প্রচুর পর্বত ও হালকা বনানীতে পূর্ণ আফ্রিকার ছোট্ট রাজ্য লিসোটোয় কিছুদিন হলো আমি বাস করছি। লিসোটোর রাজধানী হচ্ছে মাসেরু। শহরটি জনবহুল নয় একেবারে। তার ভিড়ভাট্টাহীন রাজপথ ধরে সুহূদ মি. মোজাফেলাকে সঙ্গে নিয়ে আমি মি. কাগেতাং কতসোফালাং নাকানের সঙ্গে দেখা করতে চলছি। মি. নাকানে মাসেরু শহরে যে বাড়িটি হাঁকিয়েছেন, তা আকারে বিরাট। ছাঁটা ঘাসের লনের প্রান্তে কলোনিয়েল কেতার ভিলা। পেছনের আঙিনায় তিলতলা বিজনেস আউটলেট। ওখানে একতলায় একটি হলরুমে বসে আমরা তার সাক্ষাতের অপেক্ষা করি। পেশায় মি. নাকানে ব্যবসায়ী। একসময় চালাতেন ছোটখাটো একটি মুদির দোকান। গেল ১২-১৪ বছরে তার তেজারতি, কায়কারবার এমন বিশাল হয়েছে যে, তিনি ২৫-৩০ জন কর্মচারী মাস চুক্তি মাইনে দিয়ে রেখেছেন। নাকানের সঙ্গে আমার পরিচয় স্বল্প। তার স্ত্রী থাবেলাং বনেলো অনেক বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে বয়স্ক শিক্ষার ওপর একটি প্রশিক্ষণে যোগ দিতে আসেন। আমি প্রশিক্ষক হিসেবে সেখানে কাজ করছিলাম। সেই সূত্রে তার সঙ্গে পরিচিত। বনেলো প্রশিক্ষণের পর লিসোটো ফিরে না গিয়ে কীভাবে যেন ইমিগ্রেশনের ঝুট-ঝামেলা চুকিয়ে গ্রিনকার্ড পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন ১০ কিংবা ১২ বছর। তখন তার সঙ্গে আমার মাঝেমধ্যে দেখাসাক্ষাত্ হতো। আমি আমহার্স্ট বলে যুক্তরাষ্ট্রের যে ছোট্ট শহরে বাস করতাম, ওখানে বনেলো বাকুকুকু নামে আফ্রিকান খাবারের রেস্তোরাঁ খুলেছিলেন। রেস্তোরাঁর কাউন্টারে রাখা ছিল চমত্কার কিছু পোড়ামাটির তৈজসপত্র, যা আমেরিকান ক্রেতাদের আকর্ষণ করত। দেয়ালে লাগানো বিশাল একটি ল্যান্ডস্কেপে সূর্যময় সন্ধ্যায় চরে বেড়ানো তিনটি জিরাফের ইমেজও ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে দেখত। লাগোয়া আউটলেটে চলত তার অন্য সাইড বিজনেস, সাজানো থাকত আফ্রিকান হস্তশিল্প, তথা কাঠ ও পাথর কুঁদে তৈরি মূর্তিরাজি। এগুলোর পেছনে ঝোলানো থাকত চমত্কার কিছু মুখোশ। এসব পণ্যসম্ভারের জন্য তার রেস্তোরাঁর ব্যবসা চলছিল জমজমাট। বনেলো একবার তার স্বামী নাকানেকে মাসখানেকের সাময়িক ভিসার বন্দোবস্ত করে নিয়ে এসেছিলেন আমহার্স্টে। তখন তাকে আমার সঙ্গে সামাজিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সে পরিচয়ের সূত্র ধরে নাকানে যদি আজ আমাকে চিনতে না পারেন, তাহলে তাজ্জব হব না একেবারে।
নাকানের ব্যাপারে আমার আগ্রহ কম। আজ আমি মূলত বনেলোর সঙ্গে দেখা করতে তার পারমিশন নিতে এসেছি। কয়েক বছর আগে বনেলোকে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন বিভাগ কাগজপত্রে জালিয়াতির অভিযোগে দেশত্যাগে বাধ্য করে। তিনি ফিরে আসেন তার পৈতৃক নিবাস লিসোটোর মাসেরু শহরে। আমি লিসোটোয় মূলত ফিরে এসেছি আমার জানাশোনা মানুষজন, মোজাফেলা, কিংবা বনেলো সবই— কে কেমন আছেন, তা সরেজমিন খতিয়ে দেখতে। আমার আগ্রহ সময়ের চলমান প্রবাহে তারা কে কতটা বদলে গেছেন, তার একটি পরিষ্কার খতিয়ান পেতে।
আমার সঙ্গে প্রাইভেট ডিটেক্টিভ মোজাফেলাও এসেছেন। আমি নাকানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছি জানতে পেরে মোজাফেলা তার গেল ১২-১৪ বছরে ব্যবসার বিস্তার সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য সংগ্রহ করে লাল ফিতা দিয়ে পেঁচিয়ে একটি ফাইল তৈরি করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আমহার্স্ট শহরে বনেলোর জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে ব্যাপকভাবে আগ্রহী। আমি তাকে কথা দিয়েছি যে, তথ্যগুলো গুছিয়ে লিখে তার হাতে দেব নাকানের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত্ হওয়ার আগেই। তাহলে তিনি বিশ্লেষণ করতে পারবেন, আদতে কোন পরিস্থিতিতে বনেলোর জীবনে কী ঘটেছে?
