসেছেন, মোহিত হয়েছেন গোর্কির মিসট্রেস মারিয়া আন্দ্রিয়েভার সৌন্দর্য ও আতিথেয়তায়। তাকে চিঠিও লিখেছেন।
শেষ পর্যন্ত গোর্কিও তাকে ধরে রাখতে পারেননি। ১৯১৮-১৯২১ তিনি পেট্রোগা কমিশনার অব থিয়েটার ও পাবলিক শো পদ অলঙ্কৃত করেছেন। বলকায় ড্রামা থিয়েটারের তিনি প্রতিষ্ঠাতা। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে তিনি যখনই বাধা পেয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন লেনিন।
ম্যাক্সিম গোর্কি একসময় স্ট্যালিনের সুরে কথা বলতে শুরু করেন, কিন্তু যখনই সুর ছেড়ে দেন হুমকির মধ্যে পড়েন। তার ছেলে ম্যাক্সিমের মৃত্যু তার কাছে মনে হয়েছে হত্যাকাণ্ড। স্ট্যালিন তাকে তার জীবনী লিখতে বলেছিলেন, গোর্কি রাজি হননি। ঐতিহাসিক ভাক্সবাগ দাবি করেছেন, হূদরোগে গোর্কির মৃত্যু হয়নি, বিষপ্রয়োগে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ম্যাক্সিম গোর্কির মৃত্যুর (১৮ জুন ১৯৩৬) পর পরই তার মস্তিষ্ক অপারেশন করে বের করা হয় এবং মস্কোর নিউরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটে মায়াকোভস্কি লেনিন ও অন্যান্য রুশ চিন্তাবিদের মস্তিষ্কের সঙ্গে প্রদর্শনের জন্য তা রেখে দেয়া হয়।
মারিয়া আন্দ্রিয়েভার মৃত্যু হয় আরো ১৭ বছর পর, ৮ ডিসেম্বর ১৯৫৩। তিনি একটি স্মৃতিকথার পাণ্ডুলিপি রেখে গেছেন, যা ১৯৬১ তে প্রকাশিত হয়।




