ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ভুবন বিখ্যাত গোরস্তানের কথা সবারই জানা। খ্যাতনামা শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, কবি-সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদের শেষ আশ্রয়স্থল এখানে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পর্যটকদের শ্রদ্ধার ফুলে তাদের কবরগুলো উজ্জ্বল হয়ে থাকে সারা বছর। এ সাজানো সমাধিগুলোর এক পাশে নীরব হয়ে পড়ে আছে একটি দীনহীন জীর্ণ কবর। সাধারণ ইট বাঁধানো চারকোনা একটি চত্বরে যিনি ঘুমিয়ে রয়েছেন, বেশির ভাগ দর্শনার্থী তার পরিচয় সম্পর্কে নির্বিকার। কালেভদ্রে উপমহাদেশের দু’চারজন পর্যটক হঠাৎ খুঁজে বের করেন এই বিস্মৃত প্রায় কবরটি, যেখানে স্বাধীন অযোধ্যা রাজ্যের শেষ রানী, অযোধ্যার বাদশাহ জননী, সবার শ্রদ্ধার পাত্রী মালিকাকিশওয়ার চিরনিদ্রায় শায়িত। তিনি ইতিহাসে আউলিয়া বেগম বা জনাব-ই-আউলিয়া নামে বেশি পরিচিত।

এই নিরাভরণ কবরটি দেখলেই মনে পড়ে যাবে ক্ষমতাচ্যুত প্রায় নির্বাসিত মোগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের রচিত সেই বিখ্যাত ফারসি লিপি, যেখানে কবি সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের বাংলা অনুবাদে মোগল সম্রাজ্ঞীর গভীর উপলব্ধি এবং হতাশা ব্যক্ত হয়েছে তীব্র বেদনায়। 

‘গরিব গোরে দ্বীপ জ্বেলো না

 ফুল দিও না কেউ ভুলে: শ্যামা পোকার

 না পোড়ে পাখ, দাগা না পায় বুলবুলে।’

কোথায় লক্ষ্নৌ-অযোধ্যা আর কোথায় প্যারিস! অযোধ্যার রানী সুদূর প্রবাসে কোন কর্মফলে সেই ১৮৫৮ সাল থেকে বিদেশের মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন!

ইতিহাস বলে, ব্রিটিশের শতবর্ষের মিত্র ও স্বাধীন অযোধ্যা রাজ্য কুশাসনের মিথ্যে অভিযোগে লর্ড ডালহৌসি গ্রাস করে বাদশাহ ওয়াজিদ আলীকে সিংহাসন ও রাজ্যচ্যুত করেন, ব্রিটিশ ভারতে অযোধ্যা গ্রাস লর্ড ডালহৌসির শেষ কীর্তি বা শেষ অপকীর্তি, ওয়াজিদ আলী শাহ বিদ্রোহ করেননি, অস্ত্রও হাতে তুলে নেননি। নীরবে ব্রিটিশ রেসিডেন্টকে তার মাথার তাজ ফেরত দিয়ে দিলেন। ব্রিটিশ অধিকর্তারা বাদশার কুশাসন, প্রজা নিপীড়ন বা তার ব্যভিচার— কিছুই প্রমাণ করতে পারেননি। অথচ বাদশাহর ইংরেজের ন্যায়বিচারের প্রতি স্থিতধী বিশ্বাস বরাবরই ছিল অটল, কিন্তু বাদশাহ জননী আউলিয়া বেগম যেন ছেলের তুলনায় অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি দ্রুত বাদশাহর কুশাসনের মিথ্যে অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ করে ইংরেজ রেসিডেন্টকে রাজ্য ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানালেন। এসব তিনি করেছিলেন রেসিডেন্টকে তার নিজের প্রাসাদে ডেকে এনে। পর্দার আড়াল থেকে তার প্রতিবাদকে যুক্তি দিয়ে একে একে উপস্থাপন করেন। কিন্তু সব যুক্তিতর্ক বৃথা গেল। আউলিয়া বেগম তখন ঝানু কৌঁসুলির মতো রেসিডেন্টকে এক মোক্ষম প্রশ্ন করে উত্তর চেয়ে বসলেন। প্রশ্নটির সারবত্তা হলো, বাদশাহ যদি শাসক হিসেবে ব্যর্থ, আর অত্যাচারে প্রজারা জর্জরিত, তাহলে অযোধ্যা রাজ্যের একটানা আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে কেন? ওয়াজিদ আলী শাহের বিরুদ্ধে ইংরেজের আনা কুশাসনের অভিযোগ সত্যি হলে লক্ষ্নৌ ও অযোধ্যার সর্বত্র ‘অত্যাচারী’ বাদশা রচিত ঠুমরি, মর্সিয়া ও গীত এত জনপ্রিয় কেন? কেন বাদশাহর লেখা গান বিয়েশাদি, আনন্দ-উৎসব, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রজাদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। বিলাতের রাজবংশের কোনো সদস্য বা কোনো রাজার লেখা গান কি কখনো সাধারণ ইংরেজ নর-নারীর গলায় শোনা যায়? (উল্লেখ্য, ওয়াজিদ আলীর ‘বাবুল মোরা নৈহার ছুটহি যায়’ গানটি আজো সারা উপমহাদেশে প্রচণ্ড জনপ্রিয়) রেসিডেন্টের মুখে রাটি নেই, কারণ তিনি জানেন এসব প্রশ্নের জবাব দেয়ার ক্ষমতা তার বা বিলেতের কারোর নেই।

