১.

শেরেবাংলার পান্তার থালা

শেরেবাংলার বাল্যকালের লীলাভূমি চাখার। সেই চাখারে পূর্বপাক ইতিহাস পরিষদের সভা। দেশের বহু স্থান থেকে বহু গুণীজন চললেন। আমিও পথ ধরলাম:

দীন জন যায় যথা

তীর্থ দরশনে।

আমার মনের চোখে চাখার সত্যি তো বাংলার অন্যতম তীর্থস্থান। কিন্তু এই সুজানিত তীর্থস্থান দেখতে যাওয়ার পথে যে এক অজানিত বৃহত্তর তীর্থস্থানের সন্ধান মিলবে, এমন তো ভাবিনি? অথচ কার্যত তাই হলো। বরিশাল থেকে চাখারের পথ, যেন কুমিরের চামড়া দিয়ে ঢাকা। বাস ভয়ে ভয়ে অতি ধীরে চলল। এরই মধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছে। যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ শুকনায় থেকেই ইউনুছ দোয়া জপতে লাগলেন। বরিশাল থেকে চাখার পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দেয়ার জন্য যেসব বন্ধু এসেছিলেন, তাদের একজন বসা ছিলেন আমার পাশে। কথা প্রসঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমাদের হক সাহেব আগে এই পথে যাতায়াত করতেন, তা আবার ঘোড়ার গাড়িতে। একদিন তিনি চাখার যাওয়ার কালে চলতে চলতে তিনি গাড়ি থামিয়ে নামলেন।’

তারপর শুনে ভাবলাম, এ রাস্তা যে এত দুর্গম ছিল, এতে ভালোই হয়েছিল। রাস্তা যদি পিচঢালা পাকা থাকত আর হক সাহেব যদি মোটরে চড়ে ভোঁ দৌড়ে চাখারে চলে যেতেন, তবে মাঝপথে তার নামাও হতো না, তার জীবন অঙ্গনে প্রেরণার এ নির্ঝরটিরো স্বপ্নভঙ্গ হতো না।

কিন্তু প্রেরণার সে উৎসটি কী? ফজলুল হক সাহেবের কর্মজীবনের তখন প্রভাতকাল। দেহে অসাধারণ শক্তি, মনে অসাধারণ তেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম শিক্ষায় চিন্তালোক উজ্জ্বল। সম্মুখে জীবনের দিগন্তসীমায় গৌরবোজ্জ্বল সাফল্যের কত রঙিন স্বপ্ন ঝিলমিল করছে। সেই তরুণ স্বাপ্নিক ফজলুল হক বরিশাল থেকে চাখারে যাওয়ার পথে চলেছেন। হঠাৎ পথের পাশের একটি কুটির অঙ্গন থেকে তার কানে এক শিশুর আর্তচিৎকার ভেসে এল: ‘দিব না, দিব না। আমার পান্তার থালা আমি দিব না।’

শুনে হক সাহেব গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়লেন। ঘোড়ার গাড়ি রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। তিনি রাস্তা বেয়ে নেমে গেলেন সেই কুটিরের অঙ্গনে।

একটি গরিবের বাড়ি। নাম তার ফরিদ। দুটো ছনের দোচালা। চালময় জানালা; অর্ধেক চালে যে ছন নেই? ছোট কুঁড়েটায় থাকে একটা বিয়ানো ছাগল আর তার দুটি বাচ্চা। বড়টিতে থাকে ফরিদ, তার স্ত্রী আর সাত বছরের ছেলে কেরামত।

মহাজন রহিম সরকার ফরিদের বাড়ি নিলাম নিয়ে এসেছে, তাই তার বাড়িতে গাঁয়ের বহু মানুষের ভিড়।

হক সাহেব জিজ্ঞাসা করে যা জানতে পারলেন, তার মর্ম এই:

আগে ফরিদের সাত বিঘা জিরাত জমি ছিল। ঋণের দায়ে একে একে তার ছয় বিঘা রহিম সরকারের উদরে চলে গেছে। ফরিদ এখন পরের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করে। দিন যা পায়, তা দিয়ে চাল কিনে। বকরিটা তিন পোয়া দুধ দেয়। তা-ই বাজারে বিক্রি করে তেল, নুন আনে। এমনিভাবে তাদের দিন গুজরান হয়। হক সাহেব দেখলেন, মহাজনের লোকে ছাগি আর তার বাচ্চা দুটি বেঁধে নিয়ে দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে গোটা দুই কাঁসার বাসন ছিল, তা-ও নিয়েছে। কেরামত তার পান্তা খাওয়ার বাসনটা বুকে চেটে ধরে চিৎকার করে বলছে: দিব না, দিব না। আমার পান্তা খাওয়ার থালা আমি দিব না।

