শস্য-শ্যামলা সুন্দর আমাদের এই বাংলাদেশ। এ দেশের মাটিতে যেমন নানা রঙের বাহার, এ দেশের মানুষগুলোও তেমনি কত বিচিত্র চরিত্র নিয়ে আসে। বাংলাদেশ ভালোবাসার দেশ। আমাদের মাটি সমতল, এক স্থানে বর্ষা হলে যেমন সারা দেশে গড়িয়ে পড়ে— তেমনি এ দেশে আসে প্রাণের বন্যা, ভালোবাসার বন্যা, সে বন্যা একের অন্তর থেকে অপরের অন্তরে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে।

এমনি একটি প্রাণের বন্যা এসেছিল একদিন বৈষ্ণবযুগে। বাঙালির ছেলে নিমাই পণ্ডিতের ভালোবাসা বাংলার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে নীলাচল, মথুরা, বৃন্দাবন, গয়া-কাশী পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল। বাঙালির সংস্কৃতির জীবনে সেই একদিন, বাংলার সুললিত বৈষ্ণব পদাবলি, রেনেটি, গড়ান ও মনোহর শাহী সুরের ওপর সওয়ার হয়ে সারা ভারতে পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। বাঙালির দেশে আরো একদিন এসেছিল। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের আবির্ভাব। সেদিনও একজনের অন্তর থেকে যে প্রাণবন্যা বের হয়েছিল তা বাংলার চৌহদ্দি ডিঙিয়ে সর্বভারতে প্রসারিত হয়েছিল। যেদিন রাজার দুলাল ভিখারির সাজে যখন দ্বারে দ্বারে আত্মত্যাগ ভিক্ষা করে বেড়িয়েছিল, সেদিন দলে দলে বাংলার ছেলেরা সর্বস্ব ত্যাগ করে তার পতাকাতলে এসে দাঁড়িয়েছিল।

দেশবন্ধুর সমসাময়িক বাংলার ছেলে ফজলুল হক। ত্যাগ করার তার কিছুই ছিল না। যা পেতেন তা-ই দান করে ফেলতেন। জীবনের অধিকাংশকাল নিজে ঋণজালে জড়িয়েছিলেন। বৈঠকখানায় মামলাকারী মক্কেলদের সঙ্গে পাওনাদার কাবুলিও বসে থাকতেন। তবুও তিনি দান করতেন। অর্থ না থাকলেও সামর্থ্য দান করতেন। নিজের ওকালতি বুদ্ধি দান করে শত শত লোককে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতেন।

তার সঙ্গে আমার চাক্ষুষ পরিচয় হলো এভাবে— সেটা বোধহয় ১৯২৯ বা ’৩০ সাল। আমি মেছুয়াবাজার ওয়াইএমসিএ হোস্টেলে থেকে বাংলায় এমএ পড়ি। একদিন সৈয়দ আবদুর রব এসে আমাকে বলল, ‘আসাম প্রদেশের বানিয়াচং থানায় দারুণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে। সেখানে রিলিফের কাজের জন্য কর্মী পাঠিয়েছি। টাকা-পয়সার খুব দরকার। অর্থ আদায়ের জন্য আমি একটি বিবৃতি লিখে এনেছি। চলো যাই ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। এই বিবৃতিতে তিনি যদি স্বাক্ষর দেন তাহলে টাকা-পয়সা আদায় করতে সহজ হবে।’

এখানে সৈয়দ আবদুর রবের বিষয়ে কিছু বলে রাখি। এখন তার কথা হয়তো অনেকেই ভুলে গেছেন। আবদুর রব অষ্টম শ্রেণী বা নবম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে নন-কোঅপারেশনে যোগ দেয়। তারপর আর তার লেখাপড়া হয়নি। দেশে রুগ্ণ আতুরদের সেবার জন্য হিন্দু সমাজের রামকৃষ্ণ মিশন, সেবা-সমিতি প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, কিন্তু মুসলমানদের এরূপ কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। তাই সে খাদেমুল ইনসান নামে একটি সেবা সমিতি গঠন করল। প্রথমে তার কাজ ক্ষুদ্র শহর ফরিদপুরে সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর বহু কর্মী এসে তার সঙ্গে যোগ দিল। সমিতির কাজও বহু বিস্তৃত হলো। তখন কলকাতায় তার প্রাণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সমস্ত বঙ্গদেশে, বিহারে ও আসামে সে লোকহিতকর কাজ আরম্ভ করল।

খাদেমুল ইনসান সমিতির জন্য জনদরদি ফজলুল হক সাহেব কলকাতার কাছে কোনো স্থানে প্রায় তিরিশ-চল্লিশ বিঘা জমি মঞ্জুর করে দিলেন। রবের উদ্দেশ্য ছিল সেই জমিতে বহু অর্থ ব্যয়ে ইমারত গড়ে তার প্রতিষ্ঠানকে একটা চিরস্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে যাবে। এ স্থানে ছোট ছোট ঘর করে সে পুরোদমে জনসেবার কাজ করে যেতে লাগল। মুয়াজ্জিন নামে একটি বাংলা ও ঐঁসধহরঃু নামে একটি ইংরেজি মাসিক পত্রিকা ফরিদপুর থাকতেই সে আরম্ভ করেছিল। এখানে এসে সে এই দুই পত্রিকা আরো জোরের সঙ্গে প্রচার করতে আরম্ভ করল। রবের খাদেমুল ইনসান সমিতির কর্মী হয়ে আমি এবং আমার ভাইয়েরা মাঝে মাঝে এখানে-সেখানে রিলিফের কাজে গিয়েছি। বাংলা মুয়াজ্জিনেও আমার বহু লেখা ছাপা হয়েছে। ১৯৪৭ সালের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় তার হোগলার ছাপড়া ও কাগজপত্র সব পুড়ে গেল। দেশ বিভাগের পর কলকাতা থেকে বিতাড়িত হয়ে রব ফরিদপুরে এসে আস্তানা গাড়ল। তার কর্মীরা এখানে-সেখানে শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।

