১৩ জুন ২০১৬ গ্রেগরি রাবাসা প্রয়াত হয়েছেন। পরিণত বয়সই, মৃত্যুর সময় বয়স তার ৯৪ ছাড়িয়ে।
ঠিক পরদিন ‘প্যারিস রিভিউ’ শতাব্দীর সেরা এ অনুবাদককে শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৮১-এর শীত সংখ্যা আর্ট অব ফিকশনের সাক্ষাত্কারে বলা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কিছু কথা উদ্ধৃত করেছে:
‘সাক্ষাত্কার গ্রহণকারী: আপনি অনুবাদকদের কীভাবে দেখেন?
গার্সিয়া মার্কেস: যারা লেখার নিচে ফুটনোট দেন, তাদের বাদ দিলে অনুবাদকদের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। তবে অনেক সময় সম্ভবত তারা লেখক যে কথা বোঝাতে চাননি, তাই ব্যাখ্যা করতে চেষ্টা করেন; আর যেহেতু তা বইয়ে ছাপা হয়, পাঠককে তাই সহ্য করে নিতে হয়। অনুবাদ খুব কঠিন কাজ, এর কোনো পুরস্কার নেই, অনুবাদকের প্রাপ্তিযোগ যত্সামান্য। একটি ভালো অনুবাদ ভিন্ন একটি ভাষায় সবসময়ই একটি পুনঃসৃষ্টি। সে কারণেই গ্রেগরি রাবাসার প্রতি আমার এমন ভক্তি। আমার বই ২১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং রাবাসাই হচ্ছেন একমাত্র অনুবাদক, যিনি কখনো আমার লেখার কোনো কিছু খোলাসা করে বলার জন্য আমাকে অনুরোধ করেননি, যাতে সেই ব্যাখ্যা ফুটনোটে ব্যবহার করতে পারেন। আমি মনে করি, আমার লেখা ইংরেজিতে সম্পূর্ণ পুনঃসৃষ্টি হয়েছে বইটিতে, এতে (ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড) এমন কিছু অংশ আছে, যা অনুসরণ করা সত্যিই দুরূহ ব্যাপার। পাঠকের এমন মনে হতে পারে, অনুবাদক বইটি পড়েছেন এবং তার স্মৃতি থেকে আবার এটি লিখেছেন। এ কারণে অনুবাদকদের ব্যাপারে আমার এত ভক্তি। তাদের ব্যাপারটি যতটা না বুদ্ধিবৃত্তিজাত, তার চেয়ে স্বজ্ঞাত। প্রকাশকরা তাদের যা দেন, তা মর্মান্তিকভাবে তুচ্ছ, আবার তাদের কাজটি সাহিত্যকর্ম হিসেবে স্বীকৃত হতেও তারা দেখেন না। কিছু বই আছে, যা আমি স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করতে চাই; কিন্তু তাতে আমার নিজের বই লেখার সমান কাজই করতে হবে। আর যে পয়সা পাব, তাতে খেয়ে বেঁচে থাকা যাবে না।’
গ্রেগরি রাবাসা অনূদিত ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড (শতবর্ষের নির্জনতা) স্প্যানিশ ভাষার বরেণ্য লেখক গার্সিয়া মার্কেসকে বিশ্বসভায় বরেণ্য করে তোলে।
এ বছরের গোড়ার দিকে পল এলি শতবর্ষের নির্জনতার ইতিহাস প্রকাশ করেছেন। তাতে গ্রেগরি রাবাসার ভূমিকা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এলি লিখেছেন, ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউডের হারপার অ্যান্ড রাউ সংস্করণ পড়ার পর মার্কেস নিজে ঘোষণা করেছেন, এটি তার মূল স্প্যানিশের চেয়ে ভালো। তিনি রাবাসাকে আখ্যা দিয়েছেন ‘ইংরেজি ভাষায় শ্রেষ্ঠ লাতিন আমেরিকান লেখক।’
গ্রেগরি রাবাসা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের চারটি বই অনুবাদ করেছেন।
১. ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড
২. দ্য অটাম অব দ্য প্যাট্রিয়ার্ক
৩. ক্রোনিকল অব দ্য ডেথ ফোরটোল্ড
৪. লিফ স্টর্ম
