সম্প্রতি পরলোকগত ঔপন্যাসিক ফিলিপ রথ এক বিশেষ সাক্ষাত্কারে ট্রাম্প, #মি টু এবং অবসর গ্রহণের পরিকল্পনাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন।

অক্টোবরে রিচার্ড উইলবারের পরলোকগমনের ফলে ফিলিপ রথই এখন বেসবলের কেন্দ্র কুপারসটাউনের মতো শিল্পকলার মহাকেন্দ্র, উত্তর ম্যানহাটনের অডুবোন টেরাসের মহান হল অব ফেইম আমেরিকান একাডেমি অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্সের সাহিত্য বিভাগের সবচেয়ে দীর্ঘায়ু সদস্যে পরিণত হয়েছিলেন। এত আগে থেকে তিনি এর সদস্য ছিলেন যে একাডেমি কবে ভিন্ন যুগের শুভ্র কেশ পণ্ডিত ম্যালকম কাউলি ও গ্লেনওয়ে ওয়েস্টকটের মতো ভুলে যাওয়া ব্যক্তিত্বদের সদস্যভুক্ত করেছিল, তাও মনে করতে পারে না। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে যত সম্মান— ২০১২ সালের স্প্যানিশ প্রিন্স অব অস্টুরিয়াস এবং ২০১৩ সালে লিজিয়ন ডি’অনিউর-এ একজন অধিনায়ক হিসেবে আখ্যায়িত হওয়ার বিষয়ও রয়েছে— যেন একাধারে তাকে সন্তুষ্ট এবং আমোদিত করেছে। ‘এটা দেখুন না,’ গত মাসে বাইবেলের মতো ঢাউস আর ‘লামেন্তো দি পোর্তুনি’ আর ‘জাকারম্যান স্ক্যাতেনাতো’র মতো শিরোনামের বই দেখিয়ে আমাকে বলেছেন তিনি, ‘এ রকম বই কে পড়ে?’

২০১২ সালে আশি বছরে পা রাখার মুহূর্তে লেখালেখি থেকে অবসরে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি (আসলে আরো দুই বছর আগেই লেখালেখি বাদ দিয়েছিলেন)। এর পরের বছরগুলোয় সবকিছু ঠিকঠাক করে তোলার কাজে নির্দিষ্ট সময় দিয়েছেন। যেমন তিনি নিজের জীবনেরই বিশ্বস্ত সাক্ষী নন উল্লেখ করে অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়ার উইকিপিডিয়ায় উদ্ভট দাবি চ্যালেঞ্জ করে একটা বিশদ ও আবেগময় চিঠি লিখেছিলেন (শেষ পর্যন্ত উইকিপিডিয়া পিছু হটে রথের গোটা ভুক্তিই নতুন করে লিখেছে)। ব্লেক বেইলির সঙ্গেও নিয়িমিত যোগাযোগ বজায় রাখছিলেন রথ। বেইলিকে অনুমোদিত জীবনীকার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এরই মধ্যে তিনি ১ হাজার ৯০০ পৃষ্ঠার তথ্য সংগ্রহ করে ফেলেছেন; বইটি এর অর্ধেক দৈর্ঘ্যের হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং অতি সম্প্রতি তার রচনা লাইব্রেরি অব আমেরিকা সংস্করণের শেষ খণ্ড ‘হোয়াই আই রাইট?’ প্রকাশনার তত্ত্বাবধান করেছেন। এটি একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ, উত্তরাধিকারের একটা প্রলেপ, এতে ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের সাহিত্যিক রচনার নির্বাচিত অংশ, ২০০১ সালে অন্যান্য লেখকের— যাদের অনেকেই ইউরোপীয়— সঙ্গে সাক্ষাত্কার সংকলন ‘শপ টকে’র পূর্ণাঙ্গ টেক্সট এবং স্বাগত ভাষণ ও বক্তৃতার একটি অংশ— বেশ কয়েকটি এখানেই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত— রয়েছে। ঘটনাক্রমে নয় মোটেই, বইটি শেষ হয়েছে দুটি শব্দের একটি বাক্য দিয়ে, ‘এই আমি’— মানে হার্ড কাভারের মাঝখানে।

