দিনটি ছিল ১৮৮৪ সালের ২৮ মার্চ। ফায়ার আইল্যান্ড হয়ে সেদিন সন্ধ্যায় জার্সি সিটিতে পৌঁছার কথা জাহাজ লিডিয়ান মোনার্কের। নিউইয়র্ক শহরের প্রত্যেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। জাহাজে করে কী আসছে? সার্কাসের মালিক পিটি বার্নাম অনেক চেষ্টা-সাধনা করে ‘পবিত্র সাদা হাতি’ নিয়ে আসছিলেন আমেরিকায়।
এর আগেরবার শ্যামদেশ থেকে একটি সাদা হাতি কেনার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল তার। কিন্তু বার্নামের এজেন্ট জেবি গেইলর্ড অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সাদা হাতি কিনতে সক্ষম হলেন। তুং তালুং বা ‘আকাশের মুক্তা’ নামে সেই সাদা হাতিটি বার্মার রাজা দিবাওয়ের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল। তুং তালুংকে রেঙ্গুন থেকে জাহাজে করে নিয়ে আসা হয়েছে। সুয়েজ খাল হয়ে ইংল্যান্ডের লিভারপুলে হাতিটি পৌঁছেছিল সে বছরের ১৪ জানুয়ারি। লন্ডন জুলজিক্যাল গার্ডেনে কয়েক সপ্তাহ রাখা হলে সেটি ব্রিটিশ ও আমেরিকান পত্রপত্রিকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। কয়েক দিন বিশ্রাম নিয়ে সাদা হাতি, তার মালিকের এজেন্ট ও হাতির মাহুত নিউইয়র্কের উদ্দেশে যাত্রা করে ৮ মার্চ। বিশদিন পর ‘লিডিয়ার সম্রাট’ এসে নোঙর করার সঙ্গে সঙ্গেই বার্নাম ও তার দল তুং তালুংকে দেখার জন্য নিউজার্সিতে চলে যান।
পরের দিন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বড় করে শিরোনাম করে ‘পবিত্র জন্তুটি এসেছে’। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মহামূল্যবান এই শ্বেতহস্তির সঙ্গে বার্নামের প্রথম সাক্ষাতের কথা। বার্নাম তার দলকে বলেছিলেন, ‘আমরা ততদিনে জেনে গিয়েছিলাম একেবারে খাঁটি সাদা হাতি বলতে কিছু নেই। এটা একটি পবিত্র জন্তু। এটা টেকনিক্যালি সাদা হাতি। ঈশ্বর তাকে যতটা বানিয়েছে, ততটা আর কী। মানুষ রঙ দিয়ে কোনো হাতিকে সাদা করতে পারে, কিন্তু এটা সে রকম না।’
লন্ডনে তুং তালুংয়ের অভ্যর্থনার খবর যারা অনুসরণ করছিল, তারা জানতে পারল সাদা হাতি আসলে পুরোপুরি সাদা নয়। বার্নামের সিধাসাধা বিবৃতির ফলে সাদা হাতি নিয়ে আমজনতার কল্পজগৎ কিছুটা সংশয়ের মধ্যে পড়ে যায়। তবে ১৮৮৪ সালে তু তালুং যে গাত্রবর্ণ নিয়ে সমাজে বড় বিতর্ক তৈরির অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল, সে বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই।