রাবাসার হাতে অনূদিত হয়েছেন লাতিন আমেরিকার আরো অনেক লেখক।
দেমেলিও আগুইলেরা মাল্টা, হুয়ান বোনেট, জর্জ ফ্রাঙ্কো, হুলিও কোর্তাসার, ক্লারিস লিস্পেক্তর, লুই রাফায়েল সানচেজ, হোসে লোজম লিমা, মারিও বার্গাস ইয়োসা, ম্যাচাদো দ্য আসিস, আন্তোনিও লোবো আন্তিউনেস, ওমান লিনস ও জর্জি আমাদু।
এডিথ গ্রসম্যান, ‘ডন কিহোতে’র সুখ্যাত-অনুবাদক গ্রেগরি রাবাসাকে বলেছেন: তিনি আমাদের সবার গডফাদার।
লাতিন আমেরিকান সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যে সম্পৃক্ত করার প্রধান গেইটওয়ে রাবাসা।
লুকাস রিভেরাকে দেয়া সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, আমার ধারণা, আমার কাজ লাতিন আমেরিকায় সাহিত্যের ছাপ রাখতে পেরেছে। তিনি বিনীতভাবে কমই বলেছেন। রাবাসা একই সঙ্গে লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের একজন অভিভাবকও ছিলেন।
লাতিন আমেরিকান দেশ কিউবা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান গ্রেগরি রাবাসার জন্ম নিউইয়র্কের ইয়োঙ্কার্সে ৯ মার্চ ১৯৩২। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি ক্রিপটোগ্রাফার (সাংকেতিক ভাষার পাঠোদ্ধারকারী) হিসেবে কাজ করেছেন।
গ্র্যাজুয়েশন করেছেন ডার্টমাউথ কলেজ থেকে, ডক্টরেট কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের, দুই যুগেরও বেশি সময় সেখানেই অধ্যাপনা করেছেন। তার পর নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির কুইনস কলেজে অধ্যাপনা করেন, এখানকার ডিস্টিংগুইসড প্রফেসর ইমেরিটাস হিসেবে অবসরে যান।
ক্রিপটোগ্রাফার হিসেবে তার কাজটিও ছিল এক ধরনের অনুবাদ— দুর্বোধ্য ইংরেজি থেকে বোধগম্য ইংরেজিতে রূপান্তর। তার পর তিনি স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তার অনুবাদে হুলিও কোর্তাসারের হপসস্কচ যখন প্রকাশিত হয়, তখন তিনি অনুবাদের জন্য ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পেলেন। তার পর আরো অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। অনুবাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ‘ইফ দিস বি ট্রিজন: ট্রান্সলেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস: এ মেমোয়ার।’
ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়, রাবাসা পর্তুগিজ নিয়ে পিএইচডি কেবল শেষ করেছেন, প্রকাশনা সংস্থা প্যান্থিয়নের একজন সম্পাদক কোর্তাসারের বই স্প্যানিশ থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করতে বললেন। বইটা না পড়েই তিনি সরাসরি বসে পড়লেন অনুবাদে। কোর্তাসারের ‘রেইউয়ে লা’ প্রকাশিত হলো হপসস্কচ নামে। এর পর পরই বড় বড় লেখকের বই অনুবাদের জোর অনুরোধ আসতে শুরু হলো।
১৯৬৭ সালে মার্কেসের বিখ্যাত ‘নির্জনতার একশ বছর’ গ্রন্থটি নিয়ে যখন লাতিন আমেরিকা আলোচনায় মুখরিত, হুলিও কোর্তাসার গার্সিয়া মার্কেসকে বললেন, এ বইটি রাবাসার হাতে অনূদিত হওয়া উচিত।
রাবাসা তখন অনুরুদ্ধ হলেও কাজে বসতে রাজি হননি। ‘আমি তখন গুয়েতেমালার লেখক মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল আস্তুরিয়াসের লেখা অনুবাদ নিয়ে ব্যস্ত। কাজেই তার বই হাতে নেয়ার আগে মার্কেসকে প্রায় এক বছর অপেক্ষা করতে হয়।’
