পানের রসে ঠোঁট লাল হয়। আবার তেমন মানুষ হলে ঠোঁটের স্পর্শেও পান লাল হতে পারে! যেমনটা ধরা পড়েছিল মধ্যযুগের মহাকবি আলাওলের চোখে। তার বিখ্যাত ও সর্বশ্রেষ্ঠ ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে পদ্মাবতীর রূপের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘তাম্বুল রাতুল হৈল অধর পরশে’। তাম্বুল অর্থ পান। আর রাতুল মানে লাল। অর্থাৎ, পদ্মাবতীর অধর এতটাই লাল যে তার তীব্রতায় পানও লাল হয়ে যায়। সতেরো শতকের কবি আলাওলের কাব্যের এ পঙ্ক্তি থেকে লাল রঙের প্রতি মানুষের সহজাত আকর্ষণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এ আকর্ষণ অন্য যেকোনো রঙের তুলনায় অনেক বেশি। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানবসম্প্রদায়ের কাছে লাল রঙ বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদা পেয়ে আসছে। সাদা ও কালোর পর মানুষ প্রথম লাল রঙই চিনতে শিখেছিল। বলা যায়, মানুষের মনোজগৎ প্রথম রঙিন হয়েছিল লাল রঙের মাধ্যমে। শিশুরা প্রথম লাল রঙই দেখে। তাই শিশুদের কাছে লাল জামা, লাল জুতা, লাল গাড়িসহ লাল রঙের যেকোনো কিছুই সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে সাময়িক বর্ণান্ধ হওয়া কোনো মানুষও সুস্থ হওয়ার পর প্রথম লাল রঙ দেখে। মনোবিজ্ঞানেও লাল রঙের আলাদা গুরুত্ব আছে। এ কারণে বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করতে লাল রঙ ব্যবহার করা হয়। কারণ লাল রঙ অনেক দূর থেকে দেখা যায়। একই সঙ্গে তা দর্শকের মনোজগতে অন্য যেকোনো রঙের তুলনায় অধিকতর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে। এটি একই সঙ্গে প্রেম ও ক্রোধের প্রতীক। লাল রঙের এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই তা রাজকীয় ও অভিজাত রঙ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সম্রাটদের কাছে লাল রঙ ছিল অত্যন্ত প্রিয় ও আদরের। রোমান সম্রাট শার্লেমাইন তার প্রাসাদ লাল রঙে রঞ্জিত করেছিলেন। তার ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে তিনি লাল জুতা পরিধান করতেন। গুজব আছে, তার চুলও নাকি ছিল লাল! হুন থেকে সুই সাম্রাজ্য পর্যন্ত ১৩ জন চীনা সম্রাটের ১১ জনই তাদের রাজকীয় ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে লাল আলখাল্লা পরিধান করতেন। ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়েরও লাল রঙের প্রতি দুর্বলতা ছিল। খ্রিস্টধর্মের চিত্রকলায় যিশুখ্রিস্ট ও ধর্মীয় কারণে আত্মোৎসর্গকারীদের রক্তের প্রতীক হিসেবে লাল রঙ ব্যবহার করা হয়েছিল। ক্যাথলিক কার্ডিনালদের পোশাকের রঙও লাল। সমগ্র মধ্যযুগজুড়ে লাল রঙের প্রাধান্যই ছিল সবচেয়ে বেশি।
সূচনালগ্ন থেকে মানবসভ্যতা এ পর্যন্ত বহু পর্যায় পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু লাল রঙের গুরুত্ব ও মর্যাদায় কোনো হেরফের ঘটেনি। গবেষণায় উঠে এসেছে, আজ থেকে ৪০ হাজার বছর আগেও মানুষ গুহার দেয়াল রাঙাতে বিভিন্ন উপায়ে লাল রঙ তৈরি করত। তখন মানুষ শিকার করে ও খাদ্য কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করত। গিরিমাটি ব্যবহার করে তারা লাল রঙ তৈরি করত। প্রাচীন চিত্রকলায় তাই লাল রঙের প্রাধান্য। সব মহাদেশেই প্রাচীন মানুষেরা লাল গিরিমাটি ব্যবহার করে গুহাচিত্র আঁকত। সে সূত্রে বলা যায়, সবচেয়ে প্রাচীন রঙ হলো লাল।
প্রস্তর যুগের অনেক কবরে লাল রঙের চিহ্ন দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কবরগুলোকে বিশেষায়িত করার জন্য লাল রঙ ব্যবহার করা হতো। যেন ভুল করে কেউ তা খনন না করে। অনেকে বিশ্বাস করেন, দাহ হওয়া ব্যক্তির চুল, চামড়া কিংবা জামা রঙিন করতে লাল রঙ ব্যবহার করা হতো। মন্দ আত্মাদের দূরে সরিয়ে রাখতেই ছিল এমন আয়োজন। যা-ই হোক না কেন, এ থেকে বোঝা যায় যে প্রাচীনকাল থেকেই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে লাল রঙের গুরুত্ব ছিল।