কিন্তু রথ মূলত একজন আপার ওয়েস্ট সাইড রিটায়ারির নিরিবিলি জীবন কাটাচ্ছিলেন (কানেক্টিকাটে তার বাড়ি, এখানে তিনি নিজেকে লেখালেখির বাড়তি ভার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন, ইদানীং কেবল গ্রীষ্মেই ব্যবহার করতেন)। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতেন, বিভিন্ন কনসার্টে গেছেন, ই-মেইল চেক করেছেন এবং ফিল্মস্ট্রাকে পুরনো ছবি দেখতেন। অল্প কিছুদিন আগে ‘দ্য অয়্যার’ ক্রাইম ড্রামার নির্মাতা ডেভিড সাইমন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। ‘দ্য প্লট অ্যাগেইনস্ট আমেরিকা’ নামে ছয় পর্বের একটি মিনিসিরিজ তৈরি করছেন তিনি। পরে তিনি বলেছেন, উপন্যাসটি যোগ্য হাতে পড়েছে বলেই নিজের আস্থার কথা জানিয়েছেন রথ। পিঠের ক্রমাগত যন্ত্রণার কারণে বেশ কয়েকটি অপারেশনের ভেতর দিয়ে যেতে হলেও রথের স্বাস্থ্য ভালোই ছিল। তাকে প্রফুল্ল ও সন্তুষ্ট মনে হয়েছে। তিনি চিন্তামগ্ন, তবে চাইলে বেশ আমুদে হয়ে উঠতে পারতেন। 

বেশ কয়েক বছর ধরে একাধিক উপলক্ষে রথের সাক্ষাত্কার নিয়েছি আমি। গত মাসে আবার কথা বলা যাবে কিনা জানতে চেয়েছিলাম। তার বহু পাঠকের মতোই তার ‘আমেরিকান প্যাস্টোরাল’, ‘আই ম্যারিড আ কমিউনিস্ট’ এবং ‘দ্য প্লট অ্যাগেইনস্ট আমেরিকা’র লেখক আমাদের বর্তমান অদ্ভুত সময়টিকে কীভাবে দেখেন জানতে আগ্রহী ছিলাম আমি। কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন, তাও জানতে চাই। সুদোকু? দিনের বেলা টিভি দেখে? সাক্ষাত্কার দিতে রাজি হন তিনি, কিন্তু সেটা ই-মেইলের মাধ্যমে সারা যেতে পারে। কিছুটা সময় দরকার পড়বে, বলেছেন তিনি, কী বলতে চান সেটা ভাবার জন্য।

ম্যাকগ্রাথ: কয়েক মাসের ভেতরই ৮৫ বছরে পা দিতে যাচ্ছেন। নিজেকে কি প্রবীণ মনে হয়? বয়স্ক হয়ে ওঠার ব্যাপারটা কেমন?

রথ: হ্যাঁ, এটা মাত্র কয়েকটা মাসের ব্যাপার। প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়ে আরো বার্ধক্যের দিকে রওনা দেব— প্রতিদিনই আরো গভীরভাবে ভয়ঙ্কর ছায়ার উপত্যকায় হারিয়ে যাওয়া। এ মুহূর্তে প্রতিটি দিন শেষে নিজেকে এখনো দেখতে পাওয়া বিস্ময়কর। রাতে শুতে যাওয়ার সময় মৃদু হেসে ভাবি, ‘আরো একটা দিন বেঁচেছিলাম।’ ৮ ঘণ্টা পরে জেগে উঠে পরদিনের সকাল এবং এখানেই রয়ে গেছি দেখাটাও বিস্ময়করই বটে। ‘আরেকটা রাত টিকে গেছি,’ এ ভাবনা আরো একবার আমাকে হাসায়। আমি হাসিমুখে ঘুমোতে যাই, আবার হাসিমুখে জেগে উঠি। এখনো বেঁচে আছি বলে আমি খুবই খুশি। এছাড়া আমি সোস্যাল সিকিউরিটি তোলা শুরু করার পর থেকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস এমনটা যখন ঘটে, তখন এটা আর শেষ হবে না বলে বিভ্রম তৈরি করে, কিন্তু অবশ্যই আমি জানি যে নিমেষেই এটা থেমে যেতে পারে। এটা অনেকটা খেলার মতো, নিত্যদিন বড় জুয়ার খেলা এখন, এমনকি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধেও জিতে চলেছি। দেখা যাক কতক্ষণ ভাগ্য পক্ষে থাকে।

ম্যাকগ্রাথ: ঔপন্যাসিক হিসেবে অবসর গ্রহণ করার পর লেখালেখির জন্য খারাপ লাগে, নাকি অবসর ভাঙার কথা ভাবেন?