হুলিও কোর্তাসারের এ ঘটকালিতে কিছুটা দেরিতে হলেও দুজনের মিলন দুজনকেই খ্যাতিমান হতে সাহায্য করেছে। বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে দুজনই অবদান রেখেছেন।
মার্কেসের সঙ্গে তার তেমন দেখা-সাক্ষাত্ হয়নি, তবে কোর্তাসারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ‘তার সঙ্গে আমার চমত্কার মিলে গেছে তিনি একজন অনুবাদক এবং আমার মতো শিক্ষক। আমরা দুজনই জ্যাজ সংগীত পছন্দ করি, তিনি ট্রাম্পেট বাজাতেন। তিনি তার কাজে নতুন কিছুর সমাবেশ ঘটাতেন, লেখায় তার অবলোকনশক্তি ছিল প্রখর।’
রাবাসা লুকাস রিভেরাকে বলেন, ‘বার্গাস ইয়োসা ও গার্সিয়া মার্কেসের মধ্যে সাহিত্যের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় ঝগড়ায় গিয়ে নামে। ‘ইয়োসা যখন রাজনৈতিকভাবে ডানে ঝুঁকেছেন মার্কেস তখন বামে, ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে তার বন্ধুত্ব। ইয়োসা বললেন, ‘একজন লেখক যিনি ফিদেল কাস্ত্রোর মনোরঞ্জন করেন, আর বুদ্ধিবৃত্তির দোহাই দিয়ে একনায়কও তাকে ধরে রাখেন।’
মার্কেস সম্পর্কে রাবাসা বলেন, ‘এমনিতে ভীতু মানুষ, কিন্তু লেখালেখির ব্যাপার যখন আসে তিনি দুর্দান্ত সাহসী।
চল্লিশ বছর ধরে (লুকাস রিভেরার লেখাটি ২০০৩ সালের) তাকে দুটো করে কাজ করে যেতে হয়েছে। অনুবাদ কখনই তাকে তেমন অর্থের জোগান দেয়নি।
‘আজকাল অনুবাদকরা বেশ টাকা পান। এতগুলো বই থেকে আমি বড় অঙ্কের কোনো অর্থ পাইনি। এগুলো তেমন ভালো বিক্রি হয়নি। লেখকরাও তেমন বেশি কিছু পেয়েছেন বলে মনে করি না। ‘আপনি যদি মুনিঋষির জীবনযাপন করতে চান, তাহলে অনুবাদক হিসেবে যে টাকা পাবেন তা দিয়ে বাঁচতে পারবেন। তাহলে দু’বেলা দুই বাটি জাউ খেয়ে টিকে থাকতে হবে। যদি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চান, তাহলে কোনো সৌভাগ্যের বছর হয়তো কুড়ি হাজার ডলার পেতেও পারেন। আর টিকে থাকতে দিনের বেলা ইউনিভার্সিটিতে ছাত্রছাত্রী পড়ান।
মার্কেসকে নিয়ে গ্রেগরি রাবাসার একটি টেলিফোন সাক্ষাত্কার—
২০১৪ সালে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের মৃত্যুর পর পরই ৯২ বছর বয়স্ক গ্রেগরি রাবাসার একটি টেলিফোন সাক্ষাত্কার নেন ডারা লিন্ড। সাক্ষাত্কারটি অনূদিত হলো:
ডারা লিন্ড: গার্সিয়া মার্কেসের সঙ্গে আপনার প্রথম দেখা কবে?
গ্রেগরি রাবাসা: তার সঙ্গে আমার তেমন মুখোমুখি দেখা হয়নি। কারণ তিনি থাকতেন মেক্সিকোয় আর প্রচুর ভ্রমণ করতেন। তিনি যখন নিউইয়র্ক এসেছিলেন আমি তাকে দেখেছি। আর তা ছিল খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। তবে অনুবাদের ব্যাপারে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে। আর হুলিও কোর্তাসারের মাধ্যমে আমাদের খবর আনা-নেয়া চলেছে, তার সঙ্গে আমার খুব জানাশোনা ছিল। তবে গাবোর সঙ্গে আমার তেমন ব্যক্তিগত যোগাযোগ হয়নি।
লিন্ড: তার লেখা পড়ে তার সম্পর্কে আপনার যে ধারণা হয়েছে তার সঙ্গে সাক্ষাতে কি সে ধারণা অটুট রয়েছে?
