তোমার বিচিত্র এ ভবসংসারে কর্মপারাবারপারে হে—

নিখিল ভুবনলোকের মাঝারে দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে।

তোমার এ ভবে মম কর্ম যবে সমাপন হবে হে,

ওগো রাজরাজ, একাকী নীরবে দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে

—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৪০৪: ৮১)

 

আলমগীর কবিরের এই রচনা সংগ্রহ প্রকাশে যাঁহারা উদ্যোগী হইয়াছেন তাঁহাদের সহিত আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক। মানে তাঁহাদের ‘না’ বলিবার অধিকার আমার নাই। আজ হইতে অন্তত বছর দুই আগে উঁহারা আমাকে বলিয়া রাখিয়াছিলেন আমাকে এই পুস্তকের একপ্রস্ত ‘ভূমিকা’ লিখিতে হইবে। এতদিন না লিখিয়া মনে হয় একটা অপরাধই করিয়াছি। না করিয়া হয়ত আমার অন্য উপায়ও ছিল না। যদি বলি সময়ের অভাব তবে কথাটা সত্য হইবে না— এতদিন লেখার সাহস হয় নাই আমার বিদ্যায় কুলায় নাই বলিয়া।

চারিদিকে খোঁজখবর করিয়া দেখিলাম, আজ পর্যন্ত আলমগীর কবিরের একটা মামুলি জীবনীর বইও কেহ বড় লেখেন নাই। সত্য বলিতে আমাদের হাতে ধরা রচনা সংগ্রহের এই প্রথম খ্লটিই আলমগীর কবিরের জীবন সম্পর্কে আপাতত আমার জ্ঞানের একমাত্র আকর। সান্ত্বনার কথা, সম্প্রতি সহজলভ্য কিছু কিছু স্মৃতিকথা কিংবা রোজনামচায় তাঁহার জীবন বিষয়ে সামান্য নতুন তথ্য পাওয়া যাইতেছে। এই অবস্থায় আমি যাহা লিখিলাম তাহা ঠিক ভূমিকা হইল না, হইল বড়জোর জোড়কর প্রার্থনা।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একদা লিখিয়াছিলেন, ‘কবির কবিত্ব বুঝিয়া লাভ আছে, সন্দেহ নাই, কিন্তু কবিত্ব অপেক্ষা কবিকে বুঝিতে পারিলে আরও গুরুতর লাভ।’ কথাটি আলাদা করিয়া শুনিলে মিছা মনে হইবে না। কিন্তু বাংলায় আরো একটা কথা আছে: ‘সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর।’ বঙ্কিমচন্দ্রও বিস্তর কহিয়াছেন। যেমন:

কবিতা দর্পণ মাত্র— তাহার ভিতর কবির অবিকল ছায়া আছে। দর্পণ বুঝিয়া কি হইবে? ভিতরে যাহার ছায়া, ছায়া দেখিয়া তাহাকে বুঝিব। কবিতা, কবির কীর্ত্তি— তাহা ত আমাদের হাতেই আছে— পড়িলেই বুঝিব। কিন্তু যিনি এই কীর্ত্তি রাখিয়া গিয়াছেন, তিনি কি গুণে, কি প্রকারে, এই কীর্ত্তি রাখিয়া গেলেন, তাহাই বুঝিতে হইবে। (বঙ্কিমচন্দ্র ১৪০৯: ৭৮১)

একটু ভাবিয়া দেখিলেই বোঝা যাইবে, বঙ্কিমচন্দ্রের কথায় কোথায় জানি একটা গোলও বাধিয়াছে। ‘কবিতা দর্পণ মাত্র’— কথাটা তো মাত্র অর্ধসত্য। কবিতার মধ্যে ‘দর্প’ অর্থাৎ ‘আমি’ পদার্থটা প্রথম ফুটিয়া ওঠে— এ কথা মোটেও মিছা নহে। তবে দর্পণের ভিতর কবির যে ছায়া আছে তাহা কি ‘অবিকল’? দর্পণ সমতল না হইলে ছবি তো আঁকাবাঁকা দেখাইবে। আর সমতল হইলেও সবকিছু দেখাইবে উল্টা— বামকে ডান আর ডানকে বাম। দর্পণের ভিতর আমাদের ভাষার অক্ষরাদি দেখিলে ইহা আরো স্পষ্ট হয়।

