এইবার, হে আমার প্রিয়, ধীরে নেমে আসুন রথ থেকে, আর আপনার পা দুটি, হে আমার প্রভু, যেন মাটিকে স্পর্শ না করে আর ভৃত্যগণ, বাড়ির সামনে বিছিয়ে দাও সেই অপ্রত্যাশিত আকাঙ্ক্ষা... সাজাও এক রক্তিমাভ পথ হলিউডে সাফল্য ও স্বীকৃতির শীর্ষ তিলক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে রেড কার্পেট সংস্কৃতি। সেই গ্রিক সভ্যতার যুগ থেকে শুরু করে মর্যাদার প্রতীক এ গালিচা আধুনিক সময়ে হলিউড সংস্কৃতির অত্যাবশ্যকীয় প্রতীক হিসেবে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
সাধারণত ভিআইপি, সেলিব্রিটি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য আড়ম্বরপূর্ণ প্রবেশদ্বার তৈরি করতে, অভ্যর্থনা জানাতে ব্যবহার হয় রেড কার্পেট বা লাল গালিচা। হলিউডে কিছু বিশেষ অনুষ্ঠানে বরাবর লাল গালিচা ব্যবহার হয়ে আসছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান যেমন অস্কার অ্যাওয়ার্ড, গ্র্যামি পুরস্কার এবং অন্যান্য মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড শোর মতো ইভেন্টগুলোয় প্রায়ই একটি রেড কার্পেট বা লাল গালিচার প্রবেশদ্বার বিছানো থাকে।৷সেলিব্রিটি ও মনোনীত ব্যক্তিরা লাল গালিচায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পা ফেলে হেঁটে যান, আবার সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিতে এবং ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরায় বন্দি হতে দাঁড়ান পছন্দের নান্দনিক ভঙ্গিমায়।
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের একটি এলাকার নাম হলিউড। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্রজগতের প্রাণকেন্দ্র। প্রতি বছর চলচ্চিত্রজগতের সেরাদের সেরা কয়েকজন গুণীকে চলচ্চিত্র ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য দেয়া হয় একাডেমি পুরস্কার বা অস্কার। একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস (AMPAS) কর্তৃক প্রদত্ত এ বার্ষিক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে রুপালি জগতের অসাধারণ কিছু পেশাদার যেমন পরিচালক, অভিনেতা ও লেখকদের কাজকে সম্মানিত করা হয়। আর যে আনুষ্ঠানিক পর্বের মাধ্যমে এ পুরস্কারগুলো দেয়া হয় তা পৃথিবীর সেরা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের অন্যতম একটি। এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয়ীদের অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। অনুষ্ঠানটি ২০০১-১২ পর্যন্ত আয়োজিত হয়েছে হলিউডের কোডাক থিয়েটারে। এরপর ২০১৩তে শুরু হয় লস অ্যাঞ্জেলেসের নকিয়া থিয়েটারে। যদিও এ বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে একডেমি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠিত হয়েছে ১২ মার্চ লস অ্যাঞ্জেলসে হলিউড অ্যান্ড হাইল্যান্ড সেন্টারের ডলবি থিয়েটারে। এটি ছিল অস্কারের ৯৫তম আয়োজন।
হলিউডে রেড কার্পেট প্রথম ব্যবহার হয় ১৯৬১ সালে, সান্তা মনিকা সিভিক অডিটোরিয়ামে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে। যদিও কয়েক বছর ধরে অ্যাওয়ার্ড শোগুলোয় বিভিন্ন ধরনের রেড কার্পেট স্ট্রাকচার দেখানো হচ্ছিল, কিন্তু রেড কার্পেটের প্রথম অফিশিয়াল অভিষেক ঘটেছিল ১৯৬১ সালে সান্তা মনিকা সিভিক অডিটোরিয়ামে বব হোপের সময়। ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো রেড কার্পেটের ব্যবহার ও পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান রঙিন পর্দায় সম্প্রচারিত হয় দর্শকের জন্য, যেখানে আমেরিকার জনগণ তাদের দেশের তারকাদের পায়ের নিচে লালের ছটা দেখতে পেয়েছিল। আর টিভিতে সম্প্রচারের পরেই লাল গালিচার সংস্কৃতি সাধারণ দর্শকের কাছে অবারিত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল।
