ফাতেমা যাহরা হাসান । অনুবাদ: শওকত হোসেন
তিনি ছিলেন শিল্পকলার ইতিহাসে অন্যতম মহান প্রতিভা, তাই নাম-চিহ্নহীন কবরে সমাহিত হওয়া অবধি তার জীবনের অন্য বহু দিক স্বভাবতই অনালোচিত রয়ে গেছে। ১৬৫০-এর দশকে ব্যক্তিগত জীবনের ট্র্যাজিডি পেছনে ফেলে রেমব্র্যান্ট সারা দুনিয়ার শিল্পকর্ম সংগ্রহ শুরু করেন। বিখ্যাত শিল্পীদের বিভিন্ন চিত্রকর্ম, প্রিন্ট এবং প্রাচীন রোমান সম্রাটদের আবক্ষমূর্তিসহ অ্যান্টিকের বিরল সংগ্রহ, এশিয়ার বিভিন্ন সামগ্রীর ভেতর জাপানি বর্ম, সেসঙ্গে প্রাকৃতিক ইতিহাস ও খনিজদ্রব্যের সংগ্রহ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ‘বিশ্বের সেরা শিল্পীদের আঁকা ছবি ও প্রিন্ট’ ১৬৫৬ সালে তাকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচালেও শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট না হওয়ায় রেমব্র্যান্টকে নিজের বাড়ি ও ছাপাখানা বিক্রি করতে বাধ্য করেছিল। অবশ্য তিনি হতদরিদ্র অবস্থায় পড়া সত্ত্বেও প্রায়ই যে বিষয়টি আলোচনার বাইরে থেকে যায় সেটি হলো, এই সংগ্রহই তাকে পৃথিবীর আন্তঃসাংস্কৃতিক শিল্পকলা বিনিময়ের একজন সমঝদার হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি ১ ইঞ্চি পরিমাণ ঘোরাঘুরি না করেই বিশ্বের অন্য প্রান্তের শিল্পকর্মে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে।
তার সংগ্রহের অনেক কিছুই এখন মিউজিয়াম হেট রেমব্র্যান্ট হুইস নামে এক ঐতিহাসিক ভবনের অংশ। ১৬৩৯ থেকে ১৬৫৬ সাল পর্যন্ত রেমব্র্যান্ট এখানে থেকে কাজ করেছেন। এখন সেটা আর্মস্টারডামের একটি জাদুঘর।
তার সংগ্রহের বিক্রির তালিকা টিকে আছে। তালিকার বহু সামগ্রীকে পূর্ব ভারতীয় বা ভারতীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর ভেতর রয়েছে পূর্ব ভারতীয় পেয়ালা, বাক্স, ঝুড়ি এবং পাখার পাশাপাশি তীর, বান, বর্শা, ধনুকসহ ৬০টি ভারতীয় হ্যান্ড উইপন এবং ভারতীয় নারী ও পুরুষের একজোড়া পোশাক। তালিকার ২০৩ নম্বর সামগ্রী হিসেবে উল্লিখিত একটি জিনিসকে ‘মিনিয়েচার ড্রইংয়ের পাশাপাশি তামা ও নানা ধরনের কাপড়ে বিচিত্র অঙ্কন এবং কাঠ খোদাইয়ের বই’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। (মোগল আমলে পাওয়া মিনিয়েচার চিত্রকর্মের উদাহরণ নিচে দেখা যাচ্ছে।)
বিতর্ক হলেও বিচিত্র এই সামগ্রীগুলোকে মহান শিল্পীকে অতীতের যেকোনো কাজের চেয়ে ভিন্ন ২৩টি এচিংয়ের একটি সংগ্রহ গড়ায় অনুপ্রাণিতকারী ভারতের মোগল দরবারের মিনিয়েচার চিত্রকর্ম বলে সুনির্দিষ্টভাবে কখনই প্রমাণ করা যায়নি। জীবনের শেষ দিকের বছরগুলোয় দামি জাপানি কাগজে আঁকা ছবিগুলো তার আলোচিত মোগল মিনিয়েচার সংগ্রহের অনুলিপি হলেও ডিটেইলিং ও নান্দনিকতার সুবাদে ভিন্ন হয়ে আছে। যেমন বলা হয়েছে, রেমব্র্যান্টের