রুমিকে প্রায়ই মরমি, সাধু, আলোকিত পুরুষ বলা হয়। খুব কমই মুসলিম হিসেবে উল্লেখ করা হয় তাকে।

বছর দুই আগে কোল্ডপ্লের ক্রিস মার্টিন গিনেথ প্যালট্রোর সঙ্গে বিচ্ছেদের ঘটনার ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় তার মন চাঙ্গা করতে এক বন্ধু তাকে একটা বই দিয়েছিলেন। সেটা ছিল কোলম্যান বার্কসের তরজমায় ত্রয়োদশ শতকের পারসি কবি জালালউদ্দীন রুমির কবিতার সংকলন। ‘আমার জীবন যেন পাল্টে দিয়েছিল ওটা,’ পরে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন মার্টিন। কোল্ডপ্লের অতিসাম্প্রতিক অ্যালবামে বার্কসের আবৃত্তিতে একটা কবিতা রয়েছে: ‘এই মানব দেহ এক পান্থশালা/রোজ ভোরে নতুন কেউ আসছে/আনন্দ, বিষণ্নতা, নীচতা,/ক্ষণিকের সচেতনতা দেখা দেয়/অনাহূত অতিথির মতো।’

সেলিব্রিটিদের আধ্যাত্মিক যাত্রায় সাহায্য করেছেন রুমি— ম্যাডোনা, টিল্ডা সুইনটন— তাদের কেউ কেউ একইভাবে নিজেদের কাজে তার রচনাকে যুক্ত করেছেন। রুমির নামে চালু বাণী অনুপ্রেরণা জুগিয়ে হররোজ সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ‘প্রতিটি ঘর্ষণেই বিরক্ত হলে চকচকে হয়ে উঠবে কীভাবে?’— তারই একটা ঠিক এ রকম। কিংবা ‘প্রতিটি মুহূর্তে বাটালি দিয়ে নিজের নিয়তি খোদাই করি আমি, আমি নিজের আত্মার ছুতোর।’ বিশেষত বার্কসের তরজমা ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে বিনিময় হচ্ছে, আমেরিকান বইয়ের দোকানের তাকেও সার বেঁধে রাখা হচ্ছে, আবৃত্তি হচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রুমিকে প্রায়ই বেস্টসেলিং কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। সাধারণভাবে তাকে মরমি, সাধু, সুফি, আলোকিত পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়। কৌতূহলোদ্দীপকভাবে অবশ্য কোরআন ও ইসলামের আজীবন পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও খুব কমই মুসলিম হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অ্যালবামে মার্টিনের ব্যবহার করা কথাগুলো রুমির জীবনের শেষদিকে রচিত ছয় খণ্ডের মহাকাব্য ‘মাসনবি’ থেকে নেয়া। এর ৫০ হাজার পঙিক্তর বেশির ভাগই ফার্সি, তবে মুসলিম ধর্মগ্রন্থের আরবি উদ্ধৃতিতেও ভরা; ঘন ঘন নৈতিক শিক্ষা তুলে ধরা  কোরআনীয় কাহিনীর উল্লেখ করেছে বইটি (কোনো কোনো পণ্ডিতের ধারণা মোতাবেক অসমাপ্ত রচনাটির নাম ফার্সি কোরআন রাখা হয়েছে)।

ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের পার্সিয়ান স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ফাতেমেহ কেশাভার্য আমাকে বলেছেন, কবিতায় ঘন ঘন উদ্ধৃতি দেয়ার বিষয়টি দেখলে রুমি সম্ভবত কোরআন হেফজ করেছিলেন বলেই মনে হয়। স্বয়ং রুমি মাসনবিকে ‘ধর্মের মূলের মূলের মূল’ অর্থাৎ ইসলাম ও কোরআনের তাফসির হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুল বিক্রীত অনুবাদে ধর্মের সামান্যই লেশ রয়েছে। ‘মানুষের ভালোবাসার রুমি ইংরেজিতে দারুণ চমত্কার এবং আপনার মেটানো দাম সংস্কৃতি ও ধর্মকে বাদ দেয়া,’ সম্প্রতি আমাকে বলেছেন রুটগার্জে আদি সুফিবাদের পণ্ডিত জাওয়িদ মোজাদ্দেদি।