স্বাধীনতার পূর্বেই মুসলমানদের মধ্যে যে স্বজাতি প্রেম ছিল, স্বাধীনতার পর তা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। লম্বা বাঁশের লাঠি আর পা পর্যন্ত আলখেল্লা পরে রব বড় মিয়া-ছোট মিয়া কতজনের দুয়ারে ঘুরল। দেশ যখন স্বাধীন হয়েছে, তখন আর সেবা-সমিতির প্রয়োজন কী। দেশের মন্ত্রী বাহাদুরেরা অনেক বড় বড় সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। খাদেমুল ইনসান সমিতির কথা তারা ভাববেন কেন? মুসলমান সমাজে কেউ মরলে মুর্দা দাফন করার জন্য কখনো লোকের অভাব হয় না। কিন্তু অসুস্থ লোকের সেবা করতে আমাদের ইমানদার ভাইদের একজনকেও দেখা যায় না। সেই কাজ রব আরম্ভ করেছিল। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে তার সেবার হস্ত সর্বত্র প্রসারিত হতো।

কেউই যখন রবকে গ্রহণ করল না, অর্থ ও উৎসাহ দিয়ে কেউই যখন তার মানসপুত্র খাদেমুল ইনসান সমিতিকে সঞ্জীবিত করতে সাহায্য করল না, তখন দারুণ রোগ এসে তাকে গ্রহণ করল। সেই রোগজীর্ণ অবস্থায়ও সে আশা ছেড়ে দিল না। দেখা হলেই বলত, আর একটু ভালো হলেই আমার খাদেমুল ইনসানকে গড়ে তুলব। কত আশা ছিল তার মনে— নিজের জন্য নয়, পরিবার-পরিজনের জন্য নয়, আর্ত, রুগ্ণ ও অনাহারী মানবতার জন্য।

তার আশা পূর্ণ হয়নি। মৃত্যু এসে তাকে আশা-নিরাশার ওপারে নিয়ে গেছে। যে কথা বলছিলাম আবার সেই কথায় আসি। জনসেবার কাজের জন্য আমি রবকে ভালোবাসতাম। তাই সে যখন আমাকে ফজলুল হক সাহেবের বাড়িতে যেতে বলল আমি আনন্দে তার কথায় রাজি হলাম।

ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনের একটি বাড়িতে হক সাহেব তখন থাকতেন। আমাদের খবর পেয়ে বৈঠকখানায় এসে হাসিমুখে কুশল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন।&dquote;&dquote;

এ কথা-সে কথার পর রব তার আসল উদ্দেশ্যের কথা বলল। বানিয়াচংয়ের দুর্ভিক্ষগ্রস্ত লোকদের বিষয়ে সে একটি বিবৃতি তৈরি করে এনেছিল, তা পড়তে আরম্ভ করল। পাঠক মনে রাখবেন সেটা ১৯২৯ বা ’৩০ সাল। এখনকার মতো দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েনি। রব তার বিবৃতিতে কেমন করে বানিয়াচংয়ের লোকরা কচু খেয়ে, কলার ভাদাইল খেয়ে জীবন ধারণ করে আছে সবিস্তারে লিখেছিল। শুনতে শুনতে হক সাহেবের দুই গণ্ড অশ্রুতে ভিজে গেল। রবের পড়া শেষ হলে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে হক সাহেব বললেন, ‘দেখো, আমি নিজে গিয়ে বানিয়াচংয়ের লোকদের অবস্থা দেখে এসে একটি বিবৃতি দেব। তাতে কাজ হবে। না দেখে কোনো বিবৃতি দিলে লোকের সহানুভূতি পাওয়া যাবে না।’ তারপর হক সাহেবের সঙ্গে অনেক কথা হলো। খাজা নাজিমউদ্দিনের দল তখন ক্ষমতায়। হক সাহেবকে তারা একপেশে করে রেখেছেন। তিনি যদি ক্ষমতায় আসতে পারতেন, তবে এসব ছোটখাটো দুর্ভিক্ষ একদিনেই দূর করে দিতেন।

লোকের দুঃখ-দুর্দশার খবর পেয়ে যার চোখে অশ্রুধারা বয়, এমন লোক তো দেখিনি কোথাও। হক সাহেবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অন্তরে নিয়ে সেদিন হোস্টেলে ফিরলাম। বাংলার শার্দুল আজ অভাবের জালে আবদ্ধ হয়ে কি মর্মান্তিক যাতনাই অনুভব করছেন।

এরপর হক সাহেব কলকাতা করপোরেশনের মেয়র হলেন। বাঙালি মুসলিম সমাজে সেদিন উৎসাহ আর উদ্দীপনা দেখে কে?

