১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর, এদিন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। ২২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ কলকাতা থেকে ঢাকা এসে পৌঁছে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকা রওনা দেয়ার আগে কলকাতায় থেকে যাওয়া তার স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে বলা হয়। বেগম তাজউদ্দীন ২৭ ডিসেম্বর তার স্বামীর পক্ষ থেকে এ আমন্ত্রণ কবির কাছে পৌঁছে দেন। জবাবে কবির পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়, শিগগিরই তিনি বাংলাদেশ সফরে আসবেন (বাংলাদেশ অবজারভার, ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭১)। কবি ৩১ বছর আগে ১৯৪১ সালে শেষবারের মতো ঢাকায় এসেছিলেন।
১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি বাংলাদেশ অবজারভার নজরুল প্রসঙ্গে একটি চিঠি প্রকাশ করে। সেখানে চিঠির লেখকের প্রকৃত নাম উল্লেখ ছিল না, লেখা ছিল— ‘একজন নাগরিক’। তিনি লিখেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধারা যখন ইয়াহিয়ার বর্বর বাহিনীর হাত থেকে সোনার বাংলা ছিনিয়ে নেয়ার জন্য যুদ্ধ করছিলেন, তখন নজরুলের গান তাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযোগ্য সম্মান দেখানো হলেও বিদ্রোহী কবিকে তা দেখানো হয়নি। তিনি সুপারিশ করেন, অসুস্থ কবিকে তার পরবর্তী জন্মদিনের লগ্নে হেলিকপ্টারে করে বাংলাদেশে এনে বীরের সংবর্ধনা দেয়া হোক। একই সঙ্গে তাকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিয়ে তার মাসিক ভাতাও বৃদ্ধি করা হোক।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ৬ থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি ভারত সফর করেন। শেখ মুজিব ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় পৌঁছে সেদিনই কবির সুস্থতা কামনা করে তাকে দুটি ফুলের তোড়া পাঠান (বাংলাদেশ অবজারভার, ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)। ৭ ফেব্রুয়ারি কবির দুই পুত্র— কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ সস্ত্রীক রাজভবনে শেখ মুজিবের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন (বাংলাদেশ অবজারভার, ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)। ভারতীয় পত্রিকা যুগান্তর উল্লেখ করে, ‘কবির দুই পুত্র কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ আজ রাজ্যভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে শেখ কবিকে বাংলাদেশে আসার জন্য নিমন্ত্রণ জানান। তিনি কবির স্বাস্থ্য সম্পর্কে ও তাঁর পরিবারের লোকজনের খোঁজখবর নেন।
শেখ মুজিব কবির পুত্রদ্বয়কে জানান, ‘তাঁদের পিতার বাংলাদেশ সফরের সব ব্যবস্থা তাঁর সরকার করবে’ (যুগান্তর, ৮ মে ১৯৭২)।
প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ ২০ ফেব্রুয়ারি সকালে তিনদিনের সফরে ঢাকা এসে পৌঁছেন। তাদের ঢাকা আগমনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শহীদ দিবসের (২১ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া। পরবর্তীতে তাদের সফরের মেয়াদ ১০ দিনে বর্ধিত করা হয়। অসুস্থ কবিকে কীভাবে বাংলাদেশে আনা যায়, তা নিয়ে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও সংবাদে প্রকাশ পায়।
২৩ ফেব্রুয়ারি রোটারি ক্লাব আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে কবিপুত্রদের সাক্ষাৎ হয়। সেখানে কাজী সব্যসাচী রাষ্ট্রপতিকে জানান, কবিকে শিগগিরই ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে (পূর্বদেশ, ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)। এ ঘটনার সূত্র ধরে ২৪ ফেব্রুয়ারির বেশ কয়েকটি জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ পায়, কাজী নজরুল তার আগামী জন্মতিথিতে (১১ জ্যৈষ্ঠ) ঢাকায় থাকবেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি পূর্বদেশ পত্রিকায় কবিপুত্রদের সাক্ষাত্কার প্রকাশ পায়। সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেছিলেন ওবায়দুর রহমান। সাক্ষাত্কারে কবির বাংলাদেশ আগমন প্রসঙ্গে কাজী সব্যসাচীর সঙ্গে প্রশ্ন-উত্তর ছিল নিম্নরূপ—
প্র: বিদ্রোহী কবি কবে ঢাকায় আসছেন?
