একটা মরুশেয়াল, বালিরাশি ও তারার মেলা, একটা বাওবাব গাছ ও সাহারা মরুভূমির যাযাবরদের চেহারা ঢাকা পাগড়ি তাগেলমাস্তের সমান দীর্ঘ স্কার্ফ বাতাসে ওড়ানো একটা বালক, আন্তোয়নে দে সেইন্ট এক্সুপেরি রচিত দ্য লিটল প্রিন্স পড়া শেষে পাঠকের প্রিয় হয়ে ওঠা অল্প কিছু দৃশ্যের নজির। পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমির বুকে জরুরি অবতরণের পর দৈত্যাকার অ্যাস্ট্রয়েড থেকে আসা ছোট ছেলের দেখা পাওয়া এক পাইলটকে নিয়ে শিশুদের প্রিয় এ ক্ল্যাসিকটির আওতা খোদ সাহারা মরুভূমির মতোই ব্যাপক।
১৯৪৩ সালে ফরাসি ভাষায় লে পেতিত প্রিন্স নামে প্রথম বেরোনোর পর এ বছর ৩০০তমবারের মতো অনূদিত হয়েছে গল্পটি। উত্তর আফ্রিকার যেসব ভাষায় এটি বেরিয়েছে, সেগুলোর ভেতর রয়েছে মরোক্কো, তিউনিসিয়া ও আলেজেরিয়ার দরিয়ার (স্থানীয় আরবি) পাশাপাশি আলজেরিয়া কাবিলে ও তুয়ারেগ তামাশেক ভাষা। কেবল গত দশকেই মরোক্কোর আমাযিগ বা বার্বারদের তামাজাইট ভাষায় দু-দুটি তর্জমা বেরিয়েছে, একটি ২০০৫ সালে স্থানীয় তিফিনাগ হরফে ও আমনুকাল মেইয়িন অন্যটি ২০০৭ সালে লাতিন হরফে।
‘দেখামাত্র মরুভূমির প্রেমে পড়ে গেছি আমি ও পাইলটের ডানা পেয়েই সেটা দেখে নিয়েছি’— লিখছেন আন্তোয়নে দে সেইন্ট এক্সুপেরি। হয়েছে ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি নাগাদ ফ্রান্স ও সেনেগালের ভেতর সংযোগ স্থাপনকারী ডাকপথের উত্তর আফ্রিকার অংশের মাধ্যমেই তার আকাশ থেকে দেখা সাহারার ছবির শুরু।
বইটি বেরোনোর প্রায় ৭৫ বছর পর এখনো মঞ্চ ও চলচ্চিত্রের জন্য নতুন নতুন অভিযোজন ঘটছে প্রায়ই। একটি অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র রূপ ২০১৫ সালে অস্কারের ফরাসি সমতুল সিজার পুরস্কারও পেয়েছে।
বন্ধুদের কাছে ‘সেইন্ট এক্স’ নামে পরিচিত সেইন্ট এক্সুপিয়েরি স্রেফ একান্ত ভাবনার সুবাদেই মরুভূমির এমনি সব ইমেজের দেখা পাননি। ১৯২৬-২৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে সিঙ্গল ইঞ্জিন দুই আসনবিশিষ্ট বিমান চালিয়ে সেনেগালের ডাকারকে দক্ষিণ ফ্রান্সের তুলোজের সঙ্গে সংযুক্তকারী ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডাকপথের উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে উড়াল দিয়েছিলেন তিনি। এ পথের নানা ছোটখাটো উপকূলীয় পোস্টে অবস্থানের সময় দ্য লিটল প্রিন্স যেসব ইমেজের জন্য তিনি বিখ্যাত, সেসব বহু পার্থিব প্রদর্শনীর ওপর দিয়ে উড়েছেন, সেগুলোর মাঝে থেকেছেন। নিজের দেখায় তিনি এত বিমুগ্ধ ছিলেন যে, আন্দাজ ১৫ বছর পর নিজের বই রচনা ও অলঙ্করণের কাজে হাত দিয়ে সেগুলোর কথাই স্মরণ করেছেন।
