ট্রয় নগরী জয় করে ফিরেছেন গ্রিক বীর আগামেমনন। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন তার স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা। আগামেমননের চলার পথে বিছানো হলো লাল গালিচা। গ্রিক পুরাণ অনুসারে, মর্ত্যের মরণশীল মানুষের সেই প্রথম লাল গালিচায় হাঁটা। তার আগ পর্যন্ত এমন অভ্যর্থনা কেবল দেবতাদের জন্য নির্ধারিত ছিল। স্বর্গপুরীর মহান দেবতাদের পবিত্র পদযুগল যেন মর্ত্যের ধুলা লেগে কলুষিত না হয়, তার জন্যই ছিল এমন আয়োজন। কিংবা তাদের চলার পথে ছিটানো থাকত ফুলের পাপড়ি। এমনভাবে, যেন তাদের পা মাটিতে না লাগে। সেটাই ছিল চিরাচরিত রীতি। কিন্তু নিয়ম ভাঙলেন আগামেমনন। প্রথম মানুষ হিসেবে নিলেন লাল গালিচা অভ্যর্থনা। আগামেমনন তখনো জানেন না, তাকে এ অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে মূলত মৃত্যুর দিকে!
গ্রিসের খ্যাতনামা নাট্যকার এসকাইলাস। তার রচিত বহুল আলোচিত ট্রিলজি ‘ওরেস্টিয়া’। এর প্রথম নাটক ‘আগামেমনন’। এটিকে এসকাইলাসের সবচেয়ে সেরা রচনা বলে বিবেচনা করা হয়। তর্কসাপেক্ষে আগামেমনন সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রিক ট্র্যাজেডি। গ্রিক পুরাণ অবলম্বনে নাটকটি রচনা করেছেন এসকাইলাস। রচনাশৈলী, ভাষা, সংলাপ ও চরিত্রায়নের দিক থেকে এর জুড়ি মেলা ভার। নাটকের নাম থেকেই পরিষ্কার, এর প্রধান চরিত্র আগামেমনন। মূলত তিনি ও তার স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে নাটকের কাহিনী। আর আছে আগামেমননের মেয়ে ইফিজেনিয়া ও ক্লাইটেমনেস্ট্রার প্রেমিক এজিস্থাস। কাহিনীর প্রয়োজনে আছে আরো অনেক চরিত্র। কিন্তু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, আগামেমনন নাটকের মুখ্য চরিত্র আসলে একটি গালিচা। খুব সম্ভবত ‘লাল গালিচা’। সম্ভবত লেখার কারণ হলো, আগামেমনন নাটকে উল্লিখিত গালিচাটির রঙ কী ছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেক গবেষকের মতে, গালিচাটির রঙ ছিল বেগুনি। তবে গালিচাটির রঙ যে লাল ছিল, এমন মতের প্রাধান্যই বেশি। আবার যারা বেগুনি বলে দাবি করেছেন, তারাও স্বীকার করেছেন যে বেগুনি হলেও তাতে লালের ছোঁয়া ছিল। আর এ লাল গালিচাই আগামেমনন নাটকের ট্র্যাজিক কাঠামো তৈরিতে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। তাই নাটকটিতে অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে একটি লাল গালিচা!
বিজয়ী বীর আগামেমনন! তার পা কি মাটিতে পড়তে দেয়া চলে! তাই তো তার হাঁটার জন্য লাল গালিচার ব্যবস্থা করলেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। তবে ক্লাইটেমনেস্ট্রার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। স্বামীকে হত্যা করার সংকল্প করেছিলেন তিনি। আর সে হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয়ার জন্যই তিনি আগামেমননকে লাল গালিচার ফাঁদে বন্দি করেছিলেন। বিষয়টা এমন, আগামেমনন যেহেতু মর্ত্যের মানুষ হয়ে স্বর্গের দেবতাদের মতো সম্মান নিয়েছেন, সেহেতু তিনি সীমা লঙ্ঘন করেছেন। আর সীমা লঙ্ঘনকারীকে তো শাস্তি পেতেই হবে। আসলে আগামেমননকে হত্যার পর যেন মনে কোনো অনুশোচনা না জাগে, তাই কৌশলে তাকে দিয়ে অপরাধটি করিয়ে নিয়েছিলেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। মানুষের প্রথম লাল গালিচা অভ্যর্থনার সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে একটি ষড়যন্ত্র! আর একটি অপরাধ!