সুখের মধ্যে, বঙ্কিমচন্দ্রের অনেক কথাই আবার ফেলনা নহে। আপনকার আগের যুগের মনীষী ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রসঙ্গে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন তাহা মোটের উপর হক কথাই। বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়াছিলেন, ‘স্থূল কথা [তাঁহার] কবিতার অপেক্ষা তিনি অনেক বড় ছিলেন। তাঁহার প্রকৃত পরিচয় তাঁহার কবিতায় নাই। যাঁহারা বিশেষ প্রতিভাশালী [তাঁহারা] প্রায় আপন সময়ের অগ্রবর্ত্তী। ঈশ্বর গুপ্ত আপন সময়ের অগ্রবর্ত্তী ছিলেন।’ (বঙ্কিমচন্দ্র ১৪০৯: ৭৮৫)

সবিনয় নিবেদন করি, বঙ্কিমচন্দ্রের এই কথাটি আলমগীর কবিরের ক্ষেত্রেও খাটিবে। কবিরও আপন সময়ের অপেক্ষা আগাইয়া ছিলেন। এই সত্যের তিনটা উদাহরণ দিয়া আমাকে এই ভূমিকা শেষ করিতে হইবে। প্রথম আসিবে আলমগীর কবিরের দেশবাৎসল্যের কথা। আজিকালি ইহাকেই বলা হয় ‘দেশপ্রেম’। এই বাসনাই কবিরকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে টানিয়া লইয়াছিল। তাঁহার দোসরা বাসনার নাম চলচ্চিত্র। কবিরের জীবনে এই বাসনার উৎসারণ ঘটে তিন চেহারায়— চলচ্চিত্র বিচার, চলচ্চিত্র সংসদ গঠন এবং চলচ্চিত্র উৎপাদন এই সকল পরিচয়ে। জীবনের শেষ দিন অবধি তিনি এই অবিকল বাসনার পিছনেই ছুটিতেছিলেন।

পরিশেষে আমি তাঁহার অন্য একটি বাসনার কথা বলিব— বেহতর শব্দের অভাবে যাহার নাম ‘রাজনীতি’ই রাখিতে হইবে। কবির নিজে এই বাসনার নাম দিয়াছিলেন ‘বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্য’। তাঁহার এই বাসনা অপূর্ণ থাকিয়া গিয়াছিল। মুক্তিযুদ্ধ হইতে ফিরিবার দশ বছরের মাথায় তিনি যে বলিতে বাধ্য হইয়াছিলেন, ‘[আমি তখন] মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বুঝতে পারিনি’— তাহা এই সত্যেরই প্রমাণ বৈ নহে। (কবির ২০১৮: ২০২)

আলমগীর কবিরের কোন বাসনাই শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয় নাই। হয়ত অচরিতার্থতাই বাসনার পরম ধর্ম। তাঁহার ‘অবিশ্বাস্য তিরোধানে’র প্রায় তিরিশ বছর পর এই রচনা সংগ্রহ সেই অচরিতার্থ বাসনারই নবরূপায়ণ বিশেষ— মোটেও পরিপূরণ নহে।

১

আলমগীর কবির গত হইয়াছেন আজ মোটের উপর তিরিশ বছর হইতে চলিল। ভাবিতে অবাক লাগে, মাত্র পঞ্চাশ বছরের আয়ু লইয়া এই দুনিয়ায় আসিয়াছিলেন তিনি। তাঁহার অকালমৃত্যুর দুঃসংবাদটি আমার কানে পৌঁছিয়াছিল যেদিন— ২০ জানুয়ারি ১৯৮৯— সেদিন বড়ই বিমর্ষ হইয়াছিলাম। মনে হইয়াছিল যেন কোন পরমাত্মীয় হারাইয়াছি। কেন এমন হইয়াছিল আজ আর বলিতে পারিব না। বিদেশে বসবাস করিতেছিলাম বলিয়াই বোধ হয়, কেহ না কেহ তাঁহাকে হত্যা করে নাই— কথাটা মন কিছুতেই বিশ্বাস করিতে চাহে নাই সেদিন। এ দেশের লোকসাধারণ তখনো হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ সাহেবের আধা-সামরিক রাজত্বে বসবাস করিতেছিলেন। হয়ত সে কারণেই মনে হইয়াছিল এহেন মৃত্যু মাত্র দুর্ঘটনার ফল হইতে পারে না।