ত্রয়োদশ শতকে বর্তমান আফগানিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন রুমি। পরে বর্তমান তুরস্কের কোনিয়ায় সপরিবারে থিতু হন। তার বাবা ছিলেন যাজক ও ধর্মীয় পণ্ডিত। তিনিই সুফিবাদের সঙ্গে রুমিকে পরিচয় করিয়ে দেন। সিরিয়াতেও ধর্মতাত্ত্বিক পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন রুমি, সেখানে সুন্নি ইসলামের আরো প্রচলিত আইনি বিধিবিধান নিয়ে গবেষণা করেন। পরে পাঠালয়ের শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসেন কোনিয়ায়। এখানেই প্রবীণ পর্যটক শামস-ই তাবরিজের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। তার গুরুতে পরিণত হন তিনি। দুজনের নিবিড় বন্ধুত্বের ধরন নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে, তবে সবাই একমত যে রুমির ধর্মীয় অনুশীলন ও কবিতার ওপর শামসের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে। রুমির নতুন জীবনী রুমি’জ সিক্রেট-এ ব্র্যাড গুচ শামস কীভাবে রুমিকে কোরআনের বিভিন্ন অনুচ্ছেদ নিয়ে বিতর্কের ভেতর দিয়ে খোদার একত্বের আবিষ্কারের মতো ভক্তির ধারণায় গুরুত্ব আরোপ করে, তার শাস্ত্রীয় শিক্ষাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিলেন, তারই বর্ণনা দিয়েছেন। রুমি সুফিবাদে পাওয়া ঈশ্বরের প্রতি সহজাত ভালোবাসাকে সুন্নি ইসলামের আইনি বিধি এবং শামসের কাছে শেখা অতীন্দ্রিয়বাদী চিন্তার সঙ্গে মিশিয়ে দেবেন।

কেশাভার্য আমাকে বলেছেন, প্রভাবের এমনই বিচিত্র নকশা রুমিকে তার বহু সমসাময়িক থেকেই আলাদা করেছে। তবু, সুফি, মুসলিম অক্ষরবাদী ও ধর্মবিদ, ক্রিশ্চান এবং ইহুদিদের পাশাপাশি স্থানীয় সেলজুক শাসকদের অন্তর্ভুক্ত করে কসমোপলিটান কোনিয়ায় বিশাল অনুসারী তৈরি করেছিলেন তিনি। রুমি’জ সিক্রেট-এ গুচ প্রয়োজনীয়ভাবেই রুমিকে প্রভাবিত করা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ ও ধর্মীয় শিক্ষার ঠিকুজি তুলে ধরেছেন। ‘এক ধার্মিক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন রুমি; সারা জীবন দৈনন্দিন প্রার্থনা ও উপবাসের রীতি মেনে চলেছেন’— লিখেছেন গুচ। এমনকি গুচের বইতেও এসব বাস্তবতা ও রুমি কোনো অর্থে নিজের পটভূমি ছাপিয়ে গিয়েছিলেন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভেতর দোটানা লক্ষ করা গেছে। অর্থাৎ, গুচ যেভাবে উল্লেখ করছেন, ‘সব সংগঠিত ধর্মবিশ্বাস ছাড়িয়ে যাওয়া এক “ভালোবাসার ধর্মে”র দাবি করেছেন’ তিনি।

 এই ধরনের পাঠে যে জিনিসটা খোয়া যেতে পারে, সেটা হলো এমনকি এমনি ধারণাকে রূপ দেয়া রুমির মুসলিম শিক্ষা। মোজাদ্দেদি যেমন উল্লেখ করেছেন,  কোরআন সর্বজনীনতার পথে সূচনাবিন্দু তুলে ধরে ক্রিশ্চান ও ইহুদিদের ‘কিতাবধারী জাতি’ হিসেবে স্বীকার করেছে। ‘আজকের দিনে রুমির মাঝে অনেকের সমীহ দেখানো সর্বজনীনতা তার মুসলিম প্রেক্ষিত থেকেই এসেছে।’