বর্তমানে রেডকার্পেট ড্রেসিং হলিউডের এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য। কয়েক দশক ধরে শিল্পকলার বিভিন্ন শাখার তারকারা বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ড শো, প্রিমিয়ার ও ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোকে এক রকম মিনিফ্যাশন শোয়ে পরিণত করেছেন। তারকারা ফ্যাশনজগতের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ডের পোশাক পরিধান করে উপস্থিত হন। তারপর সে পোশাকগুলোকে তারা সংবাদের শিরোনাম তৈরিতে ব্যবহার করেন। রেড কার্পেট শৈলী তাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তারে কেমন ভূমিকা পালন করেছে তা স্বীকার না করলে নির্দিষ্ট কিছু তারকাদের সাফল্যের সঠিক পরিমাপ করা কঠিন হবে। এক্ষেত্রে বলা যায় গুইনেথ প্যালট্রো, রিহানা ও জেনিফার লোপেজের মতো কয়েকজনের নাম। চলচ্চিত্র অভিনেতা ও সংগীতশিল্পীদের ক্ষেত্রে সমসাময়িক ট্রেন্ডগুলোকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা প্রকৃত অর্থে তাদের সৃজনশীল কাজের অভ্যর্থনার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এবং এতে শুধু তারাই উপকৃত হন না, সেই সঙ্গে লাভবান হয় আরো কয়েক শ্রেণীর মানুষ। প্রথম সারির ব্র্যান্ডগুলো একজন ডিজাইনারের উদ্ভাবনকে বাস্তব জগতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তথাকথিত সেলিব্রিটি অ্যাম্বাসেডরকে ব্যবহার করে কানেক্টিং তারের মতো, যারা ডিজাইনারের কাজকে বৃহত্তর জনসমাজের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তোলে। পর্দায় উপস্থিত অভিনেতাদের আড়ালে পর্দার পেছনে কাজ করে যাওয়া একটি দল থাকে, যেমন তাদের স্টাইলিস্ট, মেকআপশিল্পী, প্রযুক্তি ও কারিগরি কর্মী এবং আরো অনেক মানুষ। এসব মানুষ অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে বহুল প্রচারিত প্রতিটি রেড কার্পেট ইভেন্টের দিকে। এমনকি এসব মানুষের বাড়ির লোকেরাও ভীষণ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থাকে সরাসরি সম্প্রচারিত রেড কার্পেট শোর দিকে। তারা তারকাদের শরীরে পরিহিত প্রতিটি গাউন এবং পায়ের হিল পর্যবেক্ষণ করে গভীর মনোযোগে। তাদের পোশাকের প্রতিটি সুতাকে ব্যবচ্ছেদ করে হিসাব কষতে থাকে আগামী আয় ও মুনাফার পরিমাণ।
হলিউডের রেড কার্পেট শোয় ঘটে যাওয়া কয়েকটি বিশেষ ঘটনা—
১৯৯৭ সালের অস্কারে নিকোল কিডম্যান পরিহিত পোশাককে দারুণভাবে কটাক্ষ করেন অভিনেত্রী জোয়ান রিভারস। রেড কার্পেটে সাক্ষাৎকারের সময় তিনি নিকোল কিডম্যানকে গির্জার নানদের মতো হলুদ রঙের একটি লম্বা গাউন পরে আসতে দেখে চিৎকার করে উঠেছিলেন। জোয়ান বলেন, ‘নিকোল! আমাকে বলো তো কেন তুমি এমন বিশ্রী রঙের একটা পোশাক পরে এসেছ!’ নিকোল কিডম্যান তাকে উপেক্ষা করে পাশ দিয়ে হেঁটে চলে যান। জোয়ান আবার বলেন, "‘এ রঙ আমি ঘৃণা করি! আমার বমি পেয়ে যাচ্ছে!’ যদিও নিকোল কিডম্যানের সে পোশাকটি তার মূল্যমানের জন্য সর্বকালের সেরা অস্কারের পোশাকের তালিকায় অমর হয়ে আছে। এমনকি সে পোশাকের নিজস্ব উইকিপিডিয়ায় এন্ট্রিও আছে এখন।
