রেশমি, এক রেশমি থি।

হ্যাঁ, রেশমিকে কেমন পরীর মতো ফুটফুটে দেখাচ্ছিল। রক্তশূন্যতায় শিথিল হয়ে যাওয়া ফর্সা শরীরে গোলাপির আভা। ফ্যাকাসে নয়। অসামঞ্জস্যই বটে। ক্ষীণকায় শরীরে সে যখন শিশুদের মতো পা ফেলে হাঁটছিল, কারো কারো এ রকমই বোধ হয়, রেশমির মধ্যে অশরীরী আত্মার প্রবেশ ঘটেছে। নাহলে তাকে কেন সিনড্রেলার মতো কিশোরী সুন্দরী মনে হচ্ছে? আর সে যখন বলল, ‘ওই ছেলেটা এসেছিল। জানালা দিয়ে আমাকে ডেকেছিল।’ বলার ভঙ্গিমাতে মনে হচ্ছিল, এক কিশোরী তার প্রথম প্রেমের কাহিনী শোনাচ্ছে। তার মধ্যে ভাবালুতার সাথে সলজ্জ আভা চোখে-মুখে ঢেউ খেলে যায়।

প্রথম প্রথম কথাগুলো শুনে বাড়িতে থাকা বউটি আর কিশোরী মেয়েরা হেসে লুটোপুটি খেতে খেতে পরমুহূর্তেই কেমন একটা অজানা আশঙ্কায় আড়ষ্ট হয়েছে। রেশমির বলায় তাদের কল্পনার দৃষ্টি একের পর এক খুলে যেতে থাকে। মধ্যদুপুরে ঘোরলাগা সন্ধ্যা নেমে আসে। কেবল কাহিনী হতে থাকে তাদের চোখে। ‘অল্প বয়সী ছেলেটা, খুব সুন্দর, বলে কি আমাকে বিয়ে করবে।’ বলেই সে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। কল্পনা, কাহিনী আর বাস্তব জগতে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে সবাই একসাথে বলে ওঠে ‘ভীমরতি’। বলেই তারা বিরতিতে যায়, রেশমির ভীমরতির তো কিছু নেই।

সে তো এই জগতের মানুষ নয়।

জিন-ভূতের আছর পড়েছে কিনা এই বাড়িতে কিংবা এই ঘরে— এই ভেবে আতঙ্কিত হয়ে তারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তার কারণও আছে যথেষ্ট। রেশমির চেহারায়, চলন-বলনে আচমকা পরিবর্তন। পায়ের পাতা তার বরাবরই বালিকা গড়ন। তার চলা, আলতো আলতো কথা, খলবলিয়ে হাসা।

তার দিকে তাকিয়েই সবাই যেন আলৌকিক দৃশ্য অবলোকন করে। এক ছোট্ট পরী তার সাদা পাখা মেলে উড়ছে। পরেও ছিল ফকফকে সাদা কাপড়ে বেগুনি প্রজাপতি প্রিন্টের ম্যাক্সি।

কিশোরী মেয়েদের আগ্রহের পরিমাণ বেশি। তারা বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করে। আর তাতে রেশমি যেভাবে আবছা আবছা বর্ণনা দেয়, মনে হয় জানালার ওপাশে সত্যি কোনো রাজপুত্র এসেছিল। ঘোরলাগা আশপাশ ঘোর থেকে ঘোরতর হয়। ছোট ঘরটিতে তারা দেখে নীলাভ, বেগুনি রাতবাতি, ঠিক রেশমির ম্যাক্সিতে বসানো প্রজাপতির গায়ে যে রঙ দোল খাচ্ছিল। 

পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের স্বল্পতা এবং সংলগ্ন ভাঙাচোরা টয়লেটটি, যেখানে সন্ধ্যে কি দিনদুপুরে চ্যালা ফাঁকফোকড় থেকে বেরিয়ে পড়ে। গুমোট, ভাপসা, মলমূত্রের আবর্জনার গন্ধে যেখানে শ্বাস ঠিকমতো নেয়া যায় না। সে গন্ধ মিটে যায় কেমন ফুলের সৌরভে।

গন্ধরাজ, বেলী, দোলনচাঁপা? সবাইকে অবাক করে দিয়ে রেশমি কেমন বালিকাসুলভভাবে বলে ওঠে, ‘কি সুন্দর গন্ধ, না?’