প্রশ্ন হলো, আগামেমননকে কেন হত্যা করতে চেয়েছিলেন এবং হত্যা করেছেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা? এর উত্তর মিলবে ট্রয়ের যুদ্ধ চলাকালে। যে যুদ্ধ জয়ের জন্য আগামেমনন বলি দিয়েছিলেন তার মেয়ে ইফিজেনিয়াকে। চাতুরীর আশ্রয় প্রথম নিয়েছিলেন আগামেমননই। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জয়ের অভিলাষ তাকে নিজের মেয়েকে বলি দেয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। দেবী আর্তেমিসকে সন্তুষ্ট করে গ্রিক বাহিনীর চলার পথ নির্বিঘ্ন ও নিরুপদ্রব করার জন্যই তিনি এমনটি করেছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, দেবীকে সন্তুষ্ট করতে হলে ইফিজেনিয়াকে বলি দিতে হবে। প্রাচীন গ্রিসের বন্দরনগরী অলিসে ইফিজেনিয়াকে ডেকে পাঠান তিনি। তাকে বলা হয়েছিল, সেখানে তার সঙ্গে গ্রিক বীর অ্যাকিলিসের বিয়ে দেয়া হবে। ইফিজেনিয়া সরল মনে অলিসে যান। সত্য জানার পর পিতার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চান ইফিজেনিয়া। কিন্তু সিদ্ধান্তে অনড় আগামেমনন। এক পর্যায়ে ইফিজেনিয়াও আর আপত্তি করেন না। মেনে নেন নিয়তিকে। আগামেমনন তখন বোঝেননি, মেয়েকে বলি দেয়ার মাধ্যমে তিনি মূলত নিজে বলি হওয়ার পথই তৈরি করছিলেন। কারণ ইফিজেনিয়া মেনে নিলেও তার বলি হওয়াটা একজন মেনে নিতে পারেননি। তিনি ইফিজেনিয়ার মা ক্লাইটেমনেস্ট্রা। কন্যাকে ভালোবাসতেন তিনি। আরেকজনকে ভালোবাসতেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। তার নাম এজিস্থাস। থিয়েস্তেসের পুত্র। থিয়েস্তেসের ভাই আত্রিয়ুস। আগামেমনন আত্রিয়ুসের পুত্র। সে হিসেবে এজিস্থাস তার চাচাতো ভাই। গ্রিসের মাইসেনা নগরের শাসনক্ষমতা নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব। মাইসেনার সিংহাসনে তখন আত্রিয়ুস। থিয়েস্তেসকে সিংহাসনে বসানোর জন্য আত্রিয়ুসকে হত্যা করেছিলেন এজিস্থাস। পিতা-পুত্র মিলে একত্রে রাজ্য শাসন করবেন, এমনই আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু বাদ সাধলেন আগামেমনন। তিনি থিয়েস্তেস ও এজিস্থাসকে সিংহাসনচ্যুত করে ক্ষমতা পুনর্দখল করেছিলেন। সেই চিরশত্রু এজিস্থাসের সঙ্গেই প্রণয়াবদ্ধ হলেন তার স্ত্রী ক্লাইটেমনেস্ট্রা! গভীর সে প্রেম! ট্রয়ের যুদ্ধ পরিচালনার জন্য মাইসেনা ছেড়ে গিয়েছিলেন আগামেমনন। এক দশক ধরে চলেছিল সে যুদ্ধ। আগামেমননের এ সুদীর্ঘ অনুপস্থিতিতে এজিস্থাসের সঙ্গে ক্লাইটেমনেস্ট্রার রসায়ন গড়ে উঠেছিল। তবে এটি যে কেবল স্থানিক দূরত্বের কারণে হয়েছিল, তা নয়। ইফিজেনিয়ার বলিসহ আরো নানা কারণে আগামেমননের সঙ্গে ক্লাইটেমনেস্ট্রার মানসিকতায় যোজন যোজন ফারাক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এতকিছু ভাবার সময় কোথায় আগামেমননের! তিনি তো তখন যুদ্ধ জয়ের স্বপ্নে বিভোর। ট্রয় জয় করেছিলেন বটে আগামেমনন, কিন্তু নিজ পরিবারের কাছেই হেরে গিয়েছিলেন। বিজয়ী বীর হয়েও পরিণত হয়েছিলেন ট্র্যাজিক হিরোতে। তার পরও হয়তো ফিরত ক্লাইটেমনেস্ট্রার মন। কিন্তু ক্যাসান্দ্রার কারণে তা আর সম্ভব হলো না।
ট্রোজান রাজকন্যা ক্যাসান্দ্রা। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ আগামেমনন। তাকে রক্ষিতা হিসেবে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। এ খবর পেয়েছিলেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। তার পক্ষে ক্যাসান্দ্রাকে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। তিনি ক্যাসান্দ্রাকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে শুরু করেন। আগামেমননকে হত্যা করার সংকল্প আরো দৃঢ় হয় ক্লাইটেমনেস্ট্রার। এসব কারণে আগামেমননের নিহত হওয়া ছিল অবশ্যম্ভাবী। আর সে হত্যাকাণ্ড মঞ্চায়িত হয়েছিল লাল গালিচার প্রেক্ষাপটে।
