অবিবেচক লেখকদের কল্যাণে শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকের একটি ‘খাদক’ ইমেজ আমাদের সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল। তিনি এক বসাতেই ৪০টি ফজলি আম খেতেন, তিনি বাজারের সবচেয়ে বড় কৈ মাছ আস্ত গিলে খেতেন। তিনি ঘুষি মেরে নারকেল ভাঙতেন।

আমার শৈশবের ফজলুল হকের দুটো ইমেজ ছিল: একটিতে তিনি নদীতে সাঁতার কেটে কুমির তাড়াচ্ছেন, অন্যটিতে বই পড়া শেষ হওয়ার পর বইয়ের পৃষ্ঠা কুটিকুটি করে ছিঁড়ে ফেলছেন। আমার পক্ষে ফজলি আম, কৈ মাছ, নারকেল কিংবা কুমির কাহিনীর কোনোটারই পুনরাবৃত্তি করা সম্ভব ছিল না। অনুপ্রাণিত হয়ে আমি বই ছিঁড়তে বুঝতে পারি, ওয়াজেদ আলী সাহেব ছেলেকে পুনরায় বই কিনে দিলেও আমার বাবা দ্বিতীয়বার বই কিনে দিতে রাজি হতেন না।

বাংলার বাঘ হয়েই হোক কি বাংলার মানুষের ত্রাতা হয়ে হোক, ফজলুল হক অন্তত আমার প্রজন্ম পর্যন্ত আমাদের অনেকেরই ‘হিরো’ হয়ে বেঁচে আছেন।

১৯৬০ কিংবা ১৯৬১-তে তার জন্মদিনে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ক’জন তরুণ শিক্ষার্থী, তারা বলেছেন, ‘স্যার ইনশাআল্লাহ আমরা আপনার আগামী জন্মদিনেও অভিনন্দন জানাতে আসব, আশা রাখি।’

অসাধারণ ‘উইট’সম্পন্ন বুড়ো বাঘ তাদের শুনিয়েছেন, ‘আমিও আশা করি তোমরা অন্তত আরো এক বছর টিকে থাকবে।’ এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধটি সংসদের এ কে ফজলুল হককে নিয়ে, যখন তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সে বাংলা কেবল পূর্ব বাংলা কিংবা আজকের বাংলাদেশ নয়, অবিভক্ত বাংলা। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এর মধ্যে তাকে দুবার সরকার গঠন করতে হয়েছে।

শুরু থেকেই অনাস্থার হুমকি ও যড়যন্ত্রের মোকাবেলা করে এসেছেন। খাজা নাজিমউদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ গুরুত্বপূর্ণ আরো অনেকের নিরন্তর প্রতিকূলতা তাকে সহ্য করতে হয়েছে। তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার আয়োজন করতে তারই সুহূদ বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদদের ডেপুটেশন একদিকে গিয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে। অন্যদিকে গিয়েছে ছোট লাট (গভর্নর) ও বড় লাটের (ভাইসরয়) কাছে।

এটাও মিথ্যে নয়, কোনো না কোনোভাবে তিনি ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরেই থাকতে চেয়েছেন; এসব নিয়ে সংসারের ভেতরের ও বাইরের দ্বিমুখী চাপ তাকে সইতে হয়েছে।

অবিভক্ত বাংলার পূর্ব বাংলার মানুষের কল্যাণ কে সবচেয়ে বেশি করেছেন, এ প্রশ্ন উঠলে এ কে ফজলুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী একজনের নামও বলা যাবে না।

এ লেখাটিতে বাংলার সংসদে ফজলুল হক কেন ছিলেন তার খানিকটা পরিচয় পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য, অনালোচিত কিছু বিষয়ই তুলে আনা হয়েছে, বৃহত্তর-মহত্তর ফজলুল হককে নয়। সে কাজটি করবেন উদ্যোগী গবেষক।

 

অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী

১৯৩৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির নির্বাচনের প্রেক্ষাপট রচনা করে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন। তার আগে ১৯৩২-এ ঘোষিত সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। ২৫০ আসনের মধ্যে ১১৭টি আসন মুসলমানদের জন্য সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ১১১টি, শহরাঞ্চলে ছয়টি। সাধারণ আসনে মুসলিম প্রার্থীর দাঁড়ানোর সুযোগ খোলা থাকে। ততদিনে মুসলমান, হিন্দু ভোটার সংখ্যার অনুপাতও ৩:২-তে দাঁড়ায়। নিজেদের মধ্যে যথেষ্ট কাদা ছোড়াছুড়ির পরও নির্বাচনোত্তর মুসলিম ঐক্য বৃহত্তর বাংলায় কংগ্রেস তথা হিন্দু শাসন প্রতিষ্ঠার পথ একেবারে রুদ্ধ করে দেবে, এটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। একক দল হিসেবে ১৯৩৭-এর নির্বাচনে কংগ্রেসই সর্বাধিক ৬০টি আস পায়। মুসলিম লীগের ৪০টি, এ কে ফজলুল হকের কৃষক-প্রজা পার্টি ৩৫টি। নির্দলীয় মুসলমান ৪১, তফসিলভুক্ত সম্প্রদায় ২৩, নির্দলীয় বর্ণ হিন্দু ১৪, ইউরোপীয় ২৫, নির্দলীয় অতিরিক্ত ১২টি আসন ভাগাভাগি হয়। নির্দলীয় মুসলমান সদস্যদের একাংশ চলে আসে মুসলিম লীগ, একাংশ যায় কৃষক-প্রজা পার্টিতে। তখন দলীয় শক্তি দাঁড়ায় মুসলিম লীগ ৫৯, কৃষক-প্রজা পার্টি ৫৫। মূলত কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারিত হবে কৃষক-প্রজা পার্টির সঙ্গে। ফজলুল হক জানান, কংগ্রেসও তাকে তাদের সঙ্গে কোয়ালিশন করে প্রধানমন্ত্রী করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে। খাজা নাজিমউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগকেই তখন কৃষক-প্রজা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করতে হয়। সে সময় ধর্মে ভর করা একটি বিবৃতি ফজলুল হকও দেন: ‘মুসলমানদের স্বার্থ উপেক্ষা করে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলালে আল্লাহ-রাসুলের কাছে কী জবাব দেব।’

১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল ফজলুল হকের নেতৃত্বে ১১ সদস্যের মন্ত্রিপরিষদ গভর্নর এন্ডারসনের কাছে শপথ নেন। ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী এবং একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী।

কারো কারো বিশ্লেষণ ও মতে, ফজলুল হক কংগ্রসের সঙ্গেই কোয়ালিশন করতে চেয়েছিলেন; কিন্তু কংগ্রেসই তা চায়নি তাই তিনি তখন মুসলিম লীগকে কোয়ালিশনে আসতে আমন্ত্রণ জানান।&dquote;&dquote;

এ কে ফজলুল হক ১ এপ্রিল ১৯৩৭ থেকে ২৯ মার্চ ১৯৪৩ পর্যন্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তার আগে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের দ্বিতীয় মন্ত্রিপরিষদে ৪ জানুয়ারি ১৯২৪ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪ পর্যন্ত শিক্ষা ও নিবন্ধীকরণ দপ্তরের মন্ত্রী এবং ২৭ আগস্ট ১৯২৪ পর্যন্ত শিক্ষা, নিবন্ধীকরণ ও চিকিৎসা দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন। বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে (যতটা না আদর্শগত তার চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত লাভ এবং পারস্পরিক হিংসা ও বিদ্বেষ এবং ল্যাং মারামারির লালিত সংস্কৃতির কারণে) ফজলুল হক মন্ত্রিপরিষদ শুরু থেকে ঝুঁকির মধ্যে ছিল এবং একটার পর একটা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এসেছে। এমনকি তা নিজের তৈরি করা কৃষক-প্রজা পার্টির শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে আদাজল খেয়ে লেগেছিলেন।

খাজা নাজিমউদ্দিন, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবাব হাবিবুল্লাহ বাহাদুর ও তমিজউদ্দিন খান কোয়ালিশন থেকে বেরিয়ে যান, ফজলুল হকের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন এবং মুসলিম স্বার্থবিরোধী চিহ্নিত করে মুসলিম লীগপ্রধান মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকেও ক্ষেপিয়ে তোলেন। পূর্ব বাংলায় ফজলুল হকই জিন্নাহর একক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। অথচ এই জিন্নাহই বলেছিলেন, যখন বাংলার বাঘ গর্জন করে, তখন মেষগুলোকে নিশ্চুপ থাকতে হবে। জিন্নাহরও বহু আগে ফজলুল হকই যে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন এটিও মুসলিম লীগ নেতারা বিস্মৃত হতে চেষ্টা করেন। মুসলিম লীগ ফজলুল হক মন্ত্রিসভা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিলে ফজলুল হকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে (৪ ডিসেম্বর ১৯৪১) তার প্রথম মন্ত্রিসভার পতন ঘটে, তবে নতুন মোর্চা তৈরি হতেও সময় লাগেনি। ফজলুল হকের সমর্থনে এগিয়ে আসে কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক, হিন্দু মহাসভা, কৃষক-প্রজা পার্টি (শামসুদ্দিন গ্রুপ), নির্দলীয় গ্রুপ ও তফসিলি সম্প্রদায়। আর তার কৃষক-প্রজা পার্টি তো ছিলই। তিনিও নেতা নির্বাচিত হলেন এবং গভর্নর জন আর্থার হার্বাট ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ করালেন। নতুন কোয়ালিশনের দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিত্ব শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। শ্যামাপ্রসাদ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র; তিনিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হন। তাকে নিয়ে ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভা শ্যামা হক মন্ত্রিসভা নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।