‘শ্যানেল ফাইভ।’ ‘ও এনেছিল।’

‘ও’ কে ? কেউ তো ছিল। তারা হিসাব মেলাতে মেলাতে হাঁপিয়ে যায় সবাই। কেউ ছিল কি ছিল না, সেটাও তো বড় কথা নয়। ঘরের পরিবেশটা অথবা রেশমি যে বদলে হঠাৎ উচ্ছল হয়ে উঠল, তা কি রেশমির হ্যালুসিনেশন, নাকি তাদের!

কে কে কে? কিছু একটা আবিষ্কারের নেশায় তারা রেশমিকে চেপে ধরে। রেশমি কিছুটা বিমূঢ় হয়ে বসে থাকার পর পরই কিছু একটা মনে পড়ল ভেবে তারপর বালিশের খোলসের ভেতর থেকে প্রায় শতচ্ছিন্ন ছোট একটা ডায়েরি বের করে নিয়ে আসে। খামের ভেতর ঢোকানো স্থায়ীভাবে দাগ পড়ে যাওয়া পোস্টকার্ড। ডায়েরির ছোট পাতাগুলো এত মিহি  হয়ে আছে যে, এখনই ঝুলে পড়ে যাবে। প্রতিটি পাতায় যে কিছু লেখা ছিল, তা স্পষ্টত বোঝা যায়। যেনবা জল পড়ে পাতা ধুয়ে গেছে।

মেয়েরা তন্ন তন্ন করে খোঁজে কিছু যদি আবিষ্কার করা যায়। হারিকেনের বাতিতে দেখার মতোই তারা কোনোমতে একটা নাম পড়তে পারে। সেটা কি রেশমি যে ছেলেটির কথা বলে সে? পাশের বাড়িতে ততক্ষণে ফুল ভলিউমে বেজে ওঠে রোজার্সের ফ্লুটের ঘুম পাড়ানিয়া কিংবা ঘুম ভাঙানিয়া সুর। সবাইকে পারলে মাছির মতোন তাড়িয়ে, সরিয়ে দিয়ে রেশমি কান পাতে। ‘যাও তোমরা সবাই, এখন সে আসবে।’

২.

বাড়িটা যত তাড়াতাড়ি ডেভেলপারকে দিয়ে দেয়া যায় ততই মঙ্গল। দেয়ালের চুনা উঠে গিয়ে ইটের গাঁথুনি বের হয়ে আছে।