রোমান মিথোলজিতে লাল রঙ বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। সেখানে এটি একই সঙ্গে রক্ত ও সাহসিকতার প্রতীক। যুদ্ধের দেবতা মার্সের প্রিয় রঙ লাল। সেনাবাহিনীর প্রতীকও লাল রঙ। রোমান সৈন্যদের উর্দি ছিল লাল। গ্ল্যাডিয়েটরদের লাল রঙের পোশাকেই সাজানো হতো। রোমান সেনাপতিদের গায়ে থাকত লাল আলখাল্লা। বিজয় উদযাপন করতে তারা সারা শরীর লাল রঙে রাঙিয়ে নিত। রোমান সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠানে কনেরা লাল চাদর পরিধান করত। এটিকে বলা হতো ‘ফ্ল্যামিয়াম’। বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষেও কনেরা লাল শাড়ি পরিধান করে। তাছাড়া লাল চুড়ি, লাল টিপ ইত্যাদির প্রতি আকর্ষণ তো আছেই। সিঁদুর, আলতার রঙ যে লাল, তা তো অস্বীকার করার উপায় নেই। চীনেও তার ব্যতিক্রম নয়। এখনো চীনে বিয়ের সময় কনেরা লাল গাউন পরে। তাদের লাল দোলায় চড়িয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির করা হয়। তারা লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে মঞ্চে ওঠে। আমাদের দেশেও এখন বিয়ের অনুষ্ঠানে লাল গালিচার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। এ থেকে বোঝা যায়, লাল গালিচা অস্কার বা কোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির আবিষ্কার নয়। প্রকৃত অর্থে, মানুষের লাল গালিচায় হাঁটার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর আগে প্রকাশিত ‘আগামেমনন’ নাটকে। এর রচয়িতা বিখ্যাত গ্রিক নাট্যকার এসকাইলাস। গ্রিক বীর আগামেমনন ট্রয় নগরী জয় করে নিজ শহর মাইসেনায় ফিরে এলে তার স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা তাকে ‘লাল গালিচা সংবর্ধনা’ দিয়েছিলেন। তারপর কালক্রমে রাষ্ট্রপ্রধান, রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা অন্য কোনো কারণে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংবর্ধনায় লাল গালিচা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। চীনে লালকে সবসময় আনন্দ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীনা সম্রাটরা তাদের ব্যক্তিগত গণকদের কাছে জানতে চাইতেন, কোন রঙটি তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি উন্নতি ও সৌভাগ্য বয়ে আনবে। উত্তর ছিল একটাই—লাল। ঝৌ, হান, জিন, সং ও মিঙ সাম্রাজ্যে রাজকীয় অনুষ্ঠানে লাল রঙের ব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি। চীনাদের কাছে সুখের রঙ লাল। এ কারণে চীনাদের শেষকৃত্যে লাল রঙ নিষিদ্ধ। চীনা দর্শনে লাল রঙ আগুনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। চীনাদের কাছে এটি একই সঙ্গে আগ্রাসন, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের প্রতীক। লাল ঘোমটার আড়ালেই চীনা দম্পতির দুই জোড়া ঠোঁটের প্রথম মেলবন্ধন ঘটে। প্রথম সন্তানের জন্মের পর চীনা দম্পতিকে অভিনন্দন জানিয়ে লাল ডিম উপহার দেয়ার রীতি প্রচলন আছে। গ্রিস, আলবেনিয়া ও আর্মেনিয়ায়ও কনেরা লাল ঘোমটায় মুখ ঢেকে রাখে। এক্ষেত্রে ভারতবর্ষের নারীদের কথা তো বলাই বাহুল্য।
রোমানদের কাছে লাল ছিল রক্তের প্রতীক। আর রক্ত তো কেবল মৃত্যুকেই বোঝায় না, সুস্থ ও সচল জীবনের বার্তাও বহন করে। লাল উর্বরতার প্রতীক। মানুষের হৃৎপিণ্ডের রঙ লাল। তাই ভালোবাসার প্রতীকও লাল। এমনও ধারণা ছিল, লাল অলংকারে সজ্জিত থাকলে ভালোবাসা বেড়ে যায়। নৈতিকতার প্রতীক হিসেবেও লাল রঙকে বিবেচনা করা হতো।
যুদ্ধের ময়দানে লাল পতাকার ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। অনিবার্য আক্রমণ বোঝাতে লাল পতাকা উত্তোলন করা হতো। লাল নিশান উড়িয়েই প্রতিপক্ষ দুটি দল পরস্পরের মুখোমুখি হতো।
এবার আসা যাক বিপ্লবের প্রসঙ্গে। এ কথা তো কারো অবিদিত নয় যে বিপ্লবের রঙ লাল। বিপ্লবীরা একে অন্যকে ‘লাল সালাম’ বলে সম্বোধন করেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অভিধাই তো হয়ে গিয়েছিল ‘রেড মওলানা’। ফরাসি বিপ্লবের সময় বিপ্লবীরা লাল টুপি পরতেন এবং লাল পতাকা বহন করতেন। বলশেভিক হোক কিংবা চীনা, সারা বিশ্বের সব বিপ্লবীর সাধারণ রঙ লাল। সে কারণেই রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনামসহ বিশ্বের অনেক দেশের জাতীয় পতাকায় লাল রঙ স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার মাঝখানেও রয়েছে লাল বৃত্ত, যা একই সঙ্গে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও উদিত সূর্যের প্রতীক। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার লাল বৃত্ত যুগপৎ অতীত বিভীষিকাময় স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ আশার প্রতীক।
লাল রঙ সুখ, সমৃদ্ধি, সম্মান, সাহস ও কৌমার্যের প্রতীক। আবার এসবের বিপরীত বিষয় বোঝাতেও লাল রঙ ব্যবহার করা হয়। লাল রঙ দিয়ে কী বোঝানো হবে, তা সাংস্কৃতিক পরিপ্রেক্ষিতের ভিন্নতার ওপর নির্ভর করে। এভাবে নানামাত্রিক উপস্থাপনে সুপ্রাচীন কাল থেকে লাল রঙ সবচেয়ে অভিজাত ও মর্যাদাপূর্ণ রঙের স্থান দখল করে আছে।
মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন: লেখক