তুং তালুংয়ের নিউইয়র্কে আগমনের কয়েক মাসের মাথাতেই ‘দ্য ল্যান্ড অব দ্য হোয়াইট এলিফ্যান্ট: সাইটস অ্যান্ড সিনস ইন সাউথ ইস্টার্ন এশিয়া’ (১৮৭৪ সালে প্রকাশিত) বইটির লেখক ফ্রাঙ্ক ভিনসেন্ট জুনিয়র তার এক আর্টিকেলে ব্যাপক হইচই ফেলে দেন। ‘ম্যানহাটন’-এ প্রকাশিত ‘হোয়াইট এলিফ্যান্টস’ শিরোনামের সেই আর্টিকেলটিতে সাদা হাতিকে বোঝানোর জন্য বেশকিছু বর্ণবৈষম্যমূলক পরিভাষা ব্যবহার করেছিলেন।
এক জায়গায় তিনি লেখেন, ‘এটা সবসময় মনে রাখতে হবে, হাতির ক্ষেত্রে সাদা শব্দটির ব্যবহার কিছুটা বিশেষণের দাবি রাখে। লবণের বিভিন্ন দানা তো বিভিন্ন আকারের হয়। যেসব জিনিসগুলো একেবারেই কালো, সেগুলোর তুলনায় আনলেই কেবল সাদা হাতি সাদা। সংকর জাতের কোনো ব্যক্তি আসলে একেবারে সাদা নয়। কিন্তু পুরোপুরি নিগ্রোর তুলনায় সে তো সাদা। তথাকথিত সাদা হাতি আসলে স্বাভাবিক প্রজাতির একটা ব্যতিক্রম মাত্র।’
ভিনসেন্টের কথা অনুযায়ী সাদা হাতি এবং মিশ্র বর্ণের মানুষের মধ্যে মিল হচ্ছে, উভয়েই এক প্রকার ‘বিশেষায়িত’ সাদা। সেগুলো একেবারে কালো হাতিগুলোর তুলনাতেই কেবল ‘সাদা’। (স্বাভাবিক হাতিগুলোকে ‘কালো’ বলার চেষ্টা করেছেন ভিনসেন্ট)। ভাবখানা এমন যে তারা সেসব সাদা হাতিকে পুরোপুরি সাদা হিসেবে পরিচয় দিতে নারাজ ।
তার রচনাতে সাদা হাতি নিয়ে আলোচনায় ভিনসেন্ট নিয়মিতই বর্ণের ধারণাগুলো টেনে এনেছেন। তিনি উল্লেখ করেন কীভাবে ‘কালো’ হাতিগুলো বিভিন্ন শ্রমদায়ক কাজ করে থাকে। এবং তার তুলনায় সাদা হাতিগুলো শ্যামদেশে কীভাবে ‘পূজিত’ হয়ে থাকে। তাই তাকে লিখতে দেখি, ‘আপনার হাতির রঙ যদি কোনো নিগ্রোর হাতের তালুর মতো সাদা হয়, তাহলে আপনি সাদা হাতির মালিক।’
ভিনসেন্টের বর্ণনায় যে সত্যটা প্রকাশিত হয়েছে সেটা সাদা হাতি নিয়ে উনিশ শতকের সব লেখার বেলাতেই সত্য। সাদা হাতি আসলে পুরোপুরি সাদা নয়, অনেকটা শ্বেতাঙ্গ মানুষের মতোই সাদা।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘দ্য সেকরেড বিস্ট হিয়ার’-এর লেখক তুং তালুংকে নিয়ে লেখেন, ‘এর কপালে গোলাপি একটা ছটা আছে, যা তার চোখ ও অর্ধেক শুঁড় পর্যন্ত বিস্তৃত। তার বিচিত্র ত্রিকোনাকার কানের মাথাতেও এই গোলাপি আভাটি রয়েছে। তার বুক, কাঁধও এই মাংস বর্ণের।’ (এখানে মাংস বর্ণ বলতে আসলে শ্বেতাঙ্গ লেখকের বর্ণকেই বোঝাচ্ছে)
‘দ্য ল্যান্ড অব দ্য হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ বইয়ে ভিনসেন্টও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ করে লেখেন, ‘আসলে তথাকথিত সাদা হাতির রঙ এক অদ্ভুতুড়ে মাংস রঙের, যাকে ‘সাদা’ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।’ তার বর্ণনায় আমরা তখনকার বর্ণ বিষয়ে সাংস্কৃতিক ঐকমত্যের প্রমাণ পাই। মানুষের বাইরে একটি প্রাণীর বর্ণ আলোচনাতেও কীভাবে ‘বিশেষায়িত’ ও ‘তথাকথিত’ কথাগুলো উঠে এসেছে সেটা দেখতে পাব।
