যদিও প্রতিটি আষাঢ়ে মুহিব বর্ষারে মনে মনে বিচড়াইতো কালিদাসের যক্ষের মতন কিন্তু এইবার আষাঢ়ে আর পারে নাই। যতবার তারে নিয়া বুকের ভেতর একটা ঘনঘটা বাধাতে চাইছে, ততবার তার বউ বুকের ওপর হাত দিয়া মেঘ সরাইছে। সে বউরে কিছুই বলতে পারে নাই। তখন কেবল তার প্রাইমারি দিনের কথা মনে ভাসে। প্রাইমারি দিন। রচনা পড়ার কাল। ওইসব দিনে বর্ষাকাল তার মনে ধরে যায়। তারপর ফাইভের বৃত্তিতে একটি ‘বর্ষণমুখর সন্ধ্যা’ রচনাটা পুরা দেড়টা ঘণ্টা লেখার পরও মনে হইছিল সাধ মিটে নাই। তখন পাশ থাকি কে যেন কলমের টোকা দিয়া বলেছিল, আর কত রচনা লিখবি, সময় যায় তো! সে কথা তো বর্ষাই বলেছিল!

কত আগের কথা, ওইগুলা এখনো মাথার ভেতর জমাট বরফ হয়া আছে। মাঝে মাঝে গলে ওইসব স্মৃতি। তখন গলে যাওয়া স্মৃতিতে আউলা হয় মুহিব।

বই আর পরীক্ষার খাতা থাকি বাহির হয়া বর্ষা তারে নিরাশ করে নাই। সে বর্ষার প্রেমে পড়লে বর্ষাও তার প্রেমে পড়ে। আর আজ এই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় তার স্মৃতি গলতে থাকলে সে ঘর থাকি বাহির হয়া যায় বর্ষার খোঁজে। তার মন বলে, বর্ষা এই শহরে থাকে।

বউরে সে কিছুই বলে না। শুধু জুতাজোড়া পায়ে দেয়ার পর বউ ছাতাটা হাতে দেয়। আর তখন বউয়ের চোখে কালো মেঘ ঘন হয়া আসে আর আসমানের ডাক ব্যাপারটারে আরো উসকায়া দেয়।

ঝুমঝুম বৃষ্টিতে চশমার কাচ ঘোলা হয়া গেলে সে ঘোলা পানিতে পা বাড়ায়। ছাতাটা খোলে না। তখন ঘোলা চোখ, ঘোলা পানি আর মাথার ভেতর প্রাইমারির স্মৃতি ঝুমঝুম করে নামে। স্মৃতিকাতর কিংবা স্মৃতিরা কাতরায় এমন একটা ঘনঘটায় আষাঢ়ের সন্ধ্যাটা নিস্তেজ হয়া পড়ি থাকে কদম গাছের পাতায় পাতায়। তখন মুহিব পথ হারায় কিংবা বর্ষার জলে ভেজে। ওইসব দিন কত আগে পর হয়া গেছে। ‘এক মন এক তন এক রঙ্গরূপ।’ কদম ফোটার কাল। খানিক সাদাকালো অনুভূতি ছাড়া আর কি! মুহিব, ও মুহিব আমারে কয়টা কদম পাইড়া দেও না। এমন আকুতি কিছুটা প্রেমের কিছুটা বুনো অধিকার নিয়া বারবার কানের কাছে ঘুরপাক খায়। সত্যি কি কেউ এমন আকুতি ভরা ডাক দিয়া তার কাছে কদম চাইছিল নাকি? কদম দিব, কিন্তু বৃষ্টি আইলে আমার সাথে ভিজবি, এই একটা শর্তে। তারপর আষাঢ় যায়, শ্রাবণ যায়, বৃষ্টি নামে না। এমন হয় নাকি? এদিক কদমও ফুরায়। মুহিব, ও মুহিব আমারে কয়টা কদম পাইড়া দেও না— এই কথা আর তার কানে আসে না। কই গেল সে? যে ডাক দিত তার নাম বর্ষা। সে বছর আষাঢ়-শ্রাবণে বৃষ্টি নামে নাই। কদম ফুরায়ে গেলে বর্ষাও আর তার কাছে কোনো আকুতি করে নাই। তুমি প্রতিদিন কদম দিয়া কী করো? তার এমন কথায় বর্ষার গলা রিনঝিন করে, কদম আমার ভাল্লাগে। তখন কেবলই মনে হয়, কদম ক্যান সব মাসে হয় না? কদম কি গোলাপের চাইতে ভালো? গোলাপ কি সারা বছর হয়? তোমার গোলাপ ভাল্লাগে না? আবার রিনঝিন ওঠে, গোলাপ তার ভাল্লাগে না। তখন ইস্ করা ছাড়া আর কোনো কিছুই করার থাকে না। আরো একটা বছর তারপর বর্ষাকাল। কদম ফোটার কাল। সে অপেক্ষা করে।