নাকানের সঙ্গে আমাদের দেখা করার ডাক আসছে না। তার অপেক্ষায় আমাদের আগে এসে আরো কয়েকজন মানুষ অনেকটা ডাক্তারের চেম্বারে অপেক্ষা করার মতো হলরুমে বসে আছেন। হাতে সময় আছে, তাই এ সুযোগে আমি বনেলো সম্পর্কে স্মৃতিভিত্তিক যে রিপোর্ট তৈরি করেছি, তা খতিয়ে দেখি। অনেক বছর আগে যখন বনেলো আমহার্স্ট শহরে প্রশিক্ষণে আসেন, তখন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর সন্ধেবেলা ড্যান্সের আয়োজন হলে তিনি শুধু নৃত্যকলাই নয়, সঙ্গী ড্যান্স পার্টনার পুরুষটিকে সুযোগমতো একাধিকবার চুমো খেয়ে ঈষত্ আলোচিত হয়েছিলেন। সে যুগে তার শরীরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অঙ্গ ছিল দীর্ঘ পা জোড়া। তিনি সাপের মোটিফ আঁকা টাইটস পরে আসরে নেমেছিলেন। নৃত্যকলায় তার ঊরু যুগলের কাজ এতই অসাধারণ ছিল যে, ডিসকো বাতির বর্ণাঢ্য আলোয় মনে হচ্ছিল, যুগল শঙ্খচূড় যেন মেতেছে মিথুন মুদ্রায়। ড্যান্সিং ইভেন্টের পর আমরা রাত কাটাই একটি ডরমিটরিতে। রাত ১২টার দিকে কামরায় ফেরার সময় দেখি, বনেলো লাটভিয়া থেকে আসা আরেক সুপুরুষের বাহুলগ্না হয়ে টেবিলল্যাম্প নিভিয়ে বসেছেন লবির কাউচে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই তিনি ভোদকার বোতল হাতে নিয়ে গোলাপপাশ থেকে সুরভিত জল ঝরানোর মতো ছিটিয়ে দিয়েছিলেন কড়া ধাঁচের কিছু সুরা।
বাকুকুকু নামে রেস্তোরাঁটি খোলেন তিনি বছর দুয়েক পর। ওয়ার্ক পারমিট পেয়ে তিনি প্রথম কাজে নামেন একটি নাইটক্লাবের টপলেস বারে। তার দৈহিক সৌন্দর্যের মুগ্ধ দর্শক আমিও ছিলাম। তবে দূর থেকে তাকে চাক্ষুষ করেছি, খুব কাছে ভিড়িনি কখনো। আমার পরিচিত এক সুহূদ একদিন নাইটক্লাব থেকে ফিরে এসে বলেছিল, পরিচিতা বলে নগ্নবক্ষা বনেলোর দিকে তাকাতে তার লজ্জা হচ্ছিল। তিনি পানপাত্রে জ্যামাইকান রামের সঙ্গে ডাবের জল মিশিয়ে তাকে পরিবেশন করতে এলে সে অন্যদিকে মুখ ফেরায়, তখন নাকি বনেলো তার গালে মৃদু ঠোনা মেরে বলেছিলেন, ‘হানি, ইউ ক্যান লুক অ্যাট মি, আফ্রিকান মেয়েদের বুকের গড়ন এ রকমই হয়।’ বাকুকুকুতে জমজমাট ব্যবসা তার চলেছিল অনেক বছর। তারপর একদিন পুলিশ নাইটক্লাবে মুখোশ নৃত্যের আসরে হানা দেয়। কয়েকটি মুখোশ কেটে গোয়েন্দারা ভেতর থেকে বের করে আনে ড্রাগসের চালান। বনেলো গ্রেফতার হন। কিন্তু মুখোশটি যে তার দোকান থেকে বিক্রি হয়েছে, পুলিশ তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। উকিলের শক্ত সওয়াল-জবাবের পর বনেলো বেকসুর খালাস পেয়ে আবার বাকুকুকুর ক্যাশ কাউন্টারে বসেন। কিন্তু এক সপ্তাহের ভেতর ইমিগ্রেশন বিভাগ পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে আবিষ্কার করে, গ্রিনকার্ড পাওয়ার জন্য তিনি যেসব কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, তার অনেকগুলোই ছিল জালিয়াতি। তো বনেলোকে প্লেনে তুলে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়।