পাঠকরা দ্য লিটল প্রিন্স সম্পর্কে তাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা টানেন। মরোক্কানদের ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে খাটে, এ বইয়ে আপনার দেশটিকেই বেশি করে দেখে ওরা। স্রেফ বালি ও নক্ষত্রপুঞ্জই নয়, বরং বিচিত্র পোশাকের আগন্তুককে দেখে থতমত খাওয়া ছিটকে পড়া বিমানচালকের চোখে দেখা ল্যান্ডস্কেপও।
‘ভুলে যাবেন না, এ গল্পটা মরুভূমি সফরে দেখা মেলা যাযাবরদের অনুপ্রাণিত কিংবা শোনানো হয়ে থাকতে পারে’— বলেছেন মরোক্কোর অন্যতম সাংস্কৃতিক কর্মী ও তামাজাইট ভাষায় দুজন অনুবাদকের একজন লার্বি মৌমৌচ। যদিও সেইন্ট এক্সের কাছে সরাসরি বিশেষ কোনো তুয়ারেগের আক্ষরিকভাবে দ্য লিটল প্রিন্সের কাহিনী বয়ান করার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবে মরোক্কোর অনেক শিক্ষক ও অভিভাবকই দুনিয়ার আরো বহু দেশের মতো শিশুদের বইটি পড়ে শোনান। কিন্তু মৌমৌচ বিশ্বাস করেন যে, আমাযিগ শিশুরাই বইটির পাতায় পাতায় নিজেদের বেশি খুঁজে পায়।
‘হ্যাঁ, খোদ গল্পটা সর্বজনীন হতে পারে, তবে একটা ব্যাপার নিশ্চিত: ‘আমরা আমাযিগরা এর পটভূমির সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠতা অনুভব করি,’ নিজ বাড়িতে দাদা-দাদির মুখে তিনি ও তার দেশের মানুষ এ গল্প শুনেছেন বলে উল্লেখ করেছেন অনুবাদক। পটভূমির সঙ্গে আমাদের আমাযিগ লোককাহিনীর অনেক মিল আছে। ‘লিটল প্রিন্স’ তর্জমা করতে আমি যে শব্দটি প্রয়োগ করেছি— আমনুকাল— সেটা গোত্রীয় সর্দারের সঙ্গে হুবহু মেলে।
স্বয়ং সেইন্ট এক্সের প্রতিভূ দ্য লিটল প্রিন্সের কথক-বৈমানিক প্রথম দেখার পর তার বন্ধুর তোলা নানা প্রশ্নের কথা লিখছেন: “আমার প্লেনটা প্রথম দেখে সে জানতে চাইল, ‘ওটায় করে এসেছ তুমি? কীভাবে? তুমি কি আসমান থেকে পড়েছ?’ ভদ্রতা করে বললাম, ‘হ্যাঁ।’ ‘কি মজার’, জবাব দিল সে। ‘তাহলে তো খুব বেশি দূর থেকে আসোনি।” মুরদের মতোই গ্রহান্তরে ঘুরে বেড়ানো রাজকুমারের কাছে বিধ্বস্ত প্লেনটা বাহন হিসেবে সবচেয়ে শ্লথ উটের মতোই অনাকর্ষণীয় ছিল।
‘যে জিনিসটা মরুভূমিকে অনন্য করে’— বলল ছোট রাজকুমার, ‘সেটা হলো কোথাও একটা ঝরনা লুকিয়ে রেখেছে এটা।’
[আন্তোয়নে দে সেইন্ট এক্সুপেরি, দ্য লিটল প্রিন্স]
উট নয়, একটা নিশি শেয়ালকেই মরুভূমির সেরা আমাযিগ প্রতীক হিসেবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন মৌমৌচ। তিনি উল্লেখ করেছেন, রাজকুমারের সঙ্গে শেয়ালের ঘোরানো, বৈপরীত্যমূলক আলাপ, সে মুরগি শিকারের সময় মানুষ তাকে শিকার করে বলে নালিশ জানানো এবং চোখ দিয়ে নয়, হূদয়বান কেউই দেখতে পায় বলা আমাযিগ গল্প বলার প্রচলিত ধরন।