কোল্ডপ্লে জড়িয়ে পড়ার বহু আগেই রুমির কবিতা থেকে ইসলাম মুছে ফেলার ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল। ডিউক ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্টার্ন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক ওমিদ সাফি বলেছেন, ভিক্টোরীয় আমলেই পশ্চিমের পাঠকরা অতীন্দ্রিয় কাব্যকে ইসলামী শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ শুরু করেন। সে সময়ের অনুবাদক ও ধর্মবেত্তারা ‘মরু ধর্মে’র ধারণার সঙ্গে এর অস্বাভাবিক নৈতিক ও আইনি বিধি এবং রুমি ও হাফিজের মতো কবিদের রচনা খাপ খাওয়াতে পারেননি। তারা যে ব্যাখ্যায় থিতু হয়েছেন, আমাকে বলেছেন সাফি, সেটা ছিল, ‘ইসলামের কারণে নয় বরং ইসলাম থাকা সত্ত্বেও এই মানুষগুলো অতীন্দ্রিয়বাদী হয়েছেন।’ এটা ছিল সেই সময় যখন মুসলিমদের আইনি বৈষম্যের উদ্দেশ্যে চিহ্নিত করা হয়—১৭৯০ সালের একটি আইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কতজন মুসলিম আসতে পারবে, তার সংখ্যা হ্রাস করেছিল; এর ১০০ বছর পর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ‘অন্য সব গোষ্ঠী, বিশেষ করে ক্রিশ্চানদের প্রতি মোসলেম বিশ্বাসের লোকদের তীব্র বৈরিতার’ কথা উল্লেখ করে। ১৮৯৮ সালে মাসনবির তরজমার ভূমিকায় স্যার জেমস রেডহাউস লিখেন, ‘মাসনবি জগৎ ত্যাগ করে ঈশ্বরকে জানতে ও তার সঙ্গে থাকার প্রয়াসী, নিজেদের সত্তাকে বিলীন করে আধ্যাত্মিক ধ্যানে নিজেদের নিবেদন করতে চায়, তাদের উদ্দেশে রচিত।’ পশ্চিমে যাদের কাছে রুমি ও ইসলাম বিচ্ছিন্ন ছিল।&dquote;&dquote;

বিংশ শতাব্দীতে প্রধান অনুবাদকদের একটা ধারা— আরএ নিকলসন, এজে আরবেরি ও আনামেরি শিমেল রয়েছেন, তাদের ভেতর— ইংরেজি ভাষার ভাণ্ডারে রুমির উপস্থিতি জোরালো করেছেন। কিন্তু বার্কসই আসলে রুমির পাঠকসংখ্যা বিপুলভাবে বাড়িয়ে তুলেছেন। তিনি অনুবাদকের চেয়ে বরং বেশি করে ব্যাখ্যাকারী। ফার্সি লিখতে বা পড়তে পারেন না তিনি, তার বদলে ঊনবিংশ শতকের অনুবাদকেই আমেরিকান পঙিক্ততে রূপান্তর করেন।