বর্ষার জলে ভিজতে ভিজতে এমন অপেক্ষায় অপেক্ষায় সে নিস্তেজ হয়া গেলে পাড়ার কেউ না কেউ তারে বাসায় পৌঁছায়া দিয়া আসে। তারে নিয়া এমন ঘটনা আষাঢ়ের সন্ধ্যায় প্রায়ই ঘটতে থাকে। কোনো কোনো সন্ধ্যায় তার বউ বাহির হয়া খোঁজে। কখনো কখনো অন্য কেউ দিয়া যায়।

আষাঢ়ের সন্ধ্যায় বাসা থাকি বের হওয়া নিয়া তার বউ বাধা দেয় না। হয়তোবা বাধা দেয়ার চেষ্টা করছিল কিন্তু তাতে তার পাগলামি বাড়ার চান্স আছে— ডাক্তারের এমন পরামর্শে আর তা করে নাই। তো এমন এক বর্ষার সন্ধ্যায় ভিজতে ভিজতে নিস্তেজ হয়া পড়লে মুহিবের সাথে দেখা হয়া যায়। তখন বর্ষা নিয়া যে কবিতাটা মনে মনে পাখা মেলছিল, তা হাওয়ায় মিলায়। মুহিবরে নিয়া কী করা যায়, এমন একটা বিপাকের মধ্যে পড়লে এক পথচারী সামনে দিয়া যায় কিন্তু সে ব্যাপারটা দেইখাও না দেখার ভান করে। এই রকম একটা অচেনা মফস্বলে ঝুম বৃষ্টির রাতে মানুষের আনাগোনা একেবারে শূন্য হয়ে গেলে মুহিবের নাম-পরিচয় জানার মতন কাউরেই আর পাওয়া হয় না। তখন মোবাইলটা পকেটে বাজতে থাকে। একটা অটোরিকশা আশেপাশে চক্কর দিতে থাকে। আর তখন তারে ডাক দিলে সেই অটোরিকশাওয়ালা মুহিবরে চিনতে পারে। তখন অটোরিকশাওয়ালা বলে, পিরিতের মরা। এমন একটা কথা শোনার পর মুহিবরে নিয়া কবিমন কিছুটা আনচান করে। এই আনচান কবিমন মুহিবরে একা ছাড়তে সায় না দিলে তারে নিয়া অটোরিকশায় বসতে হয়। তখন বৃষ্টি আরো ঝুমঝুম করে নামে। এত ঝুমঝুম করে নামে যে, রাস্তাও ভালো মতন দেখা যায় না। সোডিয়ামের মফস্বলী আলো ঝুমঝুম বৃষ্টির পানিতে ভিজতে ভিজতে চুপসায়া যায়। তখন আর কারো করার কিছুই থাকে না। তো এমন চুপসানো সোডিয়াম আলোর ভেতর দিয়া মুহিবের বাড়ির সামনে অটোরিকশা ব্রেক দিলে মুহিবরে নিয়া নামার পর দরোজায় বেল দিয়া অপেক্ষায় থাকা লাগে। তখন একটা বৃষ্টিমাখা আওয়াজ চারপাশে রিনঝিন করে বলে, কে? তখন দরোজা আপনাআপনি খোলে। দরোজার ওইপাশে নির্বিকার এক নারীর নিষ্পলক চাহনি মুহূর্তের মধ্যে কবিমন ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। তখন নির্বাক হওয়া ছাড়া আর কি-বা বলার থাকে। কিছুটা সম্বিত্ নিয়া কেবল বলতে হয়, রাস্তায় ভিজছিল তাই...। তখন নারী তার পলক ফেলে। আর তখন একটা সংশয় নিয়া দরোজা থাকি সরার জন্য প্রস্তুতি চলতে থাকে। তখন অবস্থাটা এমন দাঁড়ায়, জিন্দেগিতে এমন অপ্রস্তুত হওয়া হয় নাই। আর তখন কানে বৃষ্টিমাখা কণ্ঠ আবার ভাসে, এই শহরে নতুন? মাথা কাত করে জবাব বেরোয় বটে কিন্তু তাতে খায়েশ মেটে না। আর তখন গলা দিয়া অস্পষ্ট আওয়াজ বেরোয়, আজ যাই, অটো দাঁড়ায়া আছে। তখন আরেকদিন আসার কথা দিয়া সেই রাতের নিষ্কৃতি। মনটা বেচেয়ান হয়ে ভাববে, এমন নারী কোনো দিন দেখা হয় নাই। আর তখন আবার কবে তার দেখা পাওয়া যাবে এমন খায়েশ উঁকি মারলে কবিতার নতুন কিছু লাইন মাথার ভেতর পাক দিতে থাকে। কবিতার লাইন, খায়েশ, নির্বিকার চাহনি বৃষ্টির মধ্যে কেবল ঝরঝর করে পড়ে।