একমত প্রকাশ করেছেন তিফিনাগ হরফে দ্য লিটল প্রিন্সের অনুবাদক লাহবিব ফুয়াদ। খুদে অতিথির কখনো ‘সাপের সঙ্গে, কখনো ফুলের সঙ্গে, তারা [আর] অগ্নিগিরির সঙ্গে কথা বলার বাস্তবতা... আমাযিগ মিথোলজি ও সৃষ্টিকাহিনীর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়’— আগেলদান আমেযযেন নামে বইটি বেরোনোর সময় বলেছেন তিনি।
মরোক্কার বহুল প্রচারিত নৃমনোবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিক গিতা এল খায়াতের দ্য লিটল প্রিন্সের মারোকোনাইট বা ‘মরোকীয়-ভাব’ সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। মরোক্কোর অন্যতম নেতৃস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা এডিশন্স আইনি বেন্নাইয়ের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এর আধুনিক প্রমিত (ধ্রুপদী) আরবি ও মরোক্কান দরিয়া তর্জমা— এ দুটিই বের করেছেন।
“একে আমি স্থানীয় আরবিতে অনূদিত হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই মনে করি, বিশেষ উল্লেখের দাবিদার একটি বই। কারণ এ ধরনের কাহিনী মায়ের পক্ষ থেকে শিশুর জন্য একটি উপহার ও আমার কাছে ‘দুধের ভাষায়’ এটি পড়া উচিত”— বলছেন এল খায়াত। তবু তার অর্থিক পৃষ্ঠপোষকদের প্রথমে ধ্রুপদী আরবিতে প্রথম বের করতে চাওয়াটা দুঃখজনক। ‘এমনকি যারা শিশুদের জন্য এর গুরুত্বের কথা বলেন, তাদের অনেকেই আনুষ্ঠানিক ডিসকোর্সের ভাষায় লিখিত হওয়া দেখতে চান, যেন বড়দের জন্যই তুলে ধরা হচ্ছে’— ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
‘আসলে আমার মাতৃভাষা দরিয়া বা রাবাতে অনূদিত হওয়াই চাইতাম আমি’— খেই ধরেছেন তিনি, ‘আমাদের বিশেষ মাতৃভাষাকে ছেঁটে ফেলা জাতীয় দরিয়া ভাষার চেয়ে কেবল আমার জন্মশহরেই ধার করা বহু স্প্যানিশ ও ফরাসি শব্দ নিয়ে বলা হয় এ ভাষা।’
একজন মেইল পাইলটের বাধ্য হয়ে মরুভূমিতে অবতরণ, ছোট্ট রাজকুমারের ভাষায়— ‘ওন নে সেইত জাতাইস’ (‘কেউ বলতে পারে না’)— মসৃণ বা কঠিন, কোনটা হবে একেবারে শেষ মুহূর্ত ছাড়া বলা মুশকিল। কিংবা সেইন্ট এক্সের ভাষায়, ‘উড়াল দেয়ার অলৌকিক দিকটা হচ্ছে, মানুষকে তা সরাসরি রহস্যের প্রাণকেন্দ্রে মিশিয়ে দেয়।’ কিন্তু সে রহস্য ভেদ করতে, আগে গোত্তা খাওয়ার পর বেঁচে থাকতে হবে। স্মৃতিকথায় সেইন্ট এক্স যেমন লিখেছেন:
‘দেখামাত্র মরুভূমির প্রেমে পড়ে গেছি আমি এবং পাইলটের ডানা পেয়েই সেটা দেখে নিয়েছি... যাযাবররা আমরণ বালির বিশাল গুদাম রক্ষা করবে, যেন তা স্বর্ণকণার রত্নভাণ্ডার। এবং আমরা, আমি আর আমার কমরেডও মরুভূমিকে ভালোবেসেছি, কারণ ওখানেই আমরা আমাদের জীবনের সেরা বছরগুলো কাটিয়েছি।’