লাল গালিচার ওপর দিয়ে হেঁটে আগামেমনন যখন প্রাসাদে প্রবেশ করেন, ক্যাসান্দ্রা তখনো চ্যারিয়টে বসা। আগামেমনন জানতেন না, কিছুক্ষণের মধ্যেই তাকে হত্যা করা হবে। কিন্তু ক্যাসান্দ্রা জানতেন। তিনি ঘটনা ঘটার আগেই তা দেখতে পেতেন। কিন্তু তার ওপর দেবতা অ্যাপোলোর অভিশাপ ছিল, কেউ তার ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করবে না। তাই ক্যাসান্দ্রা সাহায্য প্রার্থনা করলেও তার সে আহ্বানে কেউ কান দেয়নি। ক্লাইটেমনেস্ট্রার সংকল্প ছিল প্রথম সুযোগেই আগামেমননকে হত্যা করার। তিনি আগামেমননের গোসল করতে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। সেখানে তিনি তাকে জাল দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলেন। উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয় আগামেমননকে। এ কাজে তাকে সাহায্য করেছিলেন প্রেমিক এজিস্থাস। আগামেমননের ভবলীলা সাঙ্গ করার পর ক্যাসান্দ্রাকেও হত্যা করা হয়েছিল। দুজনকে হত্যা করার পর সিংহাসনে বসেন এজিস্থাস। তার রানী হন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। সাত বছর মাইসেনা শাসন করেছিলেন এজিস্থাস। তারপর সিংহাসনের দখল নেন আগামেমননের পুত্র ওরেস্তেস। সে অন্য কাহিনী। আমরা আপাতত আগামেমনের লাল গালিচা অভ্যর্থনা ও তার হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকি।
লাল গালিচা অভ্যর্থনার পেছনে ক্লাইটেমনেস্ট্রার যে চাতুরী, তা ধরতে পারেননি আগামেমনন। কিন্তু কিছুটা ধাক্কা তো খেয়েছিলেন বটেই। তাই তিনি আপত্তি করেছিলেন। লাল গালিচায় হাঁটতে ইতস্তত করছিলেন আগামেমনন। প্রমাদ গুনলেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। তার সব পরিকল্পনা বুঝি ভেস্তে যায়। কিন্তু মানসিকভাবে শক্তিশালী চরিত্র ক্লাইটেমনেস্ট্রা। তিনি ঘাবড়ালেন না। বরং নানাভাবে আগামেমননকে লাল গালিচায় হাঁটতে প্ররোচিত করলেন। তিনি বোঝাতে লাগলেন, আগামেমনন বিজয়ী বীর। তাই তার লাল গালিচায় হাঁটা দোষের কিছু নয়। অবশেষে ক্লাইটেমনেস্ট্রার ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের কাছে হার মানলেন আগামেমনন। তিনি পা রাখলেন লাল গালিচায়। হেঁটে গেলেন প্রাসাদ পর্যন্ত। হাসি ফুটল ক্লাইটেমনেস্ট্রার ঠোঁটের কোণে।
আগামেমনন ভুল করেছিলেন। অজ্ঞানতাবশত নয়। তাহলে হয়তো ক্ষমা পেয়ে যেতেন। কিন্তু জেনেবুঝেই ভুল করেছিলেন আগামেমনন। তিনি জানতেন, লাল গালিচায় হাঁটা মানে দেবতাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে অমান্য করা। তাছাড়া এমন আচরণ ব্যক্তির ঔদ্ধত্যকেই প্রকাশ করে। অহংকারের বশবর্তী কোনো মানুষের পক্ষেই কেবল এমন আচরণ করা সম্ভব। আর কে না জানে, ‘অহংকার পতনের মূল’। আগামেমননের ক্ষেত্রে অহংকার মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। কিন্তু বিজয়গর্বে মদমত্ত আগামেমনন। তাতে হাওয়া দিয়েছিলেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। তাই আগামেমননের সাময়িক বিচ্যুতি ঘটেছিল। আগামেমনন ভাবলেন, তিনি যুদ্ধবিজয়ী বীর। তাই তার জন্য এমন অভ্যর্থনাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, মাটির মানুষের পদবি যা-ই হোক না কেন, তার পক্ষে দেবতাদের জন্য বরাদ্দ লাল গালিচায় হাঁটা সুস্পষ্ট সীমা লঙ্ঘন। কিন্তু অহংকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায় তার চিন্তা। তাই তিনি ক্লাইটেমনেস্ট্রার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। স্বামীর এমন অহংকারী চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত ছিলেন ক্লাইটেমনেস্ট্রা। স্বামীকে প্ররোচিত করতে সে জ্ঞানকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন।
আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে রচিত হয়েছিল গ্রিক ট্র্যাজেডি আগামেমনন। সেখানেই প্রথম লাল গালিচার উল্লেখ পাওয়া যায়। যার ওপর হেঁটে দেবতাদের অভিশাপ টেনে নিয়েছিলেন আগামেমনন। কিন্তু বর্তমানে তো লাল গালিচা অভ্যর্থনা রীতিতে পরিণত হয়েছে। লাল গালিচায় হাঁটা মানুষের গায়ে কেন আর অভিশাপ লাগছে না? তবে কি এক আগামেমননের বলিতেই সন্তুষ্ট দেবতারা! যে লাল গালিচায় হেঁটে আগামেমনন মৃত্যুকে টেনে নিয়েছিলেন, তার জীবনের দামেই কি তবে দেবতাদের কাছ থেকে লাল গালিচায় হাঁটার অধিকার আদায় করে নিয়েছে দুনিয়ার মানুষ? কে জানে!
নিজাম আশ শামস: লেখক ও অনুবাদক