ওয়াজিদ আলীর সাধের অযোধ্যা ইংরেজের গ্রাস হতে বাঁচানোর মতো পরিস্থিতি আসলে ছিল না। ইংরেজের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইংরেজের অনুকূল অবস্থা এবং বিশেষ করে তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল ডালহৌসির পররাজ্য জয়ের লালসা অযোধ্যার ভাগ্য অনেক আগেই নির্ধারণ করে রেখেছিল। আগেই বলা হচ্ছে বাদশাহ বিদ্রোহ করেননি, তবে ব্রিটিশের দেয়া অমর্যাদাসূচক চুক্তিপত্র স্বাক্ষরও করেননি। ব্রিটিশের পেনশন নিতে সম্মত হননি প্রচুর প্রলোভন সত্ত্বেও। রেসিডেন্ট শেষে মরিয়া হয়ে আউলিয়া বেগমকে ধরেন, তাকে অনেক পীড়াপীড়ি করেন, মোটা অংকের পেনশনের প্রলোভন দেখালেন, যাতে তিনি বাদশাহকে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করাতে রাজি করান। আউলিয়া বেগমও ইংরেজি প্রলোভন ও ভীতি প্রদর্শনকে তোয়াক্কা না করে ছেলের সিদ্ধান্তে নিজেও অটল রইলেন। মা ও পরিবার-পরিজন, অমাত্যবর্গ-অনুসারীদের নিয়ে বাদশাহ লক্ষেৗ ছেড়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে ডেরা বাঁধলেন। উদ্দেশ্য ছিল কলকাতার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কাউন্সিলকে বিস্তারিত জানিয়ে রাজ্য ফেরত দেয়ার অনুরোধ জানাবেন, কিন্তু কাউন্সিলের অসহযোগিতায় সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। ফলে বাদশাহর সামনে এবার বিলেত গিয়ে ইংরেজ পার্লামেন্ট ও রাজদরবারে অযোধ্যা আদায়ের ন্যায্য দাবি উত্থাপন করা ছাড়া কোনো পথ রইল না।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাদশাহ নিজেই বিলাত যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, কিন্তু তার চিকিৎসকরা বাদশার ভগ্ন স্বাস্থ্যের কারণে এ কষ্টসাধ্য দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা থেকে তাকে বিরত করলেন। এছাড়া বাদশাহ যদি বিলাত থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসেন, তবে অযোধ্যার শাহী পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ন হবে। তাহলে বাদশার পরিবর্তে কে বিলাতের রাজপ্রসাদে গিয়ে এ দাবি উপস্থাপন করবে। তাছাড়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেকোনো মূল্যে বাদশার বিলেত গমন ঠেকাতে বদ্ধপরিকর। এ রকম একটা সংকটাপন্ন অবস্থায় পর্দানশিন বাদশা জননী আউলিয়া বেগম অসীম সাহস নিয়ে এগিয়ে এলেন, ছেলের হয়ে তিনিই যাবেন বিলাত। বাদশাহ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

সিদ্ধান্ত হলো বাদশাহ মোক্তার (Envoy) হবেন মৌলভী মসিহউদ্দিন খান, সঙ্গে থাকবেন বাদশাহর ভাই জেনারেল সাহেব সিকান্দর হাসমত এবং ১৮ বছরের যুবরাজ মীর্জা হামিদ আলী বাহাদুর।

তবে বাদশা জননী যথেষ্ট বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন। তিনি বুঝতে পারছিলেন ভারতের ইংরেজ সরকারের হাত থেকে অযোধ্যা উদ্ধার সহজ হবে না। আশা ক্ষীণ হলেও বিলাত গিয়ে রানী ভিক্টোরিয়া এবং পার্লামেন্টের মুখোমুখি হয়ে হূতরাজ্য উদ্ধারে প্রচেষ্টাই সামনে একমাত্র পথ, ফল আসুক বা না আসুক। আউলিয়া বেগম তার প্রচেষ্টা সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি বিলাত যাব। আমি একজন বাদশাহর মাতা, ইংরেজ রানীও একজন মহীয়সী মাতা। আমি মা হিসেবে তাকে অনুরোধ করব আমার পুত্রের রাজ্য ফিরিয়ে দিতে।’

একটি সম্ভ্রান্ত রাজপরিবারের রাজমাতার কাছ থেকে এ ধরনের অনুরোধ সে যুগের অভিজ্ঞতা ও রাজবংশের  ঐতিহ্যের নিরিখে খুব অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু বাদশা জননী উপলব্ধি করতে পারেননি যে উনিশ শতকের বিকাশমান সাম্রাজ্যবাদ ও ক্ষমতার দম্ভে এ ধরনের মহানুভবতা রাষ্ট্রীয় কূটনীতি ও রাজনীতির স্বার্থে আগেই মূল্যহীন হয়ে পড়ছে। আর উপমহাদেশের সব রাজপরিবারের মতো অযোধ্যার রানীরও ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ক্ষমতার তুলনায় রাজা-রানীর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না।

আলিয়া বেগম নিজেও ছিলেন অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান, তার পিতা ছিলেন কালকির নবাব। আলিয়া বেগম শুধু ধর্মভীরুই ছিলেন না, তিনি আরবি-ফারসি ভাষায়ও সমান দক্ষ ছিলেন। এ দুটি ভাষাই তিনি লিখতে ও পড়তে জানতেন। ছেলের দুর্গতি তিনি অনেক আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি তার ছেলে ওয়াজিদ আলীর অপরিমিত বিলাস ব্যসনের জন্য প্রায় সতর্ক করেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। 

আলিয়া বেগমের বিলাত যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কলকাতায় একটি জাহাজ চার্টার করা হলো অযোধ্যা ডেলিগেশনের পর্দানশিন যাত্রীদের সুবিধার্থে। জাহাজটি সুয়েজ পর্যন্ত যাবে, তারপর জাহাজ বদল করে যাত্রীরা আরেকটি জাহাজে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন বন্দরে গিয়ে নামবে।

যাত্রার দিন হুগলী নদীর দুই পাড়ে হাজার হাজার অনুসারী বিদায় সংবর্ধনা দিতে হাজির হলো। সবাই অজানা ভবিষ্যতের চিন্তায় বিমর্ষ ও বেদনাতুর। বাদশাহ জননী তার প্রজাদের মলিন ও ক্রন্দনরত মুখ দেখে নিজেও কেঁদে ফেললেন।