একটা উন্মুক্ত ককপিটওয়ালা ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতিবেগের ব্রিজু ১৪ বাইপ্লেনে সাহারার ওপর দিয়ে ওড়া পাইলটের প্রথম পেশাগত দায়িত্ব ছিল। বেশির ভাগ সময় তলোয়ারধারী একজন তুয়ারেগ তাকে সঙ্গ দিয়েছে। কখনো বিক্ষিপ্ত বসতিপূর্ণ পাহাড়ে নামার বেলায় দেহরক্ষীর ভূমিকা রাখার কথা ছিল তার।
দুনিয়ার সুন্দরতম বস্তুগুলো দেখা কিংবা স্পর্শ করা সম্ভব নয়, মন দিয়ে সেগুলো অনুভব করা হয়।
[আন্তোয়নে দে সেইন্ট এক্সুপেরি, দ্য লিটল প্রিন্স]
ফ্রান্স তখনো গোটা উত্তর আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শক্তির বিস্তার ঘটাচ্ছে এবং মরোক্কো, নাইজার ও আলজেরিয়ার বার্বার তুয়ারেগ নেতৃত্বের বিরোধিতার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব বিদ্রোহের খবর ১৯২৪ সালের ফ্রেঞ্চ ফরেন লিজিয়নের মরুযুদ্ধ সম্পর্কিত উপন্যাস বিউ গেস্তেতে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে। যুদ্ধ ও রক্তপাতের এ কাহিনীর প্রশান্ত প্রতিবয়ান হিসেবে দ্য লিটল প্রিন্স পড়া যেতে পারে।
১৯২০-এর দশকের শেষ দিকের দুটি বছর মৌরিতানিয়ার পোর্ট এতেইন্নে (এখন নৌয়াদিবু) ও ভিলা সিসনেরোস (বর্তমানে দাখলা) এবং দক্ষিণ মরোক্কোর কেপ জুবি (এখন তারফায়া) বিভিন্নভাবে পোস্টেড থেকে সেইন্ট এক্স মরুভূমিকেই নিজের ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন। এখানে স্টেশন চিফ হিসেবে ১৮ মাস কাজ করেছেন তিনি।
১৯৩০-এর দশকের গোড়ার দিকে মালির টিম্বাক্টুতে একটা সরাসরি বিমানপথ রেকি করে এবং ক্যাসাব্লাঙ্কা পোর্ট এতেইন্নে লাইনে রাতের যাত্রা করে মরোক্কোয় ফিরে আসেন তিনি। ক্যাসাব্লাঙ্কায় অবতরণের পর পেতিত পৌসেত রেস্তোরাঁয় ডিনারের অপেক্ষায় থাকার সময় আঁকা পেন্সিল স্কেচগুলো এখনো ওখানকার দেয়ালে সাঁটা রয়েছে।
বিভিন্ন আউটস্টেশনে, সেইন্ট এক্স লিখেছেন, ‘শান্তির এলাকায় একবারও পা না ফেলে এক স্টকেড থেকে আরেক স্টকেডে নিজেকে বালির বন্দি’ বলে মনে হয়েছে... এমনি বিচ্ছিন্নতা বিচিত্র অনভূতি উসকে দিয়েছে। এখনো আমার ওই অনুভূতিটুকু জানা। মরুভূমিতে কাটানো তিনটি বছর এটা শিখিয়েছে আমাকে।’
১৯২৬ সালে ভিলা সিসনেরোসের পশ্চিমে রিও ডি ওরোয় প্রথম চাকরিস্থলে যোগদানের উদ্দেশে যাওয়ার পথে যাত্রী হিসেবে প্রথম ফ্লাইটেই বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার স্বাদ পান সেইন্ট এক্স। কেউ চোট পায়নি। পাইলটকে তুলে নিতে একটা সাহায্যকারী বিমান এসে হাজির হয়েছিল। ‘মাত্র দুই রাত আগেও তুলোজে একটা রেস্তোরাঁয় ডিনার করছিলাম আমি’— স্মৃতিকথায় লিখেছেন সেইন্ট এক্স।
