[দ্বিতীয় পর্ব]

রাজপুত্ররা কৌতূহলভরে জিজ্ঞেস করল: তারপর পায়রারা কী করল, গুরুদেব?

বিষ্ণুশর্মা: শোনো, বলছি...

তারপর কোনো এক পায়রা সগর্বে বলল: আঃ! এত বাছবিচার করলে চলে? পৃথিবীতে সব খাবারই তো সন্দেহজনক। তাই এত ভাবলে আমাদের যে না খেয়েই মরতে হবে। দেখো, ঈর্ষাপরায়ণ, ঘৃণাপরায়ণ, সর্বদা অসন্তুষ্ট, ক্রোধশীল, সর্বদাই আশঙ্কাপরায়ণ এবং পরের অন্নে জীবিকা নির্বাহ করে— এ ছয় ধরনের লোক চিরকাল দুঃখ পায়।

এ কথা শুনে পায়রারা সেই চালের কণার ওপর বসল। কারণ অনেক শাস্ত্র পড়া, বিশাল জ্ঞানের অধিকারী এবং সবার সন্দেহ দূর করতে সমর্থ— এমন লোকেরাও লোভে পড়ে এবং পরিণামে কষ্ট পায়। তাই তো বলা হয়েছে: লোভ থেকে ক্রোধের সৃষ্টি, লোভ থেকে কামের সৃষ্টি, লোভ থেকে মোহ এবং লোভ থেকেই বিনাশ। লোভ পাপের কারণ। তাই তো সোনার হরিণ অসম্ভব জেনেও রাম তার লোভে পড়ে সীতাকে হারিয়েছিলেন। পায়রাদেরও হলো তা-ই। যেই তারা চাল খেতে নামল, অমনি জালে আটকা পড়ে গেল এবং তারা ওই পায়রাটিকে দূষতে লাগল।

তখন চিত্রগ্রীব বলল: ওকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বিপদ যখন আসে, তখন আপনজনও অপকারের কারণ হয়। তাই তো দেখো, গাভী দোহন করার সময় বাছুরটিকে তার মায়ের পায়ের সঙ্গেই বেঁধে রাখা হয়। তাছাড়া সে-ই প্রকৃত বন্ধু, যে বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায় এবং বিপদগ্রস্তকে রক্ষা করে। বিপদে বিচলিত হওয়া কাপুরুষের লক্ষণ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে না, ধৈর্য, সুসময়ে ক্ষমা, সজ্জন সভায় বাকপটুতা, যুদ্ধে পরাক্রম, যশের প্রতি স্পৃহা, অধ্যয়নে আসক্তি— এগুলো হচ্ছে মহাপুরুষের লক্ষণ। তাই এখন আমাদের এ বিপদ থেকে পরিত্রাণের উপায় চিন্তা করতে হবে।

একজন বলল: কীভাবে? ব্যাধ তো এক্ষুনি এসে আমাদের ধরে ফেলবে!

চিত্রগ্রীব বলল: আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করলে একটা উপায় হবেই। দেখো, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেকে এক হলে বিরাট শক্তি হয়। তখন তারা যেকোনো বড় কাজ করতে পারে। সামান্য তৃণ দিয়ে দড়ি পাকালে তা দিয়ে মত্ত হাতিকেও বেঁধে রাখা যায়। কিন্তু ধান থেকে সামান্য তুষও যদি বেরিয়ে যায় তাহলে তা থেকে আর অঙ্কুর গজায় না। তাই এসো, আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে এই জাল নিয়ে উড়ে যাই।

চিত্রগ্রীবের কথা শুনে ব্যাধ আসার আগেই সবাই জাল নিয়ে উড়াল দিল। ব্যাধ দূর থেকে দেখে হায় হায় করতে লাগল! নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে সে ভাবল: এই পাখিরা আর কত দূর যাবে? নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে জাল নিয়ে এই পড়ল বলে। তখন গিয়ে সবকটাকে ধরে ফেলব।

এই ভেবে সে পাখিদের পেছন পেছন ছুটতে লাগল। কিন্তু পায়রারা উড়তে উড়তে একসময় তার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। তখন ব্যাধ হতাশ হয়ে থেমে গেল।

বিষ্ণুশর্মা এই পর্যন্ত বলে থামলে রাজপুত্ররা বিপুল আগ্রহভরে জানতে চাইল: তারপর পায়রাদের কী হলো, গুরুদেব?