রথ: না। তার কারণ যেসব অবস্থা সাত বছর আগে আমাকে লেখালেখি বন্ধ করতে তাড়িত করেছিল, সেগুলো বদলায়নি। ‘হোয়াই আই রাইট?’-এ যেমন বলেছি, ২০১০ সাল নাগাদ আমার মনে ‘একটা জোরালো সন্দেহ ছিল যে, আমার সেরা লেখাটা লিখে ফেলেছি, আরো বেশি কিছু নিম্নমানের হবে। এ সময় নাগাদ আমার আর উপন্যাসের মতো জটিল কাঠামোর চাহিদা মতো কোনো দৈর্ঘ্যের বড় ধরনের সৃজনশীল চ্যালেঞ্জ গ্রহণ এবং টিকে থাকার মতো মানসিক উদ্দীপনা, ভাষিক শক্তি বা শারীরিক ফিটনেসের কোনোটাই ছিল না... প্রতিটি গুণেরই নিজস্ব শর্ত রয়েছে— এর প্রকৃতি, আওতা, শক্তি; আবার এর শর্ত, মেয়াদ, জীবনচক্রও... কেউই চিরকাল ফলপ্রসূ থাকতে পারে না।’

ম্যাকগ্রাথ: পেছনে তাকিয়ে লেখক হিসেবে আপনার ৫০ বছরকে কীভাবে দেখেন?

রথ: উচ্ছ্বাস এবং কষ্ট, হতাশা এবং মুক্তি, প্রেরণা এবং অনিশ্চয়তা। প্রাচুর্য এবং শূন্যতা। সবেগে আগে বাড়া আবার হোঁচট খেয়ে চলা। যেকোনো প্রতিভার মোকাবেলা করা পৌনঃপুনিক দ্বৈততার ভাণ্ডার এবং ভীষণ নিঃসঙ্গতাও। এবং নৈঃশব্দ্য: কোনো জলাশয়ের তলার মতো নীরব একটা কামরায় ৫০ বছর কোনোমতে কাটানো, সব ভালোয় ভালোয় চলার সময় কাজে লাগানোর মতো আমার ন্যূনতম গদ্যের জোগান।

ম্যাকগ্র্যাথ: ‘হোয়াই আই রাইট?’-এ আপনি আপনার বিখ্যাত রচনা ‘রাইটিং আমেরিকান ফিকশন’ নিবন্ধটি পুনর্মুদ্রিত করেছেন। এখানে মত প্রকাশ করা হয়েছে, আমেরিকান বাস্তবতা এতই কিম্ভূত যে, লেখকের কল্পনাকে বলতে গেলে পরাস্ত করে। ১৯৬০ সালে এ কথা বলেছিলেন আপনি। এখনকার সম্পর্কে কী বলবেন? আপনি কি কখনো আজকের বসবাসের আমেরিকার মতো কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন?

রথ: আমার পরিচিত কেউই আমরা আজকে যে আমেরিকায় বাস করছি, এমন কিছু আন্দাজ করতে পারেননি। কেউই (সম্ভবত কেবল এইচ এল মেনককেন বাদে, তিনি আমেরিকান গণতন্ত্রকে ‘গাধাদের উপাসিত শেয়াল’ বলে বর্ণনা করেছিলেন) কল্পনা করতে পারেননি যে, একুশ শতকের প্রলয় আমেরিকার ওপরই নেমে আসবে, সবচেয়ে ক্ষতিকর বিপর্যয়টি কোনো অরওয়েলীয় বিগ ব্রাদারের ভয়ঙ্কর চেহারায় নয়, বরং একজন বাগাড়ম্বরময় ভাঁড়ের হাস্যকর কমেডিয়া ডেল’আর্টের চরিত্রে দেখা দেবে। ১৯৬০ সালে এক অদ্ভুত সময়ে বাস করছি ভাবাটা কত বোকামিই না ছিল! কী খেয়ালি! কিন্তু ১৯৬০ সালে আমার পক্ষে ১৯৬৩ বা ১৯৬৮ কি ১৯৭৪ অথবা ২০০১ কিংবা ২০১৬ সাল সম্পর্কে কি-ইবা জানার ছিল?