চুনের পলেস্তারা যাও-বা ছাদে ঝুলে আছে, দিনরাত্রি মানে না, ঝুরঝুর করে পড়ে। পরবর্তী প্রজন্ম যদি লেখাপড়া শিখে ভালো চাকরি-বাকরি ধরতে না পারে বা যেনতেনভাবে টাকা-পয়সা রোজগার করতে না পারে, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তিতে এর চেয়ে আর কত ভালো থাকা যায়! ঢাকা শহরে ছোট আরো দুই ভাই নিম্নমধ্যবিত্তরা যে এলাকায় থাকে, সেখানে ভাড়া বাসায় থাকে। মূল কারণ এ বাড়িতে থাকার জায়গা নেই, তাদের কর্মস্থল ও বাচ্চাদের স্কুল-কলেজ দূরে পড়ে যায়। বড় ছেলেটির কাঁধে তাই পড়ে গেছে সব দায়িত্ব। এ সম্পত্তিতে যে কেবল তাদেরই অধিকার তা নয়। চাচাতো-ফুপাতো ভাইবোন, তারা তুলনামূলকভাবে অনেকটা দাঁড়িয়ে গেছে। তবু উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে কারো ছাড় নেই। নিজেদের একটু সচ্ছলতা এবং তাদের চাপাচাপিতে সম্পত্তি ভাগাভাগি এখন জরুরি বিষয়। ছেলে সময়ে অসময়ে মনে করিয়ে দেয়, ‘বিল্ডিং ভাঙা না পর্যন্ত খেয়ালে রেখো।’ বউয়ের মাথায় তখন ঘুরঘুর করে শ্যানেল ফাইভ। সে শুনেছিল খুব দামি নাকি। বউ আচমকা স্বামীকে বলে ফেলে, ‘আমাকে একটা শ্যানেল ফাইভ এনে দেবে?’ ছেলে যেহেতু বুঝে নাই অথবা অপরিচিত ঠেকে, তাই বারবার জিজ্ঞেস করে— ‘কী বললা?’ বউ চেপে যায়। সত্যিই তো তা কিনে দেয়ার ক্ষমতা তার স্বামীর নাই। কিন্তু বাদবাকি সময়গুলোয় শ্যানেল ফাইভ ঠিকই তাকে তাড়া করে। কী এমন অতীত আছে রেশমির? আশপাশের মানুষগুলোই যখন সুদূর অতীত, কোন অতীত তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়? বউটির নিরামিষ জীবনে এ যেন সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মতোই। রেশমি পাকিস্তান আমলে বিএ পাস। যখন পাস করেছিল তখন সব বিষয়ই ইংরেজিতে পড়তে হতো। ফলে তার ইংরেজি উচ্চারণে কোনো ভুল নাই। কেমন সুন্দর করে বলে, ‘শ্যানেল ফাইভ’। বলাটা খুব স্টাইলিশ শোনায়। বউ যখন এ রকমটি ভাবতে থাকে, ছেলেটি তখন মনে মনে দোয়াদরুদ পড়তে থাকে। এই এলাকায় যে ডেভেলপার পেয়েছে, সেটাই বিরাট ব্যাপার। ঢাকা শহরে থেকেও আশপাশে বিরান ভূমি, কিছুটা জলাভূমিও বলা চলে। অল্প বৃষ্টিতে মাঠ-ঘাট পানিতে থইথই করে। আশপাশটা পুকুর-ডোবায় ভর্তি। ইদানীং কোম্পানির মাধ্যমে দু-চারটা অ্যাপার্টমেন্ট দাঁড়াচ্ছে কেবল। ফলে যে এলাকাতেই হোক, জমির পরিমাণটা বেশি হওয়াতে সুবিধা হয়েছে। তবু চাহিদাসম্পন্ন এলাকার মতো ফিফটি ফিফটির বদলে ফরটি সিক্সটি পাচ্ছে তারা। তারা ১৪ জন কাজিন মিলে, ছেলেরা পাবে দুটো করে মেয়েরা একটা। রেশমির ভাগেও সবচেয়ে ছোট সাইজের একটা ফ্ল্যাট পড়বে। সেটা আদতে গিয়ে পড়বে এই ছেলেরই ভাগে।