অথচ আলমগীর কবিরের সহিত জীবনে মেলামেশা বিশেষ করিয়াছি এমনও নহে। ব্যতিক্রমের মধ্যে একদিন ধানমন্ডি হ্রদের পূর্ব পাড়ে স্থিত সেকালের সোবিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে একটি আলোচনা সভায় তাঁহার বক্তৃতা শুনিয়াছিলাম। সভার বিষয় স্থির হইয়াছিল সত্যজিৎ রায়— বিশেষ তাঁহার সদ্যোজাত কাহিনীচিত্র ‘ঘরে-বাইরে’ (১৯৮৪)। মনে পড়ে ঐ সভায় সভাপতির আসনে অলংকার হইয়াছিলেন আলমগীর কবির। আর মনে পড়ে তিনি সত্যজিৎ রায়ের গুণপনা গান করিতেছিলেন। সেদিন— অন্তত নাদান আমার বিচারে— মাত্রার তুলনায় একটুখানি বেশিই গাহিয়াছিলেন তিনি। যতদূর মনে পড়ে আমি একটু অন্য সুর ধরিয়াছিলাম। ফলে তাঁহার সহিত আমার উল্লেখ করিবার মতন একমাত্র মধুর স্মৃতিটিও শেষ পর্যন্ত আর মধুর থাকিল না। বছর পাঁচ না যাইতেই একদিন শুনিলাম আলমগীর কবির আর এই জগতে নাই।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র কায়েম হইবার পরপর আলমগীর কবির কাহিনীচিত্র নির্মাণে— অর্থাৎ যাহাকে তিনি বলিতেন ‘চিত্রব্যবসায়’ তাহাতেই— হাত দিয়াছিলেন। অন্য দশ জনের মত আমিও তাঁহার যে ছবিটি প্রথম দুই চোখে দেখিলাম তাহার নাম ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (১৯৭৩)। এই ছবি প্রসঙ্গেই আট বছর পর তিনি বলিতেছিলেন:

আমার সামনে সমস্যা ছিল যে ছবি তৈরির আগে দীর্ঘদিন আমি সমালোচনা লিখেছি। সেসব সমালোচনায় আমি প্রচলিত যে ফর্মকে আঘাত করেছি, সেই ফর্মে আমার পক্ষে ছবি তৈরি সম্ভব ছিল না। তাই ‘ধীরে বহে মেঘনা’কে আমি সিনেমাটিক কোলাজ হিশেবে তৈরি করি। এ ছবির সমস্ত ঘটনাই ছিল বাস্তব থেকে নেয়া। আমার মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল বলেই এ ছবিটি আমি বানাই। অথচ এর পরে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর কোন ছবি বানাইনি। আমি পরিষ্কার বলতে পারি, এর কারণ ছিল [আমি তখন] মুক্তিযুদ্ধকে ঠিক বুঝতে পারিনি। কেননা আমি জানতাম সত্য এক জিনিশ এবং বাস্তব আরেক জিনিশ। আমি বুঝতে পারিনি মুক্তিযুদ্ধে কে ভিলেন এবং কে নায়ক। আমি বুঝতে পারিনি কে দালাল এবং কে প্রকৃত মুক্তিকামী। তখন [স্বল্প] সময়ের ব্যবধানে আমি এসব বুঝতে পারিনি। (কবির ২০১৮: ২০২)

মুক্তিযুদ্ধকে সঠিক ‘বুঝতে’ না পারিলেও তিনি যুদ্ধে গিয়াছিলেন— এ কথা ধ্রুব। তাঁহার প্রস্তুতিও ছিল দীর্ঘ। তিনি বিলাতে বসিয়া দীর্ঘদিন চলচ্চিত্রে ‘পদ্ধতিগত শিক্ষা’ও লাভ করিয়াছিলেন। তবে কিনা গোড়াতেই তাঁহাকে একটা গলদের কবলে পড়িতে হইয়াছিল। গলদটিকেও বেশ মজারই বলিতে হইবে। ১৯৮১ সালের এক নিবন্ধে ঘটনাটা এভাবেই বিশদ করিয়াছেন কবির:

১৯৬৬ সালে দেশে ফেরার পর থেকেই মনে মনে একটা গোপন ইচ্ছা ছিল— ছবি বানাব। কিন্তু কিছু কড়া চিত্রসমালোচনা লিখে চিত্রব্যবসায়ীদের এমন ক্ষেপিয়ে দিলাম যে আমাকে এফডিসিতে ঢোকার সময় সাবধান হয়ে ঢুকতে হয়, পাছে কেউ অতর্কিত আক্রমণ চালায়! (কবির ২০১৮: ২২)

কবিরের প্রথম গুণ— আমরা আগেই বলিয়াছি— তাঁহার ‘দেশবাৎসল্য’। জিনিশটা তখন নতুন ছিল না। উনিশ শতকের শেষ পঞ্চকে— ইংরেজি ১৮৮৫ সাল নাগাদ— বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছিলেন, ‘বাৎসল্য পরমধর্ম্ম, কিন্তু এ ধর্ম্ম অনেক দিন হইতে বাঙ্গালা দেশের ছিল না। কখনও ছিল কি না বলিতে পারি না। এখন ইহা সাধারণ হইতেছে, দেখিয়া আনন্দ হয়, কিন্তু ঈশ্বর গুপ্তের সময়ে, ইহা বড়ই বিরল ছিল। তখনকার লোকে আপন আপন সমাজ, আপন আপন জাতি, বা আপন আপন ধর্ম্মকে ভালবাসিত, ইহা দেশবাৎসল্যের ন্যায় উদার নহে— অনেক নিকৃষ্ট।’ (বঙ্কিমচন্দ্র ১৪০৯: ৭৮৫)

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের দেশবাৎসল্য পদার্থটা কি রকম ছিল তাহা বুঝাইবার নিমিত্ত বঙ্কিমচন্দ্র একটা সুন্দর তুলনাও কাটিয়াছিলেন। বঙ্কিমের কথায়:

মহাত্মা রামমোহন রায়ের কথা ছাড়িয়া দিয়া রামগোপাল ঘোষ [আর] হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বাঙ্গালা দেশে দেশবাৎসল্যের প্রথম নেতা বলা যাইতে পারে। ঈশ্বর গুপ্তের দেশবাৎসল্য তাঁহাদের মত ফলপ্রদ না হইয়াও তাঁহাদের অপেক্ষাও তীব্র ও বিশুদ্ধ। (বঙ্কিমচন্দ্র ১৪০৯: ৭৮৫-৮৬)

প্রমাণ ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কয়েক ছত্র। বঙ্কিমচন্দ্র ভরসা করিয়াছিলেন এই কয় ছত্র পদ্য ‘সকল পাঠকই মুখস্ত করিবেন’। সুখের মধ্যে, তাঁহার এই ভরসা বৃথা গমন করে নাই।

 

ভ্রাতৃভাব ভাবি মনে,                   দেখ দেশবাসিগণে,

            প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া।

কতরূপ স্নেহ করি,                     দেশের কুকুর ধরি,

            বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া

                                    (ঊদ্ধৃত, বঙ্কিমচন্দ্র ১৪০৯: ৭৮৬)

চিত্রসমালোচনার পর কাহিনীচিত্র তৈয়ার— এই দুইয়ের আগে কবির ‘দেশবাৎসল্য’ ব্রতেই ব্রতী হইয়াছিলেন। বলা বাহুল্য এই ব্রতে তিনি দীক্ষিত হইয়াছিলেন বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অন্য অনেকেরই অনেক আগে। কিভাবে কিংবা কি কারণে, তাহার অনেক তথ্য আজও আমাদের অজানা। যতদূর জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ একপ্রকার চুকাইয়া তিনি ১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৫৬ কি ১৯৫৯ সালে) লন্ডন নগরে স্থিত হইয়াছিলেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র যাহার নাম দিয়াছিলেন ‘দেশবাৎসল্য’ হয়ত তাহার প্রকোপই আলমগীর কবিরকেও এক জায়গায় বেশিদিন স্থির থাকিতে দেয় নাই।

কবির ততদিনে বিলাতদেশে কয়েক বছর কাটাইয়া সরফরাজ হইয়াছেন। এমন সময় লন্ডন নগরের ‘দি টাইমস’ পত্রিকার সম্পাদকীয় স্তম্ভে একটি নিবন্ধ পড়িয়া স্তম্ভিত হইলেন তিনি। নিবন্ধের বিষয় ‘পশ্চিম পাকিস্তান দ্বারা পূর্ব বাংলার নির্দয় শোষণের ইতিহাস’। ‘সম্পাদকীয়টির উপসংহারে বলা হল, কবির লিখিয়াছেন, ‘পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত যদি দেশের সমস্ত সম্পদ পূর্ব বাংলার উন্নয়নে ব্যয় করা হয়, তাহলেও দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক সমতা আসবে না। এবং পূর্বাঞ্চলে সমস্ত কেন, অর্ধেক সম্পদও ব্যয় করার ইচ্ছে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকারের নেই।’ (কবির ২০১৮: ৭)