 &dquote;&dquote;

ফজলুল হকের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার সমাপ্তি ঘটে তার পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৩ সালের ২৮ মার্চ আগে থেকে তৈরি করে রাখা পদত্যাগপত্রে তাকে স্বাক্ষর করান বাংলার তখনকার ছোট লাট জন আর্থার হার্বার্ট এবং এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে খাজা নাজিমউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রী করে মুসলিম লীগপ্রধানের একটি অনুগত মন্ত্রিপরিষদকে শপথ গ্রহণ করান। খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিপরিষদে খাদ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।

অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ফজলুল হকের সামনে খোলা ছিল অনেক পথ। তিনি পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক হয়েছেন, মুসলমানের ছেলেরা গণিতে সুবিধা করতে পারে না, হিন্দু বন্ধুদের এ মন্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে গণিতে এমএ করেছেন। তিনি শিক্ষক হতে পারতেন, গবেষক হতে পারতেন, আইসিএস পরীক্ষায় বসার কথা ভাবতে পারতেন। ওকালতি ও রাজনীতির পথ তো ছিল তার জন্য অবারিত। তার পরও নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর সুপারিশ নিয়ে ছোট লাট বাংলার গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলারের কাছে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি কেন চাইতে গেলেন, এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। একটি যুক্তি, তার পিতা আইনজীবী ওয়াজেদ আলীর ইচ্ছায়। কিন্তু ততদিনে তিনি রাজনৈতিক সংগঠক ও ব্যবস্থাপক হিসেবে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাতাদের নজরে চলে এসেছেন। তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সমপর্যায়ের কো-অপারেটিভ অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরিতে ঢোকেন। তার স্ত্রী খুরশিদ তালাত চাননি তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে যান। শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সস্নেহ চাপে ১৯১১-তে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে কলকাতায় আইন ব্যবসায়ে যোগ দেয়ার জন্য ঢাকা ছেড়ে যান।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় একসময় ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বলেছেন, ‘তোমাকে কতবার বলেছি চাকরি ছাড়তে, তবুও তোমার গোলামির মোহ গেল না। তুমি দেরি না করে কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করো। যতদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারো, ততদিন আমি নিজে তোমাকে মাসে ৫০০ করে টাকা দেব’ (সিরাজ উদ্দীন আহমেদের ‘শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক’ থেকে উদ্ধৃত)।

তার চাকরি ছাড়ার খবরটি মুসলমান নেতাদের জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাগত সংবাদ। তিনি যখন ঢাকা থেকে কলকাতা আসছেন, শিয়ালদহ স্টেশনে তাকে সংবর্ধিত করতে এসেছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, নবাব সিরাজুল ইসলাম, আবুল কাশেম, মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা বেলায়েত হোসেন এবং কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার ক’জন তরুণ শিক্ষার্থী। এটাই ছিল তার জীবনের একটি টার্নিং পয়েন্ট।

১৯১৩ সালেই ফজলুল হক জায়ান্ট কিলার হিসেবে আবির্ভূত হন। ঢাকা থেকে নির্বাচন করে পরাক্রমশালী রায় বাহাদুর কুমার মহেন্দ্রনাথ মিত্রকে হারিয়ে তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য হন। কাউন্সিল আমলে তিনি মন্ত্রীও হন। লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি আমলে ট্রেজারি বেঞ্চেই হোক কি অপজিশনে— তিনি ছিলেনই।

চল্লিশের দশকের ‘জিন্নাহ ক্রেজ’, এমনকি বাঙালি মুসলমানদেরও ভুলিয়ে দেয় যে এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ থেকে ১৯২১ পর্যন্ত তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন।

অ্যাসেম্বলিতে প্রশ্নোত্তর

৯ মার্চ ১৯৪২ বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির অধিবেশনে প্রতুল চন্দ্র গাঙ্গুলী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, ডিফেন্স অব ইন্ডিয়া রুল ইন বেঙ্গলের আওতায় নিরাপত্তা কয়েদির সংখ্যা কত?

বর্তমানে আটক, নির্বাসিত ও গৃহবন্দি— এ ধরনের কয়েদির সংখ্যা পৃথক পৃথকভাবে বলুন। সরকার কি তাদের মুক্তি দেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবছে, যদি উত্তর না-বোধক হয়, তাহলে কারণটা কী?  