মানুষের সাদা রঙ এবং সাদা হাতির রঙ আলোচনা আরো জটিল করে দিয়েছে ইংরেজি ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ নির্দেশকটি। এটা আসলে থাই শব্দ ‘চাং ফিউক’-এর অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর অনুবাদ। রিটা রিনগিসের মতে, ‘চাং ফিউক’-এর অর্থ অ্যালবিনো বর্ণের বা অদ্ভুত বর্ণের হাতির কথা। থাই ভাষায় ‘সাদা’ অর্থে যে শব্দ ব্যবহূত হয় সেটা পুরোপুরি ভিন্ন শব্দ।
ইউরোপ ও আমেরিকার যারাই শ্যামদেশ বা সাদা হাতি নিয়ে লিখেছেন, তাদের মতো ভিনসেন্টও ভুলের মধ্যেই ছিলেন। তবে ভিনসেন্ট এটা স্বীকার করেছেন যে, ‘চাং ফুয়াক’-এর দুর্বল অনুবাদ ছিল ‘সাদা হাতি’। কিন্তু তার পরও সেই হাতির বর্ণনায় ‘তথাকথিত সাদা হাতি’ বলতে ছাড়েননি। তুং তালুংকে নিয়ে লেখায় ভিনসেন্টদের ভাবখানা এমন ছিল, যেন কোনো মিশ্র বর্ণের আফ্রিকান-আমেরিকান নিজেকে শ্বেতাঙ্গ বলে চালিয়ে দিয়ে সাদা পরিচয়ের সুযোগ নিতে চাচ্ছে।
সাদা হাতি যে রকম দৃষ্টিভঙ্গির মুখোমুখি হয়েছে, সেটা অক্সফোর্ডের ইংরেজি অভিধানেও জায়গা করে নিয়েছে। সাদা হাতির বর্ণনায় সেখানে লেখা হচ্ছে— ‘একটি বিরল আলবিনো প্রজাতির হাতি, যেটা কিছু এশীয় দেশে অনেক সম্মানের চোখে দেখা হয়’, আবার আরেকটি অর্থে হাতিটিকে ‘গরিবের ঘোড়ারোগ’ হিসেবে দেখাতে গিয়ে বলা হচ্ছে, ‘একটি বোঝা বা ব্যয়বহুল সম্পত্তি’ (থাইল্যান্ড বা তত্কালীন শ্যামরাজার গল্পে জানা যায়, রাজার দরবারের কোনো সভাসদ যদি তার বিরাগভাজন হতেন তাহলে তাকে একটি সাদা হাতি ধরিয়ে দেয়া হতো। দেখা যেত সেই হাতির ভরণপোষণ করতে গিয়েই সে সভাসদ সর্বস্বান্ত হয়ে যেত)। অক্সফোর্ডে এর আরেকটি যে অর্থ করা হয়েছে সেটি হলো, ‘এমন একটি বস্তু যেটা অকাজের ও মূল্যহীন।’
শ্যামরাজার গল্পটিতে যদিও ‘সাদা হাতি’র একটি শক্ত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে কীভাবে ‘এটি এমন এক বস্তু বা ফন্দিতে দাঁড়িয়েছে, যার কোনো কাজ বা মূল্য নেই’। সেটা যে ডাহা মিথ্যাচার তার প্রমাণ পাব যদি এর দুটো সংজ্ঞায়ন পড়ি। অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে সাদা হাতি একটি প্যারাডক্স হিসেবে হাজির। যদি সাদা হাতি এতই ‘বিরল’ ও ‘অনেক সম্মানিত’ হয়ে থাকত তাহলে শ্যামরাজা তার বিরাগভাজনের শিকার হওয়া সভাসদকে শাস্তি হিসেবে কেনই বা এটি দেবেন? তাছাড়া সাদা হাতি যে ‘বিরল ও সম্মানের বস্তু’ সে বিষয়ে থাই ইতিহাসে তেমন কথাবার্তাও নেই!