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন একদিন হিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট রচনা করেছিলেন। তার বদৌলতে বহু মুসলমান কলকাতা করপোরেশনে চাকরি পেয়েছিল। দেশবন্ধুর মৃত্যুর পর তার অনুসারীরা ওই প্যাক্ট পদতলে দলিত করে। খুব সম্ভব সুভাস চন্দ্রের দলের দ্বারাই এটা সম্পন্ন হয়েছিল। হক সাহেব মেয়র হলে দলে দলে মুসলমানরা কলকাতা করপোরেশনের চাকরির জন্য হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে লাগল। কিন্তু এই সময় করপোরেশনের এক্সিকিউটিভ অফিসার ছিলেন মিস্টার মুখার্জি। হক সাহেবের কথা তিনিই প্রায়ই শুনতেন না।&dquote;&dquote;

আমি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামতনু লাহিড়ীর রিসার্চ সহকারী। ১৯৩১ সালে এমএ পাস করেছি। পাঁচ-ছয় বছর গত হলো কোথাও কোনো চাকরি পেলাম না। গবেষণা সহকারীর বৃত্তি আগামী বছর পাওয়া যাবে কিনা, কে জানে। কবি আবদুল কাদির একদিন আমাকে খবর দিল, ‘কলকাতা করপোরেশনের প্রাইমারি শিক্ষকদের জন্য একটি ট্রেনিং কেন্দ্র আছে। সেখানে বাংলার অধ্যাপকদের পদ খালি আছে, জসীম তুমি চেষ্টা করো।’

আমি গিয়ে ফজলুল হক সাহেবকে ধরলাম। তিনি তত্ক্ষণাৎ মিস্টার মুখার্জিকে বলে দিলেন আমাকে যেন এই কাজে নিয়োগ করা হয়। কিন্তু আজ-কাল করে মিস্টার মুখার্জি আমাকে ঘোরাতে লাগলেন। পরে হক সাহেব মেয়রের পদ ত্যাগ করলে হাজি আবদুর রেজ্জাক ওই চাকরিতে আমাকে বহাল করার জন্য বহু চেষ্টা করেন। কতভাবেই যে তিনি আমাকে কত জায়গায় নিয়ে গিয়েছেন, তা আজ সব মনে করতে পারছি না। তবুও সেই পদ আমি পেলাম না। মিস্টার মুখার্জি আমাকে করপোরেশনের অন্য একটি পদ দিয়েছিলেন। মাস দুই ওই কাজ করে আমি তা ছেড়ে দিই। আমার কাজ ছিল স্কুলের ছেলেদের ম্যাজিক লণ্ঠনের সাহায্যে গল্প বলা।

হক সাহেব মাত্র কয়েক মাস কলকাতা করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। তখনকার দিনে করপোরেশনের অধিকাংশ কাজই সীমাবদ্ধ থাকত ইউরোপিয়ান আর হিন্দু অধ্যুষিত পাড়াগুলোয়। মুসলমানপ্রধান বস্তিগুলো নোংরা আর নানা আবর্জনায় ভরা থাকত। এসবের প্রতিকার যখন তিনি করতে পারলেন না, আর বেকার শত শত মুসলিম যুবককে করপোরেশনে চাকরি দিতে পারলেন না, সমস্ত মুসলিম সমাজ থেকে আওয়াজ উঠল— মুসলমানদের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদে আপনি পদত্যাগ করবেন। জাতির এই নির্দেশ তিনি হাসিমুখে পালন করলেন।

যেদিন তিনি মেয়রগিরি থেকে পদত্যাগ করে বাড়ি ফিরলেন, সেই সময় আমি উপস্থিত ছিলাম। দেখলাম আগের মতোই তিনি আমাদের সবাইকে নিয়ে গালগল্প করলেন। কতজনকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও করলেন। এত বড় একটা মহাসম্মানের পদ যে তিনি পরিত্যাগ করে এলেন এ যেন একগাছা খড় তার গায়ে লেগেছিল, তা পথে ফেলে দিয়ে এলেন। মুসলিম জনমতের কাছে এই আত্মত্যাগ পরবর্তীকালে হক সাহেবকে অভূতপূর্ব লোকপ্রিয় করে তুলল। বহুকাল আগে মাত্র কয়েক দিনের জন্য তিনি মন্ত্রী হয়েছিলেন। তারই মধ্যে মুসললমানদের জন্য তিনি ইসলামিয়া কলেজ আর বেকার হোস্টেল স্থাপন করে দিয়ে এসেছিলেন। তাই আবার যদি তিনি ক্ষমতায় আসতে পারেন, তবে এই সমাজের জন্য তিনি আরো কত কী করতে পারবেন। তার বৈঠকখানায় যে ওকালতির মক্কেলদের সঙ্গে পাওনাদার কাবুলিওয়ালারাও বসে থাকে, তাও তার সপক্ষে প্রচারের কাজে এল। আমাদের তরুণ যুবকদের মধ্যে সবারই মনে এ আকাঙ্ক্ষা জাগত, আহ! হক সাহেব যদি তার ঋণভার থেকে মুক্ত হতে পারতেন! কেহ যদি কয়েক হাজার টাকা দিয়ে হক সাহেবের বৈঠকখানা থেকে এই পাওনাদার কাবুলিওয়ালাদের তাড়াতে পারতেন।

হক সাহেবের এত যে অভাব, বাড়িতে এত যে পাওনাদার তবু তার দানধ্যানের কমতি ছিল না। সারা বাংলাদেশে নামেমাত্র সামান্য কিছু নিয়ে অথবা কিছু না নিয়ে কত যে লোকের মামলা তিনি করে দিয়েছেন তার লেখাজোখা নেই।

দেশ থেকে আমার বন্ধু এরোন ফকির একবার কলকাতা এসে আমাকে ধরলেন, তার গায়ের কয়েকজন লোক খুনের মামলার আসামি। কারো কারো দশ বছরের, কারো ছয়-সাত বছরের জেল হয়েছে। পক্ষ বড়ই গরিব। কোনো রকমে ত্রিশটি মাত্র টাকা সংগ্রহ করে এনেছেন। হক সাহেবকে দিয়ে এ মামলা করাতে পারলে তাদের বিশ্বাস আসামিরা খালাস হয়ে যাবে।