ফাইনাল ডিড অব এগ্রিমেন্টে সবার সিগনেচার লাগবে। রেশমি দিতে পারলে দেবে নাহলে টিপসই। কিন্তু ডেভেলপাররা একটু আগায় তো বেশি পিছায়। সাইনিং মানি নিয়ে গড়িমসি। ছেলের বুক ধড়ফড়ানি বেড়ে যায়। কখন কার কী ঘটে যায়! সবাইকে একত্রিত করে নিজ উদ্যোগে এতটুকু এগিয়েছে। ফাইনাল কিছু না হওয়া পর্যন্ত সবাই সহি-সালামতে থাকুক। পুরনো বিল্ডিং ভাঙলেই পাশেই ছোট একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে চোখের সামনে তদারক করবে। তার যখন বুক ধড়ফড় করে, সে তখন ছোট ছেলের মতো ঘ্যান ঘ্যান করে বউয়ের সাথে, ‘কটা দিন সামলে রেখে নিও।’ বউয়ের চোখে-মুখে তখন অন্য নেশা। শ্যানেল ফাইভের। পুরনো প্রেমের ভাবনা তাকেও আচ্ছন্ন করে রাখে। ছেলে যখন বউকে বলে রেশমিকে আরো কিছুদিনের জন্য সামলে রাখার জন্য, সে তখন আজব আজব প্রশ্নে স্বামীকে বিব্রত করতে থাকে। ‘উনাদের কি পছন্দের বিয়ে ছিল?’ ‘উনাদের বয়সের ফারাক কত ছিল?’ ‘উনাদের মধ্যে মিল-মহব্বত কেমন ছিল?’ যেনবা এসব জিজ্ঞেস করলেই সব রহস্য উন্মোচিত হবে। ছেলে বিরক্ত হয়, উঠে চলে যায়। ফাজিল বউ তার। বউয়ের মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। কে জানতে পারে? রেশমির কোনো বান্ধবী, সমসাময়িক আত্মীয়স্বজন। তাদের সে এখন কোথায় খুঁজতে যাবে? কারো সাথে বলতে গেলে তো বলার মতো যোগাযোগ নেই। পেলেও তাদের স্মৃতি যে বিবর্ণ হয়ে যায়নি তাই-বা কী? কেবল রেশমি যা একটু বলে, তাতে সে কল্পনার রঙ চড়ায়। এক হারিয়ে যাওয়া অনাবিষ্কৃত প্রেমের গল্পে সে বিভোর হয়ে থাকে।

৩.

বাড়ির একমাত্র কাজের মেয়েটি রেশমির ঘরে চাদর পেতে মেঝেতে ঘুমায়। একদিন সে বস্ফািরিত চোখে, আতঙ্কিত গলায় মাঝরাতে সবার ঘুম ভাঙায়, ‘আমি উনার ঘরে আর ঘুমামু না।’ তারপর অনর্গলভাবে ভয়ার্ত কণ্ঠে সে বলে যায়, যেন সে সত্যিকারের জিন-ভূত দেখেছে।

‘রাতের বেলায় উনি ঘুমায় না। জানালার পাশে বসে কার লগে জানি কী কথা কয়, হাসে। কোন ভাষা, সেটা আমি কতি পারুম না।’ তাকে কোনোভাবেই বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওই ঘরে রাতের বেলায় আর ঢোকানো যায় না। সে ওই ঘরের দরজার বাইরের বারান্দায় তোশক পেতে ঘুমায়। বউয়ের সামলিয়ে রাখাটার ব্যাঘাত ঘটে।

একদিন মাঝরাতে বৃষ্টি ধোয়া প্রকৃতিতে চাঁদের আলোয় আকাশ সাদা ঝিকমিক করে। গাছের পাতায় আন্দোলিত বাতাস। রেশমি ক’দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। কেবল বলে, সে আর আসে না। বউয়ের তিন কিশোরী মেয়ে খুব গবেষণায় মেতে ওঠে। তাহলে জিন ছেড়েছে।

সেই রাতে, মাঝরাত পর্যন্তই বাড়ির বাতি জ্বলছিল। ওই সময় অবধি বাড়ির মানুষেরা জেগে থেকে টেলিভিশন দেখে, মেয়েগুলো পরীক্ষা থাকলে পড়াশোনা করে। কাজের মেয়েটি ঘুমের গভীর জগতে। রেশমিকে কোন নেশায় টানে। কত দিন,  মাস, বছর বাদে। সে তার নিজের ঘরের বাইরে পা বাড়ায়। জগিবহীন এক নারী জগতের দিকে ধাবমান। পিছলা উঠোন, জংলি গাছের ঝোপঝাড়, জমানো ইটের ঢিবি অবলীলায় ডিঙিয়ে সে বাড়ির বড় গেটে চলে আসে। এদিকে চোর-ডাকাতের উপদ্রব নেই বলে বাইরের গেট খোলা কি বন্ধ, তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।  জং-ধরা গেট তো গেট নয়, ভাঙাচোরা টিনের ঢেউ। রাস্তায় নামতেই ফুরফুরে হাওয়ায় তার মন চাঙা হয়ে ওঠে। রূপকথার গল্প কিছু একটা মনে হয় তার, ভেবেই সে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।