রাবাসা: আমি জানতাম তিনি একজন অমায়িক মানুষ, তিনি আসলেই তাই, উষ্ণ-হূদয় মানুষ। তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে শেষবার আসতে সমর্থ হন তখন দেখা, কিউবার ফিদেলের (কাস্ত্রো) সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে স্টেট ডিপার্টমেন্ট তার ওপর খুব নাখোশ ছিল।
লিন্ড: আপনাদের যোগাযোগের ভাষায় আপনি কোন ভাষা ব্যবহার করতেন?
রাবাসা: আমি স্প্যানিশে লিখতাম, কারণ তার ইংরেজি জ্ঞান কেমন সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু আমি মনে করি ইংরেজি সম্পর্কে যে ধারণা তিনি দিয়েছেন, ইংরেজিতে তিনি তার চেয়ে ভালো।
লিন্ড: আপনি কি কলম্বিয়া গিয়েছেন?
রাবাসা: আমি তার জন্মস্থানে যাইনি। তবে তার বিশেষ পরিচিত কারতেহেনায় গিয়েছি, বোগোটায় গিয়েছি। সেখানে গাবোর কজন বন্ধুর সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেখানে আমাদের দুজনেরই কিছু কমন বন্ধু আছে। অবশ্য তা অনেক আগের কথা, কুড়ি বছর তো হবেই।
লিন্ড: তার মানে গাবোর লেখা অনুবাদ করার পরের কথা বলছেন।
রাবাসা: হ্যাঁ।
লিন্ড: আপনি যা অনুবাদ করেছেন, সেখানে শরীরের গিয়ে কোনো মিল পেয়েছেন? অথবা ওই ভ্রমণ গার্সিয়া মার্কেসের লেখার ওপর নতুন করে কোনো আলোকপাত করেছে?
রাবাসা: আমার চেনা লাতিন আমেরিকান অন্যান্য দেশের চেয়ে কলম্বিয়াকে তেমন আলাদা কিছু মনে হয়নি। আপনি যদি হিস্পানিক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে থাকেন, আপনি প্রায় সব দেশেই তার দেখা পাবেন। এখানে-ওখানে ভৌগোলিক ভিন্নতা রয়েছে, তবে সেটা আঞ্চলিক, কলম্বিয়ায় অদ্ভুত তেমন কিছু নেই। এই কাহিনীর ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলায় ঘটতে পারত, মেক্সিকোতেও ঘটতে পারত।
লিন্ড: যারা বলেন গার্সিয়া মার্কেস সম্পূর্ণভাবে কলম্বিয়ান লেখক, আপনি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন?
রাবাসা: ওহ্ তা অবশ্যই। তিনি বৈশ্বিক। তিনি আমাকে সার্ভেন্তেসের কথা মনে করিয়ে দেন। কিহোতে সম্পূর্ণ স্প্যানিশ। কিন্তু একই সঙ্গে বিশ্বজনের।
লিন্ড: অভিযোগ জানিয়ে কিংবা সংশোধনের জন্য গাবো কি কখনো আপনাকে লিখেছেন?
রাবাসা: তা নয়। আসলে তিনি বলেছেন ওটা (ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড) বরং ইংরেজিতেই ভালো। আমি তার কথাকে ইংরেজি ভাষার জন্য প্রসংসা হিসেবে গ্রহণ করেছি। বইটা তার ইংরেজিতেই লেখা উচিত ছিল।
লিন্ড: আপনি যখন গার্সিয়া মার্কেসের শেষ দিককার লেখাগুলো পড়েন তখন কি ইংরেজি অনুবাদ পড়েন, না মূল স্প্যানিশ পড়েন?
