আমার বয়স তখন কত হবে, ১০ বছর। তখন প্রথমবারের মতো যশোর রোড দিয়ে কলকাতা যাই; সঙ্গে মা ছিলেন। যশোর রোডের দু’পাশ ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ওই বিশাল গাছগুলো এখনো আমার স্মৃতি ধরে আছে। আমার মনে আছে, কলকাতায় গিয়ে জীবনের প্রথমবারের মতো পাঁচতলা এক ভবন দেখলাম। ওটা ছিল আমার প্রথম সর্বোচ্চ উঁচু ভবনে ওঠা। ঢাকায় তখনো কোনো পাঁচতলা ভবন ছিল না, এক শেরাটন (তখনকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) ছাড়া। ’৭২ সালে মাকে নিয়ে আমাদের টয়োটা করোলা গাড়িটি চালিয়ে এ রাস্তা ধরে কলকাতায় গিয়েছি। সে কি সুন্দর রাস্তা! তখন আমি ছবি তুলতাম না, যদি আলোকচিত্রী হতাম তাহলে হয়তো ওখানে অনেকক্ষণ পড়ে থাকতাম। এরপর নানা কারণে ’৮৪ থেকে ’৯০ সালের মধ্যে অসংখ্যবার এ সড়ক দিয়ে আসা-যাওয়া করেছি। তখন আমার ভেতর একটা লোভই ছিল, অন্তত ওই পথটা ধরে যদি যাওয়া যায়। পথটাকে এত পছন্দ করতাম বলে অনেক সময় বাড়তি হলেও ওই পথ ধরে যেতাম।
অ্যালেন গিন্সবার্গ যশোর রোড নিয়ে অসাধারণ কবিতা লিখেছিলেন। কবিতার একটা পোস্টার এখনো আমাদের বাড়িতে টানানো রয়েছে। এর ভিত্তিতেই পরে গিন্সবার্গের সঙ্গে আমার পরিচয়, যদিও সরাসরি নয়; কাজের সঙ্গে। এক অর্থে আমি তার অনুরাগী হয়ে যাই। তার অনেকদিন পর শরণার্থীদের নিয়ে ‘বার্থ প্যাংস অব আ নেশন’ নামে ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে আমরা একটি বই বের করেছিলাম। বইটা অনেকেই প্রশংসা করেছে। ওটা এশিয়া প্যাসিফিকের বেস্ট বুক অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পায় ২০১২ সালে। তো ওই বইটার মধ্যে যে ছবিগুলো আছে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই শরণার্থীবিষয়ক ছাড়াও অনেক বিষয় উঠে আসে। একই বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই আমরা একই নামে একটি ছবিও বানাই। ছবিটার সাউন্ড ট্র্যাকের জন্য তখন মৌসুমী ভৌমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি, যশোর রোড নিয়ে গান বিষয়ে। ওই গানটিই আমাদের সিনেমার প্রধান ব্যাকড্রপ হিসেবে কাজ করে। ওই গানটাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখেই বাকি গল্পগুলো বলা। বইটিতে রশীদ তালুকদারসহ পৃথিবীর সেরা আলোকচিত্রীদের কাজ ছিল, যা পরে ছবিটার মধ্যেও উঠে আসে। ছবিটার জন্য অনেকের সাক্ষাত্কার নিয়েছিলাম, তাদের অনেকেই এখন হারিয়ে গেছেন। কিন্তু ওই গানটাই ছবিটাকে ধরে রেখেছে।
আমরা যে পৃথিবী রেখে দিতে চাই আমাদের পরের প্রজন্মের জন্য— এ নিয়েই এখন মূল আলাপে আসতে চাই। একটা সময় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আমাদের কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো কেটে ফেলেছিলেন। এখন যেটা কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, সেখানে সারি সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল। আমরা কৃষ্ণচূড়ার সৌন্দর্য দেখার জন্য বসে থাকতাম। মিন্টো রোডের মাথায় যেখানে একটা ফোয়ারা হয়েছে, ওখানে চমত্কার একটা নাগকেশর গাছ ছিল। ভোরবেলা চলে যেতাম ওই গাছের ফুলগুলো দেখতে, কী অদ্ভুত গন্ধ! সেই নাগকেশর গাছ বহু বছর যাবৎ দেখিই না। অত সুন্দর একটা গাছ কেটে ফোয়ারা করা হয়েছে। এই করে আমাদের যা গাছ ছিল তা হারিয়ে গেছে।