মোজাফেলাকে দেয়ার জন্য আমি বনেলোর আমহার্স্টের দিনযাপন নিয়ে যে নোট করেছি, তা দেখছিলাম। একজন কর্মচারী এসে আমাদের ডেকে নিয়ে অন্য একটি কামরায় বসায়। সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশিত হয় লেবানিজ কফি ও সুমিষ্ট বাকলবা। এ হলরুমটি আকারে আরো বড়। আমরা যেখানে বসেছি, তার চারদিকে জড়ো করে রাখা খুব পুরনো ডিজাইনের সোফা, কাউচ, মার্বেল পাথরের টেবিল, গ্র্যান্ড পিয়ানো, সোনার গিল্টি করা দেয়ালঘড়ি ও কাঁড়ি কাঁড়ি তৈলচিত্র। মনে হয় আমরা চলে এসেছি পুরনো কোনো অ্যান্টিক বা কিউরিওর আড়তখানায়। ঠিক বুঝতে পারি না, নাকানে এ ধরনের বিচিত্র মালমাত্তা কীভাবে জোগাড় করলেন? আরো আশ্চর্য এ বাসোটো গোত্রের ভদ্রলোকের বৈঠকখানায় লেবানিজ কেতার কফি ও স্ন্যাকস পরিবেশিত হচ্ছে দেখে। মোজাফেলা আমার দেয়া উপহার ভারী ও মোটা সোনালি রঙের বলপয়েন্ট কলমটি খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে ম্যানুয়েলে ছোট্ট হরফে লেখা তার ব্যবহারবিধি পড়ছেন আতশি কাচে। কলমটিতে গুপ্ত আছে একটি টেপরেকর্ডার। যেহেতু মোজাফেলা প্রাইভেট ডিটেক্টিভ হিসেবে কিছু কাজকর্ম করার উদ্যোগ নিয়েছেন, সুতরাং আমি তাকে এ গুপ্ত টেপরেকর্ডারটি উপহার দিয়েছি। বস্তুটি আমি ক্রয় করি বছর কয়েক আগে আমার মেয়ে কাজরিকে নিয়ে স্পাই মিউজিয়াম দেখতে গিয়ে। কারো সঙ্গে কথা বলতে বলতে নোট নেয়ার জন্য কলমের ডগা টিপে দিয়ে লেখার ভান করলে তা আপনাআপনি রেকর্ড করে কথাবার্তা। মোজাফেলা আমাকে সব কাজে সহায়তা দিচ্ছেন। সুতরাং কলমটি যদি তার কোনো কাজে লাগে, আমি খুব খুশি হব। তিনি স্পাই টেপরেকর্ডার নিয়ে মেতে আছেন দেখে আমি ব্যাকপ্যাক থেকে নাকানেকে নিয়ে করা ফাইল বের করে টাইপ করা পৃষ্ঠাগুলো পড়ি।
স্ত্রী বনেলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেগুলার টাকা পাঠাতেন নাকানেকে। সে মূলধনে পাড়ার মুদির দোকানকে তিনি আধুনিক ডিপার্টমেন্ট স্টোরে রূপান্তর করেন। ক্রয় করেন একটি পেট্রল পাম্প। তারপর মাসেরু শহরের চীনা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রায়ট হলে তিনি লুটপাটে অংশ নেন। তখন থেকে তার বিত্ত বিস্তার হতে থাকে বিপুলভাবে। মাসেরু শহরের কৃষ্ণাঙ্গ বাসোটো সম্প্রদায়ের লোকজনের ব্যবসা-বাণিজ্যে পুঁজি খাটানোর কোনো আগ্রহ নেই। এ শূন্যতা পূরণ করছে মাঝারি মাপের অভিবাসী চীনা ব্যবসায়ীরা। বাজারে চালু গুজব হচ্ছে, নাকানে একটি কৃষ্ণাঙ্গ যুবকদের গ্যাংয়ের অভিভাবক। এ গ্যাংয়ের কাজ হচ্ছে জাদুটোনা তুকতাকের উপাচার যেমন— মৃত শেয়ালের রঞ্জিত অণ্ডকোষ, মেষের নাড়িভুঁড়ি বা বেজায় দুর্গন্ধ ছড়ানো কোনো ভেষজ রাতের অন্ধকারে চীনা ব্যবসায়ীদের বাড়ি বা দোকানপাটের আঙিনায় ছুড়ে দিয়ে ত্রাসের সঞ্চার করা। পরে এসব উত্পাত বন্ধ করার বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে লাভের একাংশ আদায় করা। কিছু চীনা ব্যবসায়ী গ্যাংয়ের যুবকদের টাকা-পয়সা দিতে অস্বীকার করলে শহরে কৃষ্ণাঙ্গ ক্রেতা বনাম চীনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে রায়ট বাধানো হয়। রায়ট করনেওয়ালা কিছু বাসোটো যুবককে পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে নাকানে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করেন।
তার দ্রুত সম্পদ বৃদ্ধির আরেকটি সূত্র হচ্ছে, কম দামে সাউথ আফ্রিকান শ্বেতাঙ্গ বুয়ারদের ফার্নিচার, গাড়ি, আর্ট অবজেক্ট ইত্যাদি কিনে নিয়ে তা পরে বেশি দামে মূলত সদ্য পয়সাওয়ালা সাউথ আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ বা পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা। পাশের দেশে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে এপারটাইট নামের বর্ণ বিভাজনী প্রথার অবসান হলে বেশকিছু শ্বেতাঙ্গ বুয়ার পরিবার সীমান্ত অতিক্রম করে লিসোটোয় এসে বাস করতে শুরু করে। এদের অনেকেই এপারটাইট আমলে খুন, জখম বা ধর্ষণজাতীয় ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এদের জন্য সাউথ আফ্রিকায় বসবাস করা আজকাল নিরাপদ নয়। লিসোটো ভিন্ন দেশ, এখানকার নিরাপত্তায় বসবাস করে বুয়াররা এজেন্টদের মাধ্যমে বিক্রি করাচ্ছে সাউথ আফ্রিকায় তাদের সহায়-সম্পত্তি। তারপর নাকানের আড়তে ঘটিবাটি বা ফার্নিচার সস্তায় বিক্রি করে তারা পাড়ি দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, হল্যান্ড বা কানাডায়। এরা রেগুলার বিমানবন্দর ব্যবহার করছে না। লিসোটোর রাজপরিবারের এক সদস্যের আছে ছোট্ট একটি বিমান। নাকানে নাকি যোগাযোগ ঘটিয়ে দিচ্ছেন, যাতে ক্রিমিনাল গোছের বুয়াররা রয়েল প্লেনে চেপে পাড়ি দিতে পারে পাশের অন্য একটি থার্ড কান্ট্রিতে।
ফাইলে লাল কালিতে হাইলাইট করা পৃষ্ঠাগুলোয় আছে বনেলোর মাসেরুতে আসার পরের ঘটনাগুলোর বিবরণ। তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের আমহার্স্টে বাস করছিলেন, তখন তার স্বামী পরপর আরো দুটি বাসোটো তরুণীকে বিয়ে করেন। লিসোটো সমাজে পুরুষদের মধ্যে বহুবিবাহের প্রচলন আছে। পরবর্তী স্ত্রীদের মাধ্যমে তার নয়টি পুত্র-কন্যা জন্ম নেয়। এতে তুষ্ট না হয়ে নাকানে একটি আফ্রো-লেবানিজ মেয়েকে কেপ্ট হিসেবে রাখেন। এ নারী চেহারা-সুরতে খুবই সুদর্শনা। তার সঙ্গে নিয়ত সঙ্গম করার অভিপ্রায়ে ৬৫ বছর বয়সের নাকানে নাকি এক চীনা বনাজি ওষুধের ডাক্তারের পরামর্শে আফ্রোদিসিয়াক হিসেবে গণ্ডারের খড়্গ চূর্ণ এস্তেমাল করছেন। মাসেরুতে ফেরার পর প্রথম সপ্তাহ-দশদিন বনেলো স্বামীর এসব হালচাল নীরবে পর্যবেক্ষণ করেন। অবশেষে এক রাতে খেপে গিয়ে তাকে কাঁটাওয়ালা হাইহিল স্যান্ডেল দিয়ে প্রহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রে সেল্ফ ডিফেন্স টেকনিক হিসেবে বনেলো তায়কোয়ান্দো বা জুজুত্সুর মারপ্যাঁচ শিখে এসেছেন, যা তিনি স্বামীর ওপর অবলীলায় প্রয়োগ করলে নাকানে ব্যাপকভাবে জখম হন। একপর্যায়ে বনেলো কাপড় কাটা কাঁচি দিয়ে নাকানের প্রজননের প্রত্যঙ্গ কেটে নেয়ার চেষ্টা করলে অন্য স্ত্রীরা কর্মচারীদের সহায়তায় তাকে ধরেবেঁধে পুলিশে এত্তেলা দেয়। রাজকীয় কানুনে স্বামীকে প্রহার করা খুবই গর্হিত কাজ। তো বনেলো দুই বছরের কারাদণ্ড পান। জেলখানায় মাসছয়েক কাটানোর পর স্ট্রোক হলে স্বামী নাকানে কলকাঠি নাড়িয়ে তাকে বের করে আনেন। এখন বনেলো বাস করছেন একাকী মাসেরু শহর থেকে বেশ দূরে পার্বত্যাঞ্চলের একটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন গ্রামে। তিনি একেবারে নীরব হয়ে গেছেন। কারো সঙ্গে আজকাল আর বনেলো কথাবার্তা কিছু বলেন না।
ফাইল পড়ে বেশকিছু জরুরি তথ্য জানা যায়। তবে অ্যান্টিকের আড়তখানায় বসে বসে বেজায় একঘেয়ে লাগে। তাই উঠে দাঁড়িয়ে বুয়ারদের ফেলে যাওয়া আসবাব ও শিল্পদ্রব্য খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করি। প্রচুর পোর্ট্রেট পেইন্টিং থেকে শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের পূর্বপুরুষরা তাকিয়ে আছেন ড্যাবড্যাব করে। আন্দাজ করি, পয়সাওয়ালা কোনো পর্যটক এসব পেইন্টিং কিনে তা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে ওখানে লাগাবে তার প্রিয় শ্যালিকার বিমূর্ত স্কেচ বা আপন শ্বশুরের তৈলচিত্র।
বেল বেজে উঠলে কর্মচারী আমাদের নিয়ে ওপরের তলায় আসে। রিভলভিং চেয়ারে বসে আছেন ওলের স্যুট পরা নাকানে। তার চাঁদির তাবত্ চুল পেকে দেখাচ্ছে শুঁয়াপোকার তুলতুলে রোয়ার মতো। বাটনহোলে টকটকে লাল গোলাপ গুঁজে ভদ্রলোক শিশা-হুঁকায় ধূমপান করছেন। তার বেশবাস দেখে মনে হয়, তিনি যেন ককটেল পার্টিতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছেন। আমাকে চিনতে পারেন, তবে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস দেখান না। আমি বনেলোর বিষয় জানতে চাইলে তিনি জানান, স্ট্রোক হাওয়ার পর থেকে তিনি আর কারো সঙ্গে কথাবার্তা কিছু বলেন না। স্বাস্থ্যগত কারণে গেল কয়েক বছর হয় তিনি বেশ দূরের একটি গ্রামের নিরিবিলিতে বাস করছেন। তার কী ধরনের চিকিত্সা চলছে জানতে চাইলে নাকানে জবাব দেন, ‘মাসেরুতে আমেরিকার মতো মনস্তাত্ত্বিক চিকিত্সার কোনো সুযোগ নেই, তার প্রয়োজনও নেই। বনেলো মূলত নির্ভর করছেন দেশী বনাজি চিকিত্সার ওপর।’ আমি এবার তাকে চাক্ষুষ দেখার পারমিশন চাই। তিনি শিশা-হুঁকার নল মুখ থেকে সরিয়ে মাথা হেলিয়ে রাজি হন। প্যাড থেকে এক টুকরো কাগজ ছিঁড়ে খসখসিয়ে তাতে লেখেন গ্রামের নাম ‘মালাতালেই’ এবং কোন সড়ক ধরে যেতে হবে তার সামান্য ডিরেকশন। লিখে তা মোজাফেলার হাতে ধরিয়ে দিতেই আমরা হাতটাত মিলিয়ে বিদায় নিয়ে নিচে নেমে কাউন্টারে আসি। গাড়ি বারান্দায় আসতেই দেখি দাঁড়িয়ে আছে একটি ল্যান্ডরোভার। ড্রাইভার মোজাফেলাকে স্যালুট দিয়ে বলে, তার ওপর অর্ডার হয়েছে আমাদের নিয়ে মালাতালেই গ্রামে যাওয়ার।