উ: সে সম্পর্কে কোনো দিনক্ষণ এখনো ঠিক করা হয়নি। তবে বঙ্গপিতা শেখ মুজিবর রহমান ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করছেন কবির আগামী জন্মদিনে কবিকে ঢাকায় রাখতে। এজন্য বঙ্গপিতা কবির বাস-উপযোগী একটা উপযুক্ত বাড়ির ব্যবস্থা করেছেন ধানমন্ডি এলাকায়। খুব সম্ভব আগামী মার্চের শেষ অথবা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কবিকে ঢাকায় আনা হবে।
কবির ঢাকায় বসবাসের জন্য ধানমন্ডিতে একটি বাড়ি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে ২৪ ফেব্রুয়ারির পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশ পায়। কাজী সব্যসাচীর বরাতে উল্লেখ করা হয়, ‘এ বাড়িটা কবির থাকার জন্য উপযুক্ত স্থান।’ বাড়িটি সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ পায় ১ মার্চ দৈনিক বাংলায়। সেখানে উল্লেখ ছিল, বাড়িটি দ্বিতল এবং ধানমন্ডি দুই নম্বর সড়কে অবস্থিত। বাড়িটিকে কিছু মেরামত করে সুন্দর করা হচ্ছে। বাড়ির সম্মুখে একটি উন্মুক্ত স্থান আছে, যা বাগানে রূপান্তর করা হবে। পরবর্তীতে কবির জন্য এ বাড়িটি বাতিল করে নতুন একটি বাড়ি ধানমন্ডি ২৮ নম্বর সড়কে নির্বাচন করা হয়। বাড়িটির বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়, ‘বাড়িটি চমত্কার। সুন্দর দোতলা। প্রত্যেক তলাতে তিনটি করে রুম। প্রতিটি রুম আধুনিক রুচিসম্মত উপায়ে সজ্জিত। নিচের তলায় প্রথম কক্ষটি বসার ঘর, দ্বিতীয় কক্ষটি খাবার এবং খাবার ঘরের ডান দিক ঘেঁষে কবির থাকবার ঘরে তিনটি জানালা। একটি একজনা থাকবার মত বিছানা, কয়েকটি চেয়ার, কবির বিছানার সামনের দেয়ালে ঝুলানো কবিপত্নী কাজী প্রমীলার একটি ছবি, কবির পায়ের কাছে টেবিলের উপরে রয়েছে কবির নিজের দুটি ছবি’ (পূর্বদেশ, ২৫ মে ১৯৭২)। পূর্তমন্ত্রী জানান, কবির কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত করা হয়েছে।
১০ দিনের সফর শেষে ঢাকা ত্যাগের আগে কাজী সব্যসাচী বিবৃতি মারফত জানান, কবি সম্ভবত তার ৭৩তম জন্মবার্ষিকী (২৫ মে ১৯৭২) ঢাকায় উদযাপন করবেন (ইত্তেফাক, ২ মার্চ ১৯৭২)।
মুক্তিযুদ্ধকালীন কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম ১৮ এপ্রিল কলকাতায় কবি নজরুলের বাসভবনে গিয়ে কবিকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। সেখানে তিনি কাজী সব্যসাচীকে জানান, কবিকে তিনি স্বগ্রামে নিয়ে গিয়ে তার রোগমুক্তির জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে চান।
১৯ মে পূর্বদেশ ও ২০ মে দৈনিক বাংলা কবির ঢাকা আগমনের সংবাদ নিশ্চিত করে। পূর্বদেশ-এ প্রকাশ পায়, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আমন্ত্রণে কবির পরিবারবর্গ কবিকে বাংলাদেশ নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আগামী ১১ জ্যৈষ্ঠ কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকী। ঐ সময়ে কবি ঢাকাতে থাকবেন। কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার জন্য আগামী দু-একদিনের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ভারতে লোক পাঠাচ্ছে। কবিকে বরণ করার সব ব্যবস্থাই চূড়ান্ত হয়ে গেছে’ (পূর্বদেশ, ১৯ মে ১৯৭২)।
কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায় জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিংয়ের মধ্যে মার্চ ও এপ্রিল মাসজুড়ে চিঠি চালাচালি হয়। কবির বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে কাজী সব্যসাচী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা করেন। ২০ মে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মল্লিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করে বঙ্গবন্ধুর আগ্রহের কথা জানিয়ে পুনরায় চিঠি দেন। এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে কবির ঢাকা সফরের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয় (দৈনিক বাংলা, ২৩ মে ১৯৭২)।
