নিশানের সাথে আমার কোনোদিন একটাও কথা হয়নি। তার কথা কেন আজকে মনে এল জানি না।

আমি আর বাবা আমাদের বাড়ির কোনার তেঁতুল গাছের নিচের বেঞ্চটায় বসে ছিলাম। বাড়ির সামনে পায়ে হাঁটা পথে নিশান পাগারে গোসল শেষে, তার একমাত্র, ভিজা লুঙ্গিটা গায়ে দিয়া, সেইটা ভিতর থিকা দুই কনুইয়ের উপরে ছড়াইয়া রোদে শুকাইতে শুকাইতে হাঁইটা আসতেছিল। আমাদের কাছাকাছি আসতেই নিশান বাবারে জিজ্ঞেস করল, ‘চাচা, বালা আছুইন?’ বাবা বলল, ‘হুম।’ তারপর নিশান তার বাড়ির দিকে চইলা গেল।

নিশান যে পাগার থিকা গোসল কইরা আসতেছিল, সেই পাগারে গরু-ছাগলরেও গোসল করানো হইত। ওই পাগারের পিছন দিকেই ছিল বড় একটা শিমুল গাছ। আমি প্রায়ই সেই গাছের নিচে পইড়া থাকা শিমুল ফুল কুড়াইতে যাইতাম।

ওই শিমুল গাছের পরেই ছিল পাগলিনী বুজির বাড়ি। সেই বাড়িতে খড়ির ঘরের উপরে একটা মিষ্টি বরই গাছ হেইলা ছিল। অনেক বরই ধরত সেই গাছে। অনেকেই সেই বরই গাছ থিকা বরই পাড়তে যাইত। আমি আর আমার ছোট ভাই হীরাও গেছি বহুবার। পাগলিনী বুজির বাড়িতে বুজি একাই থাকত। আমাদের বরই পাড়তে দেখলেই হাঁক দিত, ‘ক্যারা রে?’ সেই হাঁক শুইনা আমরা আছাড়ি পিছাড়ি দিতাম দৌড়।

দৌড়াইয়া বাড়িতে পৌঁছাইয়া গোসল সাইরা আমরা পড়তে বসতাম। যেই ঘরে আমি থাকতাম, সেই ঘরের জানালার পাশেই আমার পড়ার টেবিল ছিল। একদিন পড়ার ফাঁকে ফাঁকে দেখতেছিলাম যে, ঘরের অন্য প্রান্তে একদিকে মা দস্তরখান বিছাইয়া খাবার সাজাইতেছে, আরেকদিকে হীরা ভ্যাবাইয়া কাইন্দাই যাইতেছে। মা রান্নাঘর আর ঘরে আসা-যাওয়ার মধ্যে মধ্যে গজগজ করতে করতে বলতেছে, ‘এই মেয়েটারে নিয়া আদাড়ে-বাদাড়ে ঘোরে, এখন এরে কান্দুরায় ধরছে...।’ মায়ের কথা শুইনা আমি মনে মনে দোয়া করছিলাম, ‘আল্লাহ্, হীরার কান্দুরা ছাড়াইয়া দাও।’

মা ছিল একটু ভীতু ধরনের। যেমন কখনো সন্ধ্যা বা রাতে তেঁতুল গাছের নিচে থোকা থোকা ফুল পইড়া থাকলে মা ভাবত যে, তেঁতুল গাছের ভূত বা শয়তান সেই ফুল ফেলছে। মায়ের আছর আমার উপরেও পড়ছিল। ভাবছিলাম, কান্দুরা নিশ্চয়ই ভূত বা শয়তানজাতীয় কিছু।

দক্ষিণ-পূর্ব কোণ থিকা যেই শোঁ শোঁ বাতাস উত্তর-পশ্চিম কোণের বাঁশঝাড়ে থামত, সেই ব্যাপারেও মা এই রকম বলত যে, আমাদের পাশের বাড়ির আমীর আলীর ফুফু, যে বাঁশঝাড়ের কাছের আম গাছের ডালে ফাঁসি নিয়া মারা গেছিল, তার ভূত খুব ভোরে বাতাস হইয়া অন্য কোথাও চইলা যায়, আবার গভীর রাতে শোঁ শোঁ শব্দ তুইলা বাঁশবনে ফিরা আসে।

একদিন সন্ধ্যায় মা বাইরে রান্না করতেছে আর আমি বারান্দায় বাঁশঝাড়ের দিকে তাকাইয়া গুড়-মুড়ি খাইতেছি। হঠাৎ মনে হইল, বাঁশঝাড়ে বাঁশঝাড়ের সমানই লম্বা কে জানি কপালের বড় বড় দুই চোখ দিয়া আমার দিকে তাকাইয়া আছে। কখন যে চিল্লাইয়া উঠছি জানি না। সেই চিত্কার শুইনা আমার চাচাতো ভাইয়েরা বাইর হইয়া আইসা জিজ্ঞেস করতে লাগল, আমি বাঁশঝাড়ে কিছু দেখেছি কিনা। আমি বললাম:

- হ।

- আকাশ-পাতাল ঠিকা দিয়া খাড়াইছে, এই রকম দেখছস?

