প্রচলিত কিংবদন্তি অনুসারে ভারতের ভাইসরয় চার্লস জন ক্যানিংয়ের স্ত্রী বাঙালি মিষ্টি বিক্রেতা ভীম চন্দ্র নাগকে তার জন্মদিনের জন্য বিশেষ ধরনের ক্যান্ডি তৈরির বায়না করেন। এটা ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। ভীম চন্দ্র চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। ভাজা তারপর চিনির শিরায় ডুবিয়ে তৈরি করলেন নতুন ধরনের মিষ্টি। এ মিষ্টির নাম হলো লেডি ক্যানিংয়ের নামে, কলকাতার বিখ্যাত মিষ্টি লেডিকেনি।

ভীম চন্দ্র নাগের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার বাবা পরান চন্দ্র নাগের হাত ধরে, ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে। ভীম চন্দ্র উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যবসা পরিচালনা করেন। তাদের দোকান শুরু থেকে একই জায়গায় আছে। সে আমলে তাদের দোকান-সংলগ্ন রাস্তার নাম ছিল ওয়েলিংটন স্ট্রিট, যা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে উত্তর কলকাতার বৌবাজারের নির্মল চন্দ্র স্ট্রিট। ভীম নাগের মিষ্টির দোকান বিখ্যাত হওয়ার পেছনে প্রথম কারণটি ছিল এই লেডিকেনি মিষ্টির আবিষ্কার। তারপর আরো একটা জিনিসের কারণে তারা বিখ্যাত— কুক অ্যান্ড কেলভি ঘড়ি।

যে বছর ভীম চন্দ্র নাগ লেডিকেনি আবিষ্কার করলেন, সে বছরই ব্রিটিশ সিলভারওয়্যার কোম্পানি কুক অ্যান্ড কেলভি (টমাস কুক ও চার্লস কেলভি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত) কলকাতায় পা রাখে। লালদীঘি থেকে পূর্ব দিকে যে রাস্তাটি চলে গেছে, তা পরিচিত ছিল ওল্ড কোর্ট হাউজ স্ট্রিট। এ নামকরণ হয়েছিল প্রথম দেওয়ানি আদালতের কারণে। আদালত এ এলাকায়ই অবস্থিত ছিল। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে কোর্ট ভবন ভেঙে ফেলা হয়। পরবর্তীতে সে জায়গায় স্থাপিত হয় সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ। রাস্তাটা এখন স্বাধীনতা সংগ্রামী হেমন্ত বসুর নামে নামকরণ করা হয়েছে। রাস্তায় একসময় বেশকিছু ব্রিটিশ দোকান ও অফিস ছিল। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল, আরো ছিল হ্যামিলটন অ্যান্ড কোম্পানি (জুয়েলার, রৌপ্যকার ও ঘড়ি নির্মাতা), টমাস কুক অ্যান্ড সন্স, লরেন্স অ্যান্ড মায়ো— ২০ নম্বর দোকানে ছিল কুক অ্যান্ড কেলভি— যারা ঘড়ি তৈরি করত।&dquote;&dquote;

আমরা আজ যেসব ঘড়ি ব্যবহার করি, তা ভারতে এসেছিল উনিশ শতকে। তখনই এ ঘড়ি ইংল্যান্ডে ঘরে ঘরে নিত্যব্যবহার্য পণ্যে পরিণত হয়েছিল। গীর্জা ও উন্মুক্ত স্থানে স্থাপিত ঘড়ি ১৪ শতকেই ইংল্যান্ডে প্রস্তুত হতো। যন্ত্রপ্রকৌশলের উন্নতি ঘড়ি উৎপাদনের গতি আনে। ১৭ ও ১৮ শতকে দুনিয়ায় ঘড়ি উৎপাদনের বাজার নিয়ন্ত্রণ করত ইংল্যান্ড। ব্রিটিশ জাহাজ ইংল্যান্ডে তৈরি ঘড়ি বোম্বে, মাদ্রাজ ও কলিকাতার বন্দরে নিয়ে এল, ব্রিটিশ বণিকরা সেগুলো ভারতীয় বাজারে ছড়িয়ে দিলেন।

কিংবদন্তি অনুসারে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে টমাস কুক (যিনি তখন ঘড়ি উৎপাদনের ব্যবসা শুরু করে দিয়েছিলেন) ভীম নাগের দোকানে এসেছিলেন। লেডি ক্যানিংয়ের জন্মদিনে নতুন ধরনের মিষ্টি তৈরি করে নাগ তখন বিখ্যাত। হতে পারে তার এ খ্যাতির কারণেই টমাস কুক নাগের দোকানে যেতে উৎসাহী হয়েছিলেন। তবে কুকের সফরের কারণ যাই হোক না কেন, তিনি ভীমের তৈরি মিষ্টি খেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ ভীমের দোকানের বয়স ৩০ বছর ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ নাগদের ব্যবসা সফলতার সঙ্গে মসৃণভাবে এগিয়ে চলছিল। শোনা যায়, এত বিরাট দোকানে কোনো ঘড়ি না থাকায় কুক অবাক হয়েছিলেন এবং তাই তিনি ভীমকে একটা ঘড়ি উপহার দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভীম বললেন, একটা সমস্যা আছে। তিনি জানালে, তার কর্মীদে&dquote;&dquote;র কেউ একটি ইংরেজি শব্দও জানে না এবং তারা ঘড়ির ওপর সময় নির্দেশক ইংরেজি সংখ্যাগুলো পড়তে পারবে না। তাই ঘড়িটি তাদের জন্য কোনো কাজেই আসবে না। কুক নিজেই তখন সমাধান বাতলে দিলেন। তিনি বললেন, ‘ঘড়ির নম্বরগুলো বাংলায় লেখা হলে কেমন হবে?’ যেই ভাবা সেই কাজ। একটি নমুনা লন্ডনে পাঠানো হলো। লন্ডনে কুক অ্যান্ড কেলভি কারখানায় সেখানে তৈরি ঘড়ির ওপর বাংলা সংখ্যা আঁকা হলো, ঘড়ির যন্ত্রপাতি সবই ছিল সুইস।

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ ছিল সেই বছর, যখন ভারতের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশরাজের হাতে যায়। একই সঙ্গে সেটা ছিল ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রামেরও বছর। জাতীয়তাবাদ তখন ধীরে ধীরে শক্তি অর্জন করছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার তখনো ৩০ বছর বাকি। ব্রিটিশ পণ্য বর্জনে পরিচালিত স্বদেশী আন্দোলন হতেও তখনো ৩৭ বছর বাকি। বাঙালি ব্যবসায়ী ও ব্রিটিশ ঘড়ি নির্মাতার সেই মিষ্টি বন্ধুত্বের নিদর্শন আজো বৌবাজার স্ট্রিটের ৫ নম্বর দোকানে গেলে দেখা যাবে।

 

ভাষান্তর: শানজিদ অর্ণব

সূত্র: স্ক্রলইন