একেবারেই বিশেষ ধরনের পঙিক্ত এটা। ১৯৩৭ সালে জন্ম বার্কসের টেনেসির চাত্তানুগায় বড় হয়েছেন। পিএইচডি করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে এবং ১৯৭১ সালে তার প্রথম কবিতার বই দ্য জুস প্রকাশ করেন। একই দশকের শেষদিকে আরেক কবি রবার্ট ব্লাই আরবেরি অনূদিত একটা কপি তার হাতে দিয়ে ‘খাঁচা থেকে ওগুলোকে বের করে আনা’র অর্থাৎ আমেরিকান পদ্যে তরজমা করার কথা বললে প্রথমবারের মতো রুমির কথা জানতে পারেন। (৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিউ ইয়র্কারে কবিতা প্রকাশ করে আসছেন ব্লাই। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত তার আইরন জন: আ বুক অ্যাবাউট মেন গ্রন্থটি আধুনিক পুরুষের আন্দোলনকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে। পরবর্তীতে নিজেই রুমির কিছু কবিতা অনুবাদ করেছিলেন।) বাকর্স কখনই ইসলামী সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেননি। কিন্তু অচিরেই সম্প্রতি জর্জিয়ার বাড়ি থেকে টেলিফোনে আমাকে বলেছেন তিনি, স্বপ্ন দেখতে পেয়েছিলেন। ওই স্বপ্নে একটা নদীর কিনারে পাহাড়ের ওপর ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। তখন এক আলোর বলয়ে আগন্তুক এসে বলেছেন, ‘তোমাকে আমি ভালোবাসি।’ এই মানুষটিকে বার্কস আগে কখনো দেখেননি, তবে পরের বছর, ফিলাডেলফিয়ার কাছে এক সুফি গোষ্ঠীতে তার দেখা পান। ওই গোষ্ঠীর নেতা ছিলেন মানুষটা। বিকালগুলো ব্লাইয়ের দেয়া ভিক্টোরিয়ান অনুবাদ পর্যবেক্ষণ এবং নতুন বিন্যাসের পেছনে কাটাতে শুরু করেন বার্কস। তখন থেকে রুমির এক ডজনেরও বেশি বই বের করেছেন তিনি।

আমাদের আলাপচারিতায় বার্কস রুমির কবিতাকে ‘হূদয় উন্মুক্ত করার রহস্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন; এমন একটা জিনিস, আমাকে বলেছেন তিনি, ‘যা ভাষায় বলতে পারবেন না।’ ব্যাখ্যার অতীত ওই বিষয়ের নাগাল পেতে রুমির রচনার ক্ষেত্রে কিছু স্বাধীনতা নিয়েছেন তিনি। যেমন, ইসলামের ন্যূনতম উল্লেখ করেছেন। বিখ্যাত কবিতা ‘লাইক দিস’-এর কথা ভাবুন। এর একটি পঙিক্ত আরবেরি মোটামুটি বিশ্বস্ততার সঙ্গেই ‘হুরির কথা কেউ জানতে চাইলে (তোমার) চেহারা দেখিয়ে (বলো) “এই রকম” হিসেবে অনুবাদ করেছেন। হুরি হচ্ছে ইসলামে স্বর্গের প্রতিশ্রুত কুমারী। বার্কস এমনকি ওই শব্দটির আক্ষরিক তরজমাও এড়িয়ে গেছেন; তার ভাষ্যে পঙিক্তটি পরিণত হয়েছে, ‘কেউ যদি জানতে চায় আমাদের সব যৌন চাহিদার নিখুঁত তৃপ্তি কেমন হবে, তোমার মুখ তুলে বলো, “এই রকম”।’ ধর্মীয় প্রেক্ষিত অদৃশ্য হয়ে গেছে। আবার একই কবিতার অন্যত্র বার্কস জেসাস ও জোসেফের উল্লেখ বহাল রেখেছেন। এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেন, ইসলামী উল্লেখ বাদ দেয়ার ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃতভাবে করেছেন কিনা মনে করতে পারছেন না। ‘আমি প্রেসবিটারিয়ান হয়ে বড় হয়েছি,’ বলেছেন তিনি। ‘বাইবেলে পঙিক্ত মুখস্থ করতাম, কোরআনের চেয়ে নিউ টেস্টামেন্ট বেশি ভালো জানি।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোরআন পড়া কঠিন।’