বহু লোকের মধ্যে হক সাহেব তার বৈঠকখানায় গল্পগুজব করছিলেন। আমাকে দেখে তিনি কাছে ডাকলেন। কোনো রকমে ভূমিকা না করে আমি বললাম, আমার দেশের এই মামলাটি আপনাকে করে দিতে হবে। সামান্য কয়েকটি মাত্র টাকা তারা সঙ্গে এনেছেন। এই বলে আমি ত্রিশটি টাকা তার হাতে দিলাম। তিনি সহাস্যে বললেন, ‘তোমার এই টাকা আমি গুনিব না। তুমি যা দিয়াছ তাই পকেটে রাখলাম।’ এই বলে টাকা কয়টি পকেটে রাখলেন।

এ মামলার আসামিপক্ষের কেউ খালাস পেল, কারো কারো জেলের মেয়াদ দু-চার বছর কমে গেল। পরবর্তীকালে ইলেকশনের সময় এই গ্রামের লোকরা হক সাহেবের নমিনি হুমায়ুন কবিরকে ভোট দিয়েছিল। তারা মনে করত সাহেবের প্রতিনিধিকে ভোট দিলে সাহেবকেই ভোট দেয়া হবে।

পটুয়াখালীতে স্যার নাজিমুদ্দিনকে পরাজিত করে হক সাহেব কলকাতায় ফিরে এলেন। কলকাতা টাউন হলে এক বিরাট সংবর্ধনা সভা বসল। এ সভায় আমি উদাত্ত স্বরে হক সাহেবের প্রশংসা করেছিলাম। কারমাইকেল হোস্টেলের ছাত্রদের দ্বারা ‘ও মাঝিরে ঝড়-তুফানে চালাও তরী হুঁশিয়ার।’ এ গানটি গাওয়ানো হয়েছিল। তাতে সভাস্থলে বিরাট উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছিল।

পটুয়াখালী বিজয়ের পর সব মুসলিম দল হক সাহেবকে ধরল স্যার নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে একত্র হয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করতে। ব্যবস্থাপক সভার সমস্ত মুসলমান যদি একদল হয়, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে মুসলমানদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধা আদায় করা যাবে।

পাঠক মনে রাখবেন সেটা ১৯৩৭ সাল। মুসলমান নেতাদের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতার কথা প্রভাব বিস্তার করেনি। এখন যেমন নেতার বুলি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ থেকে পূর্ববঙ্গকে রক্ষা করতে হবে, তেমনি তথাকার মুসলিম নেতাদের বুলি ছিল হিন্দু ধনী সমাজের শোষণ থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষা করতে হবে। হিন্দু নেতারাও দেশের অর্থনৈতিক সমতা আনার জন্য তত মাথা ঘামাতেন না। তারা চাইতেন দেশ থেকে ইংরেজ শাসনের অবসান আর হিন্দু সমাজ বংশানুক্রমে যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে তার রক্ষণাবেক্ষণ। মুসলমানরা ভাবত দেশে স্বাধীনতা এলে তা হবে হিন্দু সমাজের স্বাধীনতা।

সে যাহোক, পটুয়াখালী বিজয়ের পর মুসলিম সমাজ যখন হক সাহেবকে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে স্যার নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে অনুরোধ করলেন তিনি তা মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। এ মেনে নেয়া যে তার পক্ষে কত কঠিন ছিল, তা পাঠক অনুমান করতে পারবেন না। ১২-১৪ বছর ধরে এই স্যার নাজিমুদ্দিন আর সোহরাওয়ার্দীর দল হক সাহেবকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। স্টার অব ইন্ডিয়া কাগজে দিনের পর দিন যারা তাকে গালি দিচ্ছিল আর খাঁচায় পড়া ব্যাঘ্রের মতো হক সাহেবকে সেই গালি হজম করতে হচ্ছিল, আজ জাতির মঙ্গলের জন্য তিনি সেই স্যার নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে হাত মেলালেন।

হক সাহেবের নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হলো।

হক সাহেব বাংলার প্রধানমন্ত্রী হলেন। দলে দলে মুসলিম যুবক দল আসতে লাগল তার কাছে চাকরির অনুরোধ করতে। কে কার দারোয়ানের হুমকি মানে? হক সাহেব আমাদের নিজের লোক। তার সঙ্গে দেখা করতে তুই বেটা থামাবার কে? দু-একজন দারোয়ান অভ্যাগতদের কাছে কিল ধমকও খেল। সুতরাং গেট থেকে দারোয়ান উঠে গেল। হক সাহেবের প্রকাণ্ড বৈঠকখানায় সকাল থেকে লোক গমগম করে। সবাই চাকরির উমেদার। হক সাহেব অন্দরমহল থেকে এসে এমনি মজলিসি আলাপ জুড়ে দিতেন, আর তার গালগল্প করার ক্ষমতাও ছিল অসাধারণ, সব লোক মশগুল হয়ে তার গল্প শুনত। এভাবে ঘণ্টা দেড়েক কাটতে হঠাৎ ঘড়ি দেখে বলে উঠলেন, ‘আরে আমার ক্যাবিনেটের মিটিংয়ের সময় তো হয়ে এল। আমি তবে যাই।’ এই বলে তিনি তাড়াতাড়ি তার গাড়িতে উঠতেন। এমনি আলাপী সভা বসত সন্ধ্যায়। চার-পাঁচদিন ঘুরলেও হক সাহেবের কাছে কোনো কথা বলা যেত না।

