দ্বিতীয়বারের মতো বইটা শেষ করে মনে হলো, এ ক’টা দিন আমি কী পড়লাম! আমি কি নিকারাগুয়া নিয়ে লেখা আদৌ কোনো ভ্রমণকাহিনী পড়ে ওঠলাম! নাকি বিশ্বের শক্তিমান একটি পরাশক্তির বিরুদ্ধে কম্পমান আরেকটি লড়াকু জাতির আত্মপরিচয়ের স্বচ্ছ দর্পণ দেখলাম! আর কি আশ্চর্য, এখানেও সেই নাটের গুরু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র! আর তার দানব থাবার নগ্ন প্রকট বেহায়া আস্ফাালন!

তাই বুঝি বইটি পড়তে গিয়ে বারবার বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার। সচেতন বাঙালিমাত্রই জানে, চুয়াত্তরে সৃষ্ট বাংলাদেশের দুর্ভিক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই উত্কট প্রতিশোধের ফল। আর তাবৎ বিশ্বের কে না জানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিঠে একবার সওয়ার হওয়ার মানে যেকোনো মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পেটের ভেতর ইচ্ছেয় হোক বা শত অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তলিয়ে যাওয়া!

এ ভাবনা থেকেই আমি আবার ফিরে যাই নিকারাগুয়ার অজ্ঞাতনামা সেই কবির লিমেরিকের কাছে।

এক ছিল ছোট মেয়ে নিকারাগুয়ার,

হাসিমুখে হলো এক জাগুয়ার সওয়ার।

যুগল ভ্রমণ শেষ হলে পর,

মেয়েটিকে নিয়ে পেটের ভেতর

মিটি মিটি চোখে দেখো হাসে জাগুয়ার।

ভাবতে থাকি, আচ্ছা, জাগুয়ারের মিটি মিটি হাসিটা ঠিক কেমনতরো? আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অলক্ষ্যে ছড়িয়ে দেয়া দুর্লভ মুচকি হাসির মতো কি? নাকি সুইপার কলোনিতে অতি যত্নে বেড়ে ওঠা তাগড়া কালো শুয়োরের ফিচকে হাসির মতো? লক্ষ্মী, তারা, রুক্মিণী, লতা, চম্পারা ওই শুয়োরদের পিঠে সওয়ার হয়ে হইহই করতে না করতেই ধপাস করে পড়ে যেত। আর শুয়োরগুলো মোটা নাকে ফিচেল হেসে সুড়ুৎ করে ঢুকে যেত পাশের কচু বনে! কিন্তু তাতে কি! ওরা আবার ধরে এনে শুয়োরের পিঠে ওঠার যুদ্ধ চালিয়ে যেত।

কিন্তু এ রূপকের ব্যাখ্যা কী?

যুদ্ধ এবং অতঃপর আরো যুদ্ধ! রক্ত এবং অতঃপর আরো রক্তপাত! মৃত্যু এবং অতঃপর আরো আরো মৃত্যু, কিন্তু পরাশক্তির কাছে কিছুতেই আত্মসমর্পণ নয়! কখনই নয়! তাই কি বোঝাতে চেয়েছেন নিকারাগুয়ার ওই অজ্ঞাতনামা কবি?

১৯৮৬ সাল, নিকারাগুয়ার সান্দিনিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে মার্কিন মোড়লদের চিরকালীন স্বাভাবসুলভ পেছনে থেকে যুদ্ধ উসকে দিয়ে, নিকারাগুয়ার জনগণের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি তৈরি করে, অভিজাতশ্রেণী আর মিডিয়া ক্যু ঘটিয়ে সান্দিনিস্তা সরকারের পতন অনিবার্য করে তুলেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তার পোষ্য কন্ট্রারা। প্রতিদিন যুদ্ধ, রক্তপাত, মৃত্যু ছিল সে সময়ের নিকারাগুয়ার চিত্র। যেকোনো মুহূর্তে বিমান, ফেরি, বাস অথবা শহর জনপদে কন্ট্রারা আক্রমণ করে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল নিকারাগুয়াকে। কিন্তু তখনো তারা জনগণের মনোবল ভেঙে ফেলতে পারেনি।

লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা, পূর্ব ইউরোপসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি জনগণ জানে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়া বড় পেট। আর তার ক্ষুধাও বিশ্বব্যাপী সর্বগ্রাসী। যুদ্ধ, রক্তপাত, ক্ষয়, অবিশ্বাস, তাত্ক্ষণিক উত্তেজনার ভাইরাস ছড়িয়ে যেকোনো ঐক্য ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে পৃথিবীকে আতঙ্কিত, অসহায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করাই মার্কিন সরকারের ক্ষুধা মেটানোর একান্ত নীতি। এমনকি প্রয়োজনে শত্রু তৈরি করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিয় খাদ্য খাদক খেলা।

রাত ৩টা ২০ মিনিট। শুক্রবারের ঝড়ো রাত। অবিশ্রাম বৃষ্টি-বাতাস খেলে যাচ্ছে বাইরে। ধমকে ধমকে বিদ্যুৎ চমকে যাচ্ছে সুতীব্র গর্জনে। এ রকম ভেজা রাতে মা এসে দাঁড়াত অনেকগুলো ভূতগল্প সঙ্গে নিয়ে, ‘জানো, একাত্তরে এ রকম এক রাতে হঠাৎ সাইরেনের শব্দ এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল আমাদের ছোট শহরটাকে! গুলি-পাল্টাগুলি চলেছিল ভোররাত পর্যন্ত। আসলে মুক্তিযোদ্ধারা দূর থেকে অশনিসংকেত দিয়েছিলেন পাকিস্তানি আর্মিদের, সাবধান! আমরা আসছি।’

আমার মায়ের স্বচ্ছ কাকচোখে অনেক বছর ধরে এ গল্পগুলো ভেসে বেড়াত, স্বাধীনতা তো আর এমনি এমনি আসেনি। কত রক্ত, মৃত্যু, ইজ্জত...