প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকই তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বললেন, সম্মানিত সদস্যের চাহিদামতো তথ্য তার কাছে নেই। তবে ১৯৪২-এর জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত নিরাপত্তা কারাবন্দির সংখ্যা ২৭৩; রাজনৈতিক কিংবা সরকারের যুদ্ধনীতির বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য আটক, নির্বাসিত ও গৃহবন্দির সংখ্যা বর্ণিত সময় পর্যন্ত ২ হাজার ১১।

তাদের ছেড়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা সরকার উপলব্ধি করছে না, কারণ তা হবে জনস্বার্থের পরিপন্থী।

অতুল চন্দ্র সেন, অন্য একজন সদস্য জিজ্ঞেস করলেন এটা সত্যিই জনস্বার্থের পরিপন্থী হবে কিনা, তা বিবেচনার জন্য সরকার কি একটি উপযুক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠন করার কথা ভাববে?

ফজলুল হক বললেন, এটি সরকারের বিবেচনাধীন।

সদস্য নরেন্দ্র নারায়ণ চক্রবর্তী জিজ্ঞেস করলেন, ২৭৩ জন নিরাপত্তা বন্দির মধ্যে কতজন ভারত সরকারের আদেশে বন্দি আর কতজন বাংলা সরকারের আদেশে?

জবাবে তিনি বললেন, তথ্য হাতে নেই, তবে আমি এটাকেই নোটিস হিসেবে বিবেচনা করছি, পরে জবাব দেব।

একই দিনের আরেকটি প্রশ্নোত্তর:

সদস্য কে নুরুদ্দিন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী কি অবহিত রয়েছেন যে, ১৫ জানুয়ারি ১৯৪২ বগুড়ায় মুসলমান ছাত্রদের যে সভা হওয়ার কথা ছিল জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তা করার অনুমতি দেননি? এই প্রত্যাখ্যানের কারণ মাননীয় মন্ত্রী জানবেন কি?

এ কে ফজলুল বললেন, বিষয়টি তিনি জানেন। এ সভার কারণে শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। এ দলের আহ্বায়ক প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করেই সভা বাতিল করতে সম্মত হয়েছে।

খান বাহাদুর মোহাম্মদ আলী বললেন, মাননীয় মন্ত্রী দয়া করে বলবেন কি কারা এই প্রতিদ্বন্দ্বী দল এবং কেমন করে তারা এই সম্মতিতে পৌঁছল?

এ কে ফজলুল হক বললেন, আমি বলতে পারি আমার এই সম্মানিত বন্ধু নিজেই একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

(বলা আবশ্যক এই প্রশ্নকর্তাই বগুড়ার মোহম্মদ আলী, যিনি পরবর্তী সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।)

খান বাহাদুর মোহাম্মদ আলী বললেন, তা সত্য নয়।

স্পিকার বললেন, তা সত্য কিনা এখানে তা অবান্তর। মোহাম্মদ আলী বললেন, আমরা এখনো মন্ত্রীর পুরো জবাব শুনিনি।

মন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বললেন, আমি রিপোর্ট থেকে বলছি। আমার এ সম্পর্কে ব্যক্তিগত ধারণা নেই। রিপোর্ট বলছে একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মাননীয় সদস্য নিজেই, অন্য দলের নেতৃত্বে সংগঠনের দুজন সদস্য, যারা এখন প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির সদস্য।

মোহাম্মদ আলী বললেন, সেটা আমার সম্পূরক প্রশ্ন ছিল না। আমি জানতে চেয়েছি, সভা বাতিল করার ব্যাপারে কী সমঝোতা হয় তা মন্ত্রী মহোদয় জানাবেন কি?

মৌলবি আবু হোসেন সরকার বললেন, এটা তো আপনিই ভালো জানেন।

(আবু হোসেন সরকারও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।)

মন্ত্রী এ কে ফজলুল হক বললেন, ‘দেখানোর মতো কিছু হাতে নেই, তবে রিপোর্ট বলছে, দুই দলের মধ্যে বিরোধ ছিল কোনো না কোনোভাবে তারা সমঝোতায় পৌঁছেছে, তবে সে পদ্ধতির বিবরণ রিপোর্টে দেয়া হয়নি।’

মোহাম্মদ আলী বললেন, এ রিপোর্ট সত্য না মিথ্যে, তা নির্ধারণের জন্য একটি তদন্ত করা আবশ্যক বলে কি মন্ত্রী মনে করেন?