পুয়ের্তোরিকোকে মার্কিনিরা এক অর্থে দখলই করে ফেলে। সেখানে একটা দ্বীপ আছে, যার ৬০ শতাংশ প্রথমে লিজ নেয় তারা এবং পরে নিজেদেরই করে নেয়। সেখানে মার্কিনিরা বিভিন্ন ধরনের বিস্ফোরণের পরীক্ষা নেয়। শুধু মার্কিনিরা নয়, পাশ্চাত্যের আরো অনেক দেশ এ রকম কাজ করে। নিজেদের দেশে তারা কিন্তু এ রকমটি কখনো করে না। তাদের যত পরীক্ষা, সব আমাদের মতো গরিব দেশে; যাদের প্রতিবাদ করার কোনো জায়গা নেই। পাশ্চাত্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি না, এটা আমাদের অক্ষমতা। কিন্তু আমাদের নিজেদের দেশেই আমাদের নির্বাচিত সরকার, আমাদের আয়করের টাকায় যারা দেশ চালাচ্ছেন, তারা যদি একই জিনিস আমাদের দেশের মধ্যেই করেন, তাহলে আমরা যাব কোথায়? শহরে বসেই আমরা গ্রামকে ধ্বংস করছি। শুধু ধ্বংস করছি না, এ পরিবেশের মধ্যে আমাদের সন্তানরা বড় হবে। তারা বেঁচে থাকবে কীভাবে?
সিঙ্গাপুরকে বলা হয় বাণিজ্যিক দেশ। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি জনগোষ্ঠীর বাস যেখানে, সেখানে তাদের রাস্তাগুলো দেখুন, কত সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। এখনো ওখানে বিশাল বিশাল গাছগুলো দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের রাস্তার নাম অর্চাড রোড। আমাদের তো কৃষ্ণচূড়া বলে কোনো রাস্তা নেই। সেখানে কড়া আইন রয়েছে, প্রকৃতিকে কোনোভাবেই ধ্বংস করা যাবে না। লন্ডন শহরের পার্কগুলো বিশাল বিশাল। নিউইয়র্কের সেন্টাল পার্কে বিশাল গাছগুলো যে জায়গাজুড়ে রয়েছে, তা যদি শুধু অর্থের বিচারেও মাপা হয় তাহলে এ জায়গার দাম বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু নগর কর্তৃপক্ষ সেটা ছুঁতে পারে না, ছুঁতে চায়ও না। ওয়াশিংটন ডিসিতে নিয়ম আছে ক্যাপিটাল হিলের ওপর কোনো উঁচু বাড়ি করা যাবে না। এমনকি ভারতের লোদী গার্ডেনেও একই নিয়ম আছে। তো আমাদের এত অক্ষমতা কেন? আমাদের কতশত গাছ আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলী’তে অসংখ্য গাছের নাম আছে। কথাসাহ্যিতিক হুমায়ূন আহমেদের একটা বাগানবাড়ি আছে, যেখানে গীতাঞ্জলী বইয়ে যতগুলো গাছের নাম উল্লেখ আছে, ততগুলো গাছের চারা তিনি রোপণ করেছেন। এভাবে ভাবা যায় না কেন এখন?
একটু ভিন্ন কথা বলি, সম্বন্ধীর মেয়ে নিশিতা, ওকে নিয়ে আমরা একবার শালবনবিহারে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ছোট বাচ্চা, বড়দের সঙ্গে থাকতে থাকতে একটা সময় বিরক্তবোধ করছিল। ও তখন বলল, ‘কী করব?’ আমি বললাম, তুই গাছে চড়। ও বলল, ‘গাছে কী করে চড়ে?’ আমার তখন সত্যিকার অর্থে খেয়াল হলো: এখন যে বাচ্চাটা বড় হচ্ছে, তারা তো কখনো গাছে চড়েনি; তারা ফুলের টবে, চিড়িয়াখানায় গাছ দেখছে। অথচ আমরা তো গাছেই বড় হয়েছি। গাছে চড়ে পাশের বাড়ির বড়ই, পেয়ারা নিয়েছি। কতবার পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি। আমাদের লেজ ছিল না ঠিকই, কিন্তু বানর ছিলাম এক অর্থে। তো সে জায়গায় এখনকার বাচ্চারা গাছে চড়া কী জিনিস, তাই জানে না। এ জগৎ তো আমরাই তৈরি করেছি!