বাদশা ওয়াজিদ আলী নদীর ধারের তার প্রাসাদ সুলতানখানা থেকে তার ভাই ও সন্তানের বিদায়ী সালাম নিলেন। তখন কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন তার মা, ভাই ও পুত্রের সঙ্গে এই তার শেষ দেখা।

২০ আগস্ট ১৮৫৬ সালে এস এস বেঙ্গলে চেপে অযোধ্য ডেলিগেশন সাউদাম্পটন এসে পৌঁছলেন। পর্দাঘেরা সিডান চেয়ারে করে আলিয়া বেগমকে জাহাজ থেকে নামানো হলো। ডেলিগেটের মহিলা সদস্যরাও পর্দা রক্ষা করে জাহাজ থেকে নামেন। বন্দরে তখন বিশাল এক জনতা আনন্দের সঙ্গে আলিয়া বেগমকে অভ্যর্থনা জানায়। বাদশার নিয়োজিত ব্রিটিশ এজেন্ট জন ব্রানডন লন্ডনেও এক অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করে বিশিষ্টজনদের আগেই আমন্ত্রণ জানিয়ে রেখেছিলেন। রানীমাতার লন্ডন সফর উপলক্ষে বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য পাঞ্চ’ অযোধ্য শাহী পরিবারে জন্য যে প্রচণ্ড আগ্রহ ও ঔত্সুক্য জন্মেছিল, তার একটি চমত্কার বিবরণও ছেপেছিল।

The Queen of Oude

She cries so loud

For justice like a QC

And claims her right

And wants to fight

The Marquess of Dalhousie

The Queen of Oude

Has brought a crowd

That shares her strange halluci

Nation that she

Shall shortly be

Avenged on Lord Dalhousie

The Queen of Oude

Is disendowed

Of regions rich and juicy

Their milk and honey

I mean their money

Squeezed out by Lord Dalhousie.

 

দ্য পাঞ্চ পত্রিকার বদৌলতে বিলাতের মানুষের বুঝতে বাকি রইল না যে অযোধ্যাকাণ্ডের খলনায়ক আর কেউ নন স্বয়ং লর্ড ডালহৌসি এবং এ নাটকের নিরীহ বাদশার প্রতি সহানুভূতি জন্মাতে শুরু করল জনমানুষের।

জন ব্রানডন সাউদাম্পটনের রয়েল ইয়র্ক হোটেল পুরোপুরি রিজার্ভ করে রেখেছিলেন অযোধ্যা ডেলিগেশনের ১০ দিন থাকার জন্য। ১০০ পাউন্ডের বিনিময়ে শহরের মেয়র বেগম আউলিয়া এবং নারী সদস্যদের ব্যক্তিগত প্রাইভেসির জন্য সব রকম ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। রাজমাতা যেন সাধারণের দৃষ্টির বাইরে থাকেন, সেজন্য পুরো হোটেলটি সাদা কাপড়ের পর্দায় আবৃত করা হয়েছিল।

জন ব্রানডনের জনসংযোগের তারিফ করতে হয়। তিনি হোটেলের সম্মুখে সম্মিলিত জনতাকে উদ্দেশ করে এক ভাষণে ব্যাখ্যা করলেন কোন কারণে প্রাচ্য রাজবংশের ৫২ বছর বয়সী এক রাজমাতাকে বাধ্য হয়ে এ কষ্টকর ও দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা করে বিলাতে উপস্থিত হতে হয়েছে। এ মহীয়সী নারী এ দেশে এসেছেন প্রমোদ বা বিলাস ভ্রমণে নয়, তিনি এসেছেন ন্যায়বিচার লাভের প্রত্যাশায়। যাতে তার পুত্র বাদশা ওয়াজিদ আলীর হারানো রাজ্য ও সিংহাসন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফিরিয়ে দেয়।

অযোধ্যার অতিথিদের উদ্দেশে সাউদাম্পটনের অভিজাত নাগরিকদের অভ্যর্থনা পার্টিতে ব্রিটিশ সৌজন্য এবং আন্তরিকতার ছোঁয়া ছিল প্রশংসনীয়।

তিনদিন পর অযোধ্যার রানী একটি বিখ্যাত হোটেলে সাউদাম্পটনের মেয়র ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কারে মিলিত হন। শুধু বিশেষ সম্মানিত ব্রিটিশ মহিলাদের এ সাক্ষাত্কারে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এই অতিথিদের অভ্যর্থনা জানান জন ব্রানডন ও তার পত্নী, সিকান্দর হাসমত ও মীর্জা হামিদ বাহাদুর। বাদশা জননী সমবেত অভিজাত অতিথিদের মধ্যে মহিলাদেরকে নিয়ে পৃথক ‘জেনানা বা মহিলা দরবার’ করেন। ব্রানডন ছিলেন এই অনুষ্ঠানের দোভাষী। বাদশাহ জননী উপস্থিত সবার কাছে ইংরেজিতে কথা বলতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। সম্ভবত ইংল্যান্ডে এটিই সর্বপ্রথম জেনানা দরবার।

সাউদাম্পটন ট্রেন থেকে আউলিয়া বেগম লন্ডনে রওনা হলেন। একটি বিশেষ ট্রেন রিজার্ভ করে ডেলিগেশনের সবাই রওনা দিলেন লন্ডনের উদ্দেশে। আর বাদশাহ জননী লন্ডন যান ঘোড়ার টানা গাড়িতে। তারা লন্ডনে পৌঁছান ৩১ আগস্ট ১৮৫৬ সালে।

লন্ডনের একটি অভিজাত এলাকায় হার্লে হাউজে রাজমাতার থাকার বন্দোবস্ত হয়। এটি ৫০০ পাউন্ড দিয়ে এক বছরের জন্য ভাড়া করা হয়েছিল। লন্ডন উপস্থিত হওয়ার পরপরই অযোধ্যা ডেলিগেশন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টর, পার্লামেন্ট সদস্য এবং ব্রিটিশ রানীর সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে জনমত গঠনের চেষ্টায় সর্বশক্তি নিয়োজিত করে। সাধারণ মানুষের মনোভাবকে তারা উপেক্ষা করেনি। এ প্রচেষ্টার শুরুর দিকটা তেমন আশাপ্রদ হয়নি। বাদশাহ জননীর কোম্পানির ডিরেক্টর বরাবর সরাসরি আবেদন সাফল্যের মুখ দেখেনি; রানীমাতার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়।