ফজলুল হক বললেন, এর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। যে বিষয়টির সমাধা হয়ে গেছে, আমি সে খাতা আবার খুলতে চাই না।

মোহাম্মদ আলী বললেন, কিন্তু রিপোর্টটি সঠিক নয়।

স্পিকার বললেন, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সঠিক না বেঠিক, আপনি তা জিজ্ঞেস করতে পারেন। চাইলে আপনি নতুন প্রশ্ন করতে পারেন।

কাঁচা পাটের দাম ও কৃষকের দায়

১৯৪২ সালের ১০ মার্চ অ্যাসেম্বলি সদস্য আজহার আলীর প্রশ্নে কয়েকটি বিষয় উঠে এল— পাটের দাম অনেক পড়ে গেছে; সরকার নাকি পাট চাষের জমি বর্তমানের দুই-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনার কথা ভাবছে, পাটচাষী সমিতির প্রতিনিধি নাকি এর প্রতিবাদ জানিয়েছে, পাটকলের মালিক ও বেইলার্সরা নাকি পাট কেনা বন্ধ করে দিয়েছে?

মন্ত্রী নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ বাহাদুর একটি প্রশ্ন বাদে প্রায় সবগুলোই মোটামুটি স্বীকার করে নিলেন। পাটকল মালিক ও বেইলার্সদের পাট কেনা বন্ধের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করলেন। এ নিয়ে বিতর্কে অংশ নিলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মির্যা আবদুল হাফিজ, মুহাম্মদ ইসরাইল, সুরেশ চন্দ্র ব্যানার্জি প্রমুখ।

প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক স্পিকারের অনুমতি নিয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে তিনি যে বিবৃতি দিলেন, তার সারাংশ:

পাটের সমস্যা আমাদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমাদের অনেকেরই অভিমত, পাট চাষের জমির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। এ পরিস্থিতিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সদস্য (বাণিজ্য) কলকাতা সফরে এসেছিলেন। তার সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন কাঁচা পাটের পর্যাপ্ত চাহিদা রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের আশ্বস্ত করেছে বর্তমানে যে পরিমাণ জমিতে পাট চাষ হচ্ছে, তারা সবটাই আমদানি করতে প্রস্তুত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে মহাযুদ্ধে জাপানের জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে, আমি নিজেও দিল্লি ঘুরে এসেছি। ভারত সরকার আমাদের আশ্বাস দিয়েছে পাটের চাহিদায় কোনো কাটছাঁট হবে না, তবে পরিবহন সমস্যার বিষয়টি (যুদ্ধের কারণে) বিবেচনায় রাখতে হবে। তার পরও যদি পাটের দাম নির্ধারিত একটি দামের নিচে নেমে যায়, তাহলে ভারত সরকার আমাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে। আমরা নিজ থেকে পাট চাষের জমির পরিমাণ কমিয়ে দেয়ার পরও যদি পাটের দাম কমে যায়, তাহলে আমরা ভারত সরকারকে কিছু বলতে পারব না। কাজেই তাদের পরামর্শ শোনাই উত্তম। আমরা নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি।

ঢাকা রায়ট এনকোয়ারি কমিটি&dquote;&dquote;

অ্যাসেম্বলি সদস্য সাহাবে আলম ২৫ মার্চ ১৯৪২ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর কাছে ঢাকা দাঙ্গা তদন্ত কমিটিতে যুক্ত আইনজীবী ও পরামর্শকদের নাম এবং তাদের পেছনে তখন পর্যন্ত কমিটির জন্য মোট কত খরচ হয়েছে জানতে চান।

প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকই স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী। তিনি খরচের হিসাব দিলেন:

 

নাম

ব্যারিস্টার জেএন মজুমদার সিনিয়র কাউন্সেল            ফি

৭৪,৭১৫ টাকা ভ্রমণ ভাতা

১,৭৭৪ টাকা  

ব্যারিস্টার এমএম মোর্শেদ কাউন্সেল           ২১,৬৪৯ টাকা ৮ আনা    ১,৬৬৪ টাকা     

পঙ্কজ কুমার ঘোষ সরকারি উকিল    ৬,৮২৬ টাকা     ৭০ টাকা           

নইমুদ্দিন আহমদ অতিরিক্ত সরকারি উকিল   ২,৪৩৫ টাকা     ৭০ টাকা           

 &dquote;&dquote;

জানুয়ারি ১৯৪২ পর্যন্ত মোট খরচ হয়েছে ৯৫ হাজার ৩৯৫ টাকা ৩ আনা ৩ পয়সা

 

আব্দুল লতিফ বিশ্বাস জানতে চাইলেন, এসএম মোর্শেদ কোন যোগ্যতায় কত বছরের অভিজ্ঞতায় কমিটির সদস্য হলেন।

ফজলুল হক জানালেন, এসএম মোর্শেদ ব্যারিস্টার অ্যাট-ল, তিন বছরের কিছু বেশি অভিজ্ঞতা এবং এর মধ্যেই তিনি কলকাতা হাইকোর্টের খ্যাতিমান আইনজীবী।

আবদুল লতিফ বিশ্বাস জানতে চাইলেন, এসএম মোর্শেদ কি ফজলুল হকের ভাগ্নে?