বিষ্ণুশর্মা বললেন: শেনো সে কথা...

 

প্রাণসখা হিরণ্যক

চিত্রগ্রীব বলল: তোমরা শোনো। মানুষের প্রকৃত হিতকারী হচ্ছে তিনজন— মা, বাবা আর বন্ধু। অন্যরা কারণবশত হিতকারী হয়। তাই চলো, হিরণ্যক নামে আমার এক ইঁদুর বন্ধু আছে। গণ্ডক নদীর তীরে চিত্রবনে সে থাকে। তার কাছে গেলে সে আমাদের বাঁধন কেটে দেবে।

এই বলে পায়রারা উড়ে গেল হিরণ্যকের দেশে। কিন্তু পায়রাদের নামার শব্দ পেয়ে সে ভয়ে গর্তের মধ্যে গিয়ে লুকাল। তখন চিত্রগ্রীব ডেকে বলল: বন্ধু হিরণ্যক, তুমি কি আমাদের সম্ভাষণ জানাবে না?

চিত্রগ্রীবের কণ্ঠ শুনে হিরণ্যক বাইরে এসে সানন্দে বলল: আঃ! আমি কি ভাগ্যবান। বন্ধু চিত্রগ্রীব এসেছে আমার দ্বারে। বন্ধুর সঙ্গে যার দেখা হয়, কথা হয় এবং একসঙ্গে থাকা হয়, তার মতো সৌভাগ্যবান আর কে আছে?

এরপর হিরণ্যক সবাইকে পাশবদ্ধ অবস্থায় দেখে বিস্ময়ের সঙ্গে বলল: এ কি বন্ধু? তোমরা পাশে আবদ্ধ কেন?

চিত্রগ্রীব সংক্ষেপে বলল: বন্ধু, এ আমাদের কর্মফল। যেমন কর্ম করেছি, তেমন ফল পেয়েছি। রোগ, শোক, পরিতাপ, বন্ধন ও বিপদ— এগুলো হচ্ছে মানুষের অপরাধ-বৃক্ষে ফল। এখন তুমি আমাদের উদ্ধার করো। এই বলে সে সব ঘটনা খুলে বলল।

চিত্রগ্রীবের কথা শুনে হিরণ্যক দ্রুত বন্ধুর বাঁধন কাটতে গেল। অমনি চিত্রগ্রীব তাকে বারণ করে বলল: বন্ধু, এরা আমার আশ্রিত। তাই আগে এদের মুক্ত করো। তারপর আমার বাঁধন কাটবে।

হিরণ্যক বলল: বন্ধু, আমার শক্তি অল্প। দাঁতগুলোও কোমল। সবার বাঁধন কাটতে গিয়ে যদি দাঁত ভেঙে যায়, তাহলে তোমার বাঁধন কাটব কী করে? তাই তোমারটাই আগে কাটি। পরে ওদেরটা কাটব।

চিত্রগ্রীব বলল: না বন্ধু, তা হয় না। আমি দলনেতা। আমার কর্মীদের বিপদে রেখে আমি আগে মুক্ত হতে পারি না। আমার যা হয় হবে। তুমি আগে ওদের মুক্ত করো।

হিরণ্যক। বন্ধু, নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে আশ্রিতদের রক্ষা করা নীতিবিদরাও কিন্তু অনুমোদন করেন না। তারা বলেন: বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য ধন-সম্পত্তি রক্ষা করবে। ধন-সম্পত্তির বিনিময়েও স্ত্রীকে রক্ষা করবে। স্ত্রী বা ধন-সম্পত্তির বিনিময়ে হলেও নিজেকে রক্ষা করবে। তাছাড়া ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ— এই চতুর্বর্গ রক্ষার কারণ হলো প্রাণ। তাকে নষ্ট করলে সবই নষ্ট হয়। আর তাকে রক্ষা করলে সবই রক্ষা পায়।