আরো অনেকের মতো ওমিদ সাফি বার্কসকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লাখ লাখ পাঠকের কাছে আমেরিকান পদ্যে রুমিকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার কৃতিত্ব দেন। কবির কবিতা ও জীবন নিয়ে উল্লেখযোগ্য সময় দিয়েছেন বার্কস। রুমির অন্যান্য ভাষ্যও রয়েছে যেগুলো মূল থেকে আরো অনেক দূরবর্তী— যেমন দীপক চোপড়া এবং ড্যানিয়েল ল্যাডিনস্কির নিউ এজ বুকস রুমির বই হিসেবে বিপণন ও বিক্রি করা হলেও কবির রচনার সঙ্গে সামান্যই মিল রয়েছে। আধ্যাত্মিক রচনার লেখক ও বিকল্প চিকিৎসায় উৎসাহী চোপড়া স্বীকার করেছেন তার কবিতাগুলো রুমির বক্তব্য নয়। বরং, দ্য লাভ পোয়েমস অব রুমির ভূমিকায় যেমন লিখেছেন, এগুলো এক নতুন সৃষ্টিকে জীবন দিয়ে কিন্তু এর উেসর মূল সুর বজায় রেখে মূল ফার্সি থেকে বিচ্ছুরিত নির্দিষ্ট বাক্যবন্ধ হিসেবে ধারণ করা ‘মেজাজ’।

এসব নিউ এজ ‘অনুবাদ’ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে সাফি বলেন, ‘এখানে এক ধরনের আধ্যাত্মিক উপনিবেশবাদ ক্রিয়াশীল দেখতে পাই: বসনিয়া ও ইস্তাম্বুল থেকে শুরু করে কোনিয়া এবং ইরান থেকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিমদের বসবাস ও অন্তস্থকৃত এক আধ্যাত্মিক ল্যান্ডস্কেপ পাশ কাটিয়ে, মুছে ফেলে দখল করে নেয়া।’ ধর্মীয় প্রেক্ষিত থেকে আধ্যাত্মিকতাকে বিচ্ছিন্ন করায় গভীর অনুনাদ রয়েছে। নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনীত জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল মাইকেল ফ্লিনসহ অনেকের হাতেই নিয়মিতই ইসলামকে ‘ক্যান্সার’ বলে শনাক্ত করা হচ্ছে, এমনকি আজো নীতিনির্ধারকরা অপশ্চিমা ও অশ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠী সভ্যতায় কোনো অবদান রাখেনি বলে বোঝানোর চেষ্টা করেন।

বার্কসের ক্ষেত্রে রুমির মূল সত্তার বেলায় ধর্মকে গৌণ হিসেবে দেখছেন তিনি। ‘ধর্ম দুনিয়ার কাছে এমন একটি বিতর্কের প্রসঙ্গ,’ আমাকে বলেছেন তিনি। ‘আমার নিজস্ব সত্য রয়েছে, আপনার নিজের সত্য রয়েছে— এটা স্রেফ অসম্ভব। আমরা একসঙ্গে এখানে আছি এবং আমি আমার হূদয় উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছি। রুমির কবিতা আমাকে তাতে সাহায্য করছে।’ এই দর্শনে কেউ কবিতার ক্ষেত্রে রুমির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা শনাক্ত করতে পারেন। রুমি প্রায়ই ফার্সি পঙিক্তর গীতিময় ছন্দ ও প্রকরণের সঙ্গে মেলানোর জন্য কোরআনের টেক্সট পরিবর্তন করতেন। কিন্তু রুমির পারস্য পাঠকরা এই কৌশল ধরতে পারলেও বেশির ভাগ আমেরিকান পাঠক ইসলামী নীলনকশা সম্পর্কে অজ্ঞ। সাফি কোরআন বিনা রুমি পাঠকে বাইবেল বাদে মিল্টন পড়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন: রুমি ভিন্ন মতাবলম্বী হয়ে থাকলেও এটা মানা জরুরি যে তিনি মুসলিম প্রেক্ষিতেই ভিন্ন মতাবলম্বী ছিলেন এবং শত শত বছর আগে ইসলামী সংস্কৃতিতে ভিন্নমতের জায়গা ছিল। রুমির রচনাবলি স্রেফ ধর্মে আস্তরণ দেয়া নয়, সেগুলো ইসলামী পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক গতিময়তা তুলে ধরে।