প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও রানীমাতা দমে গেলেন না। নতুন এক কৌশলের আশ্রয় নিলেন। প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি এক জেনানা দরবারের আয়োজন শুরু করলেন। তিনি দ্রুত সাড়া পেতে শুরু করেন, তার দরবারে প্রখ্যাত ব্যক্তি ও সম্ভ্রান্ত নারীর উপস্থিতি বেড়ে গেল, এমনকি রাজপ্রাসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও হাজির হতে দ্বিধা করলেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মনে অযোধ্যার জন্য এক ধরনের সমর্থন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করল। এতে দ্রুতই ব্রিটিশ সরকারের কাছে এহেন পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠল, তারা উল্টো বলা শুরু করল, রানীমাতার অযোধ্যা মিশন ভারতের ব্রিটিশ সরকারকে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশেই লন্ডনে কার্যক্রম চালাচ্ছে। অযোধ্যা মিশন প্রকৃতপক্ষে অযোধ্যা বাদশার বেহিসাবী জীবনযাপনকে ধামাচাপা দিতেই নানা প্রচারণা চালাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে অযোধ্যার বাদশার অসংযমী জীবনধারা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হলেও একটা পর্যায়ে অযোধ্যার প্রতি অবিচারের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে ঝিমিয়ে পড়তে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাদশাহ চরিত্র এবং তার শাসন সম্পর্কে ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে বিভ্রান্ত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। তা সত্ত্বেও কলকাতা থেকে যে রিপোর্ট আসে, তাতে দেখা গেল বাদশাহর বিরুদ্ধে অধিকাংশ অভিযোগই ভুয়া।

এদিকে আউলিয়া বেগমও ক্রমেই ক্ষীণবল হয়ে পড়ছিলেন। তিনি বিলাতে এসেছেন প্রায় ছয় মাস হয়ে গেছে কিন্তু রাজপ্রসাদ থেকে এখনো রানীর সঙ্গে সাক্ষাত্কারের কোনো সুনির্দিষ্ট ইঙ্গিত পাননি। আউলিয়া বেগম যাতে রানীর সাক্ষাৎ না পান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সে বিষয়েও তত্পরতা চালাচ্ছে, এ খবরও শোনা যাচ্ছিল। তার পরও আউলিয়া বেগম ধৈর্য ধরে অপেক্ষায় থাকলেন, উত্কণ্ঠা-দুশ্চিন্তা যেন তাকে লক্ষ্যচ্যুত করতে না পারে। কিন্তু যত দিন যাচ্ছিল তার মনে এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, বিলাতের রানী কি তার উপদেষ্টাদের পরামর্শে তাকে দর্শন দেবেন না? তিনি কতদিন দেখবেন?  এ রকম একটা আশা-নিরাশায় মধ্যে যখন তিনি দিন কাটাচ্ছেন, হঠাৎ একদিন বাকিংহাম প্রাসাদ থেকে সংবাদ এল আগামী ৪ জুলাই ১৮৫৭-এ অপরাহ্ন ২টা ৪৫ মিনিটে আউলিয়া বেগমকে রানী ভিক্টোরিয়া দর্শন দেবেন।

রাজপ্রাসাদে রানীর দর্শনের তারিখটা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, কারণ হিন্দুস্তানে তখন বিদ্রোহের গুঞ্জন আস্তে আস্তে জোরালো হয়ে উঠছে। ভারতের আকাশে অস্থিরতার ঝড় জমেছে। 

একই সঙ্গে রানীর উপদেষ্টারাও এ সাক্ষাতের বিরোধিতা করলেন, তারা বললেন, অযোধ্যার আউলিয়া বেগম আর এখন অযোধ্যার রানী নন, তিনি বাদশার জননী মাত্র। কাজেই তাকে সাক্ষাৎ দেয়ার কোনো মানে হয় না। রানী ভিক্টোরিয়া এসব ওজর-আপত্তি উপেক্ষা করে তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন, কারণ তিনি এর আগেও ভারত থেকে আগত বেশ কয়েকজন রাজ্যহারা ব্যক্তিবর্গকে সাক্ষাত্কার দিয়েছেন। তাই অযোধ্যার ভূতপূর্ব বাদশা জননীকে তিনি কেন বঞ্চিত করবেন? রানীর সদিচ্ছা সত্ত্বেও ভাগ্যের লিখন খণ্ডাবে কে? সবার অলক্ষ্যে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ ধীরে ধীরে জমে উঠছিল।

আউলিয়া বেগম নির্দিষ্ট সময়ে তার শীর্ষস্থানীয় সদস্য, শাহজাদা ও ঘনিষ্ঠ অন্তঃপুরিকাদের সঙ্গে নিয়ে বাকিংহাম প্রাসাদে এলেন। লর্ড জেমস স্মিথ বাদশা জননী ও শাহজাদাদের রানীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। স্যার জন ক্লার্ক ছিলেন দোভাষীর দায়িত্বে। প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রোজি এল জোনস তার ‘লাস্ট কিং ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ে এই অনুষ্ঠানের একটি বিশেষ বিবরণ লিখেছেন। সতর্ক ব্রিটিশ কর্মকর্তারা আগেই অযোধ্যার নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে, সাক্ষাত্কারের সময় রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা উভয় পক্ষ থেকেই পরিহার করা হবে। শুধু শিষ্টাচার ও সৌহাদ্যপূর্ণ রাজকীয় সম্বোধন ও অভিবাদন বিনিময় করা হবে। এবং আলাপ-আলোচনা সামাজিক সৌহাদ্যপূর্ণ বিষয়ে আবদ্ধ রাখা বাঞ্ছনীয়। দর্শনের সময় কিছুক্ষণের জন্য পর্দাপথা স্থগিত থাকবে। যুবরাজ প্রিন্স এলবার্ট তার দুই জ্যেষ্ঠ পুত্র ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে ছিলেন। রানী ভিক্টোরিয়ার সাতজন শিশু সন্তানও সাক্ষাত্কারে হাজির ছিল। আরো ছিল দুই মাস বয়সী শিশু রাজকন্যা বিয়াট্রিস।