কিন্তু সে চিৎকারে মহাজনের লোকের মন নরম হলো না। সে নিজ হাতে থালাটা ছিনিয়ে আনল। কেরামত ধুলায় গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করতে লাগল— আমার থালা- আমার পান্তার থালা।

হক সাহেবের চোখ টলমল করে উঠল। তিনি মহাজনের লোকটিকে বললেন, ‘আচ্ছা, এ থালাটার দাম বড়জোর ৩ টাকা হবে, এই নিন দাম ৫ টাকা। তারপর তিনি গড়াগড়ি দেয়া ছেলেটাকে সস্নেহে টেনে তুলে তার হাতে থালাটা দিতে দিতে বললেন, ‘নে বাবা, এই তোর থালা।’

ছেলেটা মুহূর্তের জন্য হক সাহেবের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। তারপর থালাটা বুকে চেপে ধরে এক দৌড়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকল।

মানুষের জাত তো! আবার যদি কেড়ে নেয়? হক সাহেব নিজ থেকে টাকা দিয়ে বাকি জিনিস ও বকরি ছাড়িয়ে দিলেন।

ফরিদ অবাক বিস্ময়ে ভাবছিল, একি? দুনিয়ার মানুষ, না আল্লাহর ফেরেশতা! সে হক সাহেবকে সালাম করতে এগিলে এল না; একটি ধন্যবাদের কথাও বলতে পারল না। শুধু স্তব্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। ফরিদের স্ত্রী উঠানের এক কোণে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ ঘোমটার তল থেকে চুপি চুপি কাঁদছিল। এবার তার কান্না গলা ফাটিয়ে সশব্দে বেরিয়ে এল। হক সাহেব নীরবে ফিরে এসে গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে তার একজন বন্ধু স্থানীয় সাথী ছিলেন। চাখার পৌঁছার আগ পর্যন্ত হক সাহেব তার সঙ্গে কথা বললেন না। যেন তিনি চিন্তার কোনো গহিন তলে নিশ্চঞ্চল ডুবে রইলেন। গাড়ি চাখার পৌঁছলে দারোয়ান আওয়াজ করল। হক সাহেব এতক্ষণে জেগে উঠলেন। নামার আয়োজন করতে করতে সম্মোহিতের মতো সাথীকে বললেন, ‘ওই ছেলেটার চিৎকার আমার বাকি জীবনের জন্য পথনির্দেশ করে দিল, ভাই। আমার দেশের ওই নিঃস্বদের কেড়ে নেয়া পান্তার থালাগুলো ফেরত আনতে আমি সর্বশক্তি প্রয়োগে চেষ্টা করব। এখন থেকে ও পান্তার থালা আমার।’

‘আমার পান্তার থালা- আমার পান্তার থালা’ অসহায় বালকের সেই আর্ত ফরিয়াদ হক সাহেবের দেহের রক্তকণার সঙ্গে মিশে তার শিরা-উপশিরা বেয়ে উন্মত্তের মতো অহরহ নেচে ফিরেছে। সে চিৎকারের শরাঘাতে তিনি কোনো দিনই নিশ্চিন্তে স্বস্তিবোধ করতে পারেননি। জমিদারি জুলুম নিরোধ আইন, মহাজনি জুলুম নিরোধ আইন, প্রজা আন্দোলন, ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’ স্থাপনে প্রেরণাদান, শিক্ষার ব্যাপক প্রচার দ্বারা অসহায় নিঃস্বদের চোখ খুলে দেন, এসব ছিল তার নিত্যকার দিবসের ধ্যান, নিশীথের স্বপ্ন।

সব দিক বিবেচনায় নিঃস্বের জন্য হক সাহেব জীবনভর যে অতন্ত্র সাধনা করে গেছেন, সমগ্র ভারতবর্ষ উপমহাদেশে তার তুলনা আর একজনের মধ্যেও মিলে না।

২.