দেশের গুণী ব্যক্তিদের তিনি খুবই ভালোবাসতেন। নজরুল ইসলামের প্রতিভার তিনি সবচেয়ে সমঝদার ছিলেন। গায়ক আব্বাসউদ্দীন সামান্য বেতনে অফিসের কেরানির কাজ করতেন। হক সাহেব একটি নতুন পদ সৃষ্টি করে তাকে প্রচার গানের রেকর্ড তৈরির কাজে নিয়োগ করেন।

নজরুল ইসলামকে একটি ভাতা দেয়ার জন্য আমরা তাকে কত বলেছি। একবার তিনি দার্জিলিং যাচ্ছেন, আমি, নান্না, ওয়াসেক সামছুর রহমান এবং বহু ছাত্র গাড়ি ছাড়ার সময় ধ্বনি তুললাম, নজরুল ইসলামকে সাহিত্যিক ভাতা দিতে হবে। সাহিত্যিক ভাতা তাকে দিতে হক সাহেব বহু চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তখনকার দিনে প্রধানমন্ত্রীর কাজ যে কত সীমিত ছিল, তা কল্পনার অতীত। তখনকার দিনে বিভাগীয় সেক্রেটারিরা মন্ত্রীদের আদেশ-উপদেশ খুব কমই মান্য করতেন।

 &dquote;&dquote;

ফরিদপুরের তরুণ জমিদার মোহন মিয়া তখন হক সাহেবের বিরুদ্ধ দলে ছিলেন। হক সাহেব ফরিদপুর এলে কালো পতাকা নিয়ে তার দল রেলস্টেশনে এসে উপস্থিত। গাড়ি ফরিদপুর স্টেশনে এসে থামল। হক সাহেব তখন কোরআন শরিফ পড়া আরম্ভ করলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যাচ্ছে। হক সাহেব কোরআন শরিফ পড়ছিলেন। মোহন মিয়ার কালো পতাকাধারীর দল যখন দেখল হক সাহেব কত বড় ইমানদার, অত সময় ধরে কোরআন শরিফ পড়ছেন, তারা ধীরে ধীরে স্টেশন থেকে চলে গেল। হক সাহেব তখন তার দলবল নিয়ে সার্কিট হাউজে উঠলেন।

বিকালবেলা ঈশান স্কুল প্রাঙ্গণে বিশাল সভা। হক সাহেব এখানে বক্তৃতা করবেন। হাজার হাজার লোক এসে সভায় সমবেত হয়েছে। মোহন মিয়াও এসেছেন। তার বিক্ষোভকারীর দল নিয়ে। মৌলভী তমিজুদ্দিন সাহেবকে মন্ত্রিসভায় না নেয়ায় মোহন মিয়া হক সাহেবের বিরুদ্ধ দলে যান।

অনেক বিলম্ব করে হক সাহেব এসে বললেন, ‘ভাইসব, আজ আমি বড়ই অসুস্থ। সভায় বক্তৃতা করতে পারব না। আসুন আপনারা হাত উঠিয়ে আমার জন্য মোনাজাত করুন। হক সাহেব দোয়া-দরুদ পড়ে মোনাজাত আরম্ভ করলেন। সবাই হাত উঠালেন, কিন্তু মোহন মিয়া হাত উঠালেন না। তার নিজের লোকরাই তার হাত দুটি টেনে মোনাজাতের আকারে তুলে দিল। সুতরাং  মোহন মিয়াও মোনাজাতে শামিল হলেন।

হক সাহেব মোনাজাতে বলতে লাগলেন, ‘আয়ে খোদা পরওয়ারদেগার, আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, জাতির খেদমত করতে যদি নাফরমানি করে থাকি তবে তুমি আমাকে শাস্তি দিও, কিন্তু কাউকে মন্ত্রী বানানোর ক্ষোভে যদি কেউ আমার বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে, যদি কেউ আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে থাকে, হে খোদা! গফুরুর রহিম তুমি তার বিচার করিও।

প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে হক সাহেব মোনাজাত করে গদ গদ ভাষায় বললেন, ভাইসব! আমি বড়ই অসুস্থ। আপনারা যার যার বাড়ি চলে যান।

এই সভায় হক সাহেব যদিও বক্তৃতা করলেন না, কিন্তু মোনাজাতের মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্যে সবই বলে গেলেন। মোহন মিয়ার দল তা টেরও পেল না। হক সাহেব যখন বলছিলেন, কাউকে মন্ত্রী করি না এজন্য কেউ যদি আমার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে খোদা তুমি তার বিচার করিও। তখনো মোহন মিয়া  মোনাজাতের ভঙ্গিতে হাত উঠিয়ে আছেন।

হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী কিন্তু সমস্ত ক্ষমতা তখন লাট সাহেবের হাতে। স্যার নাজিমুদ্দিনের দলের সঙ্গে লাট সাহেবের দহরম-মহরম। হক সাহেবকে তখনো ইংরেজ লাট বিশ্বাস করেন না। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই হক সাহেব সদলবলে ঢাকায় চললেন। ঢাকা এসে হক সাহেব বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসবে প্রধান অতিথির ভাষণ দিলেন। তখন দেশে কোনো বিপ্লবী আন্দোলন ছিল না। হক সাহেব এক জায়গায় বলে বসলেন, শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিপ্লবীদের আড্ডাখানা। তা যদি সত্যি হয়, তবে যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বুড়িগঙ্গার অতল তলে ডুবে যায়।