- হ।

- কপালে বড় বড় চোখ, এই রকম দেখছস?

- হ।

তারপর সারা বাড়িতে আমার ভূত দেখার খবর ছড়াইয়া গেল। চাচা ঘরের থিকা সরিষা আইনা আমার গায়ে ছিটাইতে ছিটাইতে সূরা পইড়া ফুঁ দিল।

নিশানের বাড়ির কাছ ঘেঁইয়াই পায়ে হাঁটা পথ। আর পথের অন্য ধারে বিরাট জঙ্গল। সেই জঙ্গলে হেন গাছ নাই যা ছিল না। বেত, জামরুল, জাম, শ্যাঁওড়া, গাব, করমচাসহ ছিল বাঁশঝাড়। সেই জঙ্গল ছিল ‘আরকালা’র (হারকালার) জঙ্গল। জঙ্গলের পর পরই ছিল আরকালার বাড়ি।

আরকালার জঙ্গলে অনেকে বিনা পয়সায় বাঁশ কাটতে ও অন্য যার যা ইচ্ছা নিয়া আসতে যাইত। তো সেই জঙ্গলে একদিন মেজো ভাই, চাচাতো ভাই মোপা (মোফাজ্জল) আর তাদেরই সমবয়সী পাশের বাড়ির মজিবর গেল বাঁশ কাটতে। বাঁশ কাইটা মেজো ভাই ও মোপা ভাই চইলা আসছে, মজিবর তখনো জঙ্গলের ভিতরে। মেজো ভাইরা ফিরা আসার বেশ কিছু পরে মজিবর পাশের বাড়িতে ফিরা আসছে। ওর মারে ও কাঁপতে কাঁপতে বলছে যে, ও খুব ভয় পাইছে, কারণ বাঁশবনের বাঁশগুলা নিজেরাই ঝাঁকাইতেছিল আর একটা বাঁশ ওরে চাইপা ধরছিল। সেই ভয় থিকা তার ভীষণ অসুখ হয় এবং সেই অসুখেই সে মারা যায়।

এই ঘটনা গ্রামে দ্রুত জানাজানি হইয়া যায়। অনেকে এই রকম বলে যে, কেউ যদি জঙ্গলের পাশের পথে মাছ নিয়া বাড়ি ফেরে, তখন পথিকরা অনেক সময় কাউরে খোনা গলায় বলতে শোনে, ‘আমারে একটা মাছ দিয়া যা।’ তখন পথিকরা মাছ ফেইলাই দৌড় দেয়।

এত ভয়াবহ যে জঙ্গল, তার পাশেই নিশানের বাড়ি। আমি মনে মনে ভাবতাম, ‘নিশান এ বাড়িতে কেমনে থাকে?’ রাতে অনেক সময় ঘুম ভাঙলে নিশানের দরাজ গলায় গান শোনা যাইত। নিশানের গান বেশি মধুর লাগত না আমার কাছে। সেই গানগুলার কথাও মনে নাই। শুধু মনে আছে যে, ও দরাজ গলায় গান গাইত।

ছোট্ট একটা বাড়ি ছিল ওর। সেই বাড়িতে দুইটা ছোট ছোট শনের ঘর। সেইখানে ও ওর পরিবার-পরিজন নিয়া থাকত। পরিজনদের ভিতরে ছিল ওর মেয়েরা— মাহেরুন্নেসা, খাতেমুন্নেসা ও শুকুরন্নেছা; ছেলেরা— গোলাম হোসেন ও সুরুজ এবং নিশানের বউ, যারে সবাই ‘খাতের মা’ ডাকত।

অনেক সময় আমি নিশানদের বাড়ির উঠান পার হইয়া ব্যাঙ্গার বউরে ডাকতে যাইতাম। কারণ ব্যাঙ্গার বউ কান্দুর মায়েরে আমার মা ডাইকা পাঠাইত। কান্দুর মা সারাদিন আমাদের বাড়িতে কাজ কইরা সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে ফিরত।