চিত্রগ্রীব। বন্ধু, নীতিশাস্ত্রে অবশ্য এ রকমই বলা হয়েছে। কিন্তু আমি আমার আশ্রিতদের কষ্ট কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। তাছাড়া প্রাজ্ঞ লোকেরা নিজের জীবন ও সম্পত্তি পরের জন্য বিসর্জন দিয়ে থাকেন। কারো জীবন চিরস্থায়ী নয়। তাই সৎ কাজে জীবন বিসর্জন দেয়াই তো ভালো। দেহ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু যশ-খ্যাতি চিরস্থায়ী। তাই ক্ষণস্থায়ী দেহের বিনিময়ে চিরস্থায়ী যশ-খ্যাতি অর্জন করা ভালো নয়? সর্বোপরি এরা আমাকে প্রভু বলে মানে। আমার সেবাযত্ন করে। এদের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার। এদের পাশে না দাঁড়িয়ে নিজের কথা ভাবা অন্যায়। অপরাধ। এ আমি পারব না। তুমি আগে এদেরই মুক্ত করো।

হিরণ্যক চিত্রগ্রীবের কথা শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল: বাঃ! বন্ধু, বাঃ! উত্তম! আমি তোমাকে পরীক্ষা করছিলাম। তুমি কেমন নেতা। সত্যিই তুমি নেতা হওয়ার যোগ্য। অনুসারীদের সর্বতো মঙ্গল কামনাকারী এমন নেতা জগতে দুর্লভ। তুমি ত্রিভুবনেরও প্রভুত্ব করার যোগ্য। তোমার মতো বন্ধু পেয়ে আমি ধন্য।

এ কথা বলে হিরণ্যক সবার বাঁধন কেটে দিয়ে চিত্রগ্রীবকে বলল: বন্ধু, জালে আটকে পড়া নিয়ে তুমি নিজেকে অপরাধী মনে করো না। কারণ যে পাখি শত যোজন দূর থেকেও তার খাদ্য দেখতে পায়, সে মৃত্যুকাল উপস্থিত হলে ধরা পড়ার জালটিকেই দেখতে পায় না। দেখো, এত মহৎ দুটি গ্রহ চন্দ্র-সূর্য, তারাও রাহুগ্রস্ত হয়। এমন শক্তিমান হাতি আর বিষধর সাপ, তারাও বাঁধাগ্রস্ত হয়। জ্ঞানীরাও দরিদ্র হয়। এসবই কারো না কারো কর্মফল। তাছাড়া জগতে অসম্ভব বলে কিছু নেই। পাখিরা কেবল আকাশে উড়েও বিপদে পড়ে। আবার জেলে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরে আনে। তাই নিরাপদ স্থানই-বা কী? আর সহজ কাজই-বা কী? সবকিছুকেই সাহস ও সততার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে।

এসব বলে হিরণ্যক পায়রাগুলোকে প্রাণভরে সেবাযত্ন করল এবং চিত্রগ্রীবকে আলিঙ্গন করে সবাইকে বিদায় দিল। চিত্রগ্রীব বন্ধু হিরণ্যককে বারংবার ধন্যবাদ জানিয়ে তার দল নিয়ে নিজ স্থানে ফিরে গেল। আর হিরণ্যক তার গর্তে ঢুকে গেল।

 

বিপদে বন্ধুর পরিচয়

হিরণ্যকের কাহিনী বলে বিষ্ণুশর্মা থামলে রাজপুত্ররা জানতে চাইল: গুরুদেব, লঘুপতনকের কী হলো?

বিষ্ণুশর্মা বললেন: শোনো বলছি...

 

লঘুপতনক ও হিরণ্যক

লঘুপতনক পায়রাদের জালে আটকা পড়া থেকে শুরু করে মুক্ত হওয়া পর্যন্ত সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। পায়রারা যখন জাল নিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন সে তাদের পেছনে পেছনে উড়ে আসছিল কী হয় তা দেখার জন্য। সে দেখল কীভাবে হিরণ্যক পায়রাগুলোকে চরম বিপদ থেকে মুক্ত করল। সে ভাবল, এমন বন্ধু থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। এর সঙ্গে যে করেই হোক বন্ধুত্ব করতে হবে। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। জ্ঞানীরাও বলেন, ছোট হোক বড় হোক— সজ্জনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা উচিত। এরূপ ভেবে লঘুপতনক হিরণ্যককে বাইরে আসার জন্য ডাক দিল। কিন্তু অপরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সে বাইরে এল না। ভেতরে থেকেই বলল: কে তুমি?