আউলিয়া বেগম তার মুখমণ্ডলের আবরণ সরিয়ে ভিক্টোরিয়ার হাতে চুমো দিলেন। রোজী জোনস অযোধ্যার রানীর পোশাকেরও বর্ণনা দিয়েছেন, বাদশাহ জননীর অঙ্গে সোনা ও রুপা খচিত ভারী পোশাক, মাথায় মুকুট এবং রত্নরঞ্জির অলঙ্কারে তার ছোটখাটো দেহ আবৃত। ভিক্টোরিয়া অযোধ্যার বেগমের সম্পর্কে তার নিজের ডায়েরিতে লিখেছেন, তার (আউলিয়া বেগমের) চোখ দুটি প্রথমত প্রাচ্যের রঙ দিয়ে সজ্জিত- অপরূপ ও আকর্ষণীয়। রানী আরো লিখেছেন, আউলিয়া বেগমের দুই পৌত্রের মাথাও মুকুট সজ্জিত এবং দুই শাহজাদার পরনে লম্বা ঢোলা পরিচ্ছদ। বাদশা ওয়াজিদ আলীর একটি চিঠি ভিক্টোরিয়ার হাতে সমর্পণ করলেন বেগম এবং উপহার হিসেবে তাকে একটি অতীব সুদৃশ্য মুক্তার অলঙ্কার এবং চমত্কার কাজ করা একটি রুপার আতরদানি চিঠির সঙ্গে দিলেন— এই ছিল ঐতিহাসিক রোজির দেয়া সাক্ষাত্কারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

ইতিহাসবিদ এল রোজি উর্দু ভাষা শিখেছিলেন, পরে এ বিদ্যার জোরে তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত উর্দু পত্রিকা ঘেঁটে এ সাক্ষাত্কারের একটি তুলনামূলক দীর্ঘ বিবরণ উদ্ধার করেন। এটির লেখক ঐতিহাসিক কামালউদ্দিন হায়দার। তার দাবি ছিল, এই প্রতিবেদনটি তিনি রানীর ডেলিগেশনের একজন নারীর কাছ থেকে শুনে তৈরি করেছিলেন। রানী ভিক্টোরিয়ার মার্জিত আচরণে অযোধ্যার রাজপরিবারের সবাই বেশ আপ্লুত হয়েছিলেন। তার সহজ-সাবলীল ব্যবহার এবং সাজসজ্জা তাদের আকৃষ্ট করেছিল। আউলিয়ার সফরসঙ্গীরা তার পোশাকের বর্ণনা দিয়েছেন এই বলে: বৃত্তাকার পোশাক।

দুই পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা পূর্ব সিদ্ধান্ত মাফিকই শুধু সামাজিক বিষয়ের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল। বিলেতে নৌবিহারের সুবিধা এবং কলকাতা থেকে ক্লান্তিকর দীর্ঘ সমুদ্র ভ্রমণ এমন সব বিষয়ই আলোচনা হয়েছিল। ভিক্টোরিয়া জানতে চাইলেন অযোধ্যার রানীর বিলাতের বিখ্যাত ম্যানশনগুলো দেখার সুযোগ হয়েছে কিনা? ভিক্টোরিয়া নিজেই আগ্রহী হয়ে বেগমের জন্য কয়েকটি বিখ্যাত ম্যানসন পরিদর্শনের প্রস্তাব করেন।

এই সাক্ষাত্কারের সময় আউলিয়া বেগমের কী মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা আজ আর জানার কোনো উপায় নেই। তবে তিনি যে হতাশ হয়েছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। আউলিয়া বেগমের সফরের মূল উদ্দেশ্যটি ছিল— হারানো রাজ্য ফিরে পাওয়ার কথাটি মা হয়ে আরেক প্রভাবশালী মায়ের কাছে তুলে ধরা, কিন্তু তাকে সেই সুযোগ দেয়া হলো না। যদিও রানী ভিক্টোরিয়া আউলিয়া বেগমের দীর্ঘ কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে লন্ডনে আসা ও তার দর্শনপ্রার্থী হওয়ার প্রকৃত কারণ ভালোমতোই জানা ছিল।

সম্ভবত রানী ভিক্টোরিয়ার আগ্রহেই অযোধ্যা ডেলিগেশন ওই একই দিনে আর্ট ট্রেজার প্রদর্শনী দেখতে ম্যানচেস্টার গমন করেছিল।

রোজি জোনস তার বর্ণনায় বৈঠক সেদিনের মতো মুলতবি রাখার কথা উল্লেখ করেছেন। পরদিন সকালে আবার অযোধ্য ডেলিগেশন বৈঠকে বসবে এ মর্মে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাক্ষাত্কারের শেষ হয়। ভাগ্যের পরিহাস সে রাতেই যে ভারতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের সংবাদ এবং বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে ওয়াজিদ আলী শাহের বন্দি হওয়ার খবর লন্ডনে পৌঁছায়, ফলে পরদিন আর সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। এবং আউলিয়া বেগম যতদিন লন্ডনে ছিলেন, প্রতিশ্রুত সেই বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি।

প্রখ্যাত গবেষক সুদীপ্ত মিত্র তার বই পার্ল বাই দ্য রিভার-এ লন্ডনের বাকিংহাম প্রাসাদের এ সাক্ষাত্কার সম্পর্কে লিখেছেন, সুদীপ্ত তার বর্ণনায় বেশ খানিকটা অতিরিক্ত তথ্য দিয়েছেন। যদিও লুই জোনস ও তার বর্ণনা মোটামুটি একই রকম। কিন্তু সুদীপ্ত মিত্রের বিবরণে ভিক্টোরিয়া এবং অযোধ্যার বাদশা জননীর মধ্যে যে বাক্যালাপ হয়েছিল, তার সুর এবং বিষয়বস্তুতে বিশেষ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