স্মৃতির বোঁটায় ফোটা কয়েকটি ফুল

মরহুম ফজলুল হক সাহেবের জীবনের মতো এমন আর একটি বিপুল, বৈচিত্র্যময় কর্মোজ্জ্বল জীবন ইদানীংকালের বাংলা-পাক-ভারতের ইতিহাসে আর একটিও আমাদের নজরে পড়েনি। দেশের সর্বপ্রকার কল্যাণমূলক প্রচেষ্টায় তিনি কী ছিলেন— এ কথা জিজ্ঞাসা না করে তিনি কী ছিলেন না, এ প্রশ্নের উত্তরেই তার সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জানা যেতে পারে। আমরা এখানে সে প্রশ্নের জবাব দিতে চেষ্টা করব না। তার কর্মজীবনের উদ্যানে হাজারো ফুল ফুটেছে। অগণিত জনগণ সে ফুলের গন্ধ মাধুর্যে মুগ্ধ হয়েছে। আমরা এখানে তার জীবনের এমন কয়েকটি ছোট ঘটনার কথা উল্লেখ করব, যা আমাদের স্মৃতির বোঁটায় আজো অম্লান ফুলের মতো ফুটে আছে।

টাঙ্গাইল। তরুণ উকিল ইসরাইল খাঁ একদিন সকালে খবর পেলেন ডাকবাংলোয় ফজলুল হক সাহেব আপনাকে ডাকছেন। ইসরাইল খাঁ তার পরম ভক্ত ছিলেন, হন্তদন্ত হয়ে ডাকবাংলোয় গেলেন। হক সাহেব বারান্দায় বসা ছিলেন। ইসরাইল খাঁকে দেখেই বললেন, ‘দেখো, ওই গাছে অনেক কালজাম পেকে আছে, কয়েকটা পেড়ে দিতে পারো?’

কিছুক্ষণের মধ্যে সের আড়াই পাকা কালজাম হক সাহেবের সামনে হাজির হলো। তিনি তার সের দেড়েক তক্ষণি শেষ করলেন। তারপর ইসরাইল খাঁকে চুপি চুপি বললেন, ‘টাকা-পয়সা নেই, কাল রাতে ছিলাম উপোস। এই জাম খেয়ে উদরের আগুনটার উপরে কয়েক ফোঁটা পানি ছিটিয়ে দেয়া গেল। এখন তুমি আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর একটা টিকিট করে কলকাতা পাঠিয়ে দাও।’

এর মাস ছয়েক আগে টাঙ্গাইলের অন্তর্গত আটিয়ার গজারী গড় সরকার নিজ হেফাজতে গ্রহণ করে। সেই উপলক্ষে বহু প্রজার কাছ থেকে বেদখলি সরকারি জমি সরকার ফিরিয়ে নেয়। মজলুম মানবতার নামে এক সদ্য উত্থিত গণনেতা সেই প্রজাদের পক্ষ হয়ে অনেক টাকা চাঁদা তোলেন এবং তাদের পক্ষে মামলা করার জন্য হক সাহেবকে টাঙ্গাইলে নিয়ে আসেন। এরই মধ্যে মামলার তারিখ হলো এবং নেতাটি হক সাহেবের হাতে একটি পয়সাও না দিয়ে উধাও হয়ে যান।

নেতাটির বিরুদ্ধে হক সাহেব একটি কথাও বললেন না। যেন যথেষ্ট পেয়েছেন। এমনিভাবে নির্বিকারচিত্তে তিনি ফিরে এলেন।

বহু লোকের কাছে, বহু লোকের উপকার করতে গিয়ে তিনি ঠকেছেন এবং এমনিভাবে তাদের ক্ষমা করেছেন।

দেশের সামনে আইন পরিষদের নির্বাচন। পরস্পরবিরোধী পক্ষের দলীয় ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত।

বরিশালের এক নদীর পাড়ে খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবের বিরাট নির্বাচনী সভা। ফজলুল হক সাহেব ইলেকশনে খাজা সাহেবের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। আগে থেকে খাজা সাহেবের নির্দেশ ছিল, হক সাহেব কিছুতেই যেন সে সভায় গিয়ে যোগ দিতে না পারেন। তিনি যাতে নৌকা থেকে নামতে না পারেন, সেজন্য নদীর পাড়ে হাজারো স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন ছিল।

কিছুক্ষণ পর হক সাহেবের নৌকা গিয়ে সভার নিকটস্থ এক ঘাটে হাজির হলো। কিনারে দাঁড়ানো বিরোধী দলের একসঙ্গে হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, ‘ফিরে যাও, ফজলুল হক ফিরে যাও’। হক সাহেব নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমি কথা দিচ্ছি, তোমাদের সভায় যাব না, আমাকে নামতে দাও, পাশের গাঁয়ে আমার একটি বন্ধুর কবর আছে, আমি তাই জিয়ারত করে ফিরে যাব।’ তারা বলল, ‘তবে ওই ভাটির ঘাটে গিয়ে নামতে পারেন।’ হক সাহেব তাই করলেন। উপরে উঠে একটি গোরস্থানে দাঁড়িয়ে তার মৃত বন্ধুর উদ্দেশে মোনাজাত শুরু করলেন। মোনাজাতের মধ্যে বলতে লাগলেন, দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা, সে অবস্থায় তার নিজের কর্তব্য আর বন্ধুর সন্তান ও প্রতিবেশী কীভাবে তার কাজে বাধা দিচ্ছে ইত্যাদি।

খাজা সাহেবের সভার লোকেরা দলে দলে এসে তার মোনাজাত শুনতে লাগল। মোনাজাত শেষে দেখা গেল, খাজা সাহেবের সভার লোকে তাকে ঘিরে জয়ধ্বনি করছে, ‘ফজলুল হক জিন্দাবাদ’। এ দেশে এ জাদু এক হক সাহেবই জানতেন।

করাটিয়া সাদত কলেজের প্রাথমিক অবস্থা। খানিকটা দালানে, খানিকটা টিনের ঘরে ও খানিকটা গাছের তলে ক্লাস বসে। নতুন দালান তৈরির জন্য দেড় লাখ টাকা চেয়ে আমরা আবেদন করেছি অর্থমন্ত্রী নলিনী রঞ্জন সরকারের দরবারে। ঘুরতে ঘুরতে এক জোড়া জুতার সুখ-অসুখ উভয় তলা খুইয়ে ফেলেছি। অবশেষে তিনি একদিন বললেন, আমার বাড়ি ময়মনসিংহ, আপনার বাড়ি ময়মনসিংহ, নিশ্চিন্তে বসে থাকুন, টাকা আপনি পাবেনই।

সময়মতো টাকা বিতরণ হয়ে গেল। দেখা গেল করাটিয়ার ভাগে এক কানাকড়িও পড়েনি। অথচ বর্ধমানের মহারাজাধিরাজের কলেজের ভাগে পড়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। দেখা করে সরকার মশাইকে জিজ্ঞাসা করলাম, এ কেমন হলো? তিনি বললেন, ‘বর্ধমানের মহারাজাধিরাজ তার কলেজের জন্য আগে অনেক টাকা খরচ করেছেন কিনা!’

নিরাশ হয়ে এলাম দরাজদিল হক সাহেবের দরবারে। সব কথা খুলে বলে তার শরণ নিলাম। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘নিজেদের তরফ থেকে আপনারা কত টাকা খরচ দেখিয়েছেন?’ বললাম, কিছুই দেখাইনি, অমন দেখানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি। এখন আপনি যদি হুকুম করেন, তবে আমি করাটিয়ায় ফিরে যাই, করাটিয়ার জমিদার কলেজের জন্য কত টাকা খরচ করেছেন, তার একটি হিসাব নিয়ে এসে আপনার দরবারে পেশ করি। তিনি সংক্ষেপে বললেন, ‘যান’।

এক সপ্তাহের মধ্যে কলেজের জন্য করাটিয়ার চাঁদমিয়া সাহেবের দান দেড় লাখ টাকার একটা ফিরিস্তি নিয়ে হক সাহেবের হাতে দিলাম। তিনি একনজর দেখে বললেন, ‘যান, আমি দেখব।’

সপ্তাহখানেক পরে খবর পেলাম তিনি করাটিয়া কলেজের জন্য ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকার সাহায্য মঞ্জুর করেছেন। তার দিল ছিল দরদের দরিয়া। সেই দরিয়ায় মউজ উঠলে তিনি সব করতে পারতেন।