লঘুপতনক বলল: আমি কাকরাজ লঘুপতনক।

হিরণ্যক কাক শুনে ভয় পেয়ে গেল। সে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বলল: কী চাই?

লঘুপতনক: বন্ধুত্ব।

হিরণ্যক: হবে না।

লঘুপতনক: কেন, ভাই?

হিরণ্যক: কারণ তুমি খাদক, আর আমি তোমার খাদ্য। খাদ্য-খাদকে কখনো বন্ধুত্ব হয় না।

লঘুপতনক বিনয়ের সঙ্গে বলল: তুমি আমাকে বিশ্বাস করো। তোমার আর চিত্রগ্রীবের মধ্যে যে মধুর বন্ধুত্ব দেখলাম, তাতে আমি মুগ্ধ। তাই আমি চাই তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হোক। তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেলে আমার জীবন ধন্য হবে।

হিরণ্যক: শোনো, পণ্ডিতেরা বলেন— বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে। খাদ্য-খাদকের বন্ধুত্ব বিপদের কারণ হয়। তাই তো শেয়ালের ফাঁদে আটকা পড়া হরিণ শেষে কাকের দ্বারা রক্ষা পায়।

লঘুপতনক আগ্রহের সঙ্গে বলল: কী রকম?

হিরণ্যক। শোনো বলছি...

 

হরিণ ও কাক

মগধ দেশে চম্পকবতী নামে এক বিশাল বন ছিল। সেখানে এক হরিণ ও এক কাকের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ছিল। হরিণের নাম চিত্রাঙ্গ, আর কাকের নাম সুবুদ্ধি। দীর্ঘদিন ধরে তারা দুই বন্ধু পরম সুখে কাল কাটাচ্ছিল। চিত্রাঙ্গ যত্রতত্র ঘুরে বেরিয়ে খেয়ে-দেয়ে বেশ নাদুসনুদুস হয়েছিল। একদিন দুষ্টবুদ্ধি নামে এক শেয়াল তাকে দেখল। দেখে মনে মনে ভাবল: ‘আঃ! এর নরম মাংস যদি একটু খেতে পারতাম, তাহলে জীবনটা সার্থক হতো। কিন্তু কী করে সম্ভব?’ তারপর আবার ভাবল: ‘আশা ছাড়তে নেই। চেষ্টায় কি না হয়? বিফল হলেও সান্ত্বনা পাওয়া যাবে।’ এই ভেবে সে চিত্রাঙ্গর কাছে এসে হেসে হেসে বলল: কেমন আছ, বন্ধু?

চিত্রাঙ্গ বিস্ময়ের সঙ্গে বলল: কে তুমি? কী চাও?

দুষ্টবুদ্ধি: আমি শেয়াল। নাম দুষ্টবুদ্ধি। আমার নাম শুনে কেউ আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চায় না। একা একা এই বনে ঘুরে বেড়াই। আমার বড় কষ্ট! জগতে কেউ বন্ধু ছাড়া থাকতে পারে? একবেলা না খেয়ে থাকা যায়। কিন্তু আধবেলাও কি বন্ধু ছাড়া থাকা সম্ভব? অথচ আমার জীবনটা এভাবেই কাটছে। তাই তুমি যদি আমার বন্ধু হতে তাহলে আমি বেঁচে যেতাম। বাকি জীবনটা আমার সুখে কাটত। দয়া করে তুমি যদি আমাকে বন্ধু বলে স্বীকার করো, তাহলে চিরদিন আমি তোমার অনুচর হয়ে থাকব।

দুষ্টবুদ্ধির বিনয় বাক্যে চিত্রাঙ্গর মন গলে গেল। সে বন্ধুত্ব স্বীকার করে বলল: তথাস্ত। আজ থেকে আমরা দুজন বন্ধু।