সংগ্রহে ভারত থেকে জোগাড় করা মোগল মিনিয়েচারের নির্দিষ্ট কোনো রেকর্ড নেই, তবে ভারতে ওলন্দাজ দখলদারির ইতিহাসকে সঠিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করতে গেলে ব্যাপারটা মোটেই বিস্ময়কর মনে হয় না। এটা আসলে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা যে নামে একে ডাকা হতো ভেরেনিগদে উসতিনদিশে কোম্পাগনির (ভিওসি) বিপুল বাণিজ্য কর্ম এবং মোগল আমলের শিল্পচর্চার কদরের মাঝামাঝি একটা সময়ে ঘটেছে।
১৬০৪ সালে সুরাত থেকে কলকাতা উপকূল বরাবর ব্যবসার সূচনায় ভিওসির বিভিন্ন কলকারখানা ও গুদামঘরগুলো পূর্ব ভারতীয় আর্কিপেলোগোয় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার চেয়েও বিশাল অঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত ছিল। মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর দিল্লি ও আগ্রার মধ্যবর্তী জায়গা হওয়ায় সুরাত কোম্পানির পক্ষে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইউরোপে বিনোদনমূলক মাদক হিসেবে ব্যবহূত বাংলার আফিমের অল্প পরিমাণসহ কোম্পানি লবণ, মরিচ, জায়ফল, লবঙ্গ ও দারচিনির মতো মসলা এবং রেশম ও সুতি কাপড়ের মতো বিচিত্র বস্ত্রসামগ্রী জোগান থেকে বিপুল পণ্যের বাণিজ্য করেছে।
ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে মোগল শাসকদের সঙ্গে লেনদেন করেছে, তারা শিল্পকর্মের অনুরাগী ছিল বলাটা ন্যূনোক্তি হবে। শিল্পীরা ‘সারা দুনিয়ার আনন্দের উৎস’ বিশ্বাস করে দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুন পারস্য ও মধ্য এশিয়া থেকে বেশ কয়েকজন পার্সি গুণী শিল্পীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এবং কেবল তার কাছেই নয়, শিল্পকলা সব মোগল শাসকের পরিচয়ের অচ্ছেদ্য ও কেন্দ্রীয় অংশ ছিল। তার ছেলে মহান আকবরের উদ্ধৃতি দিয়ে জীবনীকার আবুল ফজল লিখেছেন, ‘মোগল সম্রাট আকবর ফতেহপুর সিক্রির ইবাদত খানায় এক ধর্মীয় সভা আয়োজন করেন; কালো পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি হলেন জেসুইট মিশনারি রোদোলফো অ্যাকুয়ভিভা এবং ফ্রান্সিস্কো হেনরিকস, আনু., ১৬০৫।’
‘একশরও বেশি চিত্রকর নামজাদা শিল্পী হয়ে উঠেছেন, আর যারা নৈপুণ্যের কাছাকাছি পৌঁছেছেন বা মাঝামাঝি অবস্থায় ছিলেন, তাদের সংখ্যা বেশ বড়... প্রত্যেকের নৈপুণ্য বর্ণনা করতে গেলে বহু সময় লেগে যাবে। আমার ইচ্ছা, ‘প্রতিটি ময়দান থেকে একটি করে ফুল তোলা, প্রতিটি ছড়া থেকে একটি করে দানা।”’
অতি সনাতন মুসলিম ধারণা প্রত্যাখ্যান করে আকবর মনে করেন:
‘অনেকেই আছে যারা চিত্রকর্ম ঘৃণা করে, কিন্তু আমি তাদের অপছন্দ করি। আমার মনে হয় যেন একজন চিত্রকরের খোদাকে স্বীকার করে নেয়ার খুবই বিচিত্র উপায় রয়েছে; কারণ জীবন আছে এমন যেকোনো কিছু আঁকা এবং একের পর এক বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নকশা করার সময় একজন চিত্রকরকে অবশ্যই অনুভব করতে হয় যে, তার পক্ষে নিজের কাজে স্বাতন্ত্র্য আরোপ করা সম্ভব নয়, তখন সে জীবনদাতা খোদার কথা ভাবতে বাধ্য হয়।’
১৫৮০ সালে গোয়ার পর্তুগিজ জেসুইটদের একটি দলকে আমন্ত্রণ জানানোর পর আকবর তার এক দরবারি চিত্রকর বাসভানকে ‘ম্যাডোনা অ্যান্ড চাইল্ড’-এর দুটি চিত্রকর্ম আঁকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি স্বয়ং এ ছবি দুটির সামনে নত হয়েছেন। রাজার অনুমতিক্রমে এ ছবিগুলো তাদের আবাসে স্থাপিত চ্যাপেলে টানানো ছিল। যাহোক, এটা সর্বজনবিদিত সত্য যে, মোগল শাসকদের ফরমায়েশি চিত্রকর্মগুলো ভারতীয় ও ইসলামী উপাদানের সঙ্গে পাশ্চাত্য মূর্তিশিল্পের এক ধরনের মিশেল ছিল।
মোগল দরবারি শিল্পীরা খুবই সম্মানিত ছিলেন এবং ‘যুগের বিস্ময়’ ও ‘জগতের বাস্তবতা’র মতো বিভিন্ন জাঁকালো খেতাবে তাদের ভূষিত করা হতো। ইউরোপে রেমব্র্যান্টের সমসাময়িক আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীর (১৫৬৯-১৬২৭) এবং পৌত্র শাহজাহানের শাসনামলেই শিল্পকর্মের পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয়। এবং ইউরোপের শিল্পানুরাগীরা ভারতের শিল্পকর্মের ভাণ্ডার দেখে বিমোহিত হয়ে থাকলে এ মুগ্ধতার প্রতিদানও দেখেছেন তারা।
শিল্পকলার প্রতি মোগল রাজাদের এ মুগ্ধতা সেই আমলের পশ্চিমা পর্যটকদের বয়ানেও উঠে এসেছে। এলিজাবেথ ও জ্যাকোবিয় আমলে ইংরেজ কূটনীতিক এবং ১৬১৫ থেকে ১৬১৯ পর্যন্ত মোগল দরবারের ইংরেজ রাজদূত স্যার টমাস রোর চ্যাপলিন এডওয়ার্ড টেরির ভারতে অবস্থানের একটি বিবরণ ইউরোপীয় চিত্রকর্মের প্রতি জাহাঙ্গীরের মুগ্ধতার বিষয়ে আলোকপাত করেছে। টেরি উল্লেখ করেছেন, রাজা তার নিজস্ব শিল্পীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ইউরোপ থেকে সবচেয়ে সেরা মানের চিত্রকর্ম ও প্রিন্টের জন্য যুদ্ধ করেছেন।
রোর সময়ে এক ইংরেজ যাজক স্যামুয়েল পার্চাসের লেখা আরেকটি বিবরণও জাহাঙ্গীর, শাহজাহান এবং এক দাসীর পোর্ট্রেটের কথা উল্লেখ করেছে। এ যাজক বিভিন্ন দেশে পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনী প্রকাশ করেছেন। ২০১২ সালে উপমহাদেশে রাজকীয় সাফল্যের তিন দশক নিয়ে এক ব্রিটিশ প্রদর্শনী মোগল রাজবংশের কাহিনী উল্লেখ করে তাদের উদার শাসন ও সুরুচি এবং শিল্পকর্মের পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে।
তাদের জীবনের সমসাময়িক সময়রেখা এবং তিন মোগল শাসক (জাহাঙ্গীর, শাহ জাহান ও আওরঙ্গজেব) সম্পর্কে রেমব্র্যান্টের বর্ণনার বাস্তবতার সঙ্গে মেলালে এটা খুবই সম্ভব যে মালিকানা না থাকলেও তিনি নিশ্চয় এসব ভারতীয় চিত্রকর্ম পরখ করেছেন।