হক সাহেবের উদ্দেশ্য ছিল এই বক্তৃতা দিয়ে তিনি লাট সাহেবের মনোরঞ্জন করবেন। স্যার নাজিমুদ্দিনের দলের প্রতি লাট সাহেবের যে বিশ্বাস ও সহানুভূতি তা ঘুরে তার ওপর পড়বে। তা কতদূর সফল হয়েছিল জানি না। হক সাহেব ঢাকায় এলে হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। কিন্তু এই বক্তৃতার পর চারদিকে ঢি ঢি পড়ে গেল। দেশের পত্রিকাগুলো হক সাহেবের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠল। তার সঙ্গে যারা ছিলাম আমরাও তার বক্তৃতার সমালোচনা করেছিলাম।

এরপর আর কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে তার নিমন্ত্রণ হলো না। তার বন্ধু ফজলুল করিম সাহেবের বাড়িতেই তিনি দলবল নিয়ে উঠেছিলেন। তিনিও একদিন হক সাহেবকে বললেন, ‘আপনি একি করলেন? হিন্দু-মুসলমান সবাই আপনাকে এত শ্রদ্ধার সঙ্গে অভ্যর্থনা করল, আর আপনি কিনা সমাবর্তন অভিভাষণে বিপ্লবীদের উপরে আলোচনা করলেন?’ হক সাহেব কোনো কথা বললেন না।

সেদিন সকালে তিনি আমাকে বললেন, ‘চলো জসীম উদ্দীন। আজ আমার বক্তৃতা শুনবে।’

যতদূর মনে পড়ে গেণ্ডারিয়ার একটি বালিকা বিদ্যালয়ে হক সাহেবকে অভিনন্দন দেয়া হলো। এই সভায় তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলন বিষয়ে এমন সুন্দর বক্তৃতা দিলেন, যা শুধু হক সাহেবের দ্বারাই সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই বক্তৃতা কোনো কাগজে ছাপা হলো না।

হক সাহেবের সমাবর্তন বক্তৃতা নিয়ে কলকাতার হিন্দু কাগজগুলোয় প্রতিবাদের ঝড় উঠল। স্যার নাজিমুদ্দিনের দলও হক সাহেবের জনসমাজে এই অপ্রিয়তার সুযোগ গ্রহণ করলেন। হক সাহেব কোনো কথা বললেন না। কয়েক দিন পর তিনি পত্রিকায় একটি বিবৃতি দিয়ে বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে প্রদত্ত বক্তৃতাটি তৈরি করতে আমি একজন মহান হিন্দু নেতার অমুক সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে প্রদত্ত বক্তৃতার অনুকরণ করেছিলাম। এ বলে তিনি তার নিজের বক্তব্যের পাশাপাশি স্যার আশুতোষের কোনো সমাবর্তন বক্তৃতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে দিলেন। অমনি হিন্দু পত্রিকাগুলো চুপ হয়ে গেল।

এতদিন হক সাহেবের জনপ্রিয়তা শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মিস্টার জিন্নাহর মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনে হক সাহেব পুরোধা থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে অশেষ সুনাম অর্জন করলেন। বাংলাদেশে হিন্দু সমাজের অশেষ বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে তিনি মহাজন উচ্ছেদ, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা আইন পাস করালেন। এতে ভারতের মুসলমানদের মধ্যে তার জয়জয়কার পড়ে গেল। মিস্টার জিন্নাহকে তিনি মনে মনে ভালোবাসতেন না। জিন্তু সাহেবও যে তাকে খুব ভালোবাসতেন এমন মনে হয় না। তখনকার দিনে হক সাহেবের জনপ্রিয়তার কথা কল্পনা করা যায় না। বাংলাদেশের কোথাও যদি তিনি যেতেন লাখ লাখ লোক জমা হতো তার বক্তৃতা শুনতে, একনজর তাকে দেখতে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বাংলার বাইরে গভর্নমেন্টের কোনো কাজে অথবা মুসলিম লীগের কোনো সভায় যখন তিনি দিল্লি বা বোম্বাই যেতেন প্রতি স্টেশনে ফুলের তোড়া নিয়ে হাজার হাজার লোক জমা হয়ে ধ্বনি তুলল, শেরেবাংলা জিন্দাবাদ’ এই ধ্বনি হিমালয় থেকে কুমারিকা অন্তরীপ এবং খাইবার পাশ থেকে সুদূর নীলাঞ্চল পর্যন্ত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতো। হক সাহেবের প্রতিটি কথা, প্রতিটি চলনফেরন তখনকার দিনে সারা দেশের খবরের কাগজে প্রচারিত হতো। এরই মধ্যে ইংরেজ-জার্মান যুদ্ধ বেধে গেল। হক সাহেব ওয়ার কাউন্সিলের সভ্য হলেন। ওদিকে মুসলিম লীগ সেই সভা বর্জন করার প্রস্তাব পাস করল। চারদিক থেকে অনুরোধ আসতে লাগল দেশের নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে হাজার হাজার টেলিগ্রাম আসতে লাগল, হক সাহেব যেন ওয়ার কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন। কিন্তু হক সাহেব কোনো কথাই বলেন না।

স্ব-সমাজের দাবিতে বহু আকাঙ্ক্ষিত কলকাতা করপোরেশনের মেয়রের পদ, যে আসন বাংলার হূদয়দেবতা দেশবন্ধু একদিন অলঙ্কৃত করেছিলেন সেই পদ যিনি হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন, গভর্নর জেনারেল ওয়ার কাউন্সিলের সভ্য হওয়ার পদ তার কাছে সামান্য একটি তৃণদতের মন। কিন্তু হক সাহেব এ ব্যাপারে কোনোই উচ্চবাচ্য করেন না। আমি, নান্না, মিলু তার পা ধরে কত বলি, আপনি ওয়ার কাউন্সিলের পদ ত্যাগ করেন। হক সাহেব বলেন, তোমরা একটু সবুর করো।