আমার লজ্জাই লাগে বলতে, আমাকে যদি পূর্ব-পশ্চিম কোন দিক বলতে বলা হয়, তাহলে ভেবে বলতে হবে। শহরে বসে পূর্ব-পশ্চিম চেনা বড় দায়। কিন্তু যখন গ্রামে গিয়ে কারো কাছে একটা জায়গার কথা জিজ্ঞেস করি, তখন গ্রামের মানুষেরা বলে, ‘সামনে বাবলা গাছ। ওখান থেকে পুব দিক যাবেন, তারপর সামনেই একটা কেওড়া গাছ দেখবেন। তার পরের বাড়িটাই...। এখন কেওড়া গাছও চিনি না। বাবলা গাছও চিনি না, পূর্ব-পশ্চিম চিনি না। মোটকথা, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, তা হারিয়ে গেছে। সেটা একটা কারণ। এর বাইরে আরো কারণ আছে। এটা যে গবেষণা করে বলছি তা নয়। আমার মনে হয়, যারা সিদ্ধান্ত নেন, তাদের অনেকেই গ্রামে থাকেন না; গ্রামে যান না। তারা যে সিদ্ধান্তগুলো নেন, তা যাদের ওপর বর্তায়, তাদের সঙ্গে এ সিদ্ধান্তগুলোর কোনো যোগাযোগ নেই। মতমোড়লদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়ে, বাড়িঘরও হয়তো সেখানে আছে। এখানে কী হলো, তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। লাল পাসপোর্ট আছে বলে ইমিগ্রেশনে তাদের সমস্যা হয় না। তারা ভিন্ন জগতে বাস করে। আমরা যারা এ জগতে বাস করি, এ দেশে বাস করি, তারা কীভাবে চলি, এটা নিয়ে তাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
বলা হয়, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে যাচ্ছি। আমাদের জিডিপি বাড়ছে। হিসাব করে দেখলে, গড় জিডিপি নিশ্চয়ই বাড়ছে। কিন্তু কার বাড়ছে, সেটা বোঝা তো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন পৃথিবীর শীর্ষ ছয়জন ধনী ব্যক্তির হাতে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের চেয়ে বেশি ধন। ৯৯ শতাংশ মানুষের চেয়ে ১ শতাংশ মানুষের কাছে বেশি ধন যখন থাকে, সেখানে ওই জিডিপির অর্থে যে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো পরিবর্তন আসে, তা বলার কোনো কারণ নেই।
আমার মনে আছে, আমার নানা সবসময় বলতেন, ‘গাছ লাগাও।’ নানাকে যখন লোকজন জিজ্ঞাসা করত, ‘এ গাছগুলো যখন বড় হবে তখন তো আপনি দেখতে পারবেন না, লাগিয়ে কী লাভ?’ তিনি বলতেন, ‘আরেকজন দেখবে, আরেকজন ফল খাবে।’ চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান তার গাছের ফল ছিঁড়তে দিতেন না। বলতেন, ‘পাখিগুলো খাবে কী?’ এই মানসিকতা থেকে আমরা এখন কোথায় সরে গেছি! আর সরে এসেছি বলেই আমরা প্রকৃতি, গাছ কোনোটিকেই মূল্য দিই না। সে কারণে আমরা হিসাব করি, ব্যাংকে কত টাকা এল। যা ধ্বংস হলো, সেটার মূল্য কী— এ হিসাব কখনো করি না। ওই হিসাব করলে ব্যাংকের টাকা নগণ্য হয়ে যায়। ধনীরা জানেই না, অনেক বেশি সম্পদ ধ্বংস করে তারা ব্যাংকে টাকা জমাচ্ছেন। আবার ওই টাকা কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছেও যাবে না। সাধারণ মানুষের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
আমার মতে, যশোর রোড নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা। শুধু সুন্দর বলে নয়, এটার সঙ্গে কত ঐতিহ্য, স্মৃতি, ইতিহাস জড়িত। আমাদের স্মৃতি, ইতিহাস যদি মুছে ফেলি, তাহলে থাকলটা কী!