চিত্রব্যবসায়ে না নামিয়া আলমগীর কবির— ধরা যাউক— ইতিহাস ব্যবসায়েই নামিয়াছেন। তাহাতেও বোধ হয় তিনি খুব একটা মন্দ করিতেন না। তিনি ছিলেন যাহাকে বলে রীতিমত প্রতিভাবান লোক— উনবিংশ শতাব্দীর বুলিতে ‘ধুরন্ধর’ শ্রেণির। মাত্র দুই বাক্যে ১৯৭১ সালের ইতিহাস লিখিতে সক্ষম যিনি, ইতিহাসকার পরিচয়েই বা তিনি খুব কম যাইবেন কেন! কবির ১৯৮১ নাগাদ লিখিলেন, ‘১৯৬৬ সাল থেকে জাতীয় জীবনে সূচিত হল স্বাধীনতার প্রসব বেদনা— অর্থাৎ স্বাধিকার আন্দোলনের দ্বিতীয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়। ১৯৭১ সালে লাখো মানুষের শোণিতে রঞ্জিত হয়ে স্বাধীনতার সূর্য এ দেশের আকাশ-বাতাস-মাঠে ছড়িয়ে দিল হলুদের আবির।’ (কবির ২০১৮: ৫৮)

এই সহজ কথাটি এমন সহজ করিয়া তিনি বলিতে পারিলেন কি কারণে? আমি গত দুই বছর ধরিয়া বহুবার একা একা নিজেকে এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করিয়াছি। উত্তরের জন্য আমাকে অধিক দক্ষিণে যাইতে হয় নাই। মাত্র ১৯৭২ সালের ৩ আগস্ট তারিখের ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পর্যন্ত পৌঁছিতেই কাজ হইল। ঐদিন কবির কহিতেছিলেন: ‘আমি বিলেতে পদার্থবিজ্ঞান পড়তে যাই। পরে প্রকৌশলী হবার ইচ্ছে হয় এবং তাই পড়ি। শেষ পর্যন্ত ম্যাথম্যাটিকস পড়ি। সে সময় একটা বিলেতি ফার্মে বিশেষজ্ঞ হিশেবে বেশ বড় চাকরি পাই।’ (কবির ২০১৮: ২১৬)

এইটুকু মাত্র পড়িলে আর দশ মামুলি প্রকৌশলী কি পদার্থবিজ্ঞানীর সহিত কবিরের ভেদনির্ণয় কঠিন হইবে। তাঁহার দেশবাৎসল্যের কথা আগেই বলিয়াছি। তাঁহার দ্বিতীয় গুণ চলচ্চিত্র বাসনা। ইহার কথা একটু পরে বলিব। সংক্ষেপে বলিতে চলচ্চিত্র পদার্থটাই তাঁহার দ্বিতীয় প্রকৃতি হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তাহাও আবার ঠিক একদিনে হয় নাই। ১৯৮৪ সালের এক সাক্ষাত্কারযোগে কবির প্রাঞ্জল হইয়াছিলেন এইভাবে: ‘১৯৫৯ থেকে ১৯৭১— দীর্ঘ এই সময়টাই আমার জীবনে চলচ্চিত্রে আগমনের পটভূমি হিশেবে কাজ করেছে।’ (কবির ২০১৮: ২৪৫)

ঘোড়ার মুখে আর একটু শোনা যাক: ‘তখন সুইডেনের ‘দি সেভেন্থ সিল’ (১৯৫৭) ছবিটি দেখি। দেখে সেদিন প্রথম অনুভব করলাম যে চলচ্চিত্র কি প্রচ্ল শক্তিশালী এবং সম্ভাবনাময় একটা মিডিয়াম! ভীষণভাবে আলোড়িত হই, আকৃষ্ট হই। চাকরি ছেড়ে দেই। বন্ধুবান্ধবের পরামর্শে লন্ডনস্থ একটা একাডেমিতে সিনেমার থিয়োরির উপর একটা কোর্স করি। সেখানে সিনেমা সম্বন্ধে, বিশেষ করে নির্মাণের ব্যাপারে, কিছুটা ধারণা জন্ম নেয়।’ (কবির ২০১৮: ২১৬)