তার পরও ‘সাদা হাতি’ ইংরেজি ভাষায় একটি ‘সর্বনেশে উপহার হিসেবে’ স্বীকৃত হয়ে আসছে। আজকের জমানার ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট সেলস’ বা ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট গিফট এক্সচেঞ্জেস’ শব্দযুগলটিতে এই ফেনোমেনাটা দৃশ্যমান। কিন্তু ১৮৮০-এর দশকে ‘সাদা হাতি’র একেবারে সাধারণার্থে এক ধরনের বোঝা বা বেহুদা প্রাণী বোঝাত।
বার্নাম ও তুং তালুংয়ের গল্পটি উনিশ শতকের আমেরিকায় সাদা হাতি নিয়ে লক্ষণীয় মুগ্ধতার বিষয়টি তুলে এনেছে। প্রাণীটি যে অভ্যর্থনা পেল সেটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। সার্কাসে আসল জিনিসের নকল করে বেশ অর্থকড়ি কামিয়েছিলেন বার্নাম। কিন্তু তিনি যখন মার্কিন জনতার সামনে সত্যিকারের ‘সাদা হাতি’ নিয়ে এলেন, তখন তাদের বিশ্বাস করাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন যে সেটা আসলেই সাদা হাতি! বেশ অর্থকড়ি খরচ করে সাদা হাতি কিনে এনে, একে জাহাজে করে ইউরোপ ঘুরিয়ে এনে এলাহি কাণ্ড করে ফেলেও আমেরিকানদের কাছে সেটাকে সাদা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। বিশাল খরচের কথা নিজের আত্মজীবনীতেও স্বীকার করেছেন বার্নাম। তুং তালুংকে কিনতে তখনকার অর্থে আড়াই লাখ ডলার খরচ করেছিলেন, বর্তমান বাজারমূল্যে যেটা ৫৫ লাখ ডলার।
মার্কিনমুলুকে তুং তালুংয়ের উপস্থিতি অর্থনৈতিকভাবে মালিকের জন্য বেশ লাভজনক না হলেও সেটা সাংস্কৃতিক জগতে বর্ণ পরিচয় নিয়ে বেশ বিতর্কের সূচনা করেছিল। সবচেয়ে মজার প্রভাবটি ছিল পত্রিকার বিভিন্ন নিবন্ধ ও সাবানের বিজ্ঞাপনের স্বীকারোক্তিমূলক কথাবার্তায় এটা জায়গা পেয়েছে যে, ‘সাদা’ ধারণা এবং ‘সাদাদের বিশেষ সুবিধা’প্রাপ্তির বিষয়টি সামাজিকভাবে সৃষ্ট একটি প্রপঞ্চ।
তুং তালুং সাদা হাতিটি কীভাবে বর্ণ-বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, সেটা বুঝতে গেলে সে সময়ে আমেরিকার জনতার সামনে উপস্থাপিত হওয়া অন্য দুটি হাতি নিয়েও কথা বলতে হবে। ১৮৮৪ সালে আমেরিকার সার্কাস দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত দুটি হাতির একটি নিয়ে এসেছিলেন এডাম ফোরপা এবং অন্যটি পিটি বার্নাম। ফোরপার হাতিটির নাম রাখা হয়েছিল ‘লাইট অব এশিয়া’ এবং বার্নামের হাতিটির নাম ছিল ‘দ্য হোয়াইট ফ্রড’। স্বাভাবিক কালো এই হাতি দুটোকে রঙ করে সাদা করেছিলেন স্ব স্ব মালিকরা।