ল্যান্ডরোভার হাঁকিয়ে মাসেরু শহরের ঘরবাড়িতে পূর্ণ উপত্যকা অতিক্রম করে আমরা চলে আসি হ্যাট মাউন্টেনের কাছে। গাড়ির জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায় বিচিত্র পাহাড়টির ওপর পাথরের মিনারের মতো কৌণিক শেপের চূড়া। ওখানে সড়ক বাঁক নেয়। ঘণ্টা দেড়েক ড্রাইভ করার পর আমরা চলে আসি মাসেরু শহর থেকে বেশ দূরে আরেকটি পাহাড়ি উপত্যকায়। পাহাড়ের পর পাহাড় পেঁচিয়ে কাঁচা সড়ক চলে গেছে এঁকেবেঁকে। কোনো জায়গায় ল্যান্ডরোভারকে পাহাড়ের কার্নিশ বেয়ে উঠে যেতে হয় অনেক ওপরে। ধুলা উড়িয়ে নির্জন সড়কে ড্রাইভ করতে করতে এক জায়গায় দেখি, পথের পাশ ধরে তিনটি টাট্টু ঘোড়ায় সামান চাপিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কম্বল পরা দুটি রাখাল বালক। মোজাফেলা ফিসফিস করে বলেন, এদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে পারলে হয়তো জানা যাবে কিছু ক্রিটিক্যাল তথ্য। আমি ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলি। নেমে এসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তুলি একটি-দুটি ছবি। রাখাল ছেলেরা বেশ আগ্রহ নিয়ে ক্যামেরার স্ক্রিনে তাদের ছবি দেখে। এ সুযোগে মোজাফেলা তাদের সিসোটো ভাষায় কিছু প্রশ্ন করেন। গাড়িতে ফিরে এলে নোটপ্যাডে প্রশ্নগুলোর জবাব গুছিয়ে লিখে আমাকে দেখান। ছেলে দুটি উপত্যকার বেশ গভীরে গবাদিপশু
চরালেও তদের হেঁটে যেতে হয় মালাতালেই গ্রামের পাশ দিয়ে। বনেলোর বিষয়-আশয় সম্পর্কে তারা অবগত। তাদের হেঁটে যেতে হয় তার কুটিরের পাশ দিয়ে। তাদের ধারণা, মহিলা মূলত একজন ডাইনি। তিনি কারো খারাপ কিছু করেন না। তবে বেশ কতগুলো পাখি তার বশ হয়েছে। তারা তার কুটিরের পেছনে একটি গাছে নীড় বেঁধেছে। শোনা যাচ্ছে, এসব নীড়ের খড়-বিচালিতে আছে ঔষধি গুণ। তাই কয়েক দিন আগে কারা যেন গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে গেছে বেশ কয়েকটি পাখির বাসা।
মালাতালেই গ্রামে জনসংখ্যা খুবই কম। পাহাড়ের ঢালে বেশ দূরে দূরে দেখা যায় একটি-দুটি কুটির। আমরা গাছের তলায় ল্যান্ডরোভার দাঁড় করিয়ে সামনে বাড়ি। বনেলোর কুটিরটি একেবারে বিচ্ছিন্ন, একটি টিলার অন্য পাশে। ছনে ছাওয়া তার ঘর লাল কাদামাটি দিয়ে লেপাপোছা। উঠানটিও সুন্দর করে নিকানো। কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে না পেয়ে আমরা দ্বিধাগ্রস্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকি একটুক্ষণ। কুটিরের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে তারের বাদ্যযন্ত্রের মৃদু আওয়াজ। মোজাফেলা গলা খাঁকারি দিয়ে জানান দেন। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ আসে না। তখনই আমি খেয়াল করি আঙিনা থেকে একটু দূরে একটি বড়সড় গাছ। তাতে ঝুলছে অনেকগুলো পাখির বাসা। দেখতে অনেকটা বাবুই পাখির নীড়ের মতো। মৃদু হাওয়ায় গাছের সবুজ পাতায় যেন একসঙ্গে অজস্র চোখে পলক পড়ছে।