ফজলুল হক বললেন, কেবল আমার ভাগ্নে নয়, নবাব পরিবারের সঙ্গেও তার আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে।

খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান জিজ্ঞেস করলেন, ঢাকা রায়ট ইনকোয়ারি কমিটিতে চারজন উকিল নিয়োগের কি দরকার ছিল?

ফজলুল হক বললেন, প্রশ্নকর্তা নিজেও যেহেতু উকিল, কারণটা তিনি ভালোই বুঝবেন।

ডাক্তার নলিনাক্ষ স্যান্যাল বললেন, মোট খরচ বলেছেন ৯৫ হাজার ৩৯৫ টাকা ৩ আনা ৩ পয়সা, অথচ উকিলদের পেছনে যা খরচ হয়েছে তা যোগ করলেই ১ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

ফজলুল হক বললেন, হিসাবটা আমি পরীক্ষা করিনি আর সংশ্লিষ্ট কেরানিও জানত না যে, তার হিসাবের ভুল ধরার জন্য এখানে কেউ থাকবেন। আমাকে সরবরাহ করা হিসাবই আমি দাখিল করেছি। আমি বিষয়টি টুকে নিলাম এবং দেখব এ নিয়ে কী করা যায়।

সৈয়দ আবদুল মজিদ বললেন, জেএন মজুমদার ও এসএম মোর্শেদকে প্রতি সপ্তাহেই ঢাকা-কলকাতা যাওয়া-আশার জন্য তাদের নির্ধারিত ফির বাইরেও ভ্রমণ ভাতা দেয়া হয়েছে?

ফজলুল হক বললেন, প্রতি সপ্তাহে নয়, যখন কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছে।

খান বাহাদুর মোহাম্মদ আলী এসএম মোর্শেদকে কিসের ভিত্তিতে নির্বাচিত করা হলো জানতে চাইলেন।

ফজলুল হক জানালেন, আইন বিভাগ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করে তাকে নির্বাচন করেছেন। সৈয়দ আবদুল মজিদ বললেন, কোয়ালিশন পার্টির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল তাদের মামলা থেকে দুজন কাউন্সেলকে প্রত্যাহার করা, কিন্তু তা হয়নি।

ফজলুল হক স্বীকার করলেন, তাদের পেছনে জনগণের অর্থ অপচয় হচ্ছে বলে পার্টি অধৈর্য হয়ে উঠেছিল, কিন্তু খাজা নাজিমউদ্দিনের কারণে আমি পার্টির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারিনি।

(বলা আবশ্যক, এই এসএম মোর্শেদই পরবর্তীকালের বিখ্যাত বিচারক এসএম মোর্শেদ)।

 

স্কুল ইন্সপেক্টর ও সাব-ইন্সপেক্টর

বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির ১৯৪০ সালের ১৫ জুলাইয়ের অধিবেশনে সদস্য ধনঞ্জয় রায় শিক্ষা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের কাছে জানতে চাইলেন, (১) ঢাকা জেলার সাব-ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর অব স্কুল এবং সাব-ইন্সপেক্টর অব স্কুলসের সংখা কত? (২) তাদের মধ্যে জাত হিন্দু, মুসলমান ও তফসিলভুক্ত জাতির ক’জন রয়েছেন? (৩) তাদের নাম, সার্কেল এবং মহকুমা কোনটি জানাবেন কি? (৪) যদি তফসিলভুক্ত সম্প্রদায়ের কোনো সাব-ইন্সপেক্টর বা সাব-ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর না থাকে, সেক্ষেত্রে কী করবেন?

মন্ত্রী জানালেন, (১) মক্তবের জন্য একজন স্পেশাল সাব-ইন্সপেক্টরসহ মোট সংখ্যা ১৮, সাব-ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর দুজন।

(২) জাত হিন্দু ৫, মুসলমান ১৩, তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত শূন্য;

(৩) মৌলবি আবদুর রাজ্জাক, শ্রীনগর; মৌলবি মাহমুদুর রহমান, ঘিওর; মৌলবি মো. বাবরু, ধামরাই; মৌলবি সেরাজুদ্দিন আহমদ, ঢাকা সদর; বাবু আশুতোষ মিত্র, আড়াইহাজার; মৌলবি মো. আবদুল হাই, কালিগঞ্জ; মৌলবি আবুদল মজিদ, মনোহরদি; বাবু মাখন লাল গাঙ্গুলী, লৌহজঙ্গ; মৌলবি সৈয়দ আলী হামেদ, সিঙ্গাইর; মৌলবি দেওয়ান আলী, নরসিংদী; বাবু গিরিন্দ্র নারায়ণ বসাক, জয়দেবপুর; মৌলবি ইসমাইল উদ্দিন আহমদ, শিবপুর; বাবু নগেন্দ্র কুমার চৌধুরী, মানিকগঞ্জ; মৌলবি নাদির আলী রাড়ি, মুন্সীগঞ্জ; মৌলবি আবুল ফয়েজ মোহাম্মদ, নারায়ণগঞ্জ; বাবু সুরেশ চন্দ্র চক্রবর্তী, নবাবগঞ্জ; মৌলবি মাহমুদুজ্জামান স্পেশাল সাব-ইন্সপেক্টর, মক্তব, ঢাকা।