ফোরপার হাতিটির আসল নাম ‘পুঁচকে’ হলেও এটাকে তুং তালুংয়ের প্রতিপক্ষ হিসেবে সাজানো হয়েছিল। আর বার্নাম ‘দ্য হোয়াইট ফ্রড’ নিয়ে আসেন ফোরপার হাতিটি কীভাবে একটি জালিয়াতি সেটা দেখানোর জন্য। বর্ণ হিসেবে সাদাত্ব যে কত নাজুক একটি ধারণা, সেই তথাকথিত রঙ করা ‘সাদা’ হাতি দুটো তা নিয়ে বেশ সাংস্কৃতিক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছিল।
বার্নাম যখন জার্সি সিটিতে তুং তালুংকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন তার ঠিক আটদিন আগেই ‘সিটি অব চেস্টার’ জাহাজে করে নিউইয়র্কে পদার্পণ করেছে ফোরপার সাদা রঙ করা সেই হাতি। লাইট অব এশিয়া আমেরিকায় পা ফেলতে না ফেলতেই এর আসল বর্ণ নিয়ে সন্দেহের ডালপালা বিস্তৃত হতে থাকে। হাতিটি আসার দুদিনের মাথাতেই দ্য নিউইয়র্ক টাইমস অন্তত তিনটি নিবন্ধ প্রকাশ করে। সেখানে হাতিটির রঙ এবং শ্যামদেশ থেকে কেনার গল্পটিতে বেশ সন্দেহের চোখে উপস্থাপন করা হয়। সবগুলো নিবন্ধেই উল্লেখ করা হয় কীভাবে হাতিটির সারা শরীরই সমভাবে সাদা। শ্যামদেশের সাদা হাতির যে বর্ণনা পাওয়া যেত, তার সঙ্গে তেমন মিল ছিল না। আর নিবন্ধগুলোয় বিভিন্ন অনুমান ব্যক্ত করা হয়েছিল কীভাবে ফোরপা হাতিটিকে সাদা করল; সে কি সেটায় রঙ করাল নাকি কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটা করল।
এদিকে এর দিন কয়েক বাদেই টাইমসের আরেকটি প্রতিবেদনে উঠে আসে তুং তালুংয়ের কথা। নিউইয়র্ক সিটির একজন সাদা হাতি বিশেষজ্ঞ এটা নিশ্চিত করেছেন তুং তালুং একটি আসল ‘চাং ফুয়াক’। কিন্তু ফোরপার হাতির ‘সাদা’ত্বের পক্ষে কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। তুং তালুংকে স্বীকৃতি দেয়া অন্তত একজন বিশেষজ্ঞ ‘লাইট অব এশিয়া’কে নিয়ে তার সন্দেহের কথা জানিয়ে টাইমসকে লিখেছেন। একই দিনে পত্রিকাটিতে প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়তে খুব দৃঢ়ভাবে দাবি করা হয়েছে, ফোরপা রঙ দিয়ে হাতিটি সাদা করেছে।
তুং তালুংয়ের আগমনের পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ সাদা হাতি নিয়ে বার্নাম ও ফোরপার লড়াই জমে ওঠে। ১৯ এপ্রিল বার্নামের সার্কাস দল নিউইয়র্ক থেকে ফিলাডেলফিয়ার দিকে রওনা হয়, যেখানে ফোরপা তার ‘লাইট অব এশিয়া’ নিয়ে চমক ফেলতে চাচ্ছিলেন। এদিকে বার্নামের ভাণ্ডারে ছিল তুং তালুং আর ‘টিপ’ নামে অন্য একটি সাধারণ হাতি। ‘টিপ’কে রঙ দিয়ে সাদা করে তার নতুন নাম রাখা হয় ‘দ্য হোয়াইট ফ্রড’। ফোরপা এ ঘটনায় তেমন উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন বলে মনে হয়নি। তিনি শহরে একটি পুস্তিকা ছেড়ে দেন, যার শিরোনাম ছিল— ‘টু হোয়াইট ফর বার্নাম?’