রুমি প্রায়ই প্রচলিত পাঠকে চ্যালেঞ্জ করে এক ধরনের পরীক্ষামূলক ভঙ্গিতে কোরআন, হাদিস ও ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। বার্কসের অন্যতম জনপ্রিয় একটি তরজমা এই রকম: ‘সৎ কাজ এবং মন্দ কাজের ধারণার বাইরে একটা ক্ষেত্র আছে/সেখানেই তোমার সঙ্গে দেখা হবে।’ মূল ভাষ্যে ‘সৎ কাজ’ বা ‘মন্দ কাজে’র কোনো উল্লেখই নেই। রুমি রচিত শব্দগুলো ছিল ঈমান (‘ধর্ম’) এবং কুফর (ধর্মহীনতা’)। তাহলে ভেবে দেখুন একজন মুসলিম পণ্ডিত বলছেন যে, ধর্মীয় বিধিতে নয় বরং সহানুভূতি ও ভালোবাসার উচ্চতর জায়গায় বিশ্বাসের ভিত্তি অবস্থান করছে। আজকের দিনে আমরা এবং হয়তো বহু মুসলিম যাজক যাকে বিপ্লবী মনে করবেন, সেই ব্যাখ্যা ৭০০ বছরেরও আগে উত্থাপন করেছিলেন রুমি। 

সেই সময় এই ধরনের পাঠ একেবারে অনন্য ছিল না। রুমির রচনা ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের ভেতর বৃহত্তর দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছে, যদিও তুলনাহীন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। ‘ঐতিহাসিক দিক থেকে বলতে গেলে কোরআন ছাড়া অন্য কোনো টেক্সটই রুমি-হাফিজের কবিতার মতো করে মুসলিম কল্পনাকে রূপ দেয়নি,’ বলেছেন সাফি। এজন্যই লিপিকারদের হাতে লিখতে হতো তেমন একটা সময়ে রচিত রুমির ঢাউস রচনা টিকে গেছে।

‘ভাষা কেবল যোগাযোগের উপায় নয়,’ বলেছেন লেখক ও অনুবাদক সিনান আন্তুন। ‘এটা স্মৃতি, ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকারের ভাণ্ডার।’ দুটো সংস্কৃতির ভেতর সংযোগ হিসেবে অনুবাদকরা সহজাতভাবেই এক ধরনের রাজনৈতিক দায়িত্ব হাতে নেন। তাদের অবশ্যই, ধরা যাক, ত্রয়োদশ শতকের পারস্য কবিকে সমসাময়িক দর্শকদের কাছে বোধগম্য করে তোলার উপায় বের করতে হবে। তবে মূল কাজের প্রতি বিশ্বস্ত থাকারও দায়িত্ব রয়েছে তাদের— রুমির ক্ষেত্রে এই কাজ পাঠকদের এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে শরিয়ার একজন অধ্যাপকও বিশ্বের বহুল পঠিত ভালোবাসার কবিতা লিখতে পারেন।

জাওয়িদ মোজাদ্দেদি এই মুহূর্তে মাসনবির ছয়টি খণ্ডেরই তরজমার একটা প্রকল্পের মাঝপথে আছেন। তিনটি এরই ভেতর বেরিয়ে গেছে; চার নম্বরটির এবারের বসন্তে বেরোনোর কথা। তার অনুবাদ রুমির আরবিতে সরে যাওয়া শনাক্ত করতে ইটালিক ফন্ট ব্যবহার করে মূলের ইসলামী ও কোরাআনীয় টেক্সটের স্বীকৃতি দিয়েছে। তার বইগুলো টীকাটিপ্পনীতেও ভরা। পড়তে গিয়ে বেশ আয়াস এবং পূর্ব ধারণার অতীতে গিয়ে দেখার ইচ্ছার দরকার পড়ে।