ওই রাতের পর বেশ কয়েক সন্ধ্যা মফস্বল শহরের সোডিয়ামের ভেজা আলোতে ঘোরাফেরা করেও মুহিবের দেখা মিলে না। তখন কিছুটা মনমরা লাগে। এমন এক মনমরা সন্ধ্যায় মুহিব ভিজতে ভিজতে নিস্তেজ হয়া আবার হাজির হয়। আর তখন আবার সেই অটোরিকশাওয়ালা চক্কর দিতে থাকে। তারপর আবার সেই অটোরিকশায় মুহিবের বাসায়। আবার সেই নারী, বৃষ্টিমাখা কণ্ঠ, শুধু এবার তার চাহনি নিমীলিত। তখন নিজের পরিচয় দেয়ার পরও সে চিনতে পারে না। আর তখন আপ্রাণ চেষ্টা চলে তারে সেই রাতের কথা মনে করায়ে দেয়ার। তার চাহনিটা প্রসারিত হয়া আপনার ওপর পড়লেই সব খেয়াল পড়বে কিন্তু সেটা আর হয় না। তখন ঝুমঝুম বৃষ্টির মতন হতাশা নামে। আর এই সময় বৃষ্টিমাখা কণ্ঠ থেকে আওয়াজ ভাসে, কাল সকালে চায়ের দাওয়াত। এমন একটা কথায় আবার কবিতার লাইনগুলা মাথার ভেতর চক্কর দিতেই থাকে। পরদিন সাপ্তাহিক ছুটি। আর তখন রাতটা বড়ই বেচেয়ান করে তোলে। এই রকম একটা রাত ফুরানোর পর সকালে আর কোনো কিছুই করার থাকে না, কেবল আগের রাতের কথাটা মাথায় রিনঝিন করে। ওই রকম একটা আষাঢ়ে বৃষ্টির সকালে বের হয়া খায়েশ জাগে হাঁটতে হাঁটতে মুহিবের ওইখানে যাওয়ার। তখন মফস্বল শহরটা শেষ হয়া যায়। শহরটা পুরা একটা চক্কর দেয়ার পরও বাসাটা পাওয়া হয় না। আর তখন আবার শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় হাঁটা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এভাবে সকাল ফুরায়ে দুপুর নামে কিন্তু বাসাটা পাওয়া হয় না। তখন আবার অপেক্ষা করতে হয় সন্ধ্যার। সন্ধ্যায় বৃষ্টি নামলে বাসা থাকি বাহির হয়া মুহিবের খোঁজ চলে রাস্তায় রাস্তায়। কিন্তু মুহিবের দেখা নাই। এমনে কাটতে থাকে সন্ধ্যা, কাটতে থাকে রাত। তারপর একদিন আষাঢ়ের দিন ফুরায় আর শ্রাবণ নামে। শ্রাবণের সন্ধ্যায় রাস্তায় রাস্তায় সোডিয়ামের ভেজা আলোয় মুহিবের খোঁজ চলে। তখন দু-একজন বয়স্ক চশমার ঘোলা কাচ নেড়েচেড়ে ঘোলাটে চোখ নিয়া তাকায়। মুহিবের দেখা নাই। কিন্তু মন মানে না, বাসাটা কীভাবে হারায়? এইভাবে একদিন শ্রাবণ ফুরায়। বৃষ্টিও ফুরায়। তখন কিছুটা আনমনা কিছুটা উদ্ভ্রান্ত হয়া মন বলে, তবে পুরাটাই ভ্রম!    