সেদিন থেকে দুষ্টবুদ্ধি ও চিত্রাঙ্গ বন্ধুর মতো মেলামেশা করতে লাগল। সকালবেলা চিত্রাঙ্গ আসে। একটু পরে দুষ্টবুদ্ধিও আসে। একজন আসে বন্ধুত্বের টানে, অন্যজন আসে বন্ধুর মাংসের টানে। এমনিভাবে দুষ্টবুদ্ধি সুযোগ খুঁজতে থাকে। তারপর দুষ্টবুদ্ধি একদিন গেল চিত্রাঙ্গর বাড়ি। সেখানে এক চাঁপাগাছের ডালে বাস করত সুবুদ্ধি। সে শেয়ালকে দেখে চিত্রাঙ্গকে বলল: বন্ধু, এ কাকে নিয়ে এলে?

চিত্রাঙ্গ উৎসাহভরে বলল: বন্ধু, এ শেয়াল। নাম দুষ্টবুদ্ধি। খুব ভালো। আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে। তোমার সঙ্গেও বন্ধুত্ব করতে চায়।

সুবুদ্ধি মাথা চুলকে গম্ভীর সুরে বলল: বন্ধু, হঠাৎ এসে পড়া অজানা কারো সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে নেই। তাতে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা আছে। পণ্ডিতেরা বলেন:

                     জানো না যার কুলশীল, করো না তাকে বিশ্বাস।

                     দীর্ঘকর্ণে জায়গা দিয়ে জরদ্গবের গেল শ্বাস

চিত্রাঙ্গ বিস্ময়ে বলল: সে কী রকম?

সুবুদ্ধি: শোনো বলছি...

 

জরদ্গবকথা

ভাগীরথী নদীর তীরে গৃধ্রকূট নামে এক পর্বত আছে। সেখানে ছিল এক বিশাল পাকুড় গাছ। তার কোটরে বাস করত এক বৃদ্ধ শকুন। বয়সের ভারে নখ ও চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তার নাম হয়েছে জরদ্গব। গাছের পাখিরা করুণাবশত নিজেদের আহার থেকে কিছু কিছু বাঁচিয়ে তাকে দিত। তা খেয়েই সে জীবন ধারণ করত। বিনিময়ে সে পাখির শাবকগুলোকে রক্ষা করত।

একদিন দীর্ঘকর্ণ নামে এক বিড়াল এল পাখির শাবকগুলোকে ভক্ষণ করার উদ্দেশ্যে। তাকে আসতে দেখে শাবকরা ভয়ে কোলাহল শুরু করল। তা শুনে জরদ্গব তারস্বরে বলল: কে এল রে?

জরদ্গবের কণ্ঠ শুনে দীর্ঘকর্ণ ভয় পেয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, ‘সর্বনাশ! মরলাম বুঝি।’ একটু চিন্তা করে আবার মনে মনে বলল: বিপদের একেবারে সামনে এসে পড়েছি। এখন তো পালানোরও পথ নেই। বিপদ যতক্ষণ দূরে থাকে, ততক্ষণই তাকে ভয়। একবার কাছে এসে পড়লে তখন তাকে ভয় না করে তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাকেও তা-ই করতে হবে। প্রথমে এর মনে বিশ্বাস জন্মাতে হবে। তার পরে কাজ হাসিল করতে হবে।

এরূপ ভেবে দীর্ঘকর্ণ জরদ্গবের উদ্দেশে সবিনয়ে বলল: মহাশয়, আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

জরদ্গব কঠিন কণ্ঠে বলল: কে তুমি? কেন এসেছ?

দীর্ঘকর্ণ বলল: আমি বিড়াল। দীর্ঘকর্ণ।

বিড়াল শুনেই জরদ্গব ক্ষেপে গেল। সে কর্কশ কণ্ঠে বলল: এই মুহূর্তে দূর হয়ে যাও। নইলে মারা পড়বে!