একদিন সকালে কান্দুর মায়েরে ডাইকা আইনা দেখি, উঠানে বিছানো পাটিতে আমার বড় ভাই কোট-টাই খুইলা রাখতেছে। আমেরিকার ডিউক ইউনিভার্সিটি থিকা পিএইচডি শেষে হঠাৎ কইরাই ভাই চইলা আসছিল বাড়িতে। সঙ্গে অন্যান্য উপহার ও জিনিসপত্রের সাথে ছিল ক্যামেরা, ট্রানজিস্টার, রেডিও ও টেপ রেকর্ডার।

এদিকে ভাইয়ের কথা শুইনা চারদিক থিকা সমস্ত লোকজন আমাদের বাড়িতে ভিড় করতে লাগল। তখন বাহির বাড়িতে একটা টেবিল আর চেয়ার দেয়া হইল।

সেই সময় গ্রামে খুব কম ঘরেই রেডিও ছিল, আর টেপ রেকর্ডারের তো কেউ নামই শোনে নাই! ভাই বাহির বাড়িতে টেবিলের উপরে টেপ রেকর্ডারটা রাখল এবং জমায়েত হওয়া লোকজনকে জিজ্ঞেস করল, তারা গান, কবিতা, গল্প, ছড়া ইত্যাদির মধ্যে কে কী বলতে চায়। তারা অনেকেই অনেক কিছু বলল, যেগুলা টেপ রেকর্ডারে রেকর্ড কইরা তাদের শোনানো হইল। তখন পাশে নিশানরে ডাইকা ভাই জিজ্ঞেস করল:

- নিশান ভাই, তুমি কি কিছু কইতে চাও?

- হ, আমি একটা গান কবার চাই।

উপস্থিত লোকজনের মধ্যে নিশানের ছেলেমেয়েরাও ছিল। নিশানের রেকর্ড করা গান তাই তারাও শুনতে পাইল।

পরে একদিন এক শীতের সকালে কান্দুর মায়েরে ডাকতে যাইতেছি, তখন দেখি, নিশানরা সবাই ঘরের বারান্দায় বইসা মাটির সানকিতে পান্তা ভাত খাইতেছে। ভাতের তুলনায় পানির পরিমাণ অনেক বেশি। কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া আমি ওদের খাওয়ার দৃশ্য দেখলাম— কীভাবে ওরা মরিচ ডইলা, পেঁয়াজ দিয়া পানি ভাত খাইতেছে।

তারপর আর বেশি দিন গ্রামে থাকি নাই আমরা। বড় ভাইয়ের সঙ্গে সবাই ঢাকা ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টারে চইলা আসি।

এরপর যতবার দেশে গেছি, খাতেমুন জিজ্ঞেস করত, তার বাবার গান আমরা সঙ্গে নিয়া গেছি কিনা।

এরপরে অনেক ঘটনা ঘইটা গেল। আমার বিয়ে হইল, স্বামীর সঙ্গে ইংল্যান্ডে গেলাম, সেইখানে আমি এক পুত্রসন্তানের মা হইলাম। দেশে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপর ফিরা আসার পরে সেই সন্তানটা ফুড পয়জনিংয়ে মারা গেল। আবার তিন কন্যাসন্তানের মা হইলাম। কন্যারা একটু বড় হইলে অস্ট্রেলিয়ায় আইসা সেটেল করলাম। কন্যারাও আরো বড় হইল, সেটেল করল।

তারপর বহুদিন পর যখন আবার দেশে ফিরা গ্রামের বাড়িতে বাঁশঝাড়ের পাশের সেই পথে গাড়ি থিকা নামলাম, তখন খাতেমন দূরে রাস্তার পাশে দাঁড়াইয়া আমারে দেখতেছিল। আমি হাত ইশারায় তারে কাছে ডাকলাম। তখন সে দ্বিধান্বিত পায়ে আমার কাছে আইসা জিজ্ঞেস করল:

- কিবা আছুইন?

- ভালো। তুমি কেমন আছ?

সে তখন জিজ্ঞেস করল:

- আমার বাপের গানটা আনছুইন?

অনেক কষ্টে আমি উত্তর দিলাম:

- না।

আজ নিশান নাই। আমার ছোটবেলার মানুষগুলাও প্রায় কেউ নাই। তার পরও তার মেয়ে খাতেমুন্নেসার প্রশ্নটা মনের মধ্যে তোলপাড় করে।