আমরা ’৭১-এর কথা এত বলি, স্মৃতি, ইতিহাসের কারণেই তো বলি। এগুলোও তো আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত, এগুলোর অনেক ইতিহাস তো যশোর রোডের এ বৃক্ষগুলো কাটার সঙ্গে সঙ্গে মুছে যাবে। আমি মনে করি, যারা আমাদের দেশের অর্থনীতিবিদ, টাকা-পয়সার হিসাব যারা করেন, একটা সময়ে তাদের নিরূপণ করা উচিত— আমাদের প্রকৃতির কী মূল্য, আমাদের মনের শান্তির কী মূল্য কিংবা ভালোভাবে জীবনযাপন করা সেটারইবা কী মূল্য। জিডিপি বাড়া ভালো জিনিস। কিন্তু সেটাই তো একমাত্র উদ্দেশ্য নয়, জীবনটা সুখের করাই তো উদ্দেশ্য। যে জিনিস আমাদের আনন্দ দেয়, তৃপ্তি দেয়, যেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি, সেগুলোও যদি ধ্বংস করি, তাহলে থাকলটা কী!
আমি আলোকচিত্র চর্চা করি, শিক্ষকতা করি। আমরা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স, লাইট নিয়ে কথা বলি। মুস্তাফা মনোয়ারের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথের মজার একটি কবিতার পঙিক্ত শিখেছিলাম— ‘ওপাড়েতে কালো মেঘ থমথম করে/ এপাড়ে রাঙা মরিচ টুকটুক ধরে।’ তো ওই ওপাড়ের কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছি, মাঝখানে খাল, এখানে লাল মরিচ, রঙ-আলোর ব্যাপারসহ সবকিছু আমাদের প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রকৃতি না থাকলে ওপাড়ের মেঘ দেখা হবে না, মরিচও ধরবে না, নদী তো নেই।
একদিক দিয়ে আমি ভাগ্যবান। আমি যেখানেই থাকি, আমার জানালার বাইরে পাখি বাসা করে। কয়েক বছর ধরে ধানমন্ডির যে ভাড়া বাড়িতে আমি থাকি, সেখানে আমার জানালার বাইরে টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছিল। এরপর ডিম পাড়ল, বাচ্চা হলো, বড় হলো, আমি সব ছবি তুললাম, একটা সময় ওরা উড়ে চলে গেল। এখন আর ওই টুনটুনি পাখি আসে না। গত বছর লক্ষ্মীপেঁচা বাসা করেছিল। ওদের ছানাগুলো ঠিক আমার জানালার বাইরে সারাদিন বসে থাকত। আমি অনেকদিন ধরে ওদের ছবি তুলেছি। অনেক দিন হলো, ওরাও চলে গেছে। এ বছর আর একটি পেঁচাও আসেনি। পেঁচা কিন্তু শহরে থাকে, গাছপালা না থাকলেও চলতে চেষ্টা করে। সেই পেঁচাও এখন আসে না। আমাদের বাড়ির পাশে শিরিষ গাছে অনেকগুলো টিয়া পাখি বসত, সেই টিয়া পাখিও এখন আর আসে না। দৃকের বাইরে অ্যাকাশিয়া গাছে সুচ পাখি দলবেঁধে আসত, কিচিরমিচির করত। ওদেরও বহু বছর দেখি না। আমাদের যদি গাছ না থাকে, পাখি থাকবে না। পাখি না থাকলে প্রকৃতির কোনো গন্ধ নেই। আবার ফিরি ওই সময়, আমার সম্বন্ধীর মেয়ে নিশিতার কাছে। ওই বাচ্চাটি বলেছিল, ‘আমি গাছে চড়ব কী করে?’ কিছুদিন পর ওই বাচ্চাগুলোই জিজ্ঞাসা করবে, গাছ কী?