সেই পুস্তিকায় দাবি করা হয় তুং তালুং এবং দ্য হোয়াইট ফ্রড দুটোই ভেজাল হাতি। শুধু তার লাইট অব এশিয়া-ই ‘মার্কিনমুলুকে পা রাখা প্রথম এবং একমাত্র পবিত্র সাদা হাতি।’ পুস্তিকার শিরোনাম থেকেই স্পষ্ট ফোরপা সাদা হাতি নিয়ে জনমনে বেশ বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন এবং নিজের পক্ষে জনসমর্থন ভাগিয়ে আনতে পেরেছিলেন। তুং তালুংয়ের খাঁটিত্ব নিয়ে ফোরপা প্রশ্ন তুলে দেন সেটি আক্ষরিকভাবে লাইট অব এশিয়ার মতো সাদা নয়।
সাদা হাতি নিয়ে এই যুদ্ধে ‘সাদাত্ব’ এমন একটি ভঙ্গুর ধারণা হিসেবে হাজির হয় এবং এটা বর্ণ প্রতারণা, রূপান্তর বা খাঁটিত্ব নিয়ে আলাপের সূচনা করে।
১৮৮৪ সালের নভেম্বরে লাইট অব এশিয়া মারা গেলে বার্নামকে তার আত্মজীবনীতে লিখতে দেখি, ‘এই প্রতারণা কর্মটির মালিক ঘোষণা দিলেন যে হঠাৎ করে এটি মারা গেল (ডাইড)। এটা আসলে আন-ডাইড! (ঁহ-ফুবফ! রঙ করা হয়নি)
সার্কাস ব্যবসায় বিতর্কের মুখে পড়ে, বেশ ধাক্কা খেয়ে বার্নাম ও ফোরপা এর কিছুদিন পর অন্য ব্যবসায় মনোযোগী হয়েছিলেন। তবে তুং তালুং, লাইট অব এশিয়া ও দ্য হোয়াইট ফ্রড পর্বটি যুক্তরাষ্ট্রে সাদাত্ব নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার সূত্রপাত করেছে। বার্নাম ও ফোরপা লাইট অব এশিয়া ও দ্য হোয়াইট ফ্রডের চামড়ায় রঙ করেছেন কিনা, সেটা নিয়ে আমজনতার মধ্যে বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। তারা ভাবতে শিখেছে এ কলাকৌশল তো আফ্রিকান আমেরিকানদেরও প্রভাবিত করতে পারে।
ফিলাডেলফিয়ায় বার্নামের দ্য হোয়াইট ফ্রড প্রদর্শনীর দিনই দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে ‘অ্যান ইন্টারেস্টিং এক্সপেরিমেন্ট’ শিরোনামে একটি চমকপ্রদ নিবন্ধ ছাপা হয়। তার কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন মনে করছি:
‘আসল সাদা হাতির তুলনায় অন্য কোনো হাতিকে কৃত্রিম উপায়ে বার্নামের সাদা করার পরিকল্পনাটি একটি অসাধারণ কাজ। তবে হাতিদের এ রকম রঙ করার উদ্ভাবক জানালেন একই প্রক্রিয়া কাজে লাগিয়ে কৃষ্ণাঙ্গদেরও সাদা করে ফেলা যাবে। এটা জবের বিখ্যাত অনুসন্ধানের উত্তর দেয়, যেখানে তিনি একজন ইথিওপীয়কে সাদা করার সম্ভাবনা যাচাই করছিলেন। টমসন রোডে হাজারো আমেরিকান দর্শকের সামনে একটা আস্ত হাতিকে সাদা করে উপস্থাপন করা হয়ে গেল। এখন কৃষ্ণকায় লোকদের যদি এ রকম সাদা রঙ শুরু হয়ে যায়, তাহলে সাদা হাতির মতোই বিরল হয়ে যাবে তারা।
এই রঙ করার প্রক্রিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ লোকের বর্ণ হুবহু শ্বেতাঙ্গদের মতো হবে না। কোনো ইথিওপীয়কে সাদা রঙ করা হলে সে বরফের মতো উজ্জ্বল সাদা হয়ে যাবে। এর ফলে দেখা যাবে ম্যাডিসন এভিনিউয়ের ব্লন্ড সাদারা তাদের তুলনায় শ্যামবর্ণের দেখাবে। এক সময়ের শ্বেতাঙ্গ বলে পরিচিতরা কৃষ্ণাঙ্গ বলে স্বীকৃত হতে থাকবে।