২০ ও ২১ মে কবির আগমন বিষয়ে আরো কিছু তথ্য প্রকাশ পায়। জানা যায়, ২১ মে বঙ্গবন্ধুর বিশেষ দূত হিসেবে পূর্তমন্ত্রী মতিউর রহমান ও আওয়ামী লীগের সমাজকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোস্তফা সারওয়ার কলকাতা গিয়ে কবির স্বাস্থ্যের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কবিকে ঢাকায় নিয়ে আসার দিনক্ষণ ঠিক করবেন। প্রয়োজনে কবিকে বিশেষ হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় আনা হবে। অনুমান করা হয়, কবি ২৩ মে ঢাকা এসে পৌঁছতে পারেন।
২১ মে’র পূর্বদেশ থেকে জানা যায়, কবিকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রীর লেখা একটি চিঠি মতিউর রহমান বহন করবেন। চিঠিতে উল্লেখ ছিল,
‘আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা গ্রহণ করবেন।’
মুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জনসাধারণ এবং আমার পক্ষ থেকে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আপনার জন্মবার্ষিকীতে এখানে আপনার শুভ পদার্পণে বাংলাদেশ ধন্য হবে।
আমার বন্ধু ও সহকর্মী জনাব মতিউর রহমান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমাজ কল্যাণ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক জনাব মোস্তফা সারোয়ারকে আমার প্রতিনিধি হিসেবে আপনার কাছে পাঠাচ্ছি।
আমরা আগ্রহভরে আপনার বাংলাদেশে আগমন প্রতীক্ষায় আছি। আমি আশা করি, আপনি দয়া করে আসবেন।’
মন্ত্রী মতিউর রহমান ২১ মে রাতে কলকাতা দমদম বিমানবন্দরে পৌঁছেন। তিনি বিমানবন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকদের জানান, ‘কবির জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুর একটি ব্যক্তিগত পত্র বহন করে এনেছেন। আগামী ২৩ মে কবিকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে’ (যুগান্তর, ২২ মে ১৯৭২)।
২২ মে কাজী সব্যসাচী পূর্বদেশ-এর কলকাতা প্রতিনিধিকে জানান, ‘যাত্রার প্রস্তুতি এখনো অসমাপ্ত। তবে যাত্রা নিশ্চিত।’ তিনি আরো জানান, ‘মঙ্গলবার [২৩ মে] বাংলাদেশ বিমানের বিকালের নিয়মিত ফ্লাইটে কবি এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের জন্য ২০টি আসন নির্দিষ্ট করে রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার বিকালের ফ্লাইটে কবির পক্ষে ঢাকা যাওয়া সম্ভব না হলে বুধবার সকালের ফ্লাইটে অবশ্যই তিনি ঢাকা যাবেন। বাবার ঢাকা সফর নিশ্চিত। ... কবির সাথে কবি পরিবারের সবাই ঢাকা যাচ্ছেন। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য কয়েকদিন পর কলিকাতা ফিরে এলেও কবি বেশ কিছুদিন ঢাকা থাকতে পারেন। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কবির স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে।’
একই দিন গভীর রাতে কলকাতা থেকে বিশেষ প্রতিনিধি টেলিফোনে জানান, ‘কবি সোমবার (২২ মে) অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিমানে তাঁর সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার থাকবে। তাঁর সাথে যাবেন বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. দ্বিজেন্দ্র কুমার রায়’ (পূর্বদেশ, ২৩ মে ১৯৭২)।
২৩ মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদ্বয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা মুখ্যমন্ত্রীকে জানান, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ কবিকে দেখার জন্য আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছে। কবির আগামী জন্মদিন এবার তারা ঢাকায় পালন করতে চান।’ জবাবে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকার তাদের সব প্রকার সাহায্য করবে। সংবাদে আরো উল্লেখ ছিল, ‘বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কবির সঙ্গে যাওয়ার জন্য একজন সিনিয়ার অফিসার ও একজন সরকারি অভিজ্ঞ ডাক্তার চান। মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে তাতে রাজি হন এবং বলেন, দরকার হলে একটি বিশেষ বিমানও রাজ্য সরকার দিতে প্রস্তুত আছে’ (যুগান্তর, ২৪ মে ১৯৭২)।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের অনুরোধে রাজ্য সরকারের চিকিৎসকরা ২৩ মে কবির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে মত দেন, কবির বিমান ভ্রমণে শারীরিক কোনো অসুবিধা হবে না।