এখানেই আমরা যাকে রেমব্র্যান্টের মোগল এচিং বলছি, সেই প্রসঙ্গ আসে। ভারতে মোগল দরবারে কর্মরত শিল্পীদের কায়দায় আঁকা ড্রইং নিয়ে এই এচিংগুলোকে প্রায় মূলগুলোর অনুরূপ বলা চলে। মূলের ডিটেইলিং অক্ষুণ্ন রেখে রেমব্র্যান্ট শেড দিয়ে নিজের ধরনকে সমন্বিত করেছেন এবং আসল মাধ্যমকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল জাপানি কাগজে বদলে নিয়েছেন। ১৭ শতকে জাপানের সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি থাকায় নিশ্চয়ই ওলন্দাজ জাতির পক্ষে সহজ সংগ্রহ ছিল এটা। ব্যক্তিবিশেষ, তাদের পোশাক, পাগড়ি ও অলঙ্কারপাতির হুবহু অনুকরণ রেমব্র্যান্টের পোশাক ও অঙ্গভঙ্গি পর্যালোচনার জন্য মোগল চিত্রকর্ম পর্যালোচনা করার জনপ্রিয় বিশ্বাসের দিকে চালিত করেছে।
এসব সৃষ্টিকর্মের বিপুলভাবে অগোচরে থেকে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায়, এগুলো সাধারণ মানুষের দেখার জন্য নয়। বিভিন্ন বাক্সে নিরাপদে তুলে রাখা এসব ছবি কেবল বছরে ষাট দিনের জন্যে উন্মুক্ত হতে পারে। অবশিষ্ট চিত্রকর্মগুলো লুভ্যর এবং ব্রিটিশ জাদুঘরসহ ইউরোপের বিভিন্ন জাদুঘরে বিক্ষিপ্ত অবস্থায় থাকলেও একটি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জে. পল গেট্টি মিউজিয়ামে।
এগুলোকে অলক্ষ থেকে বের করে আনতে গেট্টি মিউজিয়াম ভারতভিত্তিক মার্গ পাবলিকেশনের সঙ্গে রেমব্র্যান্ট অ্যান্ড দ্য ইন্সপিরেশন অভ ইন্ডিয়া শিরোনামে একটি বই হাজির করেছে। বইটি এ নিবন্ধ রচনার অন্যতম সূত্র এবং ষোড়শ শতকের শিল্পকর্মের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে আলোকপাত করার একটি প্রয়াস, যখন শিল্পকলা, রাজনীতি, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও বিশ্ব কূটনীতি এক হয়ে গিয়েছিল। বইটির সম্পাদক স্টোফানি শ্রেডার ভূমিকাংশে লিখেছেন:
‘‘মোগল অনুকৃতি রেমব্র্যান্টের স্বাভাবিক ‘প্রাকৃতিক ওলন্দাজ পল্লী এলাকা, করুণ মনস্তাত্ত্বিক নাটকে পূর্ণ বাইবেলীয় বিভিন্ন দৃশ্যপট, বাঙ্ময় মাথার পর্যালোচনা’ নিয়ে আচ্ছন্ন থাকার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সর্বক্ষণ শিল্পী হিসেবে বিকশিত হচ্ছিলেন তিনি এবং জীবনের এ পর্যায়ে নিজেকে একজন ছাত্র মনে করেছেন। এক জমকালো জীবনযাপন করেছিলেন তিনি, কিন্তু সবকিছু তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, তার বাড়িঘর, সব সংগ্রহ।”
মোগল শাসক ও সভাষদদের রেমব্র্যান্টের বর্ণনাকে ভারতীয় চিত্রকর্ম ও একই ধরনের কম্পোজিশনের পাশাপাশি স্থাপন করে এ প্রদর্শনী শিল্পকর্মের ইতিহাসের অনুরাগীদের জন্য মোগল শিল্পকর্ম কীভাবে রেমব্র্যান্টকে সম্পূর্ণ বিদেশী সংস্কৃতির প্রতি কৌতূহলে তাড়িত হয়ে ভিন্ন পরিশীলিত ধরনে আঁকতে অনুপ্রাণিত করেছে, সেটা জানার এক অনন্য সুযোগ।




