আয়তন ৫০ হাজার বর্গফুট। বিছাতে সময় লাগে ৯০০ কর্মঘণ্টা। কেবল উৎপাদন খরচই আনুমানিক ২৪ হাজার ৭০০ ডলার। পরিবহন, স্থাপন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় তো আছেই। বলছি অস্কারের লাল গালিচার কথা। সম্ভবত এটিই বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত গালিচা।

১৯২২ সাল। হলিউডের ইজিপশিয়ান থিয়েটারে ‘রবিন হুড’ সিনেমার প্রিমিয়ার। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ডগলাস ফেয়ারব্যাঙ্কস। প্রিমিয়ার উপলক্ষে এক অভিনব কাণ্ড করে বসলেন ইজিপশিয়ান থিয়েটারের মালিক সিড গ্রম্যান। অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে তিনি লাল গালিচা বিছিয়ে দিলেন। সেই প্রথম হলিউডে লাল গালিচার ব্যবহার। তার পর থেকে হলিউডের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লাল গালিচাই হয়ে উঠল প্রধান আকর্ষণ। তারই ধারাবাহিকতায় অস্কারে লাল গালিচার ব্যবহার শুরু হয়। তবে তা আরো কয়েক দশক পরে।

অস্কারের ৩৩তম আসরে প্রথম লাল গালিচা ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৬১ সালের ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেবারের অস্কার আসর। এর সঞ্চালক ছিলেন বব হোপ। কিন্তু তখনো অস্কারের রঙিন সম্প্রচার শুরু হয়নি। তাই সেবার অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরাই কেবল অস্কারের লাল গালিচার প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছিলেন। টেলিভিশনের দর্শক তা বুঝতে পারেননি। তাদের আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৬৬ সালে অস্কারের রঙিন সম্প্রচার শুরু হয়। সেটি ছিল ৩৮তম আসর। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে লাল গালিচার প্রকৃত রূপ। তার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয় দর্শক। সেবারও অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছিলেন বব হোপ। 

অস্কারের অন্যতম আকর্ষণ লাল গালিচা। এটি এমনভাবে স্থাপন করা হয়, যেন কোথাও সামান্যতম ভাঁজও না থাকে। হাঁটার সময় অভিনয়শিল্পীদের যেন ন্যূনতম কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে লাল গালিচা স্থাপন করা হয়। তবে অস্কারের এ লাল গালিচা ঠিক লাল নয়। রঙটি অনেকটা ‘বার্গান্ডি’র কাছাকাছি। কালচে লাল। নির্দিষ্ট মাত্রায় লালের সঙ্গে অন্য রঙ মিশিয়ে অস্কারের গালিচার রঙটি তৈরি করা হয়। তবে এ মিশ্রণের অনুপাত খুব সতর্কতার সঙ্গে গোপন রাখা হয়। অস্কারে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত বিশেষ এ গালিচার রঙ যেন অন্য কেউ নকল করতে না পেরে, তাই এমন কঠোর গোপনীয়তা। অস্কারের গালিচার এ লালের সঙ্গে অন্য কোনো লাল রঙ মিলবে না। এ লাল রঙকে বলা হয় ‘একাডেমি রেড’। অস্কারের আনুষ্ঠানিক নাম ‘একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস’। সেখান থেকেই ‘একাডেমি রেড’। কেবল রঙের বিষয়টিই নয়, অস্কারের লাল গালিচা তৈরির ক্ষেত্রেও নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। আরো বিষয় আছে। প্রতি বছর অস্কারের জন্য নতুন কার্পেট তৈরি করা হয়। ব্যবহারের পর কার্পেটটি সতর্কতার সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলা হয়। পুরনো কার্পেটের ছোট একটি টুকরোও কারো কাছে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই বলা যায়, অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি পর্বে লাল গালিচা স্থাপন যেমন জটিল একটি প্রক্রিয়া, তেমনি অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে তা ধ্বংস করাটাও একটি দক্ষযজ্ঞ। অস্কারের লাল গালিচার ক্ষেত্রে এমন গোপনীয়তা বজায় রাখার কারণে তার নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানা যায় না। এমনকি যে কারখানায় গালিচাটি তৈরি করা হয়, তার নামটি পর্যন্ত জানা যায় না। কেবল এতটুকু জানা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ডাল্টন শহরে কারখানাটি অবস্থিত। ডাল্টনকে বলা হয় ‘গালিচার রাজধানী’। ‘কার্পেট ক্যাপিটাল অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। তবে অস্কারের জন্য লাল গালিচা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের নাম বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘আমেরিকান টার্ফ অ্যান্ড কার্পেট’। সংক্ষেপে এটিসি। এটি মূলত বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গালিচা ও স্টেডিয়ামের জন্য কৃত্রিম ঘাস নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সিগনেচার সিস্টেমসের একটি বিভাগ। ১৯৯২ সাল থেকে অস্কারের জন্য লাল গালিচা তৈরি করে আসছে আমেরিকান টার্ফ অ্যান্ড কার্পেট। এ প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন গ্লোব ও গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসের জন্যও গালিচা তৈরি করে। তবে অস্কারের ব্যাপারটি বিশেষ। অস্কারের লাল গালিচা নিয়ে ২০১৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছিল লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস। প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সিগনেচার সিস্টেমসের ন্যাশনাল ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজার মইসেস আর্তেগা বলেছিলেন, ‘আমরা বিভিন্ন ইভেন্টে কাজ করছি। কিন্তু অস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কোনোটিই নয়।’ বিশেষ এ লাল গালিচা যেন অস্কার কর্তৃপক্ষের একেবারে নিজস্ব সম্পত্তি। তাই এমন গোপনীয়তা। এ প্রসঙ্গে অস্কারের একজন সহযোগী প্রযোজক লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে বলেছিলেন, ‘শুনুন, একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস কিন্তু একটাই।’ তার মতে, যে কয়েকটি বিষয় একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসকে বিশেষত্ব দিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে লাল গালিচা অন্যতম। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের ২০১৭ সালের এ প্রতিবেদন অনুসারে, সে বছর অস্কারের লাল গালিচা বিছাতে ১৮ জন দক্ষ কর্মীর একটি দলের ৯০০ কর্মঘণ্টা লেগেছিল।