‘কিন্তু তা সত্ত্বেও এখানে আমার অনুভূতিটুকু ছিল ভীষণ গর্বের। জন্মের পর প্রথমবারের মতো জীবনটা আমার হয়েছিল... বালির সমুদ্র ছিল মনোহর। সন্দেহাতীতভাবেই রহস্য ও বিপজ্জনক ছিল সেটা। শূন্যতা থেকে নয়, বরং রহস্য, রোমাঞ্চের নৈকট্য থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল এর নৈঃশব্দ্য। রাত ঘনিয়ে এল। ধীরে ধীরে উন্মোচিত একটা কিছু আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল— খোদ ভালোবাসার মতো সাহারার প্রতি ভালোবাসা।’
বইটিতে ছোট্ট রাজপুত্র নীরবতা সুন্দর বলার সময়ই সেইন্ট এক্সের কথকের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করছেন। ‘ঠিক কথা’— বলছেন তিনি, ‘আমি সবসময়ই মরুভূমিকে ভালোবেসেছি। বালিয়াড়ির চূড়ায় বসে কিছুই না দেখে, না শুনে থাকতে পারেন, কিন্তু তবু শূন্যতার ভেতরই একটা কিছু নড়ে ওঠে, ঝিলিক মারে।’ রাজপুত্র তার মহাজাগতিক সফরে যেসব বিচিত্র জিনিসের মুখোমুখি হয়েছে, তার ভেতর রয়েছে মহাসাগর ও মরুভূমির খোঁজ দিতে পারার মতো একজন অভিযাত্রীর অপেক্ষায় থাকা মানচিত্রের স্তূপ হয়ে থাকা ডেস্কে বন্দি ঘাসফড়িং। ‘প্রমাণ তুলে ধরতে অন্বেষণ করতে হয়’— বলছে ঘাসফড়িং। ‘মহাসগর ক্বচিত্ নিজেকে পানিশূন্য করে।’
তুমি, কেবল তুমিই তারার অধিকার পাবে, আর কেউ নয়... কোনো একটা তারায় থাকব আমি। সেগুলোর কোনো একটায় আমি হাসব। আর তখন রাতের আকাশের দিকে তাকালে মনে হবে, সব তারাই বুঝি হাসছে।
[আন্তোয়নে ডি সেইন্ট এক্সুপেরি, দ্য লিটল প্রিন্স]
সেইন্ট এক্স নিশ্চয়ই এককালে সাহারার প্রাগৈতিহাসিক ভূমধ্যসাগরে ফিকে হয়ে যাওয়া ঝিনুকের খোলে ভরা বালির বিস্তারে হাঁটার সময়ের কথাই মনে করছিলেন।
১৯৩৫ সালে নিউ ইয়ার্স ইভের দুদিন আগে সেইন্ট এক্স প্যারিস-সায়গন পথে নতুন এয়ারস্পিড রেকর্ড সৃষ্টির চেষ্টা করতে গিয়ে ফের দুর্ঘটনায় পড়েন। এ যাত্রা মিসরের ওয়াদি ন্যাত্রানে। এ অভিজ্ঞতাই সম্ভবত তাকে জীবনরক্ষাকারী হিসেবে ছোট্ট রাজপুত্রের চিন্তা জুগিয়েছিল। চারদিন বাদে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে এবং তৃষ্ণার কারণে সৃষ্ট বিভ্রমের মোকাবেলা করার সময় তিনি ও তার কো-পাইলট এক নিঃসঙ্গ বেদুইনের হাতে রক্ষা পান।
‘তায়ারা (বিমান) বুম বুম!’ ফাটা ঠোঁটে এর বেশি কিছু বলতে পারেননি তিনি। ঘোরের ভেতরই বাড়িয়ে ধরা গোটস্কিনে চুমুক দেয়ার পর বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পেছনে ফেলে আসা খনিতে পৌঁছে দিতে বেদুইনকে একটা চিরকুট লিখে দেন: ‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গাড়ি বা নৌকা নিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