হলিউড অস্কারের রেড কার্পেট অনুষ্ঠানে অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলির বেশকিছু স্মরণীয় মুহূর্ত জমা হয়েছে এ পর্যন্ত। যেমন গলার লকেটে রাখা প্রেমিকের তাজা রক্ত নিয়ে রেড কার্পেটে দাঁড়ানো, কিংবা পা দেখানো পোশাক পরে উপস্থিত হওয়া। কিন্তু ২০০০ সালে রেড কার্পেটে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার সময় তিনি তার ভাই জেমস হ্যাভেনকে যেভাবে নিবিড় চুম্বন করেছিলেন, সেটিকে ধরা হয় চমকের শীর্ষ হিসেবে। যদিও পরে অ্যাঞ্জেলিনা ডেইলি মেইলকে বলেছেন যে ব্যাপারটি আসলে বিশেষ কিছু ছিল না। বরং"সেটি ছিল খুব সহজ কিছু ও সুন্দর।"
২০০৩ সালে মেন ইন ব্ল্যাক মুভির প্রিমিয়াম শোয় ভিটালি সেদিউক নামের একজন ইউক্রেনিয়ান প্রাংকস্টার ও সাংবাদিক অভিনেতা উইল স্মিথকে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেন। উইল স্মিথ তখন সে সাংবাদিককে চড় মারেন। ২০২২ সালের অস্কার পুরস্কারের অনুষ্ঠানে আবারো কাউকে চড় মারেন এ অভিনেতা। এবার তিনি চড় মেরেছেন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ক্রিস রকের গালে। কারণ ক্রিস রক উইল স্মিথের স্ত্রী জাদা পিংকেট স্মিথের কামানো মাথা নিয়ে কৌতুক করেছিলেন।
যদিও লাল রঙটি রক্তের সমার্থক, যা দৃঢ়তা, প্রাচুর্য, আভিজাত্য, রাজকীয়তা কিংবা সমৃদ্ধতা বোঝায়। দূর থেকে দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম প্রতিটি রক্তাভ লাল রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড। কিন্তু রেড কার্পেট বা লাল গালিচার সংবর্ধনা মানে কেবল লাল রঙের দুর্দান্ত দাপটকে বোঝায় না। একজন শিল্পীর কাছে চূড়ান্ত সম্মাননার স্বীকৃতিস্বরূপ রেড কার্পেটে দাঁড়ানো এবং রেড কার্পেট পর্যন্ত নিজের পা দুটিকে পৌঁছাতে পারার অর্থ নিজেকে একটা উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। হলিউডে চলচ্চিত্র জগতে গুণী শিল্পীদের সেরা সংবর্ধনায় লাল রঙটি অনেক বছর ব্যবহার হলেও ছয় দশকেরও বেশি সময়ের আয়োজনে এ বছর প্রথমবারের মতো ভিন্ন রঙের কার্পেট ব্যবহার করেছে কর্তৃপক্ষ। ২০২৩ সালের হলিউড অস্কারে লাল গালিচার বদলে বিছানো হয়েছে একটি শ্যাম্পেন বা বেজ রঙের কার্পেট। বহু বছরের ঐতিহ্যবাহী রেড কার্পেটের রঙ আচমকা বদলে যাওয়ার কারণ হিসেবে একাডেমির পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে অস্কারের কার্পেটের রঙ লাল থেকে শ্যাম্পেনে পরিবর্তন করার কারণ হচ্ছে অনুষ্ঠানটি এখন দিনের বেলা থেকে রাতে স্থানান্তর হয়েছে। আর আড়ম্বরপূর্ণ এমন আয়োজনে আসা শিল্পীদের ভারী ও জাঁকজমকপূর্ণ সজ্জাকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলতে লালের চেয়ে একটি ফ্যাকাশে রঙের ব্যাকগ্রাউন্ড অধিক কার্যকর হবে বলে মনে করেন তারা।
তবে সমালোচকদের কেউ কেউ মনে করেন যে গত বছর অস্কারের রেড কার্পেটে ঘটে যাওয়া থাপ্পড় দুর্ঘটনার কারণে এবারে কর্পেটের রঙই বদলে দেয়া হয়েছে। লাল যেহেতু একটি উত্তেজক বর্ণ, তাই বিপরীতে শ্যাম্পেন অথবা বেজের মতো মাটির কাছাকাছি রঙ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত থাকতে সাহায্য করবে। সম্ভবত হলিউডের আয়োজক কমিটির সদস্যরা অস্কারের মতো সম্মানজনক অনুষ্ঠানে আর কোনো রক্তারক্তি বা চড়চাপড়ের মতো অনভিপ্রেত ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না। তবে কার্পেটের রঙ যা-ই হোক না কেন, সম্মাননার মূল্য তাতে এতটুকুও কমবে না, এতে কোনো সন্দেহ নেই। হয়তো হলিউডের এ শ্যাম্পেন রঙা কার্পেটই অদূরভবিষ্যতে ফিকে করে দিতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রেড কার্পেটের একচ্ছত্র গর্বিত অহংকারের রক্তিম দ্যুতিকে।
লুনা রাহনুমা: লেখক