অস্কারের লাল গালিচাটি কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কিছু অনুমান আছে। অস্কারের এ গালিচা তৈরির প্রধান কাঁচামাল নাইলন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় নাইলন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএএসএফ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে তাদের কারখানা আছে। সম্ভবত অস্কারের লাল গালিচা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় নাইলন বিএএসএফই সরবরাহ করে। এবার আসা যাক রঙ তৈরি প্রসঙ্গে। অস্কারের লাল গালিচার রঙ প্রাকৃতিক হতে পারে। আবার সিনথেটিকও হতে পারে। প্রাকৃতিকভাবে লাল রঙ সাধারণত বিশেষ ধরনের লতা ও পোকা থেকে তৈরি করা হয়। কিন্তু অস্কারের গালিচার লাল রঙটি যেহেতু বিশেষ এবং তার নির্মাণ প্রক্রিয়া কঠোর গোপনীয়তার মোড়কে আবৃত, তাই এ লাল রঙ কোথা থেকে আহরণ করা হয়, তা হয়তো আমরা কখনই জানতে পারব না।

নাইলন, রঙ, গ্লুসহ সব কাঁচামাল জড়ো হওয়ার পর জর্জিয়ার ডাল্টনে অবস্থিত কারখানায় অস্কারের লাল গালিচা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ কারখানায় গালিচার প্রায় ৩০টি রোল তৈরি হয়। প্রতি রোলের ওজন ৬৩০ পাউন্ড। লাল গালিচা তৈরি সম্পন্ন হওয়ার পর শুরু হয় পরিবহন ব্যবস্থা।

কীভাবে লাল গালিচা ডাল্টনের কারখানা থেকে অস্কারের অনুষ্ঠানস্থল পর্যন্ত যায়, তাও নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রেও তাই অনুমানের আশ্রয় নিতে হয়। সম্ভবত আমেরিকান টার্ফ অ্যান্ড কার্পেট কোম্পানি ফেডএক্স বা ডিএইচএলের মতো পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি করে। এমন নির্ভরযোগ্য কোনো পরিবহন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই ডাল্টনের কারখানা থেকে লাল গালিচার রোলগুলো লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়্যারহাউজে নিয়ে আসা হয়। সেখানে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় রোলগুলো সংরক্ষণ করা হয়। কোনো সন্দেহ নেই যে লাল গালিচা পরিবহনের ক্ষেত্রে পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠান সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে। পরিবহন থেকে শুরু করে লাল গালিচা বিছানো পর্যন্ত দক্ষ কর্মীদের একটি দল সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকে। প্রয়োজন অনুসারে সময়মতো সবকিছু যেন প্রস্তুত থাকে, তা তারা নিশ্চিত করে। অস্কারের অনুষ্ঠানস্থলে আমেরিকান টার্ফ অ্যান্ড কার্পেট কোম্পানির প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন। তারা গালিচা বিছানোর জটিল প্রক্রিয়াটি সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করেন।

একবার ব্যবহারের পরই অস্কারের লাল গালিচা ধ্বংস করে ফেলা নিয়ে সমালোচনা আছে। বলা হয়, সারা বিশ্বে অস্কারই সবচেয়ে বেশি কার্পেট বর্জ্য তৈরি করে। এ প্রসঙ্গে নিউইয়র্কের পার্সনস স্কুল অব ডিজাইনের ফ্যাশন ডিজাইন অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক টিমো রিসানেন লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে বলেছিলেন, ‘কার্পেট বা যেকোনো টেক্সটাইলের মাত্র একবার ব্যবহার টেকসই নয়।’ অস্কার ছাড়া অন্য সব বড় অ্যাওয়ার্ডস শো এরই মধ্যে লাল গালিচা পুনর্ব্যবহার শুরু করেছে।

অস্কারের লাল গালিচা নিজেই এক বিশাল ইন্ডাস্ট্রিতে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বের সেরা ব্র্যান্ডগুলো এমন এক গালিচাকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা সাজায়, যেটি সম্পর্কে তারা প্রায় কিছুই জানে না। লাল গালিচায় হেঁটে বিশ্বজুড়ে ভক্তদের প্রশংসা কুড়াচ্ছেন যেসব অভিনয়শিল্পী, তারাও এর নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। তাই অস্কারের লাল গালিচার গোপনীয়তাই হয়ে উঠেছে এর বড় আকর্ষণ।

আহমদ শাকিল: লেখক