২

আলমগীর কবিরের তিন নম্বর গুণ— নাকি বলিব তাঁহার বাসনা— বিপ্লবী রাজনীতি। তিনি এই রাজনীতিরই নাম রাখিয়াছেন ‘বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্য’। তখন আলজেরিয়ার মুক্তিযুদ্ধ শেষ পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে। কবিরের জবানেই কথাটি শুনিতেছি: ‘এসময় বিপ্লবী কর্মচাঞ্চল্যে জড়িয়ে পড়ি। আমি [এফএলএনের] সদস্য হই। প্যালেস্টাইন লিবারেশনে সাহায্য করতে উদ্যোগী হই। এরই সূত্রে বহু বিপ্লবীর সংস্পর্শে আসি। তবে আহমেদ বেন বেল্লা এবং ফিদেল কাস্ত্রোর কথাই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে।’ (কবির ২০১৮: ২১৬)

মনে রাখিলে ভাল হয়, এফএলএন মানে দাঁড়ায় আলজেরিয়ার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট। এই ফ্রন্টের ফরাশি নামের তিন আদ্যাক্ষর লইয়া এই নাম। একবার তিনি ফরাশিদেশের সহিত যেখানে সুইৎসারদেশের সীমান্ত সেখানে আরো কয়েকজনের সহিত— যাহাকে বলে সদলবলে— ধরা পড়িয়াছিলেন। তাঁহার সঙ্গে কিছু গোপন দলিলপত্র ছিল। তাঁহার তিন সঙ্গীকে মৃত্যুদ্ল দেওয়া হইলেও তিনি শেষমেশ অলৌকিক অনুগ্রহে বাঁচিয়া গিয়াছিলেন। তাঁহাকে লঘু কারাদ্লমত দেওয়া হইয়াছিল। কারাগার হইতে ছাড়া পাইয়া তিনি লন্ডন ফিরিয়া গেলেন। ১৯৭২ সালের ৩ আগস্ট তারিখের ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় তিনি পরবর্তী কর্মচাঞ্চল্যের সংক্ষিপ্তসারটা এভাবেই দিয়াছিলেন:

তখন ১৯৬৩ সনের দিকে আমরা কয়েকজন একটা গোপন সংগঠন করি, নাম ‘ইস্ট বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট’। আমরা কয়েকজন মিলে আমাদের বক্তব্য প্রচারের দায়িত্ব নেই। সেখানে দুটো পত্রিকা— একটি ইংরেজি ‘এশিয়ান টাইড’ এবং একটি বাংলা ‘পূর্ব বাংলা’ নামে দুটো প্রচারপত্র— বের করি। নিজেরাই বিক্রি করতাম। তখন সংগঠন একটু ব্যাপক ভিত্তিতে এবং নতুন পরিকল্পনার মাধ্যমে করি। সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। ওখানেই হালকা অস্ত্র চালাতে শিখে নেই। নাশকতামূলক কাজের জন্য ট্রেনিং নেই, প্রয়োজনীয় কনটাক্ট স্থাপনের চেষ্টা করি। (কবির ২০১৮: ২১৭)

১৯৬৬ সালের গোড়ার দিকে আলমগীর কবির বাংলাদেশে ফিরিয়া আসিলেন। তাঁহার পরিকল্পনা পদ্ধতি ও চিন্তাধারার কথা শুনিয়া এ দেশের বুনিয়াদি বামপন্থার নেতারা ঠিক অবাক হইলেন না, তাঁহারা তো হাসিয়াই খুন। তাঁহারা বলিলেন, ‘এসব ছেলেমানুষি রোমাঞ্চকর ভাবনা দিয়ে দেশের কিছু আসবে যাবে না।’ আলমগীর কবির তখনো দিবাভাগে সশস্ত্র সংগ্রামের স্বপ্নই দেখিতেছেন। ১৯৭২ সালে বসিয়া তিনি স্মরণ করিতেছেন, ১৯৬৬ সালেই ছোটখাট ‘আর্মড ইনসারেকশন’ শুরু করিবার ক্ষমতা তাঁহাদের ক্ষুদে বিপ্লবী দলের ছিল।