এই সাক্ষাত্কার যে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করেছিল, সুদীপ্ত তা তার লেখায় উল্লেখ করেছেন। সুদীপ্ত মিত্রের ভাষ্যমতে, ভিক্টোরিয়া অত্যন্ত সহূদয় এবং সৌজন্যপূর্ণ ব্যবহার করেন অযোধ্যার বেগমের সঙ্গে। তিনি মলিকাকিশওয়ারকে অযোধ্যার রানী হিসেবে সম্বোধন করে সম্মান জানান। ভিক্টোরিয়া তার সঙ্গে করমর্দন করে তার উল্টো দিকে একই রকম একটি চেয়ার বসিয়েছিলেন।

সাক্ষাত্কারে অযোধ্যার বাদশাহ জননী দুঃখের সঙ্গে ব্রিটিশ শক্তি কর্তৃক অযোধ্যা দখলকে দুর্নীতিমূলক কাজ বলে উল্লেখ করেন। অযোধ্যার রাজপরিবার এক শতকেরও বেশি সময় ধরে ব্রিটিশের বিশ্বস্ত মিত্র প্রমাণিত হয়ে এসেছে। এমন মিত্রতা বন্ধনে আবদ্ধ এ প্রাচীন শাহী পরিবারটিকে তাদের নিজ প্রাসাদ থেকে বিতাড়ন নিতান্তই দুঃখজনক। তাও আবার অযোধ্যার সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে। নির্দোষ বাদশাহ লর্ড ডালহৌসির তুচ্ছ কারণে পররাজ্য অধিকারের লালসার শিকার হয়েছেন। ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রয়োজনের সময় অযোধ্যার বাদশাহ সবসময় ইংরেজের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের আর্থিক সাহায্যে বরাবরই এগিয়ে এসেছেন। রোজির বর্ণনার সঙ্গে সুদীপ্তর বর্ণনার পার্থক্য এখানেই, রোজি বলেছেন এ ধরনের বিষয়বস্তু উত্থাপন না করার জন্য দুই পক্ষের আগেই সমঝোতা হয়েছিল।

সুদীপ্তও তার বর্ণনায় সাক্ষাত্কার সেদিনের মতো মুলতবি করে পরদিন সকালে আবার বৈঠকের প্রতিশ্রুতির কথা লিখেছেন। এবং লন্ডনে বিদ্রোহের খবর পৌঁছে যাওয়ায় সে বৈঠক আর কোনোদিন অনুষ্ঠিত হয়নি এ কথাও বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন।

বাদশা ওয়াজিদ আলীর ষড়যন্ত্র এবং বন্দি হওয়ার সংবাদ আগুনের মতো ব্রিটেনে ছড়িয়ে পড়ে। রানী ভিক্টোরিয়ার পক্ষে এ রকম সন্দেহভাজন ভূতপূর্ব রাজাকে কোনো স্পস্ট সহমর্মিতা দেখানো আপাতত সুকঠিন বলে প্রমাণিত হলো। ব্রিটেনের সাধারণ মানুষ ভারতীয় সিপাহীদের বিদ্রোহে এবং ওয়াজিদ আলী শাহের গ্রেফতারে ক্ষুব্ধ হলো। ফলে আশঙ্কা দেখা দিল আউলিয়া বেগমের জন্য জন্য যে সহানুভূতি ব্রিটিশ রাজধানীতে তৈরি হয়েছিল, তা হয়তো দ্রুত হ্রাস পেতে থাকবে।

ভারতে বিদ্রোহের সংবাদ নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ২৭ জুলাই হাউজ সব কমন্সের বিতর্কের উল্লেখ এখানে প্রাসঙ্গিক বিবেচিত হতে পারে। মি. বেঞ্জামিন ডিসরেলি বলেন, ভারতে ব্রিটিশ ভুল নীতির কারণে অযোধ্যার অবনতি এবং ১৮৫৭-এর ভারতীয় বিদ্রোহের সূচনা হয়েছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বোর্ড প্রেসিডেন্ট ৩ ঘণ্টাব্যাপী অযোধ্য দখলের পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়ে বলেন, অযোধ্যা দখল অযোধ্যাবাসীর মঙ্গলের জন্য হয়েছে। তবে তার এ দাবি পার্লামেন্টের সদস্যদের কানে বিশ্বাসযোগ্য ঠেকেনি। বরং উল্টো ধারণাই সমর্থন পায় যে, ওয়াজিদ আলীর বন্দিত্ব ও রাজ্যচ্যুতির কারণেই অযোধ্যাসহ সারা ভারতে সিপাহীরা বিদ্রোহ মেতে উঠেছে।

পার্লামেন্টে এ ধরনের প্রতিক্রিয়ায় বেগমের অযোধ্যা ডেলিগেশন কিছুটা আশার আলো দেখতে পেল, পার্লামেন্টে তাদের কর্মতত্পরতা বাড়িয়ে দেয়া হলো। তবে এখানে কৌশলে ভুল হয়ে যায়, তারা অযোধ্যার বাদশা বিদ্রোহের সঙ্গে যুক্ত নন এ দাবিতে জোর দিতে গিয়ে রাজ্য উদ্ধারের প্রধান লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। ফলে বাদশাহকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করতে গিয়ে অযোধ্যা উদ্ধারের প্রচেষ্টা চাপা পড়ে যেতে থাকে। ভারতবর্ষ থেকে বিদ্রোহীদের ইংরেজ নারী-পুরুষকে নির্বিচারে হত্যার সংবাদে খবর ব্রিটিশ জনমত ধীরে ধীরে সহানুভূতিহীন হয়ে শূন্যের কোটায় নেমে আসে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতির বিপদ টের পেয়ে অযোধ্যার ডেলিগেশনে শেষ চেষ্টা হিসেবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি পিটিশন আবেদন পাঠায়, যার শিরোনাম পিটিশন ফ্রম দ্য কুইন এবং প্রিন্সেস অব আউদ, আবেদনটি হাউস অব লর্ডসে ৬ আগস্ট ১৮৫৭ লর্ড ক্যাম্পবেল উত্থাপন করেন। আগেই বলা হয়েছে অযোধ্যার শীর্ষ নেতারা বিদ্রোহে বাদশাহ নির্দোষ এ বিষয়টিকেই আবেদনের মূল লক্ষ্য করে তুলতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। আবেদনে তারা পার্লামেন্টে অনুরোধ জানালেন অযোধ্যার বাদশার বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ রয়েছে, তা প্রমাণসহ পার্লামেন্টে পেশ করা হোক। এর ফলে বাদশাহ তার আত্মপক্ষ সমর্থনে একটি সুযোগ লাভ করবেন।