অথচ নিকারাগুয়ার জনগণ নিত্য মৃত্যু, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সাঁড়াশি আক্রমণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মার্কিন পোষ্য কন্ট্রাদের যখন-তখন অতর্কিত হামলা, সদ্য তরুণ গেরিলাদের দেশরক্ষায় উপর্যুপরি আত্মাহুতি, সরকারের ওপর চরম বিরক্তি আর গভীর অভিযোগের পাশে সরকারের ওপর তখনো স্থির আস্থা রেখে চলেছিল, ‘একে তো টিকে থাকতেই হবে, তা না হলে তো কোনো আশা থাকে না।’

রুশদির ঈগলের চোখ, পিঁপড়ের মতো ঘ্রাণশক্তি, ছাঁকনির মতো হূদয়। বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার সূত্র ধরে বইটিতে চমত্কারভাবে উঠে এসেছে সোভিয়েত শৃঙ্খলের বিষয়টি। সোভিয়েত রাশিয়া সম্পর্কে নিকারাগুয়ার নিষ্পাপ আবহের মতোই বাংলাদেশের কবি, সাহিত্যিক, তরুণ-তরুণীদের একই রকম নিষ্পাপ ধারণা ছিল। কিন্তু রুশ সাহিত্যিক সলঝেনিিসন ঝনঝন করে সে ধারণা ভেঙে দিয়েছিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল সোভিয়েত শৃঙ্খলের দানব রূপ, শ্রমশিবির, নির্বাসন, একেবারে নিরুদ্দেশ করে দেয়া এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো কালো কুিসত ঘটনাগুলো। সম্ভবত কমিউনিজম সম্পর্কে স্বপ্ন বাস্তবতায় তখনই সৃষ্টি হয় দ্বিধা-অবিশ্বাসের ঘূর্ণিপাক আর আদর্শিক দোলাচল।

বইটির ৯২ নং পৃষ্ঠায় প্রেসিডেন্ট দানিয়েল ওর্তেগার একটি কথা খুব মনে ধরেছে, ‘নিকারাগুয়ার জনগণ কখনো বিলাসিতায় অভ্যস্ত ছিল না।’ চট করে মনে পড়ে গেল, বাংলাদেশের জনগণ বর্তমানের এ ভোগ-বিলাসিতার ঘন আকর্ষণে চিরকালীন অভ্যস্ত ছিল কি!

অনুবাদ শিল্প সাহিত্যের গতিশীল একটি মনোরম মাধ্যম। বিশ্বসাহিত্যের অন্তত অনেকটাই আমার মতো পাঠককুল অনুবাদের মাধ্যমে জানতে পারে। বিশ্বখ্যাত ও স্বমহিমায় বিতর্কিত ব্রিটিশ ভারতীয় লেখক সালমান রুশদির ‘দ্য জাগুয়ার স্মাইল’ স্রেফ কোনো ভ্রমণকাহিনী নয়। কোনোভাবেই রোমান্টিক কিংবা থ্রিলার নয়। এটি একটি পাকা নারকেলের মতোই শক্ত কিন্তু উপাদেয় বই। একটি জাতির হার না মানা লড়াইয়ের এক ঐতিহাসিক দর্পণ। অনুবাদ বইয়ের যা হয়, কোনো কোনো জায়গা হঠাৎ বেশ কঠিন ও দুর্বোধ্য লাগতে শুরু করে। এ বইতেও তেমন কঠিন হতে হতে শেষ পর্যন্ত আর কঠিন হয়ে উঠতে পারেনি কিছু অংশ। এখানেই অনুবাদক আলম খোরশেদের মুন্সিয়ানা। এ রকম একটি বই বাংলা ভাষার পাঠকদের কাছে তুলে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি অনুবাদককে।

একটি বই লেখার সার্থকতা এখানেই যে, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে পাঠক যেন বইটির সঙ্গে তার একাত্মতা অনুভব করতে পারে। পাঠক হিসেবে আমি তা পেরেছি। মধ্য আমেরিকার আগ্নেয়গিরি আর খনি অধ্যুষিত দেশ নিকারাগুয়ার পাহাড়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিম্নভূমি, মধ্যভাগের উঁচু ভূমির কৃষকসমাজ আর ক্যারিবীয় নিম্নভূমির সেই বৃষ্টিবিধৌত গ্রাম আর গ্রামবাসীর জীবনের সঙ্গে কিছুটা হলেও আমি একাত্ম হতে পেরেছি। পেরেছি সে কেবল আমার মতো করে। একেবারে আমার নিজস্ব পাঠ প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ এ লেখা। বইটি যত পড়ছি, তত আশ্চর্য হয়ে গেছি, নিকারাগুয়ার মানুষ সবাই দেখি বাঙালিদের মতোই কবি। কবিভাবাপন্ন। আমাদের মতোই কবি কবি মানুষ।

কিন্তু লড়াইটা ঠিকঠাক ধরে রাখতে জানে।