একটা ছায়া তার পাশে কেবল উড়ে উড়ে যায়, সেটার পেছনে সে মরীচিকার মতো দৌড়ায়। সমস্ত জীবনটা ছিল কষ্টের, কেবল এই স্মৃতিটাই যতটাই সুখের, তেমনি বিষাদের। চিঠিগুলো উড়ে উড়ে আসত, সাথে সেই সুঘ্রাণ— যেটা যাওয়ার সময় সে দিয়ে গিয়েছিল। সেও ছিল বেপরোয়া, মা-বাপের গচ্ছিত টাকাগুলো যেখানে থাকত, সেখান থেকে সে অবলীলায় চুরি করত। এছাড়া উপায়ই-বা কী। হাতে পাঁচ পয়সা কি এক পয়সারও জমান থাকত না। তারপর সে মাইলের পর মাইল হেঁটে পৌঁছে যেত ডাক অফিসে। কিছুই পুরোপুরি মনে আসে না, ভাবতে গেলে একটা কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে রয়।

কাঁচা-পাকা রাস্তা। যত্নবিহীনভাবে বেড়ে ওঠা বিশাল বৃক্ষরাজি, চাঁদের আলোয় কিছুটা দৃশ্যমান, বাকিটা অদৃশ্যমান পুকুরের বা খাল-ডোবার সীমারেখা।

দূরে আদিগন্ত মাঠের দিক থেকে একটা ছেলেকে এগিয়ে আসতে দেখে রেশমি। তাতেই উত্ফুল্ল হয়ে ওঠে রেশমি। পরনে তার প্রজাপতি ম্যাক্সি। সাদা চাঁদের আলোয় তার শরীর, মুখ চাঁদবন্যায় ভেসে যায়। পরীর মতোই ডানা মেলে তাদের দিকে উড়ে যায় রেশমি। ছেলেটার কাছে যেতেই দেখে চাঁদ হঠাৎ মেঘে ঢেকে গেছে। চারধারে কিছুই চেনা যায় না, তারপরও রেশমি অস্ফুট স্বরে বলে, ‘তুমি এখানে?’

হাসাহাসি করতে করতে তার আরো পেছন থেকে আরো ক’জন বের হয়ে আসে। ‘ওহ হো পরী।’ মুখে তাদের উত্কট গন্ধ। ‘এত রাইতে। ওই এমনিতেই ধরা দিছেরে।’

একজন রেশমিকে জাপটে ধরে কোলে তুলে নেয়। কিছু পরেই তারা বুঝে যায়, ‘না রে এ তো  থুত্থুরে বুড়ি।’

আরেকজন সামনে এসে রেশমির বুকে হাত দিয়ে তন্ন তন্ন করে খোঁজে, ‘যা শালা বুড়ি হোক আর যা-ই হোক, মেয়েমানুষ তো। বুক থাকলেই হবে।’ তার কথায় অশ্লীলতার গন্ধ পেয়ে তীব্র অশ্লীলভাবে তারা খ্যাক খ্যাক করে হাসে।

রেশমি তখন মেঘের রাজ্যে উড়ে যাচ্ছে। সে তো এই জগতের কেউ  নয়। চিঠির বুকে যে সুঘ্রাণ সুদূর থেকে উড়ে আসত, তার নেশায় সে ভেসে বেড়ায়। হারিয়ে যেতে থাকে, জলমগ্ন ঘাসে টুকরো টুকরো হয়ে থাকা রেশমির মিহি কান্নার সুর।

৪.