আবেদনটির প্রতিপাদ্য বিষয় যুক্তিসঙ্গত এবং যেকোনো অভিযোগই তদন্তের জন্য অভিযোগের ফিরিস্তি চাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া মান্য পন্থা। অযোধ্যা ডেলিগেশন তাই কোনো অন্যায় আবদার অর্থাৎ বাদশাহর মুক্তির জন্য ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে পার্লামেন্টের দ্বারস্থ হয়ে অন্যায় করেননি। এটা ন্যায্য দাবি। কিন্তু অযোধ্যা ডেলিগেশন ভাবতেই পারেনি যে, তাদের আবেদনকে ঘিরে আরো একটি নিষ্ঠুর প্রহসন প্রতিক্ষা করছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্ট তাদের জন্য। চ্যান্সেলর অব এসেস্কের লর্ড ক্যাম্পবেল স্বীকার করলেন, অযোধ্যার আবেদনটি যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে তিনি এ কথাও জানিয়ে দিলেন, তিনি হাউস অব লর্ডে অযোধ্যার আবেদনটি বিবেচনার জন্য উত্থাপন করতে অপারগ। কারণ অযোধ্যার রাজপরিবারের সদস্যদের আবেদনটি এরই মধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। কারণটি তুচ্ছ এবং হাস্যকর, ভাষার মারপ্যাঁচের শিকারে পরিণত হয়েছে অযোধ্যার প্রার্থনা। পার্লামেন্টে আবেদনটি ত্রুটিপূর্ণ বিবেচিত হয়েছে। আবেদনটিতে প্রথামাফিক বিনীত প্রার্থনা’র পরিবর্তে শুধু প্রার্থনা লেখা হয়েছে, যা এক অমার্জনীয় ব্যত্যয়। অযোধ্যার লেখা উচিত ছিল “যঁসনষব ঢ়ত্ধুবৎ” সেখানে লেখা হয়েছে শুধু “ঢ়ত্ধুবৎ” কে না জানে সব প্রার্থনা বা ঢ়ত্ধুবৎ সর্বদাই বিনীত বা যঁসনষব হয়ে থাকে। সব প্রার্থনাকারী বিনয়াবনত হয়েই প্রার্থনা বা ঢ়ত্ধুবৎ দাখিল করেন। কিন্তু পার্লামেন্ট যুক্তি দেখাল এ ধরনের বিনয়বিহীন প্রার্থনা লর্ডসদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। অযোধ্যার ডেলিগেশন ৮ আগস্ট ১৮৫৭, লন্ডন টাইমস পত্রিকার খবর মারফত জানতে পারল তাদের আবেদন প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং চিরতরে পরিত্যক্ত বলে বিবেচিত হবে। ঘটনার আকস্মিকতায় অযোধ্যার ডেলিগেশনের সদস্যরা হতবাক হয়ে গেলেন।

তারপরও পার্লামেন্টের এ বিরূপ মনোভাব উপেক্ষা করে লন্ডনে ভারতীয় সমাজ বাদশার ওয়াজেদ আলীর আশু মুক্তি প্রার্থনা করে শত শত দরখাস্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রতিদিন জমা হতে লাগল। কিন্তু ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ ব্রিটিশ জনমতকে অনেকটাই বৈরী করে ফেলেছিল। কোনো আবেদন নিবেদনই আর কাজে এল না।

কথায় বলে দুর্ভাগ্য কখনো একা হাজির হয় না। অচিরেই অযোধ্যার ডেলিগেশনের জন্য আরো একটি বড় সমস্যা করাল রূপ নিয়ে ধেয়ে এল। অযোধ্যা মিশনের ব্যয় নির্বাহের জন্য কলকাতা থেকে বাদশাহের পাঠানো ৪ হাজার পাউন্ড নিঃশেষিত প্রায়। লন্ডনের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে কিছু আর্থিক সহায়তার আবেদন করা হলে তারা তা বোধগম্য কারণেই ফিরিয়ে দেয়, ফলে শাহী পরিবার লন্ডনে বাসে ক্রমাগত দেনার চক্রে জড়িয়ে গেল। অযোধ্যা মিশন তাই ভেঙে দেওয়া অপরিহার্য হয়ে উঠল। শাহী পরিবার হার্লে হাউজ ছেড়ে দিয়ে শহরের বাইরে অপেক্ষাকৃত একটি ছোট বাড়ি ভাড়া করতে বাধ্য হল। অন্য সদস্যদের জন্য ওয়ারিক স্ট্রিটে চারটি সাধারণ মানের বাড়ি ভাড়া করা হলো। এমন সংকটময় সময়ে বাদশাহর পাঠানো ৭ হাজার ২০০ পাউন্ড বিপর্যস্ত অযোধ্যা মিশনে খানিকটা স্বস্তির সুবাতাস নিয়ে আসে। কিন্তু তা বেশি দিন স্থায়ী হলো না। মিশনের অভ্যন্তরে ঘনিয়ে ওঠা অন্তর্কলহ এবার প্রকাশ্য হয়ে পড়ল। 