কবির ঢাকা পৌঁছানোর সঠিক সময় নিশ্চিতভাবে জানা না যাওয়ার কারণে আগের সংবাদের সূত্র ধরে ২৩ মে বিকালে শত শত গুণগ্রাহী ভক্ত বিমানবন্দরে ভিড় জমিয়েছিলেন। ২৪ মে ‘বাংলার নবজাগরণের কবি আজ ঢাকার মাটিতে পদার্পণ করছেন’ শিরোনামে সংবাদে উল্লেখ ছিল, ‘আজ বুধবার বাংলাদেশ বিমানের সকালের ফ্লাইটে বাংলার নবজাগরণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকা আসছেন। পরিবারের প্রায় ২০ জন সদস্যসহ অসুস্থ কবিকে বহনকারী বিমানটি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করবে বলে আশা করা যাচ্ছে। ... কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে কবি পুত্রদ্বয় কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ সস্ত্রীক বাংলাদেশে আসছেন। মিষ্টি কাজী ও খিলখিল কাজী কবির এই নাতনীদ্বয় এবং পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত ক’জন কবি-সাহিত্যিকও একই সঙ্গে বাংলাদেশে আসছেন। (পূর্বদেশ। ২৪ মে ১৯৭২)।
কলকাতা থেকে যাত্রার দিনের বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়, ‘আজ সকালে কবি নজরুল যথারীতি ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠেন। কবির পুত্রবধূ তাঁকে স্নান করিয়ে নতুন সিল্কের পাঞ্জাবি ও ধুতি পরান। কবিকে খাইয়ে সোজা নিয়ে আসেন বিমানঘাঁটিতে। বিমানঘাঁটির নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে কবিকে বসিয়ে রাখা হয়। কবিকে বিদায় সংবর্ধনা জানাতে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধি রাজ্য সরকারের লিয়াজোঁ অফিসার ও কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন’ (যুগান্তর, ২৫ মে ১৯৭২)। বিমানে কবির কোনো অসুবিধা না হলেও কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত কবি সম্পূর্ণ নীরব থাকেন।
২৪ মে সকাল থেকেই কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিমানবন্দরে ভিড় জমতে শুরু করে। বিমানবন্দর ভবনের ছাদ ও রানওয়ের একাংশ সকাল ১০টার মধ্যে নারী-পুরুষে ভরে যায়। তাদের প্রায় সবার হাতেই ছিল ফুলের মালা ও স্তবক। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বিদ্রোহী কবিকে নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফকার ফ্রেন্ডশিপ ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী ও আওয়ামী লীগের অন্যতম সহসভাপতি কোরবান আলী কবিকে সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন। এছাড়া বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ন্যাপ নেতা মহিউদ্দিন, খন্দকার আবদুর রাজ্জাক এমসিএ, গাজী গোলাম মোস্তফা এমসিএ, ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব, নুরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, শাজাহান সিরাজ, ভারতীয় হাইকমিশনের প্রেস কাউন্সিলর সুব্রত ব্যানার্জি, সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম, বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী, আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ কর্মী, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নজরুল একাডেমি, বাফা, সংগীত বিতান, সংগীত মহাবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের শিল্পীরা। সংবাদে উল্লেখ ছিল, কবিকে বহনকারী বিমানটি বিমানবন্দরে অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষমাণ বিশাল জনতা গগণবিদারী স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে। জনতা আবেগে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে বিমানের চারপাশে ঘিরে ধরে। ফলে কবিকে বিমানের ভেতর থেকে বাইরে আনা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা পুলিশ ২০ মিনিট চেষ্টা করেও জনতাকে দূরে সরাতে পারেনি। এ সময় বিভিন্ন ছাত্রনেতা ছাড়াও কবির জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী জনতাকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তিনি একটি মাইক্রোফোনে বলেন, ‘কবি অত্যন্ত অসুস্থ। আপনাদের খুশি করার জন্য তবুও আমরা তাকে বাংলাদেশে এনেছি।’