রাবাসা: আমি স্প্যানিশে পড়ি, ইংরেজি অনুবাদও দেখি। এডিথ গ্রসম্যান (গার্সিয়া মার্কেসের শেষ দিককার লেখাগুলোর অনুবাদক) ভালো কাজ করেছেন।
লিন্ড: তার স্টাইল এবং আপনার স্টাইলে তেমন কোনো পার্থক্য রয়েছে কি?
রাবাসা: সম্ভবত সুরে আমার একটি গীতিময় প্রবণতা রয়েছে, কিছুটা অভিযান-প্রিয়তাও রয়েছে। এছাড়া আমি সবসময় চাই মূল লেখা আমাকে পরিচালিত করুক— পার্থক্য বলা কঠিন। আমার সামনে স্প্যানিশ বই রেখে আমি পাতার পর পাতা তুলনা করিনি। এটা ঠিকও না। সে কাজটা আমি প্রফেসর হরেন্ডোর জন্য রেখে দিলাম। (উকুন বেছে কেতাব ধরে সমালোচনা করেন যারা, রাবাসা তাদের ডাকেন প্রফেসর হরেন্ডো)।
লিন্ড: গার্সিয়া মার্কেসের আর কোনো কাজের অনুবাদ পড়তে গিয়ে কি আপনার মনে হয়েছে অনুবাদটা আপনি করলে ভালো হতো কিংবা কোনো লেখা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এটা আপনার হাতে অনূদিত হওয়া উচিত?
রাবাসা: আমি আসলে আলসে। আমি আনন্দিত যে, অন্যরা কাজটা করেছে। যে অনুবাদক বলবেন, ভালো করে পড়বেন তার ভয়ঙ্কর সমস্যাও হয়। হঠাত্ এদিকে একটি বাগধারা অনুবাদ করবেন, অন্যদিকে আরেকটি— এটা গতিকে শ্লথ করে দেয়। ভাষাকে আপনার পৃথক করে ফেলতে হবে, যেমন আমি ফরাসি পড়ছি। আমি ফরাসি পড়ে যতটা এগোবো, ইংরেজি অনুবাদে তত নয়। তাই পড়তে পড়তে অনুবাদ বড্ড বেশি পণ্ডিতি করার।
লিন্ড: কিন্তু আপনি বলেছেন অনুবাদ পড়ার সময় পেছনে মূল ভাষা ওতপেতে থাকে।
রাবাসা: আমি কখনো কখনো এটা অবুভব করি। কিন্তু এতে নাক গলাতে পারি না। যদি একটি স্প্যানিশ বাগধারাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয় আমি অনুভব করতে পারি অনূদিত অংশ স্প্যানিশ বাগধারা থেকে ভিন্ন। ব্যকরণের একটা প্রভাব থাকতে পারে, আংশিক। স্প্যানিশ ব্যাকরণ ইংরেজি করা হলে এটাকে সেকেলে মনে হবে।
আসলে আমার একটি অলীক প্রকল্প রয়েছে, আমি ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড’কে ভার্জিলের পঞ্চপদী কবিতায় অনুবাদ করতে চাই এবং লাতিন মহাকাব্যে পরিণত করতে চাই। বোর্হেস সেটাই পছন্দ করতেন।
লিন্ড: আপনি কখনো অনুবাদকে সংগীতের সঙ্গে, কখনো অভিনয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আপনি যখন গাবোকে অনুবাদ করছিলেন এটা কোনো রূপকালঙ্কারের মতো মনে হয়েছে?
রাবাসা: সবচেয়ে শক্তিশালী রূপক হবে অভিনয়। আপনি একটি ভূমিকায় অভিনয় করছেন। আপনি যখন শেক্সপিয়ার অনুবাদ করেন কোনো না কোনোভাবে আপনি শেক্সপিয়ার, কারণ আপনি তার রচিত পঙিক্তগুলোকে প্রকাশ করছেন, আবার একই সঙ্গে হ্যামলেটের ভূমিকাও পালন করছেন। উপন্যাসের অনুবাদ অভিনয়ের সবচেয়ে কাছাকাছি, কারণ আপনি লেখকের কথাগুলো বলছেন— কিন্তু তার তো চরিত্রও রয়েছে।
ব্যাপারটা অনেকটা অভিনয়ের মুডে থেকে শব্দ বাছাই করা। কখনো নিজেকে প্রস্তুত না করেই কাজটা সারতে হয়। কিছু বিষয় আছে, যা সরাসরি করা যায় না— যদি সঠিকভাবে অনুবাদ করার পরও মনে হয় ঠিকভাবে প্রকাশ করা হলো না, তাহলে অনুবাদকের নিজের শব্দ যোগ করতে হয়।
লিন্ড: মার্কেস নিয়ে আর কিছু?