দীর্ঘকর্ণ বলল: আগে আমার কথা শুনুন, তারপর মারার হলে মারবেন। কারণ বিশেষ জাতির অন্তর্ভুক্ত হলেই কেউ বধ্য বা পূজনীয় হয় না। ব্যবহার বিচার করেই কাউকে বধ্য বা পূজনীয় নির্ধারণ করতে হয়।

দীর্ঘকর্ণের যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে জরদ্গব একটু শান্ত হলো। সে বলল: আচ্ছা বলো, কেন এসেছ।

দীর্ঘকর্ণ আশ্বস্ত হয়ে বলল: ধন্যবাদ, মহাশয়। আমি গঙ্গার তীরে নিত্য স্নান করি। ব্রহ্মচর্য পালন করি। সব ব্রত আচরণ করি। আপনি সর্বদা ধর্মচর্চা করেন এবং একান্ত বিশ্বাসের পাত্র। পাখিরা সর্বদা আমার কাছে আপনার প্রশংসা করে। তাই আপনার মতো বিদ্বান ও বয়সে প্রবীণের কাছে ধর্মকথা শুনতে এসেছি। কিন্তু আপনি আমাকে দূর-দূর করছেন। শাস্ত্রে আছে— শত্রুও যদি বাড়িতে আসে তাহলে গৃহস্থের উচিত তার সেবা করা। দেখুন না, যে ব্যক্তি গাছের গোড়া কাটছে, গাছ তার ওপর থেকেও ছায়া সরিয়ে নেয় না। ঘরে টাকা-পয়সা না থাকলে একটুখানি মিষ্টি কথা দিয়েও অতিথির সেবা করা যায়। বসার আসন, বিশ্রামের জায়গা, জল ও মিষ্টি কথা— এ চারটির অভাব কখনো কারো ঘরে হয় না। যারা মহৎ তারা সবাইকে সমান দেখে। দেখুন না, চন্দ্র ব্রাহ্মণকে যেমন জ্যোত্স্না দেয়, চণ্ডালকেও তেমনই দেয়। উচ্চবর্ণের ঘরে নিম্নবর্ণের কোনো অতিথি এলে তারও উত্তমরূপে সেবা করা উচিত। কারণ অতিথি সব দেবতার মিলিত রূপ। অতিথি কারো বাড়ি থেকে হতাশ হয়ে ফিরে গেলে সে তার সব পাপ দিয়ে গৃহস্থের সব পুণ্য নিয়ে যায়। যারা সব প্রকার হিংসা থেকে দূরে থাকে, সবকিছু সহ্য করে, সবাইকে আশ্রয় দেয়, তারাই স্বর্গে যায়। বন্ধুত্বই একমাত্র ধর্ম, যা মৃত্যুর পরেও সঙ্গে যায়। অন্য সবকিছু শরীরের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। যে মাংস খায় আর যার মাংস খায়— এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো, প্রথমজনের ক্ষণিক তৃপ্তি, আর দ্বিতীয়জন প্রাণে মারা যায়। মৃত্যুপথযাত্রীর মনের কষ্ট অন্যে অনুমান করে বর্ণনা করতে পারে না। শাকপাতা খেয়েও উদরপূর্তি করা যায়। তার জন্য কে প্রাণী হত্যার মতো পাপ কাজ করে?

দীর্ঘকর্ণের এরূপ সুন্দর সুন্দর কথা শুনে জরদ্গবের মনটা গলে গেল। সে তাকে বিশ্বাস করল এবং দ্বিতীয় একটি কোটরে তাকে থাকতে দিল। কিছুদিন যাওয়ার পর দীর্ঘকর্ণ একটা একটা পক্ষীশাবক ধরে তার কোটরে বসে খেতে লাগল। তারপর একদিন যাদের শাবক হারানো গেছে, তারা চিত্কার শুরু করল। তা শুনে দীর্ঘকর্ণ দ্রুত পলায়ন করল। পাখিরা খুঁজতে খুঁজতে সেই কোটরে শাবকদের হাড়গোড় দেখতে পেয়ে ভাবল, জরদ্গবই তাদের শাবকদের খেয়ে ফেলেছে। তখন সবাই মিলে তাকে মেরে ফেলল।

জরদ্গবের এ কাহিনী বলার পর সুবুদ্ধি চিত্রাঙ্গকে বলল: এজন্যই বলছিলাম— অজানা অচেনা কাউকে বিশ্বাস করতে নেই।