ম্যাকগ্রাথ: আপনার ২০০৪ সালের উপন্যাস ‘দ্য প্লট অ্যাগেইনস্ট আমেরিকা’-কে আজকের দিনের স্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে হয়। উপন্যাসটি বেরোনোর সময় কেউ কেউ একে বুশ প্রশাসনের বর্ণনা মনে করেছেন, কিন্তু এখন যেসব মিল দেখা যাচ্ছে, তার কাছাকাছি কিছু ছিল না।

রথ: দ্য প্লট অ্যাগেইনস্ট আমেরিকাকে আপনার চোখে যতটাই ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে হোক না কেন, ওতে আমি ১৯৪০ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে রাজনৈতিক অবস্থা তৈরি করেছিলাম এবং আজকের দিনে যে রাজনৈতিক দুর্যোগ আমাদের হতাশায় ফেলছে, তার ভেতর একটা বড় তফাত আছে। সেটা প্রেসিডেন্ট লিন্ডবার্গ ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈশিষ্ট্যের ভেতর পার্থক্য। আমার উপন্যাসের মতো বাস্তব জীবনেও চার্লস লিন্ডবার্গ হয়তোবা সত্যিকারের বর্ণবাদী, সত্যিকারের অ্যান্টি-সেমাইট ও ফ্যাসিবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল শ্রেষ্ঠত্ববাদী ছিলেন, কিন্তু আবার ২৫ বছর বয়েসে তার একাকী ট্রান্স-আটলান্টিক অসাধারণ কৃতিত্বের কারণে— আমি তাকে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হিসেবে পাওয়ার ১৩ বছর আগে— সত্যিকারের আমেরিকার বীর ছিলেন তিনি। ঐতিহাসিকভাবে লিন্ডবার্গ সাহসী পাইলট ছিলেন, ১৯২৭ সালে প্রথমবারের মতো লং আইল্যান্ড থেকে প্যারিসে বিরতিহীন উড়ে গেছেন। একটা সিঙ্গল সিট, সিঙ্গল ইঞ্জিন মনোপ্লেনে কাজটা করেন তিনি। এভাবে নিজেকে আকাশ যুগের অন্যতম প্রথম আলোকবর্তিকা বিশ শতকের লিয়েফ এরিকসনে পরিণত করেন। সে তুলনায় ট্রাম্প এক বিরাট ঠগ, তার সব ঘাটতির অশুভ সমাবেশ, একজন মেগালোম্যানিয়াকের ফাঁপা আদর্শ ছাড়া আর কিছুই নেই।

ম্যাকগ্রাথ: আপনার অন্যতম পৌনঃপুনিক থিম হচ্ছে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা— প্রায়ই সেটা অবদমিত আকাঙ্ক্ষা— এবং এর নানা প্রকাশ। আমরা এখন যে অবস্থায় আছি বলে মনে হচ্ছে, অসংখ্য নারী বহু পুরুষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে যখন সামনে এগিয়ে আসছেন?