রাকাসা: আমি যদি তাকে ব্যক্তিগতভাবে আরো ভালো করে চিনতাম! সেই যোগাযোগ আমার ছিল না। বিভিন্ন উপলক্ষে চিঠিপত্র চালাচালি হতো। হুলিও কোর্তাসারের মতো আমি আমার লেখকদের কাউকে কাউকে চিনি, আমার মনে হয়েছে গ্যাবো একজন ভালো মানুষ।
সুসান বারনভস্কির নেয়া সাক্ষাত্কারের অংশ—
১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ সুসান বারনভস্কি গ্রেগরি রাবাসাকে তার আপার ইস্ট সাইট অ্যাপার্টমেন্টে সাক্ষাত্কারটি নেন।
সুসান: আমি আপনার অনুবাদ পড়ে বড় হয়েছি, আমার বয়স যখন ষোলো তখন থেকেই আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি খুব খুশি আপনি স্মৃতিকথা লিখেছেন— কাহিনীগুলো পাঠ করা আনন্দময় অভিজ্ঞতা।
রাবাসা: অদ্ভুত ব্যাপার, এটা (ইফ দিজ বি ট্রিজন: ট্র্যান্সলেশন অ্যান্ড ইটস ডিসকনটেন্টস) স্মৃতিকথা নয়। ওরা আমাকে বলল, ‘আপনি কি অনুবাদ নিয়ে একটি বই লিখে দেবেন?’ কাজেই আমার অভিজ্ঞতা ও অনুবাদ নিয়ে আমার ভাবনা মিলিয়ে বইটা লিখে ফেললাম। কিন্তু স্মৃতিকথা হিসেবে বেশ বিক্রি হচ্ছে এবং একে স্মৃতিকথাই বলছে, আর আমি একটি পুরস্কারও পেয়ে গেছি।
সুসান : এটা কি অনুবাদ নিয়ে স্মৃতিকথা নয়?
রাবাসা : আমি এটা পরে বুঝতে পেরেছি। আসলে আমি চাইছি, বইটি তত্ত্বকথার হোক।
সুসান: সাহিত্যতত্ত্ব কি আপনার কাছে কোনো মজার বিষয় নয়?
রাবাসা: না। কাজটা অসাহিত্যিকসুলভ, অশিল্পীসুলভ।
সুসান: কেবল অনুবাদের ওপর নির্ভর করে আপনি কি কখনো জীবন
ধারণ করেছেন? এটা কি আপনার পক্ষে সম্ভব ছিল?
রাবাসা: না। যদি এটাকে সত্যিকারের জীবনধারণ বলতে চান, তাহলে সম্ভব নয়। আমাকে এর বাইরের কিছু ধরতে হতো। নতুবা আমাকে লড়াই করে যেতে হতো। কিন্তু আমি সে ধরনের নই। আমি সর্বান্তকরণ লড়াকু হতে পারিনি।
সুসান: অনুবাদের জন্য আপনি কখন সম্মানী পেতে শুরু করেন?
রাবাসা: ঠিক মনে নেই। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যা-ই পেয়েছি তা এমন বেশি কিছু নয়— আমার জন্য বাড়তি এক কাপ কফি। সে সময় একটি কাজের সম্মানী আমার পছন্দ হয়েছিল মাচাদো দ্য আসিসের অনুবাদ। কারণ তিনি তখন মৃত! আমি নিজেই মাচাদো। তখন যে রয়্যালটি পেয়েছি, আজকের তুলনায় চেকটি ছোট হলেও খুশি হয়েছি।




