দৃষ্টিসীমানার মধ্যে কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। তিব্বতের পবিত্র মানসরবর হ্রদের কাছে ছোট্ট একটি জলস্রোত পার হচ্ছিলাম। অগভীর সেই জায়গাটির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের চালক শুধু হর্ন দিচ্ছিলেন। আমি হয়তো অবিশ্বাস্য নজরে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার দৃষ্টিকে পাঠ করে সেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী চালক জানালেন, ‘আমি তো কোনো মাছকে আঘাত দিতে পারি।’
ঠিক এ রকম একটি দৃশ্যের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল, যা এখনো আমার মনে গেঁথে রয়েছে। কিন্তু তারপর থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা ও এখন মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মাধ্যমে যে ভয়ানক রক্তপাতের সূত্রপাত হয়েছে, তা আমাকে তীব্রভাবে নাড়িয়ে দিচ্ছে। অবশ্য এ সংঘাতের বিষয়টি শুধু বৌদ্ধদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মুসলমান, খ্রিস্টান, হিন্দু, ইহুদি সবাই ধর্মের নামে সংঘাত চালাচ্ছে। এটা তো আজকের দুনিয়ার অতিপরিচিত দৃশ্য। শুধু ‘ভুল’ জায়গায় ‘ভুল’ ধর্ম-বর্ণ, জাতি-শ্রেণী বা লিঙ্গের কারণে আজ অন্যায্য যুদ্ধের শিকার বিশ্বের বিভিন্ন এলাকার নিরীহ মানুষ।
লোভ নতুন কিছু নয়। ভূমিদস্যুদের হাতে বাড়িঘর হারানো লোকেরা আমাদের অপরিচিত নয়। অন্যের সম্পত্তি দখলের জন্য যুদ্ধ বাধানো অপরিচিত দৃশ্য নয়। এটা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভণ্ডামির স্বাক্ষর যে, রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে নিপীড়িতদের মূল্যের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সংকটে জবাব দেয়। তাদের কাজকে সাফাই গাইতে যে রেটরিক প্রদান করে, সেগুলো আসলে আমাকে ক্ষুব্ধ করছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিষয়টি তুচ্ছ ও ছেঁড়া কাগজের টুকরার জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে, যেটা কিসিঞ্জার ও ওবামাকে দেয়া যায় কিন্তু গান্ধী ও এদিকে দেয়া যায় না [পাকিস্তানের নাগরিক আবদুল সাত্তার এদি (১৯২৮-২০১৬) ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাসেবী অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্কটির প্রতিষ্ঠাতা। অন্তত ২০ হাজার এতিম শিশুর অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এদি]! নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীরা যখন নিরীহ মানুষের হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেন এবং নোবেল শান্তি কমিটি সেখানে চুপ থাকে, তখন স্পষ্ট হয় যে এসব সংগঠন ও ব্যক্তি ন্যায়বিচার বা মানুষের মতামতকে কতটুকু তোয়াক্কা করে।
এটা কতটুকুই বা পার্থক্য তৈরি করে ওই ছোট্ট মেয়েটির জন্য, যে তার বাবাকে খুন হতে দেখেছে, মাকে ধর্ষিত হতে দেখেছে, তার ঘর পুড়ে যেতে দেখেছে? বিশ্বনেতারা যদিও ওইসব বর্বর কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান, তা তাকে কী সান্ত্বনা দেবে? আসলে তাদের নিষ্ক্রিয়তা বরং তাকে পীড়া দিচ্ছে বেশি। সে ক্ষুধার্ত, গৃহহীন ও বীতশ্রদ্ধ। তার একটি পরিবার দরকার, একটু স্নেহের পরশ। তার আস্থার জায়গা দরকার, যাতে সে বিশ্বাস করতে পারে আগামী দিনটি ভিন্ন হতে পারে।
অন্যায়-অনাচারের যে তথ্যপ্রমাণাদি রয়েছে, তা ভয়ানক। যে পরিমাণে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা অসহনীয়। ঘটনাস্থলে মানুষের চাহিদা বেশুমার। খাবার, পানি, চিকিত্সাসেবার প্রয়োজনীয়তা খুবই তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে এবং সেটা আশু মনোযোগ দাবি করে। সবচেয়ে অপ্রস্তুত একটি দেশের ওপর বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পড়ার ফলে যে ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।
এই শক্তিশালী ছবিগুলো বেদনার কথা স্পষ্ট করে বলছে। তাদের ব্যথা, নিরাপত্তাহীনতা, ভয়, ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে যাওয়া, চিরদিনের জন্য হারানোর অনুভূতি কোথাও জমা থাকবে না।
যদি বিশ্বের বিবেক বলে কিছু থাকে তাহলে সেটা দেখানোর সময় এখন। আমাদের চোখের সামনে চলা আধুনিক জমানার সবচেয়ে বড় এই অবিচারকে মুখ বুঝে সহ্য করতে পারি না। আমরা যদি নিজেদের এই জবাবদিহি করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের সন্তান বা সন্তানদের সন্তানরা আমাদের প্রশ্ন করবে— কীভাবে আমরা এটা ঘটতে দিয়েছি? এ প্রশ্নটা আমাদের সারা জীবন নাড়িয়ে যাবে।
অনুবাদ: সাবিদিন ইব্রাহিম