আমরা অবশেষে বাজনার সুরলয় নিশানা করে চলে আসি পেছনের আঙিনায়। ওদিকে আরেকখানা কুটির। মনে হয় বনেলোকে দেখভাল করার কোনো কাজের মহিলা ওখানে বাস করেন। তাকে পাওয়া যায় সে কুটিরের পেছনে। বসে আছেন এক চিলতে আঙিনায় বেতের একটি মোড়ায়। তিনি গায়ে কম্বল জড়িয়ে আছেন। তাতে গাছপালার নকশা আঁকা। তার মুখ কাঠের মুখোশের আড়ালে বলে আমরা তার চোখ দেখতে পাই না। বনেলোর সামনে রোদে দাঁড়িয়ে কম্বল গায়ে একটি মেয়ে বাজিয়ে যাচ্ছে তারের বাদ্যযন্ত্র। তার মাথায় পশুর চামড়ায় তৈরি টুপি। তাতে সেলাই করে গাঁথা কোনো পাখির দীর্ঘ পালক। তার বাদ্যযন্ত্রটি একটি গাছের ডালে শুধু তার জড়িয়ে তৈরি করা। কিন্তু তা থেকে বেরোচ্ছে রহস্যময় সুরলহরি। আমাদের আগমনে বনেলোর মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা যায় না। তিনি স্থির হয়ে বাজনা শুনতে শুনতে যেন বুঁদ হয়ে আছেন অন্য কোনো জগতে। লিসোটোর সমাজে প্রতিটি আচার-অনুষ্ঠানে পরার জন্য আছে বিশেষ রকমের নকশা করা কম্বল। বনেলো যে কম্বলটি পরে আছেন, তার নাম ‘সেফাতে’ অর্থাত্ বৃক্ষ। মানুষ যখন বয়সের প্রান্তিকে এসে প্রকৃতির অংশ হয়ে উঠতে চায়, তখন তারা এ ধরনের কম্বল গায়ে জড়িয়ে বনানীর গভীরে এসে প্রতীক্ষা করে মৃত্যুর। কিন্তু তার তো তত বয়স হয়নি। হয়তো জীবনের এ পর্বে এসে নীরবতা তার কাম্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে গেলেন কেন মহিলা, তা ঠিক বুঝতে পারি না। দেখতে দেখতে গাছ থেকে উড়ে এসে তার শরীরে বসে সাত-আটটি ছোট ছোট হলুদিয়া পাখি। পাখিগুলো কম্বলের ওপর দিয়ে হাঁটছে। চিঁউ চিঁউ শব্দে ছড়াচ্ছে কৌতূহল। বনেলো তাদের আগমনেও নির্লিপ্ত থাকেন। পাখিগুলো হঠাত্ বোধ করি আমাদের উপস্থিতিতে সচেতন হয়ে ফুড়ুত্ করে একসঙ্গে উড়ে পালায়।
আমি তাকে সম্ভাষণ জানাই। কোনো জবাব পাই না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগে। বনেলো কাঠের মুখোশের দুটি ছিদ্র দিয়ে নিষ্পলকভাবে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। ছিদ্র দুটি সংকীর্ণ বলে তার চোখ দুটিকে দেখায় পতঙ্গের অক্ষিগোলকের মতো ক্ষুদ্র। আমি আরো একটু কাছে গিয়ে বলি, ‘আমাকে মনে পড়ে না মিসেস বনেলো, একসময় আমহার্স্ট শহরের বাকুকুকু রেস্তোরাঁয় মাঝে মধ্যে খেতে যেতাম। তার বছর দুয়েক আগে একটি প্রশিক্ষণে আমরা একসঙ্গে নানা ধরনের অ্যাক্টিভিটিতে যুক্ত ছিলাম।’ ফুল পাড়তে গিয়ে ঝাঁকিয়ে দেয়া গাছের মতো তার শরীর দুলে ওঠে। প্রচুর পরিশ্রম করে তিনি উঠে দাঁড়ান। কোনো দিকে না তাকিয়ে তারপর হাঁটতে থাকেন তার কুটিরের দিকে। পেছন থেকে দেখি, হাঁটতে হাঁটতে তার শরীর কেঁপে উঠছে থেকে থেকে।