সারা ভারতের নানা স্থান থেকে মুসলমানরা সভায় মিলিত হয়ে হক সাহেবকে ওয়ার কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে লাগল। দিনে দিনে এই প্রস্তাব যখন শত-সহস্রে পরিণত হলো, হক সাহেব যখন বুঝতে পারলেন তার জনপ্রিয়তা জিন্নাহ সাহেবের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, একদিন হঠাৎ তিনি বড় লাটের যুদ্ধসভা থেকে পদত্যাগ করলেন। সারা ভারতের প্রায় সবগুলো কাগজে বড় বড় হরফে ব্যানারসহ এই খবর ছাপা হলো। আসমুদ্র হিমাচল কম্পিত করে আবার ধ্বনি উঠল শেরেবাংলা জিন্দাবাদ। এই ধ্বনি খুব সম্ভব মি. জিন্নাহর ভালো লাগেনি।

যদিও হক সাহেব নিজে সমাজের দাবিতে মুসলিম লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, তবু স্যার নাজিমুদ্দিনের দল তাকে ভালো চোখে দেখত না। তারা অপেক্ষায় ছিলেন কখন হক সাহেবকে সরিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। যশোরের সৈয়দ নওশের আলী সাহেব হক সাহেবের দক্ষিণ হস্ত ছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে বহু ইংরেজ কর্মচারীকে তাড়িয়ে বাঙালি নিয়োগ করেন। একবার মন্ত্রিসভার কোনো একটি গোপন কথা বাইরে প্রকাশ হয়ে পড়ে। এজন্য স্যার নাজিমের দল বিক্ষোভ প্রকাশ করে। পার্টির সভায় হক সাহেবের অনুরোধে সৈয়দ নওশের আলী সাহেব এজন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। হঠাৎ সোহরাওয়ার্দী সাহেব বাংলায় বলে উঠলেন, ‘অন্তর থেকে দুঃখ প্রকাশ করছেন, না মুখে বলছেন।’

এ কথায় নওশের আলী সাহেব সভা থেকে চলে গেলেন। যেতে যেতে বলে গেলেন, ‘যেখানে আমার কথার সম্মান নেই, সেই মন্ত্রিসভাকে আমি ঘৃণা করি।’

 

অমনি স্যার নাজিমের দল ‘আল্লাহু আকবর’, ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’ প্রভৃতি ধ্বনি করতে লাগল। হক সাহেবের কালো মুখখানি হাঁড়ির মতো কালো হয়ে গেল। সেদিন সন্ধ্যা বেলায় তিনি তার খোশগল্পের আসরে আর এলেন না।

মন্ত্রিসভায় সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে হক সাহেব মোটেই সহ্য করতে পারছিলেন না। আসমুদ্র হিমাচল ব্যাপিয়া হক সাহেবের সুখ্যাতি। এর আগে যুদ্ধপরিষদ থেকে পদত্যাগ নিয়ে তিনি লোকপ্রিয়তা যাচাই করে নিয়েছেন। বড় বড় লোকের বড় বড় হিংসা। জিন্নাহর একচ্ছত্র নেতৃত্বও হয়তো তিনি ভালো চোখে দেখতেন না।

অনেক ভেবে-চিন্তে হক সাহেব তার মন্ত্রিসভা থেকে সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে সরিয়ে দিলেন। তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি স্যার নাজিমুদ্দিনও সদলবলে তার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবেন।

স্যার নাজিমের দল একযোগে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি মি. জিন্নাহর উচিত ছিল বঙ্গদেশে এসে এই দুই দলের মধ্যে মিটমাট করে দেয়া। তা না করে তিনি দিল্লি থেকে ফরমান জারি করে হক সাহেবকে মুসলিম লীগ থেকে বিতাড়িত করলেন। এর আগের এত যে লোকপ্রিয়তা আসমুদ্র হিমাচলব্যাপী, এত যে ‘শেরেবাংলা জিন্দাবাদ’ ধ্বনি, তা আজ কোনো কাজেই লাগল না। শ্যামা-হক মন্ত্রিসভা গঠনের পর হক সাহেব মুসলিম সমাজ থেকে একেবারে একঘরে হয়ে রইলেন। জিন্নাহ সাহেব মনে মনে হাসলেন।

মি. জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলনের পশ্চাতে ছিল হিন্দুদের সঙ্গে মুসলমানদের অর্থ-সম্পদের পার্থক্য। যারা বড়, তারা গরিবদের ওপর অবিচার করবেই। সেই অবিচারের ইন্ধন মিস্টার জিন্নাহকে সর্বভারতের মুসলমানদের নেতা করেছিল। গান্ধীর মতো, পণ্ডিত নেহেরুর মতো সর্বত্যাগী নেতাদের আহ্বানে সাধারণ মুসলিম সমাজ সাড়া দেবে, এটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু তবুও হিন্দু সমাজের বড় বড় নেতাদের আহ্বানে কর্ণপাত না করে সারা ভারতের মুসলিম সমাজ মিস্টার জিন্নাহর পতাকাতলে গিয়ে দাঁড়াল। তার কারণ এ পর্যন্ত কোনো সর্বভারতীয় হিন্দু নেতা দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য কিছুই করেননি। পাকিস্তান পেলে এ অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর হবে। মুসলমানরা অধিক সংখ্যায় চাকরি পাবে। মুসলমান ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যে বহু সুযোগ-সুবিধা পাবে। তাই পাকিস্তান আন্দোলন।