বেশি সময় লাগে না। ঘটনাটা কেউ দেখেনি। মধ্যরাত তার আরো আগে পার হয়ে গেছে। জগতের আকাশ, চাঁদ, বৃক্ষ, বাতাস, প্রকৃতি নীরব চোখে সেই দৃশ্য অবলোকন করে। প্রকৃতির গতিবিধি কিছু সময়ের জন্য কি স্থবির হয়ে গিয়েছিল? আকাশের জমানো মেঘ থেকে এক ফোঁটা বৃষ্টি কি সেই মুহূর্তে ঝরেছিল? বিশাল বিশাল বৃক্ষে জমে থাকা বৃষ্টির জল কি মাটিতে গড়িয়েছিল কিনা জানা নেই। এছাড়া তো সাক্ষী বলতে কিছু ছিল না।

না জানা থাকলেও একটা ব্যাপারে বিস্ময় থেকে যায়। এটা কি প্রকৃতির রহস্যজনক অদ্ভুত প্রতিশোধ? ছেলেগুলোর মাঝে কোনো পাপবোধ, অনুশোচনা ছিল না। চার-চারটা তরতাজা ছেলে। আঠারো-বিশ বছর হবে। বখে গিয়েছিল এই বয়সেই। সারা রাত জুয়া, ব্লু ফিল্ম, ইয়াবা সেবন করে রাস্তা-ঘাটে পড়ে থাকত বা বাড়িতে ফিরে খেঁকশিয়ালের মতো শোরগোল তুলত।

রেশমির বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুদিন বাদেই তাদের লাশ পড়েছিল বিশাল জলমগ্ন মাঠটিতে। কেউ বলতে পারে না, কীভাবে! গাছচাপা পড়েও না, বিদ্যুতের তারে জড়িয়েও না। তাদের মৃত শরীর ছিল অক্ষত। সেই রাতে ভাপসা গরম ছিল, আকাশে জমানো কোনো মেঘ ছিল না। তাই বজ পাতের প্রশ্নই ওঠে না। তার পরও চারটা লাশ শনাক্ত হয় মৃত শরীরগুলো যখন কাঠের মতো শক্ত হয়ে ছিল।

ওদিকে সে রাতের পর রেশমিকে আর কেউ দেখেনি। ছেলের তো মাথা খারাপ। ছোট ভাইরা পারলে তাকে খেয়ে ফেলে। একটা জলজ্যান্ত মানুষ কেমনে হারায়? তাদের তিন ভাইয়ের জন্মদাত্রী মা। আগে সে বউকে চড়-থাপ্পড় মেরেছে, এবার সে পা দিয়ে লাত্থায়। ‘তোরে এতো বলে রাখছি, বেশি দিন না মাত্র কয়টা দিনের জন্য দেইখ্যা রাখ, মাগী তাও পারলি না।’

থানায় জিডি করা, নিখোঁজ মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবে রেশমির ছবি, সে কবেকার পুরনো একটা ছবি পত্রিকায় উঠে যায়।

ডেভেলপাররাও লাপাত্তা হয়ে যায়। রেশমির হারিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাদের সুন্দর জীবনের স্বপ্ন আপাতত স্থগিত হয়ে যায়। সবাই স্বপ্ন দেখে, কল্পনার চোখে দেখে রেশমি ফিরে এসেছে।

সেই কল্পনার জগত্টা তো রেশমি তাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে।

আর বউটি সংসারের সব কাজ, স্বামীর যত্ন-আত্তি, মেয়েদের তদারকি বাদ দিয়ে খালি কাঁদে আর কাঁদে। তার বুকটা কেমন খালি খালি ঠেকে। রেশমি যে তার পুরনো প্রেমকে উসকে দিয়ে গিয়েছিল। তারও যে ছিল চিঠি প্রেমের ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত স্বল্প আয়ের শ্রমিকটির হাতে মেয়েকে সঁপে দেয়ার বদলে পুরনো আভিজাত্য আছে এমন বাড়িতে তাকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। স্মৃতি বিতাড়িত তার কথা মনে করে সে আর বর্তমান স্বামীর রূঢ় আচরণ সহ্য করে যায়। রাত বাড়লেই তার কান্না বাড়ে, সে তখন তার আশপাশে মিহি কান্নার সুর শোনে আর নিজেকে রেশমি ভাবতে শুরু করে। তার স্বামী ভেতরের ঘর থেকে চিল্লাতে থাকে অনবরত, ‘তোরে কিন্তু পাবনার হাসপাতালে রেখে আসমু।’