আউলিয়া বেগমের সবচেয়ে বিশ্বস্ত পাত্র মৌলভী মসিউদ্দিন বেগমের নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টরদের কাছে চিঠি লিখলেন, তারা যেন বেগমের সব ধরনের যোগাযোগের চেষ্টা উপেক্ষা করেন। হতাশ বেগম তখন সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার তিনি দেশে ফিরে যাবেন, যাওয়ার পথে তিনি মক্কা-মদিনায় ওমরা ও জিয়ারত করবেন। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন তার সঙ্গে শেষ অসৌজন্য আচরণটি করলেন, তাকে তারা ব্রিটিশ পাসপোর্ট নেয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করল। যদিও ফরাসি সরকার আগেই আউলিয়া বেগমকে ফরাসি পাসপোর্ট দিয়েছিল, বেগমের ফ্রান্স ভ্রমণের জন্য। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর চাপ দিতে শুরু করল, বেগম যাতে ব্রিটিশ পাসপোর্ট গ্রহণ করে ব্রিটিশ প্রজা হিসেবে তার আনুগত্য প্রকাশ করেন। তবে এর পেছনে মূল অভিসন্ধি ছিল আউলিয়া বেগম ব্রিটিশ পাসপোর্ট গ্রহণ করলে ব্রিটিশের অযোধ্যা দখল বৈধ বলে স্বীকৃত হয়ে যেত।

রাজমাতা লন্ডন ছেড়ে প্যারিসে এসেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার অসুস্থতার দ্রুত অবনতি ঘটতে শুরু করল। কিন্তু শুরুতে তিনি কোনো ফরাসি চিকিৎসকের চিকিৎসা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে তিনি চিকিৎসা নিতে সম্মত হন। অসুস্থ অযোধ্যার রানীর চিকিৎসায় সম্রাট নেপোলিয়ন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. রয়েডকে নিযুক্ত করেন। যিনি শেষ দিন পর্যন্ত রাজমাতার রোগশয্যায় পাশে ছিলেন।

আউলিয়া বেগম ইন্তেকাল করেন ২৪ জানুয়ারি ১৮৫৮ সালে। লন্ডনে তার পরিবারের সদস্যদেরকে টেলিগ্রাফ মারফত এ ইন্তেকালের সংবাদ দেয়া হয়।

প্যারিসে পরিপূর্ণ ইসলামিক রেওয়াজমাফিক বেগমের শেষকৃত্য করা হয়েছিল। তাকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পর্দা রক্ষা করে গোসল দেয়া হয় তার নারী সদস্যদের সাহায্যে। তার মরদেহ নিয়ে একটি শোভাযাত্রা অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং তার মরদেহ প্যারিসের রাস্তা দিয়ে নগরীর বিখ্যাত কবরখানার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। প্যারিসে এ ধরনের দৃশ্য খুব কম দেখা গেছে— সাদা কাপড় দিয়ে ঢাকা তার মরদেহ সাতটি সাদা ঘোড়ার গাড়িতে বহন করে নেয়া হয়। শববাহী গাড়ির পেছনে তার পুত্র শাহজাদা সিকান্দার হাশমত এবং ফরাসি সরকারের কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জেনারেল দ্য আরগন হেঁটে বেগমের গাড়ির অনুগমন করেন। এছাড়া ১০টি ঘোড়ায় টানা গাড়িতে ফরাসি সাম্রাজ্যের মন্ত্রিবর্গ, তুর্কি রাষ্ট্রদূত হায়দার পাশা এবং ইরানের রাষ্ট্রদূত ফারুক খান ও প্যারিসের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা শেষকৃত্যে অংশ নেন। বেগমকে প্যারিসের বিখ্যাত গোরস্থান চধত্ব ষধ পযধংবতে দাফন করা হয়। দাফন পর্ব এবং শোভাযাত্রা ফ্রান্সের বিখ্যাত পত্রিকা খ’রষষঁংঃত্ধঃরড়হ-এ বিস্তারিত বিবরণ ৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৮তে ছাপা হয়।

আউলিয়া বেগম গত হয়েছেন, অনেক বছর। কবরটির কথা কারোই মনে নেই। বিস্মৃতপ্রায় আউলিয়া বেগমের এ কবর ইতিহাসবিদ রোজি জোনস কয়েক বছর আগে প্যারিসের বিখ্যাত গোরস্থানে খুঁজে বের করেছেন। করবটি চারকোনা, সামান্য উঁচু এবং নিম্নমানের কাজ করা ইট দিয়ে তৈরি একটি প্লাটফর্মে অবস্থিত। রোজির অভিমত এই কবরে কোনো এপিটাফ বা নামফলক কখনই লাগানো হয়নি।

১৮৫৮ এপ্রিলে মসি উদ্দীন নির্মাণ করিয়ে দেন। ১৮৪৬-এ সমাধির তত্ত্বাবধায়ক প্যারিস পৌরসভাকে এক পত্র মারফত উল্লেখ করেন যে অযোধ্যার বেগমের কবরটি অত্যন্ত ভগ্ন অবস্থায় টিকে আছে এবং এর দৈন্যদশা অত্যন্ত দুঃখজনক, এছাড়া সমাধিটি বেশ অনেকটা জায়গাজুড়ে আছে। যেহেতু অযোধ্যা রাজ্য ব্রিটিশের অধীন ছিল, সেহেতু ফ্রান্সের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত এর রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে সম্মত হতে পারেন। পত্রটি নানা স্থানে ঘুরে শেষে কলকাতায় ওয়াজিদ আলী শাহর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হলে কবরটি মার্বেল দিয়ে বাঁধাই করার প্রস্তাব করা হয়। ওয়াজিদ আলী শাহ তার সামান্য পেনশনের টাকা থেকে এর ব্যয়ভার বহনে অপারগতা জানালেন। কবরের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ হয়েছিল বলে জানা নেই। ফরাসি নাগরিকদের করের টাকায় কবরের মেরামত হতে দিতে রাজি হল না প্যারিস পৌর কর্তৃপক্ষ। সুখের বিষয় যে কবরটি অন্যত্র সরানো হয়নি।

বেগমের কবরের দৈন্যদশা আজো ঘোচেনি বরং কালের ছোবলে তা আরো জীর্ণ হয়ে কোনোভাবে টিকে আছে।