বহুকাল হতে মুসলমানরা যে হিন্দু জমিদার ও কুসিদজীবীদের দ্বারা শোষিত হচ্ছিল, এই নেগেটিভ ভোট ছিল জিন্নাহ সাহেবের স্বপক্ষে, তাই হক সাহেবের এত জনপ্রিয়তাও জিন্নাহ সাহেবের পাকিস্তান আন্দোলনের তরঙ্গে ডুবে গেল।

হক সাহেব তার নিজ দলের সঙ্গে হিন্দুদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন। তাসের ঘরের মতো তা টিকল না। নিজ সমাজের মধ্যে লোকপ্রিয়তা হারিয়ে অপর সমাজের মধ্যে সৌহার্দ্য বেশি দিন টেকে না।

ঝাউতলার বাড়িতে হক সাহেব তখন প্রায় একাকী জীবনযাপন করেন। তার অনুরাগীরা কতবার তাকে মুসলিম লীগের সভ্য হতে অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু হক সাহেব অবিচল-অটল। একদিন মোল্লা জান মোহাম্মদ, আমি এবং আরো অনেকে গিয়ে হক সাহেবকে ধরলাম, মুসলিম লীগের স্বপক্ষে আপনাকে স্বাক্ষর দান করতে হবে। তিনি স্যার নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বললেন। আমরা উত্তর করলাম, আপনি মুসলিম লীগে যোগদান করলে সব অনাচার দূর করা যাবে। আমাদের কথায় হক সাহেব মুসলিম লীগে যোগ দিলেন। পরবর্তীকালে র্যাডক্লিফ রোয়েদাদের সময় মুসলিম লীগের বড় কর্তারা হক সাহেবকে কোনো প্রাধান্য দিলেন না। অনেকের ধারণা তিনি যদি এক সময়ে পাকিস্তানের স্বার্থে যুক্তি প্রয়োগ করতেন, তবে ভাগবাঁটোয়ারায় আমরা আরো বেশি কিছু পেতাম। খুলনাবাসীরা এ সময় হক সাহেবকে উকিল মেনে ছিল। হক সাহেবের যুক্তির ফলে খুলনা পাকিস্তানের ভাগে পড়ল।

দেশ ভাগ হয়ে আমরা পাকিস্তান অর্জন করলাম। হক সাহেব কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় এলেন। আজ আর আসমুদ্র হিমাচল কম্পিত করে বাংলার ব্যাঘ্র গর্জন করে না।

মুসলিম লীগ গভর্নমেন্ট গঠিত হলো। কিন্তু এই গভর্নমেন্ট যখন জাতির আশা-আকাক্ষা মিটাতে পারল না, তখন আবার ডাক পড়ল, সেই জরাপীড়িত, ভগ্ন স্বাস্থ্য মাঝিয়ালের প্রতি। জাতির তরণীকে এই ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে ঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য। সেদিন সমাজের ডাকে আবার সেই বয়োবৃদ্ধ হক সাহেব যৌবনের প্রদীপ্ত তেজ নিয়ে জাতির খেদমতে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে এলেন তারই মতো এক বৃদ্ধ মওলানা ভাসানী আর শহীদ সোহরাওয়ার্দী। জাতির প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বীকেও বুকে জড়িয়ে ধরার শক্তি একমাত্র হক সাহেবের মতো লোকের ছিল।

রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের সেই রোমাঞ্চকর কাহিনী সবাই জানেন। তা লিখে আর প্রবন্ধের কলেবর বর্ধিত করব না।

শেষ জীবনে তিনি কেএম দাস রোডে বড়ই একাকী জীবনযাপন করেন। একদিন প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারি বন্ধুবর কুদরতউল্লাহ সাহেব আমাকে বললেন, ‘দেখো তোমাদের এখানে দুই বয়োবৃদ্ধ প্রতিভা পড়ে রয়েছেন— হক সাহেব আর মওলানা আকরাম খাঁ। তাদের জীবনের কাহিনীতে জাতির কত অজানা ইতিহাস মিশে রয়েছে। আমি স্টেনোগ্রাফার ও নকলকারী পাঠিয়ে দেব। তুমি তাদের অনুরোধ করবে তারা যেন দিনের কোনো এক সময়ে তাদের বিগত জীবনের কাহিনী বলে যান।’

আমি একদিন হক সাহেবের বাসায় গেলাম। তার সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না। হক সাহেবের কোনো আত্মীয় আমাকে বললেন, আপনি অনেক দেরিতে এসেছেন। এখন আর তিনি জীবনের কোনো ঘটনা বলতে সক্ষম নন। পরিবারের লোকেরা ওষুধ খাইয়ে, গায়ে-হাতে-পায়ে নানা রকম মালিশ মেখে তাকে কোনো রকমে জীবিত রেখেছেন। ভগ্ন পাল, ভগ্ন মাস্তুল, সাত সাগরের মাঝি রোগশয্যায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছেন।

সেই মৃত্যু যখন এসে তাকে নিয়ে গেল, তার আত্মীয়স্বজন কেউই বুঝতে পারেনি এই দেশে তার এর গুণগ্রাহী আছে। অতি সাধারণভাবে কোনো রকম মাইকের ব্যবস্থা না করে হক সাহেবের মরদেহ পল্টন ময়দানে আনা হলো। কোথা থেকে শত সহস্র ভক্তে দল পঙ্গপালের মতো এসে জুটল। পল্টন ময়দানে লোক আর ধরে না। তাদের অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাবে হক সাহেবের দ্বারা উপকৃত। আজ তারা অশ্রুসিক্ত নয়নে এসেছে এই মহামানবের প্রতি শেষ কৃতজ্ঞতা জানাতে। হক সাহেবের মতো কোনো মুসলিম নেতাই জাতিকে এমন করে আর ভালোবাসেননি।