বনেলো কুটিরে ঢুকে দুয়ার আটকে দিলে আমি বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ি। তবে কি তার খোঁজ নিতে আমি যে এসেছি, বিষয়টি তার পছন্দ হয়নি? নাকি কোনো কারণে তার বিস্মরণ এত তীব্র যে, আমাকে তিনি চিনতে পারেননি? মোজাফেলা এবার তারের বাদ্যযন্ত্র বাজানো মেয়েটিকে কিছু প্রশ্ন করেন। জবাবগুলো তিনি নোটবুকে গুছিয়ে লেখেন। তার উকিলের মতো চুলচেরা সওয়ালে মেয়েটিকে সন্ত্রস্ত দেখায়। অবশেষে বিরক্ত হয়ে আমি বলি, ‘মোজাফেলা, লেটস গো ব্যাক টু দ্য কার। মেয়েটিকে খামোখা জ্বালাতন করে ফায়দা কী? চলেন আমরা গাড়িতে ফিরে যাই।’ মুথাঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা বনেলোর কী হয়েছে, তা নিয়ে টুকটাক কথাবার্তা বলি। মোজাফেলা প্রশ্ন করে যা জেনেছেন তা হচ্ছে, মেয়েটিকে নাকানে মাসোয়ারা দিয়ে রেখেছেন বনেলোকে প্রতিদিন একবার করে এসে ওষুধ খাইয়ে যেতে। তার দাদা গ্রামের নাগানগা বা তুকতাক জাদুটোনার ওঝা। অসুখবিসুখে তিনি বনাজি ওষুধবিষুদ দিয়ে চিকিত্সা করে থাকেন। ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় তার শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় ঘণ্টা দুয়েকের মতো। শীতের তীব্র অনুভূতিতে তার গা কাঁপতে থাকে। তখন কম্বল জড়িয়ে তিনি রোদে বসে থাকেন। মন্ত্রপূত বাদ্যবাজনা মেয়েটি তার দাদামশাইয়ের কাছ থেকে শিখেছে। তার বাদনে শান্ত হয়ে আসে বনেলোর দেহ।
গাড়িতে ওঠার আগে মোজাফেলা আমাকে তার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে বলেন। তার ধারণা, নাকানে চান না বনেলো মাসেরু শহরে তার সংসারে বাস করে উত্পাত সৃষ্টি করেন। তাই তিনি তাকে কৌশলে এখানে রীতিমতো নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। নাগানগার ওষুধ আর জাদুটোনা দিয়ে বশ করে তিনি তাকে সম্মোহিত করে রেখেছেন, যাতে বনেলো আর সংসারের বাস্তবতায় ফিরতে না পারেন। গাড়িতে বসে আমি ভাবি, হয়তো বনেলো ভুগছেন পর্কিনসন রোগে। অনেক বছর আগে আমি যখন তাকে চিনতাম, তখন তিনি তার দৈহিক সৌন্দর্য নিয়ে ছিলেন অতিমাত্রায় সচেতন এক যুবতী। কারাগারে যখন স্ট্রোক হয়, তখন অচিকিত্সার জন্য তবে কি তার মুখ বাঁকাচোরা হয়ে গেছে, লোপ পেয়েছে কথা বলার স্বাভাবিক শক্তি? তবে কি বনেলো তার রোগজনিত দৈহিক অবক্ষয় ও মুছে যাওয়া রূপকে আড়াল করতে আজকাল সর্বদা মুখোশ পরে থাকেন? গাড়ি কাঁচা সড়ক বেয়ে ধুলা উড়িয়ে উঠে আসছে একটি বৃহত্ টিলার ওপর। একটি বিষয়ে আমি সচেতন হয়ে ওঠি— বছর দশেকের ব্যবধানে লিসোটোয় কীভাবে আমার জানাশোনা সবার দেহমন ও সামাজিক অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। আমিও কি আগের মতো আছি? ভাবি, নিরিবিলিতে এবার খতিয়ে দেখতে হবে আমার শরীর, মনমানস ও সংসারে কতটা পরিবর্তন এসেছে?