মৌলবি আতাউর রহমান, সাব-ডিভিশনাল ইন্সপেক্টর ঢাকা এবং মৌলবি তোফাজ্জল আলী, নারায়ণগঞ্জ।

(৪) তফসিলভুক্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ঢাকা রেঞ্জের ইন্সপেক্টর অব স্কুলসের তদন্তাধীন। তফসিলভুক্ত সম্প্রদায়ের একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হবে।

 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালের স্পেশাল মোশন

রাজকীয় ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বাহিনী আবিসিনিয়ায় ইতালির বিরুদ্ধে লড়াই করে কেরেন, হারার ও আসমারা দখল করে নিয়েছে। এজন্য প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক প্রস্তাব করেন এই বিজয়ে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি যে আনন্দিত সে বার্তা বাংলার গভর্নর ও কমান্ডার ইন চিফের মাধ্যমে স্যার আর্চিবল্ড ওয়াভেলকে দেয়া যায়।

তার স্পেশাল মোশনের পরই অতুল কৃষ্ণ ঘোষ জানতে চান, এই গৌরবময় সাফল্য অর্জন করতে কতজন ভারতীয় সৈন্যকে প্রাণ দিতে হয়েছে। মোশনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয় বলে স্পিকার তাকে আর এগোতে দিলেন না।

সৈয়দ জালাল উদ্দিন হাশেমি বললেন, এই বিজয়ে আমাদের কিছুই এসে যায় না, কেবল এক হাত থেকে অন্য হাতে বদল, এক সাম্রাজ্যবাদীর হাত থেকে অন্য সাম্রাজ্যবাদীর হাতে। যখন ব্রিটিশ বোমারু বিমান ইথিওপিয়ার ওপর বোমা বর্ষণ করে শিশু ও নারী হত্যা করেছে, কোনো গণতান্ত্রিক ইউরোপীয় দেশ এর প্রতিবাদ করেনি। আমি খোলামেলাভাবেই বলছি, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর ইতালির ফ্যাসিবাদ একই কথা।

নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার বললেন, ভারত জার্মান-শাসিত না ব্রিটিশ-শাসিত তাতে এমন কিছু এসে যায় না। সরকার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দিকে ঝুঁকে আছে। আমরা বরং আমাদের ভারতীয় সেনাদের অভিনন্দন জানাই। ব্রিটিশের পরিবর্তে আমরা জার্মান শাসনাধীনে চলে গেলে কী হবে— এ প্রশ্ন শুনে এক কৃষক জবাব দিয়েছে, কমছে কম, কান্ধা তো বদল হো গয়া। অন্তত কাঁধ তো বদল হয়েছে।

মৌলবি আবুল হাশিম এই বিজয়ের ফলে আবিসিনিয়ায় ইসলামী জাগরণের সম্ভাবনা দেখে প্রধানমন্ত্রী মোশনকে সমর্থন দেন।

ফজলুল হক স্মরণ করিয়ে দেন সদস্যদের কারো কারো বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহের আওতায় পড়ে। নিহারেন্দু দত্ত মজুমদার বলেন, দাস হওয়ার চেয়ে ফাঁসিকাষ্ঠে গিয়ে সত্য উচ্চারণ শ্রেয়।

ফজলুল হক বলেন, ইতালিয়ানদের হাতে আবিসিনিয়ায় সামরিক বেজ তৈরি হলে তা ভারতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াত। ভারতীয় সৈন্য এবং ব্রিটিশ বাহিনীর বীরত্ব ও সাফল্য সে সম্ভাবনাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ রকম একটি সাফল্যকে অভিনন্দন জানানোর প্রস্তাব বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে, এটা ভাবাই যায় না। ফজলুল হক আশা করেন, বিরোধীরা যেন কেবল শব্দেই বিরোধী হন, কাগজে-কলমে যেন না হন।

ফজলুল হকের স্পেশাল মোশন শেষ পর্যন্ত ভোটে দেয়া হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ১২৫টি এবং বিপক্ষে ৪৬টি ভোট পড়ায় প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

 