পরাবাস্তব দিনগুলোর এটা ছিল কেবল প্রথম দিন। গ্রেট পিরামিডের অল্প দূরে থাকতেই রেসকিউ ভেহিকলের তেল ফুরিয়ে যায়। এখানেই ২০ বছর পরে খুফু সোলার শিপ মাটিচাপা দেয়া অবস্থায় পাওয়া গেছে। গিযার মিনা হাউজ হোটেল থেকে সেইন্ট এক্স ফরাসি দূতাবাসে ফোন করার পর সেক্রেটারি রাষ্ট্রদূতকে মাঝরাতের পর আসায় ফোনটা নাকচ করে দিতে সতর্ক করে দিয়েছিলেন।
দ্য লিটল প্রিন্সও একই রকম দৃশ্য দিয়ে শুরু হয়েছে:
ছয় বছর আগে সাহারা মরুভূমিতে আমার প্লেন নিয়ে একটা দুর্ঘটনায় পড়ি আমি। আমার ইঞ্জিনের একটা কিছু ভেঙে গিয়েছিল... কোনোমতে সপ্তাখানেক টিকে থাকার মতো সামান্য পানি ছিল আমার কাছে... তো প্রথম রাতে মানববসতি থেকে হাজার মাইল দূরে বালির ওপর ঘুমাতে গেলাম আমি। মাঝসাগরে জাহাজডুবির শিকার কোনো নাবিকের চেয়েও ঢের বেশি বিচ্ছিন্ন ছিলাম।
মৌরিতানীয় উপকূলের ব্যাংক ডি’আর্গিনের কাছে কাজ করতেন সেইন্ট এক্স। নিকটস্থ বিখ্যাত জাহাজডুবির ঘটনাস্থলটি লুভ্রর থিওডর গেরিকাল্টের পেইন্টিং ‘দ্য র্যাফট অব দ্য মেডুসা’য় তুলে ধরা হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই তার জানা ছিল সেটা। দক্ষিণ থেকে ডাকারে ডাক বহন করে নেয়ার পথে নিশ্চয়ই ওদিকের জলে নিচু দিয়ে উড়ে গেছেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবসানের কাছাকাছি সময় ১৯৪৪ সালের জুলাইয়ে ভূমধ্যসাগরের ওপর দিয়ে পর্যবেক্ষণ বিমানে ওড়ার সময় তৃতীয় বিমান দুর্ঘটনাই মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায়। এর কারণ কখনো জানা যায়নি। তবে জীবনের সেরা মুহূর্তগুলো যেভাবে কাটিয়েছিলেন, ঠিক সেভাবেই মারা যান তিনি। যদিও তিনি সবসময় বলতেন যে, সাগরের চেয়ে বালিই তার পছন্দ। (একবার এক উপকূলীয় এয়ারস্ট্রিপ থেকে টেকঅফের পর ইঞ্জিনের গোলমাল তাকে পানির ওপর দিয়ে বিপজ্জনক কম উচ্চতায় উড়তে বাধ্য করেছিল। পরে তার যাত্রী জানিয়েছেন যে, কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে নজর দেয়ার বদলে সেইন্ট এক্স স্কেচপ্যাড বের করে গভীর সাগরের ডাইভার হিসেবে তাদের ছবি আঁকা শুরু করেন।) অন্তত পরে যেমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি, বালিতে বিমান বিধ্বস্ত হলে ডোবার ঝুঁকি থাকে না। মরুভূমির যেকোনো তুয়ারেগ বা এমনকি জলহীন অ্যাস্ট্ররয়েড থেকে হাজির হওয়া খুদে অতিথিও নির্ভুল বুঝতে পারবে সেটা।