‘এরপর বিমানের সামনের দরজা (ককপিটের দরজা) দিয়ে কবিকে কোনোমতে একটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। জনতা অ্যামু্বলেন্সের ওপর অবিরাম পুষ্পবর্ষণ করে। অ্যাম্বুলেন্সটি কবিকে নিয়ে সরাসরি ধানমন্ডিতে কবির জন্যে নির্দিষ্ট বাড়িতে চলে আসে’ (দৈনিক বাংলা, ২৫ মে ১৯৭২)। দৈনিক বাংলার স্টাফ রিপোর্টার সেই মুহূর্তটিকে স্মরণ করেছেন, ‘এয়ারপোর্টে দেখেছিলাম এক পলক। বিমানের সামনের দরোজা দিয়ে তাঁকে নামানো হচ্ছিলো। আমার চোখ সেদিকে গিয়েছিল— বিশাল একজোড়া চোখ বিস্ফোরিত হতে না হতেই মুহূর্তের মধ্যে ক্রোধ আর বিরক্তিতে বদলে গেলো। তা দেখলাম, মাত্র এক পলকের জন্যে। তারপর কবি হারিয়ে গেলেন ভিড়ের ভিতর। কিছুক্ষণ পর একটা অ্যাম্বুলেন্স ভিড় কেটে দ্রুতগতিতে এয়ারপোর্ট ছেড়ে চলে গিয়েছিল।
এয়ারপোর্টে সকাল থেকে কবিকে এক নজর দেখার জন্য যাঁরা অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা হতাশ হলেন। তাদের হাতের মালা হাতেই থেকে গেলো। কবিকে ফুলমালা দিয়ে বরণ করে নেয়ার সৌভাগ্য কারো হলো না (দৈনিক বাংলা, ২৫ মে ১৭৭২)।
কবি ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছানোর আগে থেকেই সেখানে দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে যায়। দুপুরের পর থেকে আরো লোকজন আসতে থাকে কবিকে একবার দেখার জন্য। বাড়ির সামনের আঙিনা, এক ফালি সবুজ লন, টানা বারান্দা সবই দর্শনার্থীতে ভরে যায়।
কবিকে বিমানবন্দর থেকে ধানমন্ডির বাসভবনে নিয়ে আসার ঘণ্টাখানেক পরেই রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কবিকে দেখতে আসেন। কবি তখন তার শয্যায় চক্ষু মুদ্রিত অবস্থায় ছিলেন। রাষ্ট্রপতি কবিকে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। রাষ্ট্রপতি কবির শয্যার পাশে ৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর সেখান থেকে চলে আসেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, জনগণ ও সরকারের পক্ষ থেকে তিনি কবিকে শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্য এসেছেন। তিনি আরো বলেন, কবির ঢাকা আগমন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা, যা চিরদিন স্মরণ করা হবে।
মধ্যাহ্নে গমনের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। বঙ্গবন্ধু সস্ত্রীক কবির কক্ষে ঢুকে তাকে তন্দ্রাজড়িত অবস্থায় শুয়ে থাকতে দেখেন। পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে মাথায় হাত বুলান। সঙ্গে সঙ্গে কবি চোখ মেলে তাকান মুজিবের দিকে। বঙ্গবন্ধু কবির মাথার কাছে বসে বলেন, ‘আমি এসেছি। আমি মুজিব এসেছি। আমি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি।’ কবি বিরক্ত বোধ করবেন মনে করে কবির কণ্ঠে পরিয়ে দেয়ার জন্য নেয়া মালাখানি শেখ মুজিব তার শিয়রে রেখে দেন। বেগম মুজিবও একটি ফুলের তোড়া কবির শিয়রে রাখেন। সংবাদে উল্লেখ ছিল, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবৃত্তি করলেন, ‘আমি বিদ্রোহী রণকান্ত...’ অনেক আশা, কবিতার পঙিক্ত যদি কবিকে বিস্মৃতির অতল থেকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনে। কিন্তু সে আশা আশাই থেকে গেল। ঘোলাটে চোখে কবি শুধু একবার যেন তাকালেন শেখ মুজিবের দিকে” (পূর্বদেশ, ২৫ মে ১৯৭২)। বঙ্গবন্ধু মুজিব চলে যাওয়ার পর বেগম মুজিব সন্তানদের নিয়ে আরো কিছুক্ষণ কবিগৃহে অবস্থান করেন।
এভাবেই বাংলাদেশের আপামর জনতা কবি নজরুলকে বাংলাদেশে স্বাগত জানাল আর বরণ করে নিল আজীবনের জন্য।