তখন কোনো এক রাতে সেই নারী স্বপ্নে আসে। তখন আবার আউলা হয় মাথা। মনে পড়ে, কতদিন কবিতা লেখা হয় না! তখন কোনো উপায় থাকে না। বাড়ি বাড়ি মুহিবের খোঁজ চলে। মুহিব বাড়ি আছে? মুহিবের খোঁজ নাই। তখন কেবল একজন, যার বয়সের কোনো গাছ-পাথর নাই, তিন কুল খায়া বসে বসে মরার দিন গোনে, সে মুহিবের নামে মাথাটা ঝাঁকায়। তখন সে বলে, মুহিব আর বর্ষার কথা। মুহিবের সাথে বর্ষার পিরিতি ভালো মতন জমে নাই। কিংবা বলা যায়, বর্ষা মুহিবরে দিয়া আরো আরো কদম পাড়ায়া নেয়ার জন্য প্রেমের ভান করে। তো যখন কদম ফুরায় তখন বর্ষা মুহিবরে আর ডাকে না। আর মুহিব আশায় আশায় দিন গোনে আবার কখন কদম ফোটে। কদম তো বর্ষা ছাড়া ফোটে না। আর মুহিব কেবল বর্ষার অপেক্ষা করে। এমন করে দিন, মাস, বছর গড়ালে মুহিব বাড়তে থাকে, বর্ষাও বাড়তে থাকে। তখন বর্ষার আর কদম ভালো লাগে না। কিংবা বর্ষার কদমের টান আর থাকে না। সে অন্য কিছু চায়। আর মুহিব কেবল কদম ঘিরেই অপেক্ষা করে। এমন একদিন বর্ষা গোলাপ হাতে নিয়া চলা শুরু করে। আর মুহিব কেবল কদমতলায় অপেক্ষা করে। বর্ষার সেই গোলাপের খোঁজ মুহিব রাখে না। এমন করে দিন কাটতে থাকলে একদিন আষাঢ় নামার আগেই কদম ফোটে। কিন্তু সেই কদম আর বর্ষা নেয় না। তার তখন গোলাপ ভালো লাগে। মুহিব প্রতিদিন কদম নিয়া যায় কিন্তু বর্ষারে আর দেয়া হয় না। বর্ষা বের হয় না। এমন করে সময় গড়াতে থাকলে বর্ষার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায় না। মুহিব তখনো কদমতলায় বসে থাকে। এই রকম এক সময় বছরজুড়ে বৃষ্টি নামে। ওই বৃষ্টিতে সারা বছর কদম ফোটে। আর মুহিব সেই কদম নিয়া বর্ষারে খোঁজে। তারপর একদিন বৃষ্টি ফুরায়, কদম ফুরায়। তখন সে দেখে, কদম ফুরায়ে যায় কিন্তু বর্ষার খোঁজ নাই। তখন তার মাথাটা ধীরে ধীরে আউলা হতে থাকে।

এইসব কথা শোনার পর মনে আকুপাকু করতে থাকা প্রশ্নটা বের হয়া যায়, তাইলে মুহিবের ঘরে যে সুন্দরী, সেইটা কে?

কিছু সময় নিরুত্তর থাকার পর কথক আবার বলা শুরু করে, সেই সুন্দরীর খোঁজে সে এখনো বসে আছে।

এই কথা শোনার পর পুরা মাথা আউলা না হয়া উপায় থাকে না। আর তখন কথক তার অসংখ্য ভাঁজ পড়া শরীরটা টানতে টানতে বলে, হইতে পারে এর নাম মায়া!

তখন আকাশজুড়ে মেঘ ঘন হয়া আসে। আর আকাশের দিকে চাহনি দিয়া পূর্বমেঘ ও উত্তরমেঘ খুঁজতে থাকে কবিমন।