তাহলে শ্বেতাঙ্গদের সামনে একটি অদ্ভুত সংকট এসে দাঁড়াবে। দেখা যাবে রঙ করা কৃষ্ণাঙ্গরা বর্ণের জন্য আগেকার শ্বেতাঙ্গদের ঘৃণার চোখে দেখবে। কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য বানানো সব কলা-কানুন ককেশীয়দের জন্য ব্যবহূত হওয়া শুরু হবে। কোনো হোটেলে প্রবেশ করতে বা গাড়িতে চড়তে আমাদের একটি নতুন সিভিল রাইটস বিল পাস করতে হবে। যদি কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের আচরণ রপ্ত করে, তাহলে হয়তো এটাও শুনতে হবে— কেউ আমাদের ঘৃণার স্বরে ‘নিগার্স’ বলে গালি দিচ্ছে। ’
যদিও ‘অ্যান ইন্টারেস্টিং এক্সপেরিমেন্ট’ নিবন্ধের লেখক স্পষ্টত বিদ্রূপাত্মক স্বরে কথাগুলো বলছেন, তার পরও সেখানে অকপট স্বীকারোক্তি আছে ‘সাদাদের শ্রেষ্ঠত্ব’ ও ‘নিগ্রো প্রশ্ন’গুলো আসলে সামাজিক প্রথাজাত। ‘যত সাদা ততই ভালো’ এ সংস্কারটাকে কল্পনায় উল্টে দেখার মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন সাদাত্ব সম্পূর্ণভাবে সামাজিকভাবে বিনির্মিত একটি বিষয়। ‘অ্যান ইন্টারেস্টিং এক্সপেরিমেন্ট’ নিবন্ধে যে দৃশ্যকল্প নিয়ে আসা হয়েছে, সেটা কাল্পনিক হলেও সেখানে বর্ণ নিয়ে ১৮৮০-এর দশকের সত্যিকারের সামাজিক উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।
সাদা হাতি নিয়ে চলা লড়াইয়ের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর পর্বটা হচ্ছে ১৮৮৪ সালের মার্চে শুরু হওয়া পিয়ার্স সোপের একটি বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ব্রিটিশ সাময়িকী ‘দ্য গ্রাফিক’-এ। তুং তালুং যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছার পর পরই সেটা পাক, হার্পারস উইকলি ও ফ্রাংক লেসলির সানডে ম্যাগাজিন সাময়িকীগুলোয় পুনঃমুদ্রিত হতে থাকে। এক পৃষ্ঠাব্যাপী বিজ্ঞাপনটিতে ছিল একটি হাতি ও তার মাহুত। হাতির মাহুতটি ছিল দাড়ি শোভিত ও কৃষ্ণকায় বর্ণের। তার এক হাতে ছিল একটি পিয়ার্স সোপ। বিজ্ঞাপনটির নিচে লেখা ছিল, ‘সাদা হাতির আসল রহস্য-পিয়ার্স সোপ। ত্বকের জন্য তুলনাহীন।’
দ্য লিডিয়ান মোনার্ক জাহাজ থেকে মার্কিনমুলুকে পা ফেলার পর পরই তুং তালুং সমকালের আমেরিকান সংস্কৃতির টেনশনটাকে ধারণ করেছে। ১৮৮৪ সালে সাদা হাতি অনেক বড় খবরের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদিও বার্নাম ও ফোরপার জীবজন্তুগুলো দেখতে আসা আমেরিকান জনতা মনে করেছিল— তারা হয়তো কোনো কিম্ভূতকিমাকার প্রাণী দেখবে, কিন্তু তারা আসলে সাদাত্ব নিয়ে নিজেদের চিন্তার প্রতিফলনই দেখেছে।
সূত্র: ওপেন ডোমেইন