১৯৬৬ সালে আলমগীর কবিরের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা তাঁহার দলের কোন ভূমিকা ছিল না। এই সত্যের প্রমাণ স্বয়ং শেখ সাহেবের ‘কারাগারের রোজনামচা’ হইতে পাওয়া যায়। তাহাতে রসিকতারও টান পড়ে নাই। ১৯৬৬ সালের ৬ আগস্ট নাগাদ শেখ সাহেব লিখিতেছেন:

সন্ধ্যায় আরও দুই ভদ্রলোককে জেলে আনল, একজনকে সন্ধ্যার পূর্বে, আর একজনকে তালাবন্ধ করার পরে। তাদেরও পুরানা ২০ সেলের ৪ নম্বর ব্লকে রাখা হয়েছে। খবর নিয়ে জানলাম একজনের নাম ফজলে আলী, তিন মাস পূর্বে চার্টার্ড একাউনটেন্ট হয়ে বিলাত থেকে এসেছেন। আর-একজন আলমগীর কবির, ন’মাস [হিশাব কষিলে প্রকৃতপক্ষে সাত মাস] পূর্বে বিলাত থেকে এসেছেন— সাংবাদিক। কি করেছে জানি না, পূর্ব বাংলায় রাজনীতি করে নাই। কোনোদিন করলে নিশ্চয়ই আমি জানতাম। বিলাতে বসে কোনো কিছু করেছেন কি না জানি না। বিলাতি কায়দায় কাপড়-চোপড় পরে এসেছে। ভাবলাম, বেচারা কোথায় এসেছে একটু পরেই বুঝতে পারবে। দুনিয়ার দোজখ, পাকিস্তানি জেল। দেড় টাকা খোরাক বাবদ সারাদিন ভরে। এদের ডিভিশন দেওয়া হয় নাই। আমি যেখানে থাকি সেখানে থেকে ওদের জায়গাটা দেখা যায়। ঐ ঘরে আমিও একদিন ছিলাম জাকির হোসেন সাহেবের বদৌলতে। কাপড়, জামা, বিছানা কিছুই আনে নাই। একেবারে নতুন লোক। বেশ কষ্ট হবে। বোধহয় বিলাত থাকতে পূর্ব বাংলার দাবি-দাওয়ার কথা একটু একটু বলে থাকবে। ইংরেজ গণতন্ত্র দেখে এসেছে। এইবার পাকিস্তানি গণতন্ত্র দেখবে। (শেখ মুজিবুর ২০১৭: ১৯২-৯৩)

আলমগীর কবিরের সাক্ষ্যেও ঘটনাটার একটা লাজুক পরিচয় আছে। শুদ্ধ দৃষ্টিকোণ সামান্য অন্য জায়গায় সরিয়া গিয়াছে। কারারুদ্ধ শেখ সাহেবকে তিনি ‘ভাল এবং উদার’— এই দুই বিশেষণে বিশেষিত করিয়াছেন। কবির বলিতেছেন:

জেলে থাকা অবস্থায় শেখ সাহেবের সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। কিন্তু ওঁকে ওখানে কিছুই বলিনি। উনি খুবই স্নেহের চোখে দেখতেন, সকলের সুবিধা-অসুবিধা, খাওয়া-পরা, ওষুধপত্র ইত্যাদি সম্বন্ধে ব্যক্তিগতভাবে খবর নিতেন, ব্যক্তিগত প্রভাবে যতটুকু করা সম্ভব করতেন। আমার মনে আছে, জেলে প্রথমে গিয়েই আমার জ্বর হয়। ওখানকার খাবার খেতে পারতাম না। তখন শেখ সাহেবই আমার জন্য আলাদা রান্না, ওষুধপত্র ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। জেলে ওঁর মত ভাল এবং উদার সঙ্গী পেয়ে আমরা খুবই ভাল ছিলাম। (কবির ২০১৮: ২১৭)                  (আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

[আলমগীর কবির রচনা সংগ্রহ প্রথম খণ্ড প্রকাশ পাইতেছে ‘চলচ্চিত্র ও জাতীয় মুক্তি’ নামে। প্রকাশক আগামী প্রকাশনী এবং মধুপোক। বর্তমান রচনা সেই বইয়ের ভূমিকা হিশাবে লিখিত। ইহার কোন কোন অংশ ইতিপূর্বে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত।]