রথ: আপনি যেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, ঔপন্যাসিক হিসেবে যৌন উত্তেজনার বেলায় আগন্তুক নই। আমার কোনো কোনো বইতে আমি পুরুষের জীবনের একটা বৈশিষ্ট্য হিসেবে পুরুষের যৌন প্রলোভনে আচ্ছন্ন থাকার কথা লিখেছি। অব্যাহত যৌন আনন্দের আহ্বানে সাড়া দেয়া, গ্লানিকর আকাঙ্ক্ষা এবং বিকৃত লালসায় অবরুদ্ধ, এমনকি টাবুর প্রলোভনেও প্রতারিত পুরুষ— দশকের পর দশক নিজেদের সঙ্গে রফা করতে এবং লড়াইয়ে বাধ্য হওয়া ঠিক এমনি যন্ত্রণাকর শক্তিতে আচ্ছন্ন পুরুষের একটা ছোট কোটারির কথা কল্পনা করেছি। আমি এদের প্রত্যেককে তার মতো করেই, জৈবিক চেতনায় উত্তেজিত, আলোড়িত, ক্ষুধার্ত এবং আকাঙ্ক্ষার চাহিদা তুলে ধরা মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দ্বিধা মোকাবেলার ক্ষেত্রে প্রত্যেককে তার আচরণ অনুযায়ী বর্ণনা করার বেলায় আপসহীন থাকার চেষ্টা করেছি। এসব গল্পে আমি স্থ্থূল পুরুষরা কেন, কীভাবে এবং কখন তাদের কাজগুলো করে, সেই কঠোর বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাইনি, এমনকি যখন সেসব পুরুষালি জনসংযোগ প্রচারণার— যদি তেমন কিছু থেকে থাকে— পছন্দের ছবির সঙ্গে খাপ না খেলেও। আমি কেবল পুরুষের মাথার ভেতরই নয়, বরং তার সেইসব তাগিদের ভেতরও ঢুকেছি, যেগুলোর বিপুল চাপ এগুলোর নাছোড় স্বভাবের কারণে কারো যৌক্তিকতাকে ভীত করে তুলতে পারে, তাগিদ অনেক সময় প্রবল হয়ে ওঠে, এমনকি এক ধরনের পাগলামি হিসেবেও প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। পরিণামে ইদানীং পত্রপত্রিকায় আমি যেসব ভীষণ ঘটনার কথা পড়ছি, সেগুলোর কোনোটাই আমাকে হতবাক করেনি।

ম্যাকগ্রাথ: অবসর গ্রহণের আগে আপনি দীর্ঘ বিরতির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এখন যেহেতু লেখালেখি বাদ দিয়েছেন, অবসর সময়ে কী করেন?

রথ: পড়ি— অদ্ভুত কিংবা তেমন অদ্ভুত মনে না হলেও গল্প কমই পড়া হয়। আমার গোটা কর্মজীবন আমি গল্প পড়া, গল্প শেখানো, গল্প নিয়ে গবেষণা আর গল্প লেখার পেছনে ব্যয় করেছি। সাত বছর আগে অন্য কিছু ভাবিনি বলা চলে। তার পর থেকে আমার প্রতিদিনের পড়ার সময়ের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইতিহাস পাঠের পেছনে কাটাচ্ছি, বিশেষ করে আমেরিকান ইতিহাস, তবে আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসও পড়ি। পড়াই লেখালেখির জায়গা দখল করে নিয়েছে এবং আমার চিন্তার অনুপ্রেরণার প্রধান অংশ গঠন করেছে।

ম্যাকগ্রাথ: সম্প্রতি কী পড়েছেন?

রথ: আমি বোধহয় ইদানীং পথ থেকে সরে এসে বিভিন্ন ধরনের বইপত্র পড়েছি। তা-নেহিশি কোটসের তিনটি বই পড়েছি, সাহিত্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই হূদয়গ্রাহী, বাবার তরফ থেকে ছেলেবেলার চ্যালেঞ্জের স্মৃতিচারণ ‘দ্য বিউটিফুল স্ট্রাগল’। কোটস পড়ার পর আমি নেল আরভিন পেইন্টারের উসকানিমূলক শিরোনামের ‘দ্য হিস্ট্রি অব হোয়াইট পিপল’ সম্পর্কে জানতে পারি। পেইন্টার আবার আমাকে আমেরিকান ইতিহাস থেকে এডমান্ড মরগানের ‘আমেরিকান স্লেভারি, আমেরিকান ফ্রিডম’-এর কাছে নিয়ে গেছে: এক বিশাল পাণ্ডিত্যপূর্ণ ইতিহাস, মরগান যাকে বলছেন ‘দাসত্ব আর মুক্তির মিলন,’ গোড়ার দিকের ভার্জিনিয়ায় যেভাবে ছিল এটা। মরগান আমাকে পরোক্ষে তেজু কোলের রচনা পড়ার দিকে নিয়ে গেছেন, যদিও সেটা পনেরো শতকের লুক্রেতিয়াসের বিধ্বংসী ‘অন দ্য নেচার অব থিংস’-এর পাণ্ডুলিপি আবিষ্কারের পেছনের ঘটনা নিয়ে স্টিফেন গ্রিনব্লাটের ‘দ্য সোয়ার্ভ’ পড়ার বড় ধরনের গতি পরিবর্তনের আগে নয়। এটা আমাকে মার্টিন ফার্গুসন স্মিথের গদ্যানুবাদে লুক্রেতিয়াসের খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের কোনো একটা সময়ে রচিত কিছু দীর্ঘ কবিতা সামাল দেয়ার দিকে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে আবার পড়তে গেছি গ্রিনব্লাটের ‘শেক্সপিয়ার কেমন করে শেক্সপিয়ার হলেন,’ সে সম্পর্কিত বই ‘উইল ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’ এসবের ভেতরই কীভাবে যেন ব্রুস স্প্রিংস্টিনের আত্মজীবনী ‘বর্ন টু রান’ হাতে পেয়ে পড়ে আনন্দও পেয়েছি। আমি কেবল এ কথা বলা ছাড়া ব্যাখ্যা করতে পারব না, এখন হাতের কাছে যা আসছে, তাই পড়ার মতো অফুরন্ত সময় থাকাটা অচিন্তনীয় বিস্ময় নিয়ে আসছে।