কেন পদত্যাগ করলেন অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী

বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে ১৯৪৩-এর জুলাইয়ের এক অধিবেশনে এ কে ফজলুল হক তার পদত্যাগের কাহিনী বিস্তারিত বর্ণনা করেন। সিরাজ উদ্দীন আহমেদের গ্রন্থ থেকে তার বর্ণনার একটি অংশ উদ্ধৃত হলো:

২৮ মার্চ (১৯৪৩) রোববার সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিট, গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য হঠাৎ তার কাছ থেকে পত্র পাই। আমি গভর্নর হাউজে যখন যাই, তখন আমি খুব উত্ফুল্ল ছিলাম। কারণ আমি দেখলাম যে, আমার সহকারী ও সমর্থকরা আমাদের অপরাজেয় অবস্থা সম্পর্কে বিশ্বাসী। আমি যখন ৭টা ৩০ মিনিটে গভর্নরের সঙ্গে দেখা করি, আমি তাকে তার সচিবের সঙ্গে বসা অবস্থায় দেখলাম। আমরা যখন আলোচনা শুরু করি তখন কক্ষে আমরা মাত্র তিনজন ছিলাম। কয়েক মিনিট আলোচনার পর গভর্নর আমার পদত্যাগ দাবি করেন। আমি এ কাহিনী এতবার বলেছি যে, আমি মনে করি ঘটনার পুনরুল্লেখ করা আইনসভায় বিরক্তি সৃষ্টি করবে। কিন্তু বর্ণনার ধারাবাহিকতার জন্য আমি সে চমকপ্রদ গল্পের পুনরুল্লেখ না করে পারি না।

আমি বিনয়ের সঙ্গে ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলাম, কিন্তু গভর্নর আমার পদত্যাগপত্র দাবি করে বসেন। কারণ আমি সর্বদলীয় সরকার গঠনের সুবিধার জন্য পদত্যাগ করতে প্রস্তুত এই মর্মে আইনসভায় ভাষণ দিয়েছি। আমি বলেছিলাম, আমি এখনো সে অবস্থানে কঠোর আছি। কিন্তু সেটা কারণ হতে পারে না, সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের পরিবেশ সৃষ্টি না হলে আমার পদত্যাগ করার কোনো কারণ নেই। কিন্তু তত্ক্ষণাৎ আমাকে পদত্যাগ করার জন্য তিনি অনমনীয় হয়ে ওঠেন এবং বিষয়টি সম্পন্ন করার জন্য গভর্নর পদত্যাগের একটি টাইপ করা পত্র উপস্থিত করেন। আমি তাকে ব্যাখ্যা করলাম যে, এ মুহূর্তে পদত্যাগ করলে বাজেট মঞ্জুরি অসমাপ্ত থাকবে এবং অর্থবিলের প্রতি চরম আঘাত হানা হবে। অধিকন্তু আমি সহকর্মী ও দলের সঙ্গে আলোচনার সময় চাইলাম। কিন্তু গভর্নর ছিলেন একগুঁয়ে এবং আমার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। সেখানে এবং তখনই আমার পদত্যাগের জন্য তিনি অটল ছিলেন। আমি তবু বাধা দিয়েছিলাম। তখন গভর্নর তার কৌশল কিছুটা পরিবর্তন করেন এবং নিশ্চয়তা দেন যে, তত্ক্ষণাৎ পদত্যাগ কার্যকর হবে না এবং এটা তিনি তার কাছেই রেখে দেবেন। যদি সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের সম্ভাবনা দেখা দেয়, তাহলে তিনি দলনেতাদের দেখাবেন। সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করার জন্য প্রয়োজন না হলে পদত্যাগপত্র কার্যকর করা হবে না— গভর্নর এ নিশ্চয়তা প্রদান করলে আমি পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে তা গভর্নরকে প্রদান করি। আমি পুনরায় তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম যে, এ পত্রকে যেন পদত্যাগ হিসেবে গ্রহণ করা না হয় এবং কার্যকর করা হবে না, যদি না সে রকম অবস্থার সৃষ্টি হয়। এ নিশ্চয়তা পেয়ে আমি আগেই খসড়া করা পত্রে স্বাক্ষর করি। ... আমি যেইমাত্র গভর্নরকে পদত্যাগপত্র দিলাম, তিনি তার সচিবের দিকে তাকালেন এবং ইউরোপীয় দলকে ফোনে কিছু বলার নির্দেশ দেন। ... আমি বাসায় ফেরার ২ ঘণ্টার মধ্যে সেদিন সন্ধ্যায় আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণের খবর প্রকাশ হলো। এ ছিল তার প্রদান করা অঙ্গীকারের বিরুদ্ধে। কে অস্বীকার করতে পারবে যে, সমাপ্তিটা ছিল অসহনীয় এবং এর পেছনে ছিল নোংরা চরিত্রের অভিসন্ধি ও বড়যন্ত্র।