বিভিন্ন বইয়ের প্রকাশপূর্ব কপি নিয়মিত মেইলের মাধ্যমে আসছে। এভাবেই আমি স্টিভেন যিপারস্টেইনের ‘পোগ্রোম: কিশিনেভ অ্যান্ড দ্য টিল্ট অব হিস্ট্রি’ আবিষ্কার করি। যিপারস্টেইন বিশ শতকের গোড়ার দিকের মুহূর্তের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যখন ইউরোপে ইহুদিদের বিপর্যয় সবকিছুর সমাপ্তির ভবিষ্যদ্বাণী করা এমন ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। ‘পোগ্রোম’ আমাকে ব্যাখ্যামূলক ইতিহাসের একটা সাম্প্রতিক বইয়ের দিয়ে গেছে, ইউরি স্লেযকিনের ‘দ্য জুইশ সেঞ্চুরি’। এখানে ‘আধুনিক যুগ আসলে ইহুদি যুগ এবং বিশেষ করে বিশ শতক ‘ইহুদি শতক’ বলে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। আমি ইসায়াহ বার্লিনের ‘পার্সোনাল ইম্প্রেশনস’ পড়েছি। এটা তিনি যাদের সংস্পর্শে এসেছেন, বিশ শতকের সেইসব ব্যক্তি সম্পর্কিত নিবন্ধ। এখানে ভার্জিনিয়া উল্ফের মারাত্মক সব মেধা নিয়ে একটা ভাণ্ডার রয়েছে, রয়েছে ১৯৪৫ সালে মারাত্মকভাবে বোমাবিধ্বস্ত লেনিনগ্রাদে রাশিয়ান কবি আন্না আখমোতোভার সঙ্গে প্রাথমিক সান্ধ্য সাক্ষাত্কারের ওপর বিশেষভাবে আকর্ষণীয় অংশ। তখন তার বয়স পঞ্চাশের কোটায়; বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, ঘৃণিত এবং সোভিয়েত শাসকগোষ্ঠীর হাতে নির্যাতিত। বার্লিন লিখছেন, ‘যুদ্ধের পর লেনিনগ্রাদ তার কাছ বিশাল গোরস্তান ছাড়া আর কিছুই ছিল না, তার বন্ধুবান্ধবের কবর...তার জীবনের সীমাহীন ট্র্যাজেডি আমার কাছে মুখের ভাষায় এ পর্যন্ত শোনা যেকোনো কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।’ রাত ৩ বা ৪টা পর্যন্ত কথা বলতেন তারা। এ দৃশ্য তলস্তয়ের যেকোনো কিছুর মতোই নাড়া দেয়।

এই তো গত সপ্তাহে দুজন বন্ধুর লেখা বই পড়লাম, এডনা ও’ব্রেইনের লেখা জেমস জয়েসের প্রাজ্ঞ ক্ষুদ্র জীবনী এবং আকর্ষণীয় বিচিত্র আত্মজীবনী ‘কনফেশনস অব অ্যান ওল্ড জুইশ পেইন্টার,’ লিখেছেন আমার একজন খুবই প্রিয় পরলোকগত বন্ধু, মহান আমেরিকান শিল্পী আর.বি. কিতাজ। আমার মৃত প্রচুর প্রিয় বন্ধু আছে, বেশ কয়েকজন ঔপন্যাসিক। মেইলে ওদের নতুন বই না পাওয়